মধ্যপ্রাচ্য
বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিরোধিতায় ইসরায়েলজুড়ে বিক্ষোভ
ইসরায়েলে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার রক্ষণশীল ইহুদি। এ সময় তারা বিভিন্ন স্থানে তারা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ইসরায়েলজুড়ে জনজীবন ও পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২ জুন) ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব ও জেরুজালেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় একটি বিক্ষোভস্থলে এক সেনাসদস্যের ওপর হামলা করে বিক্ষুদ্ধ জনতা। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে জলকামান ও ঘোড়া ব্যবহার করতে হয়েছে।
এই বিক্ষোভের ফলে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জেরুজালেম ও তেল আবিব মহানগর এলাকায় বিশাল জনসমাগমের কারণে বেশ কয়েকটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি সেখানে গণপরিবহন চলাচলও সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল।
ইসরায়েলে অধিকাংশ ইহুদি নারী ও পুরুষের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রক্ষণশীল ইহুদিরা এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছেন। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পড়াশোনা করতে এই সম্প্রদায়কে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে বর্তমানে তাদের সেই অব্যাহতি ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আবার অনেক ইসরায়েলি রক্ষণশীল ইহুদিদের দীর্ঘদিনের এই অব্যাহতি ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। তাদের মতে, বর্তমানে সেখানে সেনাবাহিনী চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে অনেক নাগরিককে একাধিকবার সংরক্ষিত সেনাসদস্যের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমন সময়ে রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক সেবার দায়িত্ব থেকে ছাড় দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয় বলে দাবি তাদের।
এদিকে, এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। রক্ষণশীল ইহুদিরা সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। ফলে চলতি বছরে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একটি সংসদীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার রক্ষণশীল ইহুদি তরুণ ১৮ বছর বয়সে সামরিক নিয়োগের উপযুক্ত হন। তবে তাদের মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
অন্যদিকে, সেনাসদস্যের ঘাটতি মোকাবিলায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে অধিকাংশ ইহুদি পুরুষকে প্রায় তিন বছর সামরিক সেবা দিতে হয়। এরপর তাদের দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত সেনাসদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইহুদি নারীদের জন্য এই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ দুই বছর।
জেরুজালেমের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা রক্ষণশীল সম্প্রদায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা এই বিক্ষোভকে আমাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছি। আমাদের দৃষ্টিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া মানে ধর্ম ত্যাগ করা। আমরা আমাদের ইহুদি ধর্ম ছাড়তে চাই না। তাই আমাদের কাছে এটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাজার হাজার রক্ষণশীল ইহুদিকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার কোনো উপায় নেই।’
বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায়, যাতে লেখা ছিল, ‘জায়নিস্ট হিসেবে বেঁচে থাকার চেয়ে আমরা ইহুদি হিসেবে মরতে রাজি’ এবং ‘জায়নিস্ট ধর্মের স্বার্থে পরিচালিত সেনাবাহিনীতে আমরা সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাই।’
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশই রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের সদস্য। একইসঙ্গে এই সম্প্রদায়ে সেখানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠী। ঐতিহ্যগতভাবে তারা পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছেন।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় এই ব্যবস্থার সূচনা হয়। সে সময় গণহত্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইহুদি শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে রক্ষণশীল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অধ্যয়নে নিয়োজিত করা হয়েছিল।
তবে রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা থেকে এই অব্যাহতি এবং ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সরকারি ভাতা দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বহু ইসরায়েলির অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।
এদিকে, ইসরায়েলকে বর্তমানে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় একযোগে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সংঘাতে জড়িত পড়েছে তারা। ফলে তাদের সেনাবাহিনী জনবল সংকট ও তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে।
২০১৭ সালে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট রক্ষণশীলদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবে আদেশ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসির কারণে এই অব্যাহতি ব্যবস্থা এখনও কার্যকর রয়েছে।
