মধ্যপ্রাচ্য
জোর করে কেন হরমুজ প্রণালি খুলতে পারছেন না ট্রাম্প?
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থলসেনা উপস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দেওয়ার একটি ‘বিপজ্জনক’ সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ তেহরানের কঠোর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের এ প্রণালিটি বন্ধের কৌশলগত অবস্থান তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে। ফলে এটি ট্রাম্পের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট একদিকে কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে ইরানে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছেন। স্থানীয় সময় রবিবার (২৯ মার্চ) ট্রাম্প সরাসরি জানিয়েছেন যে, তিনি ইরানের তেল দখল করতে চান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলতে ট্রাম্পের সামনে দুটি সামরিক পথ খোলা আছে—ইরানের ভূখণ্ড দখল করা অথবা জলপথে নৌবাহিনী মোতায়েন করা। তবে সীমিত স্থল অভিযানও এমন প্রাণহানির কারণ হতে পারে যা একজন প্রেসিডেন্টের গদিও নড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের জন্য তাদের মাটিতে বিদেশি সেনার উপস্থিতি একটি ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক এমা সালিসবারি মনে করেন, ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের কোনো একটি ইরানি দ্বীপ দখলের মাধ্যমে সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি (ট্রাম্প) আগ্রাসী পথ বেছে নিয়েছেন। সৈন্য হাতে থাকলে তিনি অবশ্যই তা ব্যবহার করবেন, তবে তা ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হতে পারে।’
অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান একটি কঠোর বার্তা পাঠিয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা ঢুকলে তারা নিজেদের এলাকাতেই ব্যাপক বোমা হামলা করতে পারে, এমনকি অবকাঠামো ধ্বংস করতেও প্রস্তুত রয়েছে।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে তেহরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে আলোচনার কথা বললেও গোপনে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, তারা একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘালিবাফ বলেন, মার্কিন সেনারা এলে তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বীর সেনারা মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন, যাতে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায় এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের চিরতরে শিক্ষা দেওয়া যায়।
সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত শনিবার প্রায় ৫ হাজার মার্কিন নৌসেনার অর্ধেক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এরা জল-স্থল উভয় পথেই অভিযানে দক্ষ। আরও প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার (প্যারাসুট ব্যবহার করে বিমান থেকে নামা বিশেষ প্রশিক্ষিত সৈনিক) পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল ‘খার্গ দ্বীপ’ মার্কিন হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সীমিত সংখ্যক সৈন্য দিয়ে দ্বীপ দখল করা সহজ হলেও তা ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ ইরান তখন রকেট, মিসাইল এবং ড্রোন হামলা শুরু করবে।
আবার বড় ধরনের স্থল অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই সেনা সংখ্যা যথেষ্ট নয়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন প্রায় দেড় লাখ সেনা মোতায়েন করেছিল। আর ইরানের আয়তন তার তিন গুণেরও বেশি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী এবং আরও ১০ হাজার সৈন্য পাঠানোর কথা ভাবছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প আরও একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের কথা বিবেচনা করছেন। তা হলো, ইরানের মূল ভূখণ্ডে ঢুকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দখল করা। তবে এটি করতে বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হবে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করতেও পারি, আবার নাও পারি। আমাদের অনেক পথ খোলা আছে।
কিন্তু খার্গ দ্বীপটি উপসাগরের অনেক গভীরে হওয়ায় সেখানে লজিস্টিক সহায়তা পাঠানো এবং সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে থাকা কিশ ও আবু মুসার মতো দ্বীপগুলো এ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, যা দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট মনে করেন, এই সেনা মোতায়েন মূলত আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি কৌশল বা ‘প্রদর্শনী’ হতে পারে। কারণ সামরিকভাবে কোনো দ্বীপ দীর্ঘসময় দখল করে রাখা মার্কিনিদের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর কিছু হবে না।
এছাড়া স্থল অভিযান হলেও ইরানের হুমকি পুরোপুরি দূর হবে না। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক জাহাজে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা, মাইন অপসারণ ও আকাশ সহায়তার প্রয়োজন হবে। এ জন্য বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ দরকার, যা যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজও নেই।
তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ইতোমধ্যে সংঘাতে যুক্ত হয়ে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথেও হামলা শুরু করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখতে হতে পারে।
৩ দিন আগে
ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনার কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ (দখলে) নেব, হয়তো নেব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে।’ তিনি আরও বলেন, দ্বীপটি দখল করলে সেখানে কিছু সময় অবস্থান করতে হবে।
এদিকে, ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে তাদের ভূখণ্ডে হামলা হলে পারস্য উপসাগরে মাইন বিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সোমবারও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে, যদিও যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসের খবরে বলা হয়েছে, ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে কুয়েতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে তেহরানের চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ওই হামলা চালানো হয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘সম্মানের নিদর্শন হিসেবে’ সোমবার সকাল থেকে কয়েক দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০টি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আলোচনায় আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি, কিন্তু ইরানকে নিয়ে কখনোই নিশ্চিত হওয়া যায় না।’
চলমান সংঘাতের ফলে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে হুমকি সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সার সংকট বেড়েছে এবং বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।
সোমবার দিনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রায় ১১৫ ডলারে পৌঁছায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর যৌথ হামলা শুরুর দিনের তুলনায় এটি প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
এদিকে, ইরানের সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজার্দি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কেন বিধিনিষেধ মেনে চলব? আমরা পারমাণবিক অস্ত্র চাই না, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা নিয়ম মানব আর তারা আমাদের বোমা মারবে।’
উল্লেখ্য, এনপিটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যার লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করা। এতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার অঙ্গীকার করে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) তাদের কর্মসূচি যাচাইয়ের সুযোগ দেয়।
তবে ইরান গত কয়েক বছর ধরে আইএইএর পরিদর্শন সীমিত করে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার শিকার হওয়া তিনটি পরমাণু সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় সংস্থাটিকে প্রবেশ করতে দেয়নি।
৩ দিন আগে
উপহাস করে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখান করল ইরান
সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফা একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন এক কর্মকর্তা। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী এই কূটনৈতিক চালকে উপহাস করে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও হামলা চালিয়েছে।
প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছেন, টানা এক মাস ধরে বিধ্বংসী এই আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াশিংটন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় নতুন করে একটি আলোচনায় বসার প্রস্তাবও দিয়েছে ইসলামাবাদ।
যুদ্ধচলাকালীন বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। ফলস্বরূপ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা পাঠানো অব্যাহত
এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৩ জন ব্যক্তি দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের অন্তত ১ হাজার সেনা সদস্যকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগন আরও দুটি মেরিন ইউনিট মোতায়েনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই দুটি মেরিট ইউনিট মোতায়ন করা হলে ওই অঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার মেরিন এবং হাজার হাজার নৌসেনা যুক্ত হবে। ওই ব্যক্তিরা আরও বলেন, এই পদক্ষেপগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন ট্রাম্প ভবিষ্যতে কী করবেন সে বিষয়ে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ নমনীয়তা’ দেওয়ার জন্যই এই কৌশল নিচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। তবে ইরানের নিয়মিত আধাসামরিক রেভল্যুশনারি গার্ড খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স ইঙ্গিত দিয়েছে যে এরকম কোনো আলোচনা চলছে না।
এ প্রসঙ্গে সদর দপ্তরের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেন, ‘তোমাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন তোমরা নিজেদের সঙ্গেই নিজেরা আলোচনা করছ?’
