বিশেষ-সংবাদ
স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিচ্ছে সরকার
দারিদ্র্য, অভিবাসন, প্রতিবন্ধকতা কিংবা পারিবারিক সংকটের কারণে দেশের হাজারো শিশুর কাছে স্কুলশিক্ষা এখনও অধরা। দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকা এসব শিশুর জন্য এবার ‘দক্ষতাভিত্তিক বিকল্প শিক্ষা কর্মসূচি’র মতো নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
স্কুলবহির্ভূত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ‘অল্টারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটিস ফর আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন’ শীর্ষক এ প্রকল্প অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার নির্বাচিত কিছু উপজেলায় এটি বাস্তবায়ন করবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই)।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৪৭ কোটি ৩ লাখ টাকা সরকার দেবে এবং ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রকল্প সহায়তা হিসেবে দেবে ইউনিসেফ।
শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শেখার সুযোগ
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, যেসব শিশু কখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি বা মাঝপথে ঝরে পড়েছে, তাদের জন্য মানসম্মত অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
তবে এটি শুধু পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞানের পাশাপাশি কর্মমুখীমুখী ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগও থাকবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পরিবর্তিত ও দক্ষতানির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
এ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত শিশুদের চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানো হবে। এরপর নমনীয় পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম ও দক্ষতা মডিউল পরিচালনা, নিয়মিত তদারকি ও মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হবে।
অগ্রগতি সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সর্বজনীন প্রাথমিক ভর্তি নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শিক্ষার হার বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে দৃশ্যমান। বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিক অঙ্গীকার হিসেবেও বহাল রয়েছে।
অবশ্য তারপরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী কিশোর-যুবকদের প্রায় ২২ দশমিক ১০ শতাংশ এখনও নিরক্ষর। ২০২২ সালের জনশক্তি জরিপে দেখা গেছে, কর্মরত মানুষের ২৮ দশমিক ৭ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এবং ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ কেবল প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়েছে। তাদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের মতো মানুষ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, শৈশবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিতদের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়নে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
দ্বিতীয় সুযোগের প্রয়াস
নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এ প্রকল্প শিশুদের স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নমনীয় শিক্ষা ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয় শিক্ষাকে আরও প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ করে তুলবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য দক্ষতাভিত্তিক, মানসম্মত অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে। এতে তারা মূলধারার শিক্ষায় ফিরতে পারবে এবং আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত হবে।’
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলবহির্ভূত শিশুদের জন্য বিনিয়োগ মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এসব শিশুদের জন্য শিশুশ্রম, দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রান্তিকতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া সুযোগকে নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশে আরও দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ জনশক্তি গড়ে ওঠে।
১২৫ দিন আগে
সরকার গঠনের পথে বিএনপি, তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে। ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে উৎসবমূখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন দেশের কোটি কোটি ভোটার।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই দেশের নানা প্রান্তের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে বাড়তে থাকে ভোটারদের ভিড়। তার মধ্যে বয়স্ক ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় গণনা। ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা স্বতস্ফূর্ত ছিল তার দেখা মেলে ভোট পড়ার হারে। গতকাল রাত ৯টার দিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় জানায়, কয়েকটি কেন্দ্র বাদে গড়ে ৬০.৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ভোটের আগের রাত পর্যন্ত নানা আশঙ্কা ও উদ্বেগের কথা শোনা গেলেও ভোটগ্রহণের দিন বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই দেশের ২৯৯টি আসনের ৪২ হাজার ৬৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। কোথাও কোথাও হাতাহাতি বা উত্তেজনার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ।
শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসনের বেসরকারি ফল জানা গেছে। তাতে ২১০টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পেয়েছে ৭২ আসন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন।
ফলে বিএনপির নেতৃত্বেই গঠিত হতে যাচ্ছে আগামী সরকার। নতুন এই সরকারের নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে ৩৫ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এরশাদ জমানায় ১৯৮৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন কাজি জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালে তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার হাতেই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের ব্যাটন।