ইসরায়েলের ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর কাছে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা জাতীয় ঐক্য এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের অনেকেই আশঙ্কা করেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে তরুণরা ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির সংস্পর্শে চলে যাবে।
৩ মিনিট আগে
ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, কুয়েতে পাল্টা হামলা তেহরানের
চলতি সপ্তাহের শেষদিকে ইরান মার্কিন এমকিউ১ প্রিডেটর ড্রোন ভূপাতিত করার পর দেশটির রাডার ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার মাঝেই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত ক্রমেই তীব্রতর হয়ে উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে।
স্থানীয় সময় সোমবার (১ জুন) মার্কিন সামরিক বাহিনী এ হামলার তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে, ইরানও তাদের পাল্টা হামলার কথা স্বীকার করেছে। একই সময়ে কুয়েত জানিয়েছে, তারা নিজেদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতহত করেছে।
সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এখন খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে এখনও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কারণ, বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচভাগের একভাগ এই জলপথ দিয়েই পরিবহন হয়।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ছে। ইসরায়েল লেবাননে লিতানি নদীর উত্তরের এলাকাগুলোতে নিজেদের দখল বাড়িয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহও ইসরায়েল লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনি ও রবিবার ইরানের গেরুক শহর ও কেশম দ্বীপের আশপাশে তারা হামলা চালিয়েছে।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, এর আগে আন্তর্জাতিক জলসীমার উপরে উড়তে থাকা একটি মার্কিন এমকিউ ১ ড্রোন ভূপাতিত করে তেহরান। এর জবাবেই তারা এ হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্রুত অভিযান চালিয়ে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। ইরানের এসব সামরিক স্থাপনা উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী মার্কিন জাহাজগুলোর জন্য হুমকি ছিল বলে দাবি তাদের।
তারা আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ধীরে ধীরে এমকিউ প্রিডেটর ড্রোনের ব্যবহার কমিয়ে আনছে। বর্তমানে তারা এমকিউ ৯ রিপার ব্যবহার করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে এখনও প্রিডেটর ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে এসব হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি বলে জানিয়েছে সেন্টকম।
কুয়েতে হামলা প্রতিহত
এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, সোমবার ভোরে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য করে তারা গুলি চালায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, মার্কিন বাহিনী দেশটির একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু কোথায় ছিল, তা বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা কুয়েতের হামলার কথাই উল্লেখ করেছে। কারণ কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেন্ট্রালের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ফরোয়ার্ড কমান্ড অবস্থিত।
পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ভিডিও প্রচার করা হয়। ভিডিওতে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে একটি স্টিকার দেখা যায়। স্টিকারে আঘাতপ্রাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি, বন্ধ হরমুজ প্রণালির প্রতীক ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা হটাও লেখা ছিল।
যুদ্ধবিরতি আলোচনা ঘিরে নতুন সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। তবে উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশ জানিয়েছে, আলোচনা এখনও চলছে। বিশেষ করে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
এরই মধ্যে এ সপ্তাহের শেষের দিকে ইরানের বন্দর অবরোধ অতিক্রমের চেষ্টা করে গাম্বিয়ার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ। পরে জাহাজাটির ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ এখনও রয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে। এতে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ, বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া রাসায়নিক সারের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
সোমবার ভোরে নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পোস্টে চলমান হামলার বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও সমালোচকদের উদ্দেশে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ইরান একটি চুক্তি করতে চায় যেটি যুক্তরাষ্ট্র ও সব দেশের জন্য ভালো একটি চুক্তি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা শান্ত থাকুন এবং অপেক্ষা করুন। শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে।’
১ দিন আগে
গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলে নিতে ইসরায়েলি বাহিনীকে নেতানিয়াহুর নির্দেশ
গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কার্যত ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও তীব্র হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে ইসরায়েলি বাহিনী একটি নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যায়, যার মাধ্যমে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকার ওপর ইসরায়েলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে হামাস-নিয়ন্ত্রিত অংশে নিজেদের অবস্থান বিস্তৃত করেছে এবং সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকাকে ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় কে প্রবেশ করতে পারবে, তা নির্ধারণের অধিকার নিজেদের বলে দাবি করছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেই সঙ্গে যাদের হুমকি মনে হচ্ছে, তাদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধবিরতির সীমারেখা-সংলগ্ন এলাকা খালি করার কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। তারা বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে নির্দেশ দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির মাঝেও ইসরায়েলি বাহিনী ‘ইয়েলো লাইন’-সংলগ্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে এবং পশ্চিম গাজার ভেতরে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এসব হামলায় ৯০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি বসতিতে আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের ভূখণ্ডগত লক্ষ্য স্পষ্ট করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরছি। এখন গাজার ৬০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে। আগে ছিল ৫০ শতাংশ, এখন ৬০ শতাংশে এসেছি। আমার নির্দেশ হচ্ছে এটিকে ৭০ শতাংশে নেওয়া।’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস বুধবার বলেন, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা, যাকে তিনি ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বলে উল্লেখ করেন। তবে মানবাধিকারকর্মীরা একে ‘বসবাসের পরিস্থিতি অসহনীয় করে দীর্ঘমেয়াদি জাতিগত নিধন পরিকল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি, তা অনুমোদনকারী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার সরাসরি লঙ্ঘন হবে। ওই পরিকল্পনায় গাজাকে অস্থায়ীভাবে ইসরায়েল ও হামাস নিয়ন্ত্রিত হিসেবে দুই ভাগে ভাগ করে একটি ‘ইয়েলো লাইন’ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ট্রাম্প পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ‘কাউকে জোর করে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা যেতে চাইবে, তারা যেতে ও ফিরে আসতে স্বাধীন থাকবে। আমরা মানুষকে গাজায় থাকার জন্য উৎসাহিত করব এবং উন্নত গাজা গড়ে তোলার সুযোগ দেব।’
এ বিষয়ে ফিলিস্তিনী গবেষক, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, ‘নেতানিয়াহু এখন কার্যত পুরো ট্রাম্প চুক্তিকেই বাতিল ঘোষণা করছেন। সহজ ভাষায় এটাই এর অর্থ।’
তিনি জানান, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবশিষ্ট ভবনগুলোও পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করেছে। ফলে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করা হলে যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ২২ লাখ ফিলিস্তিনিকে মূল ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও কম এলাকায় গাদাগাদি করে থাকতে হবে, যা আগে থেকেই অতিরিক্ত জনবহুল।
শেহাদা আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি এটি। প্রতি বর্গমিটারে বাস্তুচ্যুত পরিবার, অস্থায়ী তাঁবু বা আশ্রয় রয়েছে। ফলে বহু মানুষের জন্য এটি মৃত্যুদণ্ডের শামিল হবে, কারণ তাদের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।’
নেতানিয়াহুর ‘৭০ শতাংশ’ মন্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বিষয়টি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির সময়জুড়ে ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেছে। গাজায় কাজ করা মানবিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের জন্য জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক অগ্রগতির তথ্য উঠে এসেছে।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, উত্তরাঞ্চলীয় জাবালিয়ায় প্রায় প্রতিদিন ট্যাংক অগ্রসর হচ্ছে এবং ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি যেকোনো নড়াচড়া করা বস্তু ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিসের পূর্ব দিকেও ইসরায়েলি ট্যাংক অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এতে আরও বলা হয়, গাজার স্থানীয় সশস্ত্র নেতা আশরাফ আল-মানসি পরিচালিত ইসরায়েল-সমর্থিত একটি হামাসবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী গত সপ্তাহে জাবালিয়া এলাকায় ‘ইয়েলো লাইন’ থেকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে।
এসব গোষ্ঠী এখন সীমারেখা এলাকায় ক্রমেই সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বাহিনীর অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে কাজ করছে। তারা হামাসের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তেও বাধ্য করছে।
দক্ষিণ গাজার দেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী ওয়ায়েল নায়েফ আবু আল-আজিন বলেন, চলতি মাসের শুরুতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে তার পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, ‘দুপুর ১টার দিকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা এলাকায় ঢুকে আবু আল-আজিন পরিবারের সদস্যদের রাত ১০টার মধ্যে এলাকা খালি করতে বলেন। তারা যতটুকু সম্ভব আসবাব ও জিনিসপত্র নিয়ে যেতে নির্দেশ দেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ফিরে আসতে নিষেধ করেন।’
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট -এর গবেষক নাসের খদৌর বলেন, ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শুধু হামাসের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে না, বরং সীমারেখা-সংলগ্ন বাসিন্দাদের আরও পশ্চিম দিকে ঠেলে দিতেও ভূমিকা রাখছে।’