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় জোলফাঘারি বলেন, ‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমারা আমাদের সিদ্ধান্তে অটুট থাকব। আমরা কখনোই তোমাদের সঙ্গে সমঝোতা করব না; এখনও নয় এবং ভবিষতেও নয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বিস্মিত ও যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের নতুন বড় পরিসরে হামলা
সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে তর্ক-বির্তকের মাঝে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তারা ইরানের সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের প্রত্যক্ষদর্শীরা ইতোমধ্যে একটি বিমান হামলার খবর জানিয়েছেন।
এদিকে ইরান হামলা চালানোয় ইসরায়েলে বুধবার ভোর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে। গত মাসের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান তার উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও চাপ বজায় রেখেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলে অন্তত আটটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতার সাইরেন শোনা গেছে।
কুয়েত জানিয়েছে, তারা একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করেছে, তবে একটি ড্রোন কুয়েত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত হানে। এর ফলে সেখানে আগুন লেগে যায় বলে জানিয়েছে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
আলোচনার পথে বড় চ্যালেঞ্জ
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনও জটিল।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে কার হাতে আলোচনা করার ক্ষমতা রয়েছে বা কে আলোচনা করতে আগ্রহী হবেন—তাও স্পষ্ট নয়; বিশেষ করে ইসরায়েল যখন দেশটির নেতাদের হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাটি চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
হোয়াইট হাউসে মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, আমরা এখনই আলোচনা করছি। এতে উইটকফ, কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের অনেকেই এতে কাজ করছেন। অন্যপক্ষও চুক্তি করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির দপ্তর জানিয়েছে, তিনি এ সপ্তাহে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এক সামরিক মুখপাত্রও বলেছেন যে যুদ্ধ চলবে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহি আলিয়াবাদি বলেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় অটল রয়েছে এবং পূর্ণ বিজয় না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।
মিসরের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি আনার চেষ্টা চলছে। এতে ইসরায়েল জড়িত নয়।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা ঠেকানোই এখন অগ্রাধিকার। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর একটি প্রক্রিয়া নিয়েও কাজ চলছে।
আলোচনার সম্ভাবনার খবরে কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম কমলেও পরে আবার বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে ওঠে, যা যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
৮ দিন আগে
যুদ্ধবিরতিতে ইরানকে ট্রাম্প প্রশাসনের ১৫ দফা প্রস্তাব
যুদ্ধবিরতিতে ইরানকে ১৫ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে ডোনিাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে মোতায়েন প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও অন্তত ১ হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাতে এ প্রস্তাবের রূপরেখা সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি এ তথ্য জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের কাছে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছে পাকিস্তান।
ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাবটি পৌঁছানোর খবর প্রথম প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে আরও দুটি নৌ ইউনিট মোতায়েনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে পেন্টাগন। এর ফলে প্রায় ৫ হাজার মেরিন ও হাজারো নৌসেনা ওই অঞ্চলে যুক্ত হবে। এসব পদক্ষেপকে ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নমনীয়তা নিশ্চিতের কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানান ওই ব্যক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে ট্রাম্পকে উৎসাহিত করা ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে, মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সময়ে ইরান কড়া ভাষায় নিজেদের অবস্থান জানায়।
একদিকে ওয়াশিংটন হামলা অব্যাহত রাখায় তেহরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য ইসরায়েল ও অঞ্চলটির বিভিন্ন স্থাপনা। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে তেহরান। আবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর জন্য দেওয়া নিজের নির্ধারিত সময়সীমাও পিছিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যাহত করেছে, জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি তৈরি করেছে।
আলোচনার পথে বড় চ্যালেঞ্জ
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনও জটিল।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে কার হাতে আলোচনা করার ক্ষমতা রয়েছে বা কে আলোচনা করতে আগ্রহী হবেন—তাও স্পষ্ট নয়; বিশেষ করে ইসরায়েল যখন দেশটির নেতাদের হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের গভীর সন্দেহ রয়েছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাটি চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা মোতায়েন
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত তিনজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের অন্তত ১ হাজার সেনা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে।
এই ডিভিশনকে মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফোর্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যারা খুব অল্প সময়ের নোটিশে মোতায়েন হতে পারে। গত সপ্তাহে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নৌবাহিনীর কয়েকটি জাহাজে থাকা হাজারো নৌসেনাও ওই অঞ্চলে যাচ্ছে।
নৌ ইউনিটগুলো সাধারণত মার্কিন দূতাবাস রক্ষা, বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগকালীন সহায়তার জন্য প্রশিক্ষিত হলেও, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সেনারা শত্রুভাবাপন্ন বা বিরোধপূর্ণ এলাকায় প্যারাস্যুটের মাধ্যমে নেমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও বিমানঘাঁটি দখল করতে পারদর্শী।