এই দুই নেত্রীর ক্ষমতায় আসা এবং এর চূড়ায় আরোহণ করাটাও ছিল পরিস্থিতির চাহিদায়। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খালেদা জিয়ার স্বামী এবং বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই দুই ঘটনাই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ঠেলে দিয়েছিল রাজনীতির আঙিনায়। এরপর রাজনীতির অঙ্গনে তাদের লড়াই ছিল নজরকাড়া। তবে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সেই অবস্থার অবসান ঘটছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত হয়েছেন গত ৩০ ডিসেম্বর। অন্যদিকে, টানা ১৭ বছর দেশ শাসনের পর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের শাসনক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তিনিও যে আর সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন না, তা শোনা গেছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মুখেই।
এর মধ্য দিয়ে যে নতুন নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হয়েছিল দেশের রাজনীতিতে, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় দুই যুগ পর লন্ডন থেকে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তনে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
দেশের ফেরার পর থেকে ভোটের মাঠ, সব জায়গায় তার প্রকাশিত পরিকল্পনার মধ্যে প্রধানতম ছিল— সবার আগে বাংলাদেশ, দেশের তরুণদের দক্ষ করে তোলা, নারীদের উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও দেশের কৃষকদের কল্যাণ।
কৃষিপ্রধান এই দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। আর তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী। এই তরুণ সমাজের কাঁধে ভর করেই যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তা-ই দৃশ্যমান হয়েছে।
ওই আন্দোলনে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্বদানকারী অধিকাংশ তরুণ নেতাকেই দেশের সাধারণ জনগণ স্বীকৃতি দিয়েছে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের চোখের মণি হয়ে ওঠা শরীফ ওসমান হাদির কথাও মানুষ ভোলেনি। নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেও অকালে চলে যাওয়া এই তরুণ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বারবার; নানাজনের আলাপচারিতায়, ফেসবুক পোস্টে ফিরে এসেছেন তিনি।
তাই তারুণ্যকে সঙ্গে নিয়ে শিল্প-প্রযুক্তিখাতকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের কৃষক ও নারীর উন্নয়নই যে সত্যিকারের উন্নয়নের চাবিকাঠি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই তিনের ওপরই বারবার জোর দিয়েছেন তারেক রহমান।
এখন দেশের শাসনভার কাঁধে নিয়ে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন এই নেতা, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা।
১২৬ দিন আগে
ভোটের আগমুহূর্তে ‘সিদ্ধান্তহীন’ ভোটাররাই বড় নির্ণায়ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বাকি দুই দিন। ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা। এখন অপেক্ষা শুধুই ভোটগ্রহণের। এমন অন্তিম মুহূর্তে এসেও ভোটারদের একটি বড় অংশ সিদ্ধান্তহীন। ফলে এই ‘অনিশ্চিত’ ভোটাররাই কোনো প্রার্থী ও দলের পাল্লা ভারী করতে হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গত ১ থেকে ২০ জুলাই পরিচালিত দেশব্যাপী ভোটারদের মনোভাব জরিপে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশ ভোটার এখনও ঠিক করেননি কাকে দেবেন। আট মাস আগে এই হার ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। সে হিসেবে এই সময়ে এসে ভোটারদের অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা অনেকটাই কেটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো।
সারা দেশের ৫ হাজার ৪৮৯ জন ভোটার এই জরিপে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছিলেন পুরুষ ভোটার এবং ৪৭ শতাংশ নারী। এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের ৭৩ শতাংশই গ্রামের বাসিন্দা, আর ২৭ শতাংশ ছিল শহরের।
‘বিআইজিডি পালস সার্ভে: জুলাই ২০২৫—নাগরিকদের ধারণা, প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক এ জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে কিছু বলতে চান না; আর ১ দশমিক ৭ শতাংশ বলেছেন, তারা ভোটই দেবেন না।
অর্থাৎ, ভোটারদের সমর্থন আদায়ে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা, জনসমাবেশ, নানা প্রতিশ্রুতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচেষ্টার পরও প্রায় অর্ধেক ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন রয়েছেন।
সিদ্ধান্তহীন ভোটার গোষ্ঠী আসলে কত বড়?
শুধু বিআইজিডি পালস সার্ভেই নয়, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে একাধিক জনমত জরিপে মিলেছে এই সিদ্ধান্তহীনতার চিত্র।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস রাউন্ড–৩) অনুযায়ী, কাকে ভোট দেবেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভোটারদের মধ্যে দল হিসেবে বিএনপি সমর্থিত জোট সবচেয়ে এগিয়ে। ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অংশগ্রহণকারীদের ৩১ শতাংশ। তবে জরিপের ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার কোনো দলীয় প্রার্থীকে পছন্দ করবেন কিনা, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন।
ইনোভিশন কনসালটিংয়ের এই জরিপের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট। ২২ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—এ বিষয়ে তারা এখনো কিছু বলতে পারছেন না। বিপরীতে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্দিষ্ট একজন নেতার নাম বলেছেন এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ অন্য কাউকে বেছে নিয়েছেন।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা আরও বেশি। তরুণদের ওপর পরিচালিত ‘ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ ভোটার কাকে ভোট দেবেন সে বিষয়ে অনিশ্চিত; প্রার্থী, প্রতীক বা দল পছন্দ করেছেন তুলনামূলক কম অংশ।
ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী নন। এই ভোটব্যাংককে উপেক্ষা করে নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ কষা সত্যিই কষ্টসাধ্য।
ভোটের মাঠের চিত্র