গত নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্ব ট্রাম্প-নিযুক্ত ‘বোর্ড অব পিস’-এর হাতে দেওয়া হয়। তারা জাতিসংঘের অভিজ্ঞ বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলে ম্লাদেনভকে গাজার ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে নিয়োগ দেয়।
তবে গত সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া ম্লাদেনভের প্রতিবেদনের সমালোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতির ব্যর্থতার জন্য মূলত হামাসকে দায়ী করা হয় এবং তাদের নিরস্ত্র হতে অস্বীকৃতির কথা বলা হয়, কিন্তু ইসরায়েলের লঙ্ঘনের বিষয়টি তেমনভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েল যদি যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের শর্ত, বিশেষ করে গাজায় বোমাবর্ষণ বন্ধ ও মূল ‘ইয়েলো লাইন’-এ ফিরে যাওয়ার শর্ত পালন করে, তাহলে তারা নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত।
অতীতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন গোপন আলোচনায় যুক্ত থাকা ইসরায়েলি বিশ্লেষক গেরশন বেসকিন বলেন, তার বিশ্বাস মূল যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, হামাসের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা নিয়ে হামাসকে প্রস্তাব দিয়েছিল, যেখানে হামাসের আগের দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হামাস কোনো জবাব দেয়নি।’
বেসকিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিকল্প পরিকল্পনার দিকে যাবে, যার আওতায় ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত ‘গ্রিন জোনে’ পুনর্গঠন কার্যক্রম চালানো হবে এবং হামাস বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের পরই ফিলিস্তিনিদের সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমেরিকানদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ইয়েলো জোনে কেবল হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীই থাকবে। এরপর ইসরায়েল তাদের সঙ্গে যেভাবে খুশি ব্যবস্থা নিতে পারবে। আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে আমি এটাই ঘটতে দেখছি।’
৪ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কুয়েতে ‘পাল্টা হামলা’ চালিয়েছে ইরান
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার কুয়েত জানায়, দেশটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। তবে কোথায় হামলা হয়েছে বা কী লক্ষ্যবস্তু ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি দেশটির সামরিক বাহিনী।
পরে ইরান জানায়, সপ্তাহের শুরুতে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাবে তারা পাল্টা অভিযান চালিয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেনি তেহরান।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, বুধবার গভীর রাতে ইরান কুয়েতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে পারস্য উপসাগরে তাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রের বিরুদ্ধে ‘অত্যন্ত গুরুতর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কুয়েতে হামলার দায় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি। তবে ইরানে চলমান সংঘাতের সময় এর আগেও কুয়েতে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য কুয়েত অতীতে ইরান ও ইরান-সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়াদের দায়ী করেছিল।
এ ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আলোচনা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এখনো পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
পারস্য উপসাগরের এই সরু জলপথ দিয়ে একসময় বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হতো। প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
এর মধ্যে ইরানকে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে তেহরান তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে, যাতে দেশটির ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।
সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, মাইন স্থাপনকারী নৌকা এবং আক্রমণকারী ড্রোন লক্ষ্য করে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোরে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, হরমুজ প্রণালির আশপাশে হুমকি তৈরি করা ইরানের চারটি একমুখী ড্রোন ভূপাতিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বাহিনী। একইসঙ্গে ইরানের বন্দর আব্বাসে একটি স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে, যেখান থেকে পঞ্চম একটি ড্রোন উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি চলছিল বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ড রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আইআরএনএর মাধ্যমে বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় হামলার কথা স্বীকার করেছে। হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইরান দাবি করেছে, যে বিমানঘাঁটি থেকে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল, সেটিকে লক্ষ্য করেই তারা পাল্টা আঘাত হেনেছে। তবে কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। কুয়েতে হওয়া হামলার সঙ্গে এই অভিযানের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়।
৪ দিন আগে
ইরানে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় আনতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল!