এ অঞ্চলে নৌসেনা মোতায়েন নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের তেল নেটওয়ার্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে। এর আগে, পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালালেও তেল স্থাপনা অক্ষত রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী নামানোর চেষ্টা করলে উপসাগরে মাইন বিছিয়ে দেবে তারা।
নিউইয়র্কভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সুফান সেন্টার এক বিশ্লেষণে লিখেছে, আলোচনা চলাকালীন ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলার হুমকি স্থগিত রেখেছেন। তবে এটি নৌসেনাদের পৌঁছানোর জন্য সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল হতে পারে। সংস্থাটি অবশ্য এও উল্লেখ করেছে যে, ট্রাম্প হয়তো সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ খুঁজছেন।
৮ দিন আগে
ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘নির্যাতনের লাইসেন্স’ দেওয়া হয়েছে ইসরায়েলকে: অ্যালবানিজ
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা অ্যালবানিজ বলেছেন, বিশ্ব ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালানোর এক ধরনের লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র দিয়ে দিয়েছে। এর ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জীবন এখন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ এ দূত বলেছেন, ইসরায়েলে নির্যাতন কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে তার সর্বশেষ প্রতিবেদন পেশ করার সময় তিনি বলেন, ইসরায়েলকে প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কারণ আপনাদের বেশিরভাগ সরকার এবং মন্ত্রীরা এর অনুমতি দিয়েছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নির্যাতন ও গণহত্যা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে অ্যালবানিজ বলেন, যা একসময় গোপনে চলত, তা এখন প্রকাশ্যেই করা হচ্ছে। এটি একটি সংগঠিত অবমাননা, বেদনা এবং লাঞ্ছনার শাসন ব্যবস্থা, যা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে অনুমোদিত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্যাতন শুধু কারাকক্ষ বা জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এতে আরও বলা হয়, গণ-উচ্ছেদ, অবরোধ, ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা অস্বীকার, সামরিক বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের লাগামহীন সহিংসতা এবং ব্যাপক নজরদারি ও সন্ত্রাসের পুঞ্জীভূত প্রভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এখন একটি ‘সামষ্টিক শাস্তির’ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে জীবনযাত্রার পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে গণহত্যা সংক্রান্ত সহিংসতাকে সামষ্টিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সুদূরপ্রসারী মানসিক ও শারীরিক প্রভাব পড়ছে অধিকৃত জনগোষ্ঠীর ওপর।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড এবং গাজায় তাদের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কট্টর সমালোচক অ্যালবানিজ ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি তাকে বিশেষ দূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭২ হাজার ২৬৩ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৪ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে, যার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫০০ শিশু ছিল।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি মিশন অ্যালবানিজের প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাকে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এজেন্ট’ বলে অভিহিত করেছে।
এক বিবৃতিতে মিশনটি জানায়, ‘অ্যালবানিজ তার জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মকে উগ্র ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে অপব্যবহার করছেন, যার মধ্যে হলোকাস্টের (ইহুদি নিধনযজ্ঞ) বিকৃতি ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো বয়ানও অন্তর্ভুক্ত। তিনি নিয়মিতভাবে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে বিপজ্জনক উগ্রপন্থি বয়ান প্রচার করেন।’
অ্যালবানিজ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্যাতন ও গণহত্যার কাজ প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি গণহত্যার অংশ হিসেবে এই ক্রমবর্ধমান নির্যাতন আরও গুরুতর এবং অমার্জনীয় করে তুলেছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ফিলিস্তিনিদের ওপর এই ধরনের কাজ সহ্য করতে থাকে, তবে আইন নিজেই তার অর্থ হারাবে।’
৯ দিন আগে
ইরান চুক্তিতে আগ্রহী বলে দাবি ট্রাম্পের, কূটনৈতিক আলোচনার সময়সীমা বৃদ্ধি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ শেষ করতে একটি চুক্তির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ইরান। এছাড়া, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানকে দেওয়া সময়সীমা আরও পাঁচ দিন বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) ট্রাম্প দাবি করেন, চুক্তির ব্যাপারে ইরানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছে ওয়াশিংটন। হরমুজ প্রণালি না খুললে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করা যুদ্ধ নিরসনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে ট্রাম্পের এই অবস্থান পরিবর্তন। তেলের দাম কমাতে এবং শেয়ার বাজারে চাঞ্চল্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে এটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকির পর ট্রাম্পের এ বার্তা কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
ওই হুমকির ফলে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পানীয় জল সরবরাহকারী লোনা পানি শোধনাগারগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ইরান একটি চুক্তি করতে চায়। তিনি দাবি করেন, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার রবিবার ইরানের একজন নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি সেই নেতার নাম প্রকাশ না করলেও জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
তবে ইরান আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে ভুয়া খবর ব্যবহার করা হচ্ছে।
চুক্তি হলে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছাড়বে ইরান!