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের দিকে এগোলেও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নেতাদের দেশত্যাগ ও কারাবাসের কারণে দলটির সমর্থক শুধু নয়, সাধারণ নিরপেক্ষ ভোটারদের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। আর এর প্রভাবে ভোটের মাঠের সমীকরণ বদলে গেছে অনেকখানি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একজন সরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই দল হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত। এখন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তারা দীর্ঘদিনের মিত্র এবং আদর্শগতভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতির কারণেই মূলত তারা এখন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে। আর এ বিষয়টির কারণেই এবারের নির্বাচন ভোটারদের চোখে ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা পড়েছে।’
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে অংশগ্রহণের ঘাটতি ছিল, এবারেও তার অনেকটা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার কথায় সমর্থন দিয়ে পাশে থাকা আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘যে কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক ছিল না, একই কারণে এবারের নির্বাচনও পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, কিন্তু তাদের ভোটব্যাংক কিন্তু নির্বাচনে ঠিকই বড় ফ্যাক্টর। আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের ভোটারদের একটা বড় অংশই ভোটকেন্দ্রে যাবে না বলে আমার বিশ্বাস।’
অন্যদিকে, গণভোট নিয়ে সংশয়ও ভোটারদের ভোটে অনীহা প্রকাশের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন রফিকুল আলম নামের এক ব্যক্তি। এই বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘গণভোটের কিছু ইতিবাচক দিক আছে, যা ভবিষ্যৎ সরকারকে আরও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এ বিষয়টি সমস্যাজনক।’
তার ভাষ্য, ‘অনেকগুলো শর্ত একসঙ্গে উপস্থাপন করে ভোটারদের শুধু “হ্যাঁ” বা “না” বলতে বলা হচ্ছে। শর্তগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটিতে কেউ কেউ সমর্থন দেবেন, আবার কোনো কোনোটি হয়তো তার মতের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু “হ্যাঁ” ভোট দিলে সবগুলোতে সমর্থন দিতে হবে, আবার “না” বললে সবগুলো শর্তের বিরোধিতা করা হবে।
‘এই অবস্থা ভোটারদের চরম দ্বিধায় ফেলেছে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে ভোটের দিন। অনেকে হয়তো এই দ্বিধার কারণেই ভোট দিতে যাবেন না।’
গণভোট নিয়ে দ্বিধার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাও। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিরক্ষর এবং অনেক ভোটারই গণভোট ঠিক কী নিয়ে হচ্ছে, সেটাই ঠিক করে জানেন না। প্রশ্নগুলোই যদি বোঝাই না যায়, তাহলে সেই ভোট কতটা অর্থবহ হয়?’
সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের ব্যাপারে হতাশার কথাই জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে খুব বেশি প্রত্যাশা নেই। ভোট দেব, তবে এবার আমার ভোটটা হবে যাকে আমি তুলনামূলকভাবে কম দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করি এবং যারা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার পক্ষে।’
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি ভোট দেবেন না। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের কোনো প্রত্যাশাই পূরণ হয়নি। যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝখান থেকে একটি গোষ্ঠী ব্যাপক লাভবান হয়েছে। এই নির্বাচনের পরও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’
এবারের নির্বাচনে নতুন প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে, আর তা হচ্ছে পোস্টাল ব্যালট, অর্থাৎ ডাকযোগে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি। আধুনিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান কর্মরত ব্যক্তি, কারাবন্দি, এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটাররাও নিজের প্রার্থীকে সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন।
নতুন এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে শুরুতে উদ্দীপনা লক্ষ করা গেলেও কার্যত তাদের তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি।
পোস্টাল ভোটের ব্যাপারে জানতে চাইলে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি সুমাইয়া জান্নাত বলেন, ‘আমি এটাকে সত্যিকারের নির্বাচন মনে করি না। আমার কাছে এটা জনগণকে দেওয়া একধরনের সান্ত্বনা পুরস্কার বলেই মনে হয়।’
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আরেক ভোটার কাশপিয়া বাঁধন বলেন, ‘এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আমার দল এবারের নির্বাচনে নেই। তাই আমি ভোট দিচ্ছি না।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আমি নই, আমার পুরো পরিবারই সেই দলকে সমর্থন করে। আমি যদি বাংলাদেশে থাকতাম, তাহলে ভয়ে হোক আর সামাজিক চাপে, আমাকে হয়তো ভোটকেন্দ্রে যেতে হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় আমার আর সেই বাধ্যবাধকতা নেই।’
তাই আওয়ামী লীগের ভোটের মাঠে না থাকা, গণভোটের জটিলতা—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটা বড় অংশের অংশগ্রহণ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ভোটারদের মাঝে অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা ততই কমে আসে। কিন্তু এবারের নির্বাচন ভিন্ন। আওয়ামী লীগের মতো প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিই ভোটের মাঠের প্রতিযোগিতার চিত্র বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
দলীয় সমর্থকদের বাইরে নিরপেক্ষ ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে ইনোভিশনের এ বিষয়ে করা জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলেও ১২ শতাংশ গণভোট প্রশ্নে সিদ্ধাহীনতায় ভুগছেন।
জরিপগুলো থেকে আরও দেখা যায়, অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সময়মতো নির্বাচন—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা রাজনৈতিক বয়ান আর প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সমস্যা নিয়েই বেশি ভাবছেন।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারে আস্থা