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে আবার ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল ইসরায়েল। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই এই তথ্যকে অবাস্তব বলে মনে করছেন।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ওই সময়ে তিনি ইসরায়েলবিরোধী কঠোর বক্তব্যের কারণে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন। তবে পরে তিনি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেকে তিনি সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। সে সময় তিনি নিজেকে সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের পক্ষে থাকা নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আহমাদিনেজাদকে গৃহবন্দি থেকে পালাতে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এমনকি তাকে তার তেহরানের বাড়ি থেকে বের করে আনতে বাড়িটির কাছের একটি নিরাপত্তা ভবনে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল। তবে পরে আহমাদিনেজাদ এই পুরো পরিকল্পনা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে যান।
এদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের এ প্রতিবেদনকে বিশ্লেষকদের অনেকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না। অনেকের মতে, এটি আহমাদিনেজাদের সমর্থকদের ছড়ানো প্রচারণা। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। এ ছাড়াও তারা বিমান হামলার মাধ্যমে ইরান সরকারকে দুর্বল করে দিয়ে সরকার পতন ঘটাতে চেয়েছিল।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষোভের মুখে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই তিনি চলমান ইরান সংঘাত থেকে কিছুটা সরে আসার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দেওয়া শর্ত মানতে তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছন তিনি। এ কারণে প্রয়োজনে ইরানে আবার হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন তিনি।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) ট্রাম্প জানান, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের নেতাদের অনুরোধে তিনি ইরানে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করেছেন। তবে পরদিন মঙ্গলবার (১৯ মে) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার দীর্ঘ ফোনালাপ হয়। ফোনালাপে আবার তারা সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইসরায়েলকে হামলা থেকে বিরত রাখা সম্ভব কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল (বুধবার) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যা চাই, নেতানিয়াহু তা-ই করবেন। আমার কাছে তিনি দারুণ একজন মানুষ।’
অন্যদিকে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতেই এ অবরোধ দেওয়া হয়েছে। কারণ, চীনই এখন ইরানের রপ্তানি করা তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস।
ট্রাম্প বলেন, তিনি হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ খুলে দিতে চান, তবে এ নিয়ে তার কোনো চাপ নেই। তিনি বলেন, আমি হরমুজ নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ার মধ্যে নেই। আমি চাই এই সংঘাতে প্রাণহানি না হোক।
আবার, তেহরান মনে করছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে। এ কারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ-সংক্রান্ত দাবি মানতে রাজি নয় ইরান। ইরান চায়, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরে করে আগে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নিক যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, ট্রাম্প যদি ইরানে আবার হামলা শুরু করে, তাহলে তারা এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেবে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন নিয়ে ইরানি গণমাধ্যমগুলোও সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ইরানি গণমাধ্যমগুলো বলছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ কখনোই গৃহবন্দি ছিলেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইসরায়েলের হামলার সময় ইরানি গণমাধ্যমে খবর এসেছিল, আহমাদিনেজাদ তার বাড়িতে হামলায় নিহত হয়েছেন।
পরে অবশ্য জানা যায়, উত্তর-পূর্ব তেহরানের নারমাক এলাকায় আহমাদিনেজাদের বাড়ির বাইরে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা করেছিল ইসরায়েল। পরে স্যাটেলাইট ছবিতেও সেই হামলার সত্যতা নিশ্চিত হয়। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করতে পারেন।
ওই বিমান হামলার পরের কয়েক দিনে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছিল, হামলায় তিনি সামান্য আহত হয়েছেন। তবে এ ঘটনায় তার দেহরক্ষী নিহত হয়েছেন।
আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় আসলে তিনি নেতানিয়াহুর ভালো মিত্র হতে পারতেন না। কারণ, তিনি তার তীব ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।
ইরানে হামলার শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি ইরানে ভেনেজুয়েলার মতো একটি মডেল অনুসরণ করতে চান। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করলেও সেখানে কারাকাসের সরকার পুরোপুরি অক্ষত রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের সঙ্গে অনেকটাই সমন্বয় করে কাজ করছেন। তবে ইরানে আহমাদিনেজাদ ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে, তাই সেখানে এমন সমঝোতার সম্ভাবনা কম।