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, কোনো চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেবে, যা দেশটির বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান অতীতে এ ধরনের দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে এবং শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার বলে দাবি করে আসছে।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও ফিউশন এনার্জি গবেষক অধ্যাপক রবার্ট গোল্ডস্টন জানান, ইরান ইতোমধ্যে ৯টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক মানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনের ৯৯ শতাংশ সেন্ট্রিফিউজের কাজ সম্পন্ন করেছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল।
এদিকে, তুরস্ক ও মিসর জানিয়েছে যে তারা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে। এটি এই অঞ্চলের শক্তিশালী দেশগুলোর পক্ষ থেকে সমন্বিত মধ্যস্থতার প্রথম পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আকাশপথগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ না সরায়, তবে তিনি দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেলের পাঁচভাগের একভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ওয়াশিংটন সময় সোমবার রাতে সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা।
ট্রাম্প বলেন, পাঁচ দিনের এই সময়সীমা বৃদ্ধি চলমান বৈঠক ও আলোচনার সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল।
পরবর্তীতে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, তার প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করছে।
ট্রাম্প বলেন, তারা শান্তি চায়। তারা একমত হয়েছে যে, ‘তাদের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি... তবে দেখা যাক কী হয়।’ তিনি আরও জানান, এই সপ্তাহেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। এর কৃতিত্ব তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়ার হুমকির ওপর দিয়েছেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার বিষয়ে অবগত আছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিস্তারিত না জানিয়ে সোমবার তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য জানত যে এমন কিছু ঘটছে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার সম্ভাবনা
এর আগে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, তিনি তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অতীতেও তুরস্ক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে।
সোমবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অবশ্য রবিবার তুর্কি কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ফিদান কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, তার দেশ উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ইরানকে সুস্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সব পক্ষের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মিসরীয় কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা এড়ানোর লক্ষ্যে মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বার্তা আদান-প্রদান করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কূটনীতিকও নিশ্চিত করেছেন যে, মিসর ও তুরস্ক উত্তেজনা প্রশমনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, আপাতত মনে হচ্ছে, তারা জ্বালানি বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
ট্রাম্প পিছু হটেছেন বলে দাবি ইরানের
ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের পর ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স ও তাসনিম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে পিছু হটেছেন বলে উল্লেখ করেছে।
তাসনিম নিউজ জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তেহরানে বার্তা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ইরানের স্পষ্ট জবাব হলো, প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাবে। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে হরমুজ প্রণালিকে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফেরানো যাবে না বা জ্বালানি বাজারেও শান্তি আসবে না বলে জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ড হুমকি দিয়েছে যে, ট্রাম্প হামলা চালালে তারা মার্কিন ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কেন্দ্র এবং আমেরিকানদের অংশীদারত্ব থাকা অর্থনৈতিক, শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালাবে।
এর আগে, কালিবাফ বলেছিলেন, ইরান এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অবকাঠামোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে, যার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর পানীয় জলের জন্য জরুরি লোনা পানি শোধনাগারও রয়েছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘনিষ্ঠ ফারস নিউজ এজেন্সি এ ধরনের স্থাপনার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও রয়েছে। ইরান ইসরায়েলের ডিমোনা শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যা দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত। তবে স্থাপনাটির কোনো ক্ষতি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধজাহাজ এবং নৌসেনা মোতায়েন করার প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রতিরক্ষা কাউন্সিল যেকোনো স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে সতর্ক করে বলেছে, এর ফলে সমস্ত প্রবেশপথে মাইন বিছিয়ে দেওয়া হবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই, তবে তিনি সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়েও দেননি। অপরদিকে, ইসরায়েল ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের স্থল সেনা এ যুদ্ধে অংশ নিতে পারে।
তেহরান ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা
ইসরায়েল সোমবার তেহরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলা চালাচ্ছে তারা।