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নানা প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনা হলেও নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থার ইঙ্গিত মিলেছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে। অংশগ্রহণকারীদের ৮২ দশমিক ৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন, তারা ভোটকেন্দ্রে নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন। (পিইপিএস রাউন্ড–৩: আস্থা সূচক)
এ থেকে বোঝা যায়, অনেক ভোটার ভোটদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন থাকলেও ভোটের সুষ্ঠু আয়োজন নিয়ে তাদের মধ্যে আস্থা রয়েছে।
শেষ সময়ের হিসাব
সার্বিক দিক বিবেচনায়, তাই একেবারে অন্তিম সময়ে এসে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের ফল নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোট ভোটারদের বিরাট এই অংশ যদি ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহলে সমীকরণ একরকম হবে, আর তারা ভোট দিলে কে কোন প্রার্থী বেছে নেবেন, তার ওপর ফলাফলের অনেকটা নির্ভর করবে।
তাই প্রার্থীরা এই শ্রেণিকে কতটা নিজেদের দিকে টানতে পারবেন, কিংবা আদৌ পারবেন কিনা—শেষ সময়ে তা-ই হয়ে উঠেছে আলোচনা ও জল্পনার অন্যতম কেন্দ্র। তবে শেষ পর্যন্ত এই শ্রেণির ভোটাররা প্রতিটি আসনের ফল নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখেন, তা দেখতে সবার নজর এখন ১২ তারিখের ভোটে।
১২৯ দিন আগে
কুড়িগ্রামের চার আসনে নীরব ভোটারদের দিকে তাকিয়ে প্রার্থীরা
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসে কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশে মাঠ মুখর থাকলেও ভোটের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কে জয়ী হবেন, এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সরজমিনে স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরা সক্রিয় থাকলেও প্রকাশ্যে মত দিচ্ছেন মাত্র ৩০ শতাংশ ভোটার। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব, মুখ খুলছেন না তারা। ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী ও সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যে প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে পারবেন, জয়ের পথে তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
কুড়িগ্রাম-১
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী হারিসুল বারী রনি এবং গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা।
এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ৪২৪ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৫১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন।
স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ধানের শীষ, ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের মধ্যে। তবে কে বিজয়ী হবেন তা এখনও অনিশ্চিত।
কুড়িগ্রাম-২
এ আসনে প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের ড. আতিক মুজাহিদ (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমেদ (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের অধ্যক্ষ নুর বখত (হাতপাখা), নাগরিক ঐক্যের মেজর (অব.) মুহাম্মদ আবদুল সালাম (কেটলি), সিপিবির নূর মোহাম্মদ (কাস্তে), এবি পার্টির নজরুল ইসলাম খান (ঈগল), স্বতন্ত্র প্রার্থী সাফিউর রহমান (হাঁস)।
এখানে মোট ভোটার রয়েছেন ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯০, নারী ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৪১ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭ জন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজারহাট উপজেলায় হিন্দু ভোটারদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা পলাতক থাকলেও তাদের সমর্থক-ভোটাররা ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কুড়িগ্রাম-৩
এ আসনের প্রধান প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলাম, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী ড. মাহবুবুল আলম সালেহী, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী আব্দুস সোবহান সরকার, ইসলামী আন্দোলনের ‘হাতপাখা’র প্রার্থী ডা. আক্কাছ আলী সরকার, গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী নুরে এরশাদ সিদ্দিকী, স্বতন্ত্র ‘হাঁস’ প্রতীকের প্রার্থী সাফিউর রহমান।
এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ জন। এর মাঝে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৬ জন।
এখানেও আওয়ামী লীগপন্থী ও হিন্দু ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম-৪
এই আসনের প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির আজিজুর রহমান (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের মোস্তাফিজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির কে এম ফজলুল হক মণ্ডল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের হাফিজুর রহমান (হাতপাখা), বাসদ (মার্ক্সবাদী) রাজু আহমেদ (মই), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রুকুনুজ্জামান (বালতি)।
এ আসনে রয়েছে ভিন্ন মাত্রার লড়াই। আসনটিতে ধানের শীষ ও ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন আপন দুই ভাই।
ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন করেছে কুড়িগ্রামের এ এলাকাগুলোকে। পাশাপাশি ভাটিয়া ও উজানী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে সামাজিক বিভাজন। ফলে ভোটের মাঠে বিরাজ করছে নানা জটিল সমীকরণ।
কুড়িগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বিগত নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মানুষ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার এখনও ভোটে অনাগ্রহী। তবে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলে শেষ মুহূর্তে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের চার আসনেই নির্বাচন নিয়ে উত্তাপ থাকলেও জয়-পরাজয়ের হিসাব এখনও অঙ্কের বাইরে, শেষ সিদ্ধান্ত নেবে নীরব ভোটারা—এমন অভিমত স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক, ভোটার ও সচেতন মহলের।
১৩০ দিন আগে
ভোট নয়, টিকে থাকার দুশ্চিন্তায় কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়লেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এখানে ভোট নয়, মানুষের প্রধান ভাবনা—আগামী বছর বসতভিটা থাকবে তো? অসুস্থ হলে শহরে কি পৌঁছানো যাবে? সংসার চলবে কীভাবে আর সন্তানরা আদৌ শিক্ষার আলো পাবে কি?
ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা, গোয়াইলপুরী, পূর্ব ঝুনকা, অষ্টআশির চর, চিড়া খাওয়া, খেয়ারচরসহ প্রায় ২০টি চরে বসবাসরত প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটারের মধ্যে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। অনেকেই জানেন না ‘হ্যাঁ’ ভোট বা ‘না’ ভোট কী; এমনকি ভোটের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবন নদীনির্ভর ও অনিশ্চিত। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে এসব চর সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা।
কালির আলগা চরের বাসিন্দা জামাল বলেন, ‘ভোট দিয়ে কী হবে? নদী আইলে আইলে ভাঙে। আজ ঘর আছে, কাল নাই—এই চিন্তায় ভোট মনে আসে না।’
গোয়াইলপুরী চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ভোটের সময় কেউ আসে না। আর এলেও ভোট শেষ হলে আর খোঁজ থাকে না। তাই ভোট নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই।
চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক নিয়মিত না যাওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পূর্ব ঝুনকা চরের এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল আছে, কিন্তু মাসে কয়দিন শিক্ষক আসেন, কেউ জানে না।’ বাচ্চারা পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলে শঙ্কিত তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও নাজুক। স্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিড়া খাওয়া চরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, অসুখ হলে নৌকা পাওয়াই মুশকিল। শহরে যেতে যেতে অনেক সময় চলে যায়। এই অবস্থায় ভোটের কথা ভাববে কে?
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘শুধু যাত্রাপুর ইউনিয়ন নয়, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত চর ও দ্বীপচর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪৬৯টি চর রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এসব চরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বলতে কার্যত কিছুই নেই।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে রাজনৈতিক নেতারা যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে চরবাসী। ফলে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ খুবই কম।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, ‘দারিদ্র্যের দিক থেকে ৬৪ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম প্রায় তলানিতে অবস্থান করছে। ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ মানুষ দরিদ্র। চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি।’
তিনি বলেন, ‘গত পতিত সরকার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় শুধু চরাঞ্চল নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভোটের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে। আমার হিসেবে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত জটিল। কোন প্রার্থী জয়ী হবে, তা অনুমান করা কঠিন।’
চরবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের তেমন আনাগোনা নেই। প্রচারণা শহর ও মূল ভূখণ্ডেই কেন্দ্রীভূত থাকে। চরগুলো এসব কার্যক্রম থেকে কার্যত উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
খেয়ারচরের যুবক আল আমিন বলেন, ‘ভোটের জন্য কেউ আসে না, বোঝায় না। উন্নয়ন না হলে ভোটে আগ্রহ আসবে কীভাবে?’
চরবাসীরা বলছেন, তারা ভোটের বিরোধী নন। তবে ভোটের আগে নয়, ভোটের পর বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলেই ভোটের গুরুত্ব তাদের কাছে নতুনভাবে ধরা দেবে। তাদের একটাই দাবি, ভোটের আগে চাই বাঁচার নিশ্চয়তা; উন্নয়ন এলে ভোট আপনাতেই গুরুত্ব পাবে।
১৩১ দিন আগে
চরম জনবল সংকটে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, নষ্ট হচ্ছে ১৫৩ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
দীর্ঘদিন ধরে জনবল-সংকটে ধুঁকছে নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। চার ভাগের এক ভাগ কর্মচারী দিয়ে চলছে দেশের বৃহত্তম এই রেলওয়ে কারখানার কার্যক্রম। জনবলের অভাবে পড়ে আছে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানিকৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি, যা ব্যবহারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় তীব্র কাঁচামাল-সংকট দেখা দিয়েছে। এসব কারণে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কারখানা সূত্রে জানা গেছে, আসাম–বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে ১৮৭০ সালে স্থাপিত হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। ১১০ দশমিক ২৯ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানায় রয়েছে ২৭টি শপ (উপকারখানা)। এখানে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ এবং মালবাহী যান (ওয়াগন) মেরামতের কাজ করা হয়। পাশাপাশি রেলওয়ের স্টিম রিলিফ ক্রেন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামত করা হয়ে আসছে। এছাড়া ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের প্রায় ১ হাজার ২০০ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি হয় এই কারখানায়।
ক্ষমতা ও গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানাটির আধুনিকায়ন করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী বগি এবং ওয়াগন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৭টি ওয়ার্কশপের সংস্কার করা হয়। ৪৩ ধরনের যান্ত্রিক (মেকানিক্যাল) এবং ১৩ ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়। এছাড়া গভীর নলকূপ স্থাপনসহ একটি ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়। তবে দক্ষ জনবল না থাকায় এই আধুনিকায়নের কোনো বাস্তব সুফলই মিলছে না।
সূত্র জানায়, বর্তমানে কারখানাটিতে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীর মোট পদ ২ হাজার ৮৫৯টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৭১৬ জন। অর্থাৎ ২ হাজার ১৪৩টি পদই রয়েছে শূন্য। এই জনবল-সংকটের কারণে ক্যারেজ মেরামতের দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন তিনটি কোচ মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে হচ্ছে দুটি। ২৭টি শপে থাকা ৭৪০টি মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিকও নেই।