এর আগে, ২০১১ সালে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন আহমাদিনেজাদ। এরপর থেকে আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে ২০১২ সালে আহমাদিনেজাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আলি লারিজানি পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচিত হন। মূলত মন্ত্রী নিয়োগ ও অর্থনৈতিক নীতি এসব বিষয় নিয়ে আহমাদিনেজাদতাদের সঙ্গে অন্য নেতাদের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
২০১৮ সালে আহমাদিনেজাদ তার উত্তরসূরি হাসান রুহানির সরকারের সমালোচনা করার পর গ্রেপ্তার হন। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় নেতারা জনগণের সমস্যা ও উদ্বেগ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছেন। সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।’
এসব কারণে পরবর্তীতে আহমাদিনেজাদকে ইরানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ২০২৪ সালের নির্বাচনও ছিল। পরে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই নীরব হয়ে যান। এরপর ২০২৫ সালে ইরানে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে তিনি খুব সীমিত পরিসরে সমালোচনা করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরে আহমাদিনেজাদের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর জুনে তিনি ইসরায়েলপন্থি দেশ হাঙ্গেরি সফরে গিয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর অল্প কয়েকবার বিদেশ সফরে গিয়েছেন তিনি। তার হাঙ্গেরি সফর ছিল এই কয়েকটি সফরের মধ্যে একটি। তবে, এই সফরটি ইরান সরকারের অনুমোদন নিয়েই হয়েছিল।
১২ দিন আগে
হামাসকে নিরস্ত্র করতে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চাইবে বোর্ড অব পিস
হামাসকে নিরস্ত্র করতে চাপ প্রয়োগের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আহ্বান জানাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২০ মে) অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হাতে আসা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র সমর্পণ ও গাজায় বেসামরিক প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি নয়। এ কারণে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা বোর্ড অব পিস গাজায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান নাজুক যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চলমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে নিয়ে সংস্থাটির এই প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়নের প্রধান বাধাগুলো হলো হামাসের নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হওয়া, গাজায় তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অনীহা এবং গাজাকে বেসামরিক প্রশাসনে রূপান্তরের সুযোগ না দেওয়া। এসব কারণেই সেখানে যুদ্ধবিরতির পূর্ণ বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।
তবে হামাস এক বিবৃতিতে এই প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, এতে ‘ভুল তথ্য’ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটির সঙ্গে পরিচিত এক কূটনীতিক এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে প্রতিবেদনটি এখনও প্রকাশ না হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি কথা বলেছেন।
ট্রাম্পের ২০ দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার আওতকায় হামাসকে অস্ত্র সমর্পণসহ তাদের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংসের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে এ পরিকল্পনায় গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, নতুন ফিলিস্তিনি সরকার গঠন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠনের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি স্থবির হয়ে আছে
গত সপ্তাহে বোর্ড অব পিসের প্রধান ও সাবেক জাতিসংঘ মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ জানান, অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া গাজা যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেছেন, হামাসকে নিরস্ত্র করতে গিয়ে পুরো যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি থেমে গেছে।
নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া বোর্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাস তাদের অস্ত্র জমা না দিলে গাজা পুনর্গঠন শুরু করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য কিছু চুক্তি সম্পন্ন হবে। এতে হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার নেতৃত্ব দেওয়া হামাস অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েল তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। একইসঙ্গে হামাস নিজেদের নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে শর্ত হিসেবে ধরেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বর্তমানে ভূখণ্ডটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