শহরের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে ঠিক কোথায় আঘাত হানা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গেও লড়াই করছে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে শত শত রকেট ছুড়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েল বৈরুতের আবাসিক ভবন এবং দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদীর ওপরের সেতুগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের সেনাপ্রধান জোসেফ আউন সেতুগুলোতে হামলাকে স্থল আক্রমণের পূর্বাভাস বলে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির কথা বিবেচনা করলেও ইসরায়েল ইরান ও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, সামনে আরও হামলা আসছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে ইরানি হামলায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ১০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
৯ দিন আগে
ভারত মহাসাগরে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এ ঘটনাকে তেহরানের ‘বেপরোয়া হামলা’ বলে নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।
হামলার কথা নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেননি ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। তবে হামলাটি ব্যর্থ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটির কতটা কাছাকাছি ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছেছিল, তাও স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার (২১ মার্চ) এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের ‘অঞ্চলজুড়ে আগ্রাসী আচরণ এবং হরমুজ প্রণালি জিম্মি করে রাখা’ ব্রিটেন ও এর মিত্র দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সরাসরি অংশ না নিলেও যুক্তরাজ্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে মার্কিন বোমারু বিমানকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলার সুযোগ দিয়েছে।
শুক্রবার ব্রিটিশ সরকার জানায়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে যেসব অভিযান পরিচালিত হবে, তাতে দিয়েগো গার্সিয়াসহ যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে পারবে মার্কিন বোমারু বিমান।
তার আগেই ওই ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান।
হামলা আরও বাড়াবে ইসরায়েল
এদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, আগামী সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার মাত্রা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বাড়ানো হবে।
শনিবার দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘চলতি সপ্তাহে আইডিএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সন্ত্রাসী শাসন ও তাদের নির্ভরশীল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হামলার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।’
তার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে আনার’ বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা
শনিবার ইরানের নাতানজ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে বিমান হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। তবে এতে কোনো তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাজধানী তেহরানে রাতভর ভারী বিমান হামলার শব্দ শোনা গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানায়, তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত নাতানজ স্থাপনায় হামলার পর বাইরে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাড়েনি।
জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, তারা এ হামলার বিষয়ে অবগত হয়েছে এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধি পায়নি বলে ইরান তাদের জানিয়েছে। তবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে এই হামলাগুলো ঘটল। এর আগে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেও নাতানজ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে ড্রোন হামলায় একজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এ হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি।
এ ছাড়াও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র নাদাভ শোশানি জানান, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি খালি কিন্ডারগার্টেনে আঘাত হানে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
১২ দিন আগে
যুদ্ধ শিথিলের ইঙ্গিতের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান ‘ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনার’ কথা বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে ওই অঞ্চলে আরও তিনটি উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় আড়াই হাজার অতিরিক্ত মেরিন সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ মার্চ) বিশ্বব্যাপী বিনোদন ও পর্যটন স্পটগুলোতে ইরান হামলার হুমকি দেয়। এর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের এ মন্তব্য আসে। একইসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে জাহাজে তোলা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে, যা জ্বালানি তেলের দামের লাগাম টেনে ধরার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে যখন ধস নেমেছে, ঠিক সেই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এ দ্বিমুখী বার্তা এল।
গত তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েল জানিয়েছে, শনিবার ভোরেও ইরান তাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব বলেছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এর একদিন আগে পারস্য নববর্ষ নওরোজ উদযাপন চলাকালে ইরানের রাজধানী তেহরানে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।
লক্ষ্যের সন্নিকটে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। কখনও ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আবার কখনও তেহরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্দেশ্য সাধনের কোনো লক্ষণ প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। সেই সঙ্গে ইরান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে, তাতে যুদ্ধের অবসান কবে হবে, সে বিষয়টিও অনিশ্চিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সামরিক কার্যক্রম গুটিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করার পাশাপাশি আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’