১৩৫ দিন আগে
চুয়াডাঙ্গার দুই আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, ইতিহাস গড়তে চায় জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার দুই সংসদীয় আসনের নির্বাচনি মাঠ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে সরগরম গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা। উঠান বৈঠক, পথসভা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা—কোনো দিক থেকেই প্রচারণায় ঘাটতি রাখতে চান না প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
প্রচারণায় প্রার্থীরা অঙ্গীকার করছেন, নির্বাচিত হলে চুয়াডাঙ্গাকে সন্ত্রাস, মাদক ও টেন্ডারবাজিমুক্ত একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও জেলার দুই আসনে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে দলটির কর্মী-সমর্থক ও নিরপেক্ষ ভোটাররা।
চুয়াডাঙ্গা-১: বিএনপির ঘাঁটিতে দ্বিমুখী লড়াই
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ সালে এখানে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনটি নির্বাচনে বিতর্কের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয় পান।
এবার এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তিন প্রার্থী। ধানের শীষ প্রতীকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ, জামায়াত ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল এবং হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওলানা জহুরুল ইসলাম আজিজী।
গণসংযোগে বিএনপি প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই করে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে এসেছি। এবারের নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আমরা শুধু নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছি না, সব দলের, এমনকি নির্দলীয় ভোটারদেরও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। ভোট কাকে দেবেন সেটাই মুখ্য নয়, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভোট পড়লে সেটিই বড় সাফল্য হবে।’
তিনি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অবহেলিত চুয়াডাঙ্গাকে উন্নয়নের শিখরে নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, ‘দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গাকে একটি রোল মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী জহুরুল ইসলাম আজিজী বলেন, ‘বড় দলগুলোর রাজনীতির বাইরে গিয়ে আমরা পরিষ্কার ভাবমূর্তির নেতৃত্ব দিতে চাই। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি।’
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণে জামায়াতের জয় কঠিন হলেও তারা সম্মানজনক ভোট ও নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৩ হাজার ৭১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০৪ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন।
চুয়াডাঙ্গা-২: জামায়াত অধ্যুষিত আসনে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা
দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনটি জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। অতীতে এখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই জয় পেয়েছে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজিএমইএর সভাপতি, দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি নির্বাচিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে তার ব্যক্তিগত ইমেজ এই আসনে আলোচিত বিষয়।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘নির্বাচিত হলে কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, খাদ্য হিমাগার স্থাপন, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।’
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য, আয়কর আইনজীবী রুহুল আমিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীগের সকল বাধা উপেক্ষা করে ২০১০ সাল থেকে তিনি এ আসনে কাজ করছেন। জেল-জুলুম, হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে এলাকায় অবস্থান করে দলকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় তাকে হারানো সহজ হবে না।
রুহুল আমিন বলেন, ‘এই জনপদের মেঠো পথেই আমার বেড়ে ওঠা। মানুষের চাওয়া-পাওয়া আমি জানি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্থলবন্দর বাস্তবায়ন, কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আধুনিকায়ন, চুয়াডাঙ্গা–কালীগঞ্জ সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণসহ সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই।’
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাসানুজ্জামান সজীব বলেন, ‘সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই এবার বড় ফয়সালা দেবেন। আমি নির্বাচিত হলে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়তে কাজ করব। আমার বিশ্বাস মানুষ হাতপাখার প্রতি বিশ্বাস রাখবেন।’
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৩৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩১ জন, নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন।
নেতৃত্বহীন ও নিরপেক্ষ ভোটারই বড় নিয়ামক
এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের বাইরে থাকা ভোটাররা। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা। দলীয় প্রার্থী না থাকায় এই ভোটারদের একটি অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন অবস্থায় রয়েছেন। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগাতে মরিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
চুয়াডাঙ্গা শহরের এক ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দল নেই, তাই ভাবছি কাকে ভোট দিলে এলাকার জন্য ভালো হবে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেব।’
একই ধরনের কথা শোনা গেছে আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী গ্রামেও। সেখানকার এক ভোটার বলেন, ‘তিন প্রার্থীর মধ্যে কাউকে না কাউকে ভোট দিতে হবে। কিন্তু কাকে দেব, এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় আছি।’