বোর্ড অব পিসের নতুন প্রতিবেদনে নিরাপত্তা পরিষদকে বলা হয়েছে, গাজায় সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্র অপসারণ করা হলে যুদ্ধের সমাপ্তি হবে। পাশাপাশি অস্ত্র হস্তান্তর সম্পন্ন হলে গাজা পুনর্গঠন শুরু হবে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরির জন্য সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হামাসের দবি, যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিতেই এ প্রতিবেদন
এদিকে, হামাস জানিয়েছে, প্রতিবেদনটি ভুল তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে। ইসরায়েলি দখলদার সরকারকে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের দায় অব্যাহতি দিতেই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েল কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য আশ্রয় তৈরিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণ প্রবেশে বাধা দিয়েছিল। এই বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উপেক্ষা করা হয়েছে।
হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, নিরস্ত্রীকরণ বিষয়টি নিয়ে করা পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে ভেস্তে দিতেই এমন অযৌক্তিক শর্তকে বার বার সামনে আনছেন তারা।
এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদ ও নিকোলাই ম্লাদেনভের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হামাস বলেছে, ইসরায়েলকে আগে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিদিনের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ
হামাস বিবৃতিতে জানিয়েছে, গাজায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তারা আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করে আসছে। এছাড়া, গাজার মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছ্। এ বিষয়গুলোকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় এখনও বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত এলাকার চেয়েও বেশি অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। অন্যদিকে, গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষ চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। অধিকাংশ মানুষই এখানে তাবু টাঙিয়ে বসবাস করছে।
গত সপ্তাহে নিকোলাই ম্লাদেনভ জানান, তার দপ্তর প্রতিদিন উভয় পক্ষের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলা করছে। তবে এক্ষেত্রে তিনি নিরস্ত্রীকরণ বিষয়টিকেই কোনো সমাধান বের না হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, হামাস অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে কোনো আলোচনায় আসতে রাজি না। এ কারণেই গাজায় অন্যান্য বিষয়ে অগ্রগতি আটকে আছে।
১২ দিন আগে
ইরান যুদ্ধের জের: আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের শঙ্কায় আরব আমিরাত
সহিংসতা ও অস্থিরতায় ভরা মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে আরব আমিরাত নিজেদের ‘আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে প্রচার করে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে ইরানের চক্ষূশূল হওয়ায় ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশটির অর্থনীতি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র আরব আমিরাত যুদ্ধ চলাকালে অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় সব থেকে বেশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আমিরাতের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, পর্যটন ও সম্মেলন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পারস্য উপসাগরের ওপারে অবস্থিত ইরানের ঠিক বিপরীত দেশ আরব আমিরাত নিজেদের শক্তিশালী ও অবিচল দেখানোর চেষ্টা করলেও দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি তারা হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে তারা ওপেক তেল কার্টেল থেকে সরে এসেছে। অবশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই তারা এই পরিকল্পনা করেছিল।
প্রথম থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রত্যক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তবে আস্তে আস্তে এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে আরব আমিরাত। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সময় রবিবার (১৭ মে) আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরান ড্রোন হামলা করে।
তবে এই প্রতিকূল অবস্থা ও সংকটের মধ্যেও দেশটির অর্থনীতি টিকে আছে। চলমান এই সংকট এখনও কর্মসংস্থান হ্রাস বা বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। একটি বিশাল পরিমাণে নগদ উদ্বৃত্তের সঞ্চয় দেশটিকে এই সম্ভাব্য মন্দা থেকে অনেকটা বাঁচিয়ে রেখেছে।
তবে এই সংকট যত দীর্ঘ হবে, ততই আমিরাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ধীরে ধীরে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে দেশটি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে।
বর্তমানে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে জলদস্যুতা এবং এমনকি সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলছেন এবং সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।