তবে তার এই বক্তব্য বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং যুদ্ধে ব্যয়ের জন্য কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলার চাওয়ার মতো পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও তিনটি উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ নৌসেনা মোতায়েন করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও দুই মার্কিন কর্মকর্তা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে সেগুলো রওনা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তারা।
এর আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আড়াই হাজার নৌসেনার একটি বহর সরিয়ে আনা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানে ওই নৌসেনারা বর্তমানে ওই অঞ্চলে অবস্থান করা ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার সঙ্গে যুক্ত হবে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই, তবে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হামলার হুমকি ইরানের
ইরানের শীর্ষ সামরিক মুখপাত্র জেনারেল আবোলফজল শেখারচি শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের ‘পার্ক, বিনোদন এলাকা ও পর্যটনস্থল’গুলোও শত্রুদের জন্য নিরাপদ থাকবে না।
তার ওই মন্তব্যের পর তেহরান চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও সশস্ত্র হামলার পথ বেছে নিতে পারে, সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নওরোজ উপলক্ষে দেওয়া এক লিখিত বার্তায় যুদ্ধের মুখে দেশটির জনগণের দৃঢ়তার প্রশংসা করেন, যদিও ইসরায়েলি হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত এবং তিনি নিজে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি।
ইরান থেকে খুব কম তথ্য বাইরে আসায় দেশটির সামরিক, পারমাণবিক বা জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্পষ্ট নয়। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরও ইরানের পাল্টা হামলা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে। এতে করে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে হুঁ হুঁ করে।
হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, শনিবার ভোরে তারা বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা শুরু করেছে।
বৈরুত শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধোঁয়া, আগুন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ওই অঞ্চলের সাতটি এলাকা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা জারি করে ইসরায়েলি বাহিনী।
লেবানন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ এরই মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
চলমান যুদ্ধে ইরানে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৫ জন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও চারজন নিহত হয়েছেন। তেহরানের হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা।
ইরানি তেলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম যুদ্ধের কারণে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৭০ ডলারের মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ঘোষণায় শুক্রবার পর্যন্ত জাহাজে তোলা ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে, যা ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত উৎপাদন বাড়তে সহায়ক হবে না। ফলে দামের ঊর্ধ্বগতি কতাট নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা অনিশ্চিত।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করে আসছে, ফলে তাদের অধিকাংশ তেল আগেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যায় বলে ধারণা করা হয়।
ইরান যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে রাশিয়ার কিছু তেল চালানের ওপরও ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল। সমালোচকদের মতে, এতে মস্কো লাভবান হলেও বাজারে এর প্রভাব ছিল সীমিত।
১২ দিন আগে
বন্ধ হরমুজ দিয়েই ৯০ জাহাজ পারাপার, লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে ইরান
সামুদ্রিক ও বাণিজ্য তথ্য প্ল্যাটফর্মগুলোর মতে, ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ প্রায় ৯০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। বিশ্বখ্যাত এ জলপথটি কার্যত বন্ধ থাকলেও ইরান এখনও এর মধ্য দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে।
মেরিন ডেটা ফার্ম লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, প্রণালি অতিক্রম করা জাহাজগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ছিল তথাকথিত ডার্ক ট্রানজিট বা ছায়া জাহাজ, যারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও নজরদারি এড়িয়ে চলাচল করে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনার ফলে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোও সফলভাবে এ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম কমানোর আশায় মিত্র ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী প্রণালিটি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল মার্চ মাসের শুরুতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বন্ধ রয়েছে। এ অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
তবে বাণিজ্য বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরান ১৬ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির কারণে চীন এখন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রেডডালের ক্লায়েন্ট ডিরেক্টর কুন কাও বলেন, এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইরান যেমন তেলের বাজার থেকে মুনাফা লুটছে, তেমনি নিজের রপ্তানি পথটিও সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, ১ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে কমপক্ষে ৮৯টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে ১৬টি ছিল তেলের ট্যাঙ্কার। যুদ্ধের আগে এই পথে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করত। এই ৮৯টি জাহাজের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশই ইরান-ঘনিষ্ঠ বলে ধারণা করা হচ্ছে; বাকি জাহাজের মধ্যে চীন ও গ্রিসের জাহাজও রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য দেশের জাহাজও এই পথ দিয়ে যাতায়াত করছে।
পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন করাচি নামক একটি তেলের ট্যাঙ্কার গত রবিবার (১৫ মার্চ) এই প্রণালি অতিক্রম করে। অন্যদিকে, ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিপিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার শিভালিক এবং নন্দা দেবী নামক দুটি এলপিজিবাহী জাহাজও ১৩ বা ১৪ মার্চের দিকে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার পর জাহাজ দুটি পার হতে পেরেছে। ইরাকও তাদের তেলের ট্যাঙ্কারগুলো চলাচলের অনুমতি পেতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে।
লয়েডস লিস্টের এডিটর-ইন-চিফ রিচার্ড মিড বলেন, জাহাজগুলো কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যাতায়াত করছে। এর ফলে ইরান কার্যকরভাবে একটি নিরাপদ করিডোর তৈরি করেছে যেখানে কিছু জাহাজ ইরানি উপকূলের খুব কাছ দিয়ে যাতায়াত করছে।
তবে বিশ্লেষণে এ-ও দেখা গেছে, কিছু জাহাজ হামলার ঝুঁকি কমাতে নিজেদের চীন-সংশ্লিষ্ট বা সম্পূর্ণ চীনা ক্রুচালিত হিসেবে ঘোষণা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিচ্ছে এই জাহাজগুলো।
যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে এখন ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে অবস্থান করছে। ইরান হুমকি দিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের এক লিটার তেলও এই পথ দিয়ে যেতে দেবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে তারা ইরানি তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে প্রণালি পার হতে দিচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সোমবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানি জাহাজগুলো আগে থেকেই বের হচ্ছিল। বিশ্বের বাকি অংশে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে আমরা তা হতে দিচ্ছি।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল নেটওয়ার্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালালেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, তিনি আপাতত দেশটির তেলের অবকাঠামোতে আঘাত হানছেন না।
কুন কাওয়ের মতে, হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি বলছে এটি পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং এটি কিছু নির্দিষ্ট দেশের জন্য বেছে বেছে বন্ধ রাখা হয়েছে। ইরানের রপ্তানি এবং তাদের পছন্দের কিছু দেশের চলাচলের জন্য এটি এখনও সচল রয়েছে।
ডাচ ব্যাংক আইএনজির কৌশলবিদ ওয়ারেন প্যাটারসন ও ইভা ম্যান্থি একটি গবেষণা নোটে লিখেছেন, যদি জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যন্ত্রণা দেওয়াই ইরানের পরিকল্পনা হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তারা যে সংখ্যক ট্যাঙ্কারকে যেতে দেবে, তা খুবই সীমিত হবে।
১৫ দিন আগে
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা লারিজানি নিহতের দাবি
ইসরায়েলের রাতভর হামলায় ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তবে এ দাবি সত্যতা এখনও নিশ্চিত করেনি ইরান।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) এক বিবৃতিতে কাটজ বলেন, ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে লারিজানির পাশাপাশি বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানিও নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ইরানের “সন্ত্রাস ও নিপীড়ক” শাসনের নেতৃত্বকে খুঁজে বের করে অভিযান অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী (নেতানিয়াহু) ও আমি আইডিএফকে (ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী) নির্দেশ দিয়েছি।’
তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নেতৃত্বে ‘দ্রুত পরিবর্তন’ ঘটছে এবং সাম্প্রতিক হামলায় শীর্ষ দুই নেতাকে হত্যার মাধ্যমে সেই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। অভিযানে অংশ নেওয়া ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর পাইলট ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এ সময় প্রশংসা করেন তিনি।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, একটি গোপন আস্তানায় লারিজানি ও তার ছেলের উপস্থিতির খবর পেয়ে হামলা চালানো হয়। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
লারিজানির নিহত হওয়া দাবিসহ বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, আলি লারিজানি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রভাবশালী সচিব ছিলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে এ পদে নিয়োগ দেন। তিনি দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
লারিজানি ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। এর আগে ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একসময় পার্লামেন্টে প্রিন্সিপালিস্ট শিবিরের নেতৃত্ব দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে ‘মধ্যপন্থী রক্ষণশীল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো।
তার ভাই সাদেক লারিজানিও ইরানের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, যা ইরানের পার্লামেন্ট ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ সংস্থা।
গত শুক্রবার তেহরানে কুদস দিবসের সমাবেশে সর্বশেষ জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল লারিজানিকে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু কয়েকটি টুইটে (এক্স পোস্ট) তা জেতা যায় না।’
লারিজানির নিহতের খবরের মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার নামে একটি হাতে লেখা বার্তা প্রকাশ করেছে, যেখানে নৌবাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করা হয়েছে। যদিও বার্তাটির সময় ও তারিখ উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে, তেহরানের হামলার পর ইরানের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে আইডিএফ। তারা জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নিহত নৌসেনাদের স্মরণে আজ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে, তবে লারিজানি ও সোলেইমানির মৃত্যুর বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেয়নি ইরান।
১৬ দিন আগে