একই কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও মুখেও। তাদের মতে, জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ মাঠে অনুপস্থিত থাকলেও তাদের সমর্থক ভোটাররা এখনও বড় ফ্যাক্টর।
চুয়াডাঙ্গা শিক্ষাবিদ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বলেন, ‘এটা আসলে নিজস্ব ভোটব্যাংকের নির্বাচন নয়, এটা মন জয়ের নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে কে কতটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবেন, সেটাই ফল নির্ধারণ করবে।’
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজমুল হক স্বপন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে এবারের জয়পরাজয়ে নিয়ামক ভূমিকায় থাকবে নেতৃত্বহীন ও নিরপেক্ষ ভোটার। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততাও বড় প্রভাব ফেলবে। শুধুমাত্র দলীয় ভোট ব্যাংক দিয়ে বৈতরণী পার হওয়া যাবে না। বিশেষ করে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সমর্থকদের ভোট কোন দিকে যায়, সেটাও হতে পারে জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট।
সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও গণভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চুয়াডাঙ্গার দুই আসনে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিএনপি হারানো আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া, জামায়াতে ইসলামী নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে, আর বিকল্প রাজনীতির বার্তা নিয়ে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ছুটছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
১৩৬ দিন আগে
কচুরিপানার করাল গ্রাসে জৈন্তার লাল শাপলার বিল, হুমকিতে স্থানীয় পর্যটন
কচুরিপানার আগ্রাসনে নান্দনিকতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাল শাপলার বিল। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত এই বিলটির প্রাণ–প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় অবিলম্বে সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনের নেতারা।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ওই শাপলা বিল ও জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ পরিদর্শন করে।
পরিদর্শক দলে আরও ছিলেন জার্মানপ্রবাসী লেখক ও ঐতিহ্য গবেষক সাকি চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, সংগঠনটির সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট গোলাম সোবাহান চৌধুরী।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জৈন্তিয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন মো. হানিফ প্রতিনিধি দলটিকে স্থানীয় উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘তরুছায়া প্রকল্প’ সম্পর্কে অবহিত করেন। এই প্রকল্পের আওতায় বিলের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১৪ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।
১৩৮ দিন আগে
দেশের বৃহত্তম কুষ্ঠ হাসপাতাল এখন নিজেই ‘রোগী’
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালটি বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে যে, নিজেই যেন এক দণ্ডায়মান ‘রোগী। ভবনের যত্রতত্র ফাটল, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি এবং খসে পড়া পলেস্তারা হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের জন্য পদে পদে বিপদের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। শৌচাগারে দরজা নেই, চিকিৎসার ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে পড়েছে—সব মিলিয়ে হাসপাতালটির অবস্থা তথৈবচ।
১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল দেশের তিনটি বিশেষায়িত সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতালের মধ্যে সর্ববৃহৎ। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৮০ হলেও বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ৪৮টি।
গত ২৪ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯ জন এবং প্রতিদিন গড়ে ১৫–২০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের তিনটি শৌচাগারে দরজা নেই, রোগী দেখার জন্য ব্যবহৃত মনিটরগুলো নষ্ট, বাথরুমগুলো নোংরা। মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় ঝুঁকি নিয়েই সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের কর্মীরা জানান, বৃষ্টি এলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ কারণে সবাই আতঙ্কে থাকেন।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিষয়ক কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ২০২০ সালে জেলায় কুষ্ঠরোগী ছিলেন ২০ জন। পরবর্তী বছরগুলোতে যথাক্রমে ৩৭ (২০২১), ৩৫ (২০২২), ৭৯ (২০২৩), ৫৯ (২০২৪) ও ৫৮ (২০২৫) জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হন।
চিকিৎসকরা বলছেন, কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়, মৃদু সংক্রামক। জীবাণুর মাধ্যমে এর সংক্রমণ হয়। এ জীবাণু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। প্রথমে চামড়ায় হালকা ফ্যাকাশে বাদামি বা লালচে অনুভূতিহীন দাগ, যেখানে চুলকায় না, ঘামে না এবং ওই স্থানে লোম থাকে না।
মুখে, ঘাড়ে বা বুকে-পিঠে ব্যথাহীন দানা বা গুটি, কানের লতি ফুলে যাওয়া, হাত-পা চোখে অনুভূতি না পেলে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানান তারা।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, কুষ্ঠরোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছেন, এর মানে এই নয় যে রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। আগেও অনেকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হতেন, তবে তারা শনাক্ত হতেন না। এখন মানুষের সচেতনতা বাড়ছে, তারা চিকিৎসা নিতে আসছেন।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম বাড়ানোয় সুফল এসেছে।
মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ৪ দশমিক ৭২ একর জমিতে ১৮৯০ সালে হাসপাতালটি কার্যক্রম শুরু করে। এর দীর্ঘ সময় পর ১৯৬৩ সালে তিনতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটির একতলা নির্মিত হয়, পরে ধীরে ধীরে সেটিকে তিনতলায় উন্নীত করা হয়। ফলে বিল্ডিংটি অনেক পুরাতন এবং অবস্থা খুবই খারাপ। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও ভবন পুনর্নিমাণ বা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
হাসপাতালের প্রধান সহকারী সাব্বির আহমেদ বলেন, বৃষ্টির দিনে দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করে। খুবই বিপদজনক ভবনে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুঘটনা ঘটতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৭০ বছর বয়সী এক রোগী বলেন, ‘আমার হাত পচে গেছিল। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করাইছি। এখানে কোনো ব্যবস্থা নাই।’
৬৫ বছর বয়সী আরেক রোগী বলেন, ‘শরীরে চামড়ায় প্রথমে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দাগ দেখা যায়। পরে সেটি কুষ্ঠরোগ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এখানে ১৪ দিন আগে ভর্তি হয়েছি। সারা দিনে চিকিৎসক মাত্র একবার আসেন। অন্যদিকে, বিল্ডিংয়ে থাকতে ভয় লাগে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।’
হাসপাতালের বহির্বিভাগের রোগী আক্তার হোসেন জানান, তারা যখন হাসপাতালে থাকেন, তখন চোখ থাকে মাথার ওপর; কখন ছাদ থেকে কিছু খুলে পড়ে।
হাসপাতালটিতে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও এর বিপরীতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন মাত্র ২৯ জনে। কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরির জন্য একজন কর্মী থাকার কথা হাসপাতালে, এই পদটি ২০২১ সাল থেকে শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যাও কম।
হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, আগে আমরা ছয়জন কাজ করেও সামাল দেওয়া যেত না। অথচ এখন আছে মোটে চারজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মচারী বলেন, হাসপতালের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা একেবারেই বন্ধ। জনবল না থাকায় ইনডোরের রোগীরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, বাংলাদেশে তিনটি কুষ্ঠ রোগের হাসপাতালের মধ্যে সিলেটের হাসপাতালটি সবচেয়ে বড়। অথচ এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুন। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।
১৩৯ দিন আগে
আসছে সম্প্রচার কমিশন: অনিয়ম হলে তিন বছর জেল, ৫০ লাখ টাকা জরিমানা
দেশের সম্প্রচার খাতে নিয়ন্ত্রণ ও মানদণ্ড নির্ধারণের জন্য নতুন একটি সম্প্রচার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। খসড়া অনুযায়ী, সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট অনিয়মের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ চলছে।
সম্প্রচার ক্ষেত্র ও আওতা
খসড়া অনুযায়ী, টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট, ক্যাবল টেলিভিশন, রেডিও, আইপি টিভি, ডিটিএইচ, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও, ওটিটি, স্ট্রিমিং এবং ভিডিও অন ডিমান্ড (ভিওডি) প্ল্যাটফর্মকে সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনলাইন ইনফোটেইনমেন্ট পোর্টাল, অ্যাপস ও ভিডিও স্ট্রিমিং কার্যক্রমও এর আওতায় আসবে। তবে ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা অপেশাদার কনটেন্ট এই অধ্যাদেশের বাইরে থাকবে।
কঠোর শাস্তির বিধান
লাইসেন্স বা কমিশনের অনুমতি ছাড়া সম্প্রচার, সরকারের নির্দেশনা অমান্য, গোপন সামরিক বা বেসামরিক তথ্য প্রচার, অনুমোদনহীন বিজ্ঞাপন সম্প্রচার এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দৃশ্যপণ্য ব্যবহার করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা বা কমিশনের সুপারিশ না নিলে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১০–৫০ লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয়ই হতে পারে। জাতীয় ইস্যু ও জনস্বার্থে নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
সরকারি অনাপত্তি ছাড়া সম্প্রচার যন্ত্রপাতি আমদানি করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫–২০ লাখ টাকা জরিমানা, গোপন সামরিক/বেসামরিক তথ্য প্রচারে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি
অনুমোদনহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাজি ও জুয়া, তামাকজাত ও মদ্যজাত পণ্য, বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচারে বিজ্ঞাপনদাতা ও সম্প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫–৩০ লাখ টাকা জরিমানা প্রস্তাব করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দৃশ্যপণ্য ব্যবহার করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
অপরাধে আরোপিত অর্থদণ্ড ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট-১৯১৩’ অনুযায়ী আদায় করা হবে।
সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল ও বিচার প্রক্রিয়া
অধ্যাদেশের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে এক বা একাধিক সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে একজন বিচারক নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে এবং অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, সম্প্রচার কমিশন গঠনে একটি বাছাই কমিটি কাজ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেবে। পাঁচ সদস্যের কমিশনে অন্তত একজন নারী কমিশনার রাখা বাধ্যতামূলক। সদস্যরা কোনো লাভজনক পদে বা সম্প্রচার/মিডিয়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না।
কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে কমিশনের দায়িত্ব হিসেবে সম্প্রচার লাইসেন্সের বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করা, আচরণবিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন, সম্প্রচার কার্যক্রম তদারকি এবং দর্শক-শ্রোতার অভিযোগ নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। কমিশন বিটিআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে কারিগরি বিষয়গুলো দেখবে এবং প্রয়োজনে জরিমানা, সংশোধিত প্রচারের নির্দেশ বা লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত খসড়া অধ্যাদেশের বিষয়ে মতামত দেওয়া যাবে।
১৪০ দিন আগে