রবিবার (১৭ মে) রাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘কোনো পরিস্থিতিতেই আমিরাত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো প্রকার হুমকি সহ্য করবে না। যেকোনো হুমকি, অভিযোগ বা শত্রুতার জবাব দিতে এটি তার পূর্ণ, সার্বভৌম, বৈধ, কূটনৈতিক ও সামরিক অধিকারের প্রয়োগ করবে আমিরাত।
আমিরাতের শাসক পরিবারও আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বারাকাহ হামলায় আমিরাত কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এই হামলায় আবুধাবির সুদূর পশ্চিমের মরুভূমিতে অবস্থিত পারমাণবিক কেন্দ্রটিতে তেজস্ক্রিয়তা নির্গমন হয়নি এবং এর কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
আমিরাত মূলত সাতটি স্বৈরতান্ত্রিকভাবে শাসিত শেখ শাসনের একটি ফেডারেশন, যার মধ্যে রয়েছে দুবাই ও আবুধাবি। দেশটির শীর্ষ শাসক সংস্থা হলো ফেডারেল সুপ্রিম কাউন্সিল, যা সাতটি আমিরাতের বংশানুক্রমিক শাসকদের নিয়ে গঠিত। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবুধাবির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও তার পরিবারের আধিপত্য বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শাসক পরিবারটি গত কয়েক দশক ধরে আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ। আমিরাত ২০১৩ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সুদান ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষে অস্ত্র পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে। তবে তারা এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
প্রকাশ্যে খুব কম কথা বলা শেখ মোহাম্মদ মার্চ মাসে একটি হাসপাতালে ইরানি হামলায় আহতদের দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমিরাত আকর্ষণীয়, আমিরাত সুন্দর, আমিরাত একটি আদর্শ। কিন্তু আমি তাদের বলব, আমিরাতের চেহারা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আমিরাতের চামড়া কিন্তু অত্যন্ত মোটা এবং মাংস তিতা। আমাদের ঘায়েল করা অত সহজ নয়।’
অর্থনৈতিক সতর্কতার লক্ষণ
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া আমিরাতের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যদিও কয়েকটি ট্যাংকার ওই নৌপথ দিয়ে বের হতে সক্ষম হয়েছে। প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থিত তেল টার্মিনালসহ ফুজাইরাহ শহরে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা যাচ্ছে। আমিরাত সেই সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে দ্বিতীয় পাইপলাইন দ্রুত নির্মাণ করার চেষ্টা করছে।
তবে ইরান যুদ্ধের জেরে আমিরাতের পর্যটন ও সম্মেলন বাজার কঠিন আঘাতের মুখে পড়েছে। এটি দেশটির মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের ১২ শতাংশেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।
কাতারভিত্তিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান নর্থবোর্ন অ্যাডভাইজরির তথ্য অনুযায়ী, যারা যুদ্ধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাতে ৭০টিরও বেশি নির্ধারিত অনুষ্ঠান স্থগিত, বাতিল বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমিরাত সরকার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি, তবে আয়োজকরা সম্ভবত ‘বীমা প্রত্যাহার ও দায়বদ্ধতার ঝুঁকির’ কারণে পরিকল্পনাগুলো পরিবর্তন করেছেন।
দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের বিষয়ে গত ৪ মে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানসংস্থা এমিরেটস ঘোষণা করে যে তাদের প্রায় সম্পূর্ণ ফ্লাইট সূচি পুনরায় চালু হয়েছে। কিন্তু সেই একই দিন ইরান একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ ঘটনার পর মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় যা আমিরাতে অবস্থানরত দেশে ফিরতে আগ্রহী ব্যবসায়ী সমাজে হাহাকার সৃষ্টি করে।
বিমানবন্দরটি এখন তার জেট জ্বালানি ট্যাংকের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা আলোচনা করতে রাজি হননি।
দখলের হার প্রায় ২০ শতাংশে নেমে আসায় দুবাইয়ের আইকনিক বুর্জ আল আরবসহ একাধিক হোটেলের সংস্কার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষক সংস্থা মুডিজ অ্যানালিটিক্স অনুমান করছে, এই হার জুন প্রান্তিকে ১০ শতাংশে নামবে, যা যুদ্ধের আগে ছিল ৮০ শতাংশ।
মুডিজ সতর্ক করেছে যে, দখলের হার সম্ভবত ২০২৬ সালের বাকি সময় আরও নিম্নমুখী থাকবে, কারণ যুদ্ধ থামলেও পর্যটকরা ভ্রমণে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবেন।
সোমবার (১৮ মে) প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুবাইয়ের উন্মুক্ততা এটিকে ভ্রমণ, লজিস্টিক্স ও আস্থার ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে, তবে আবুধাবির ব্যালেন্স শিট ও জ্বালানি সম্পদ ফেডারেশনকে আঘাত সামলে নেওয়ার সক্ষমতাও দেয়।
কয়েন-চালিত যুদ্ধবিমানের শিল্পকর্ম
দুবাই বিশেষভাবে দেখানোর চেষ্টা করছে যে দেশটি এখনও সক্রিয়। গত সপ্তাহের শেষে দুবাই তার বার্ষিক আর্ট দুবাই শোয়ের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ আয়োজন করেছে। সেখানে একটি শিল্পকর্ম ছিল। শিল্পকর্মটি একটি কয়েন-চালিত কালো যুদ্ধবিমান। এটি একটি কালো নাইকি টেনিস জুতা দিয়ে ঢাকা ছিল।
স্পেনের শিল্পী সুলিমান লোপেস একটি ধাতু-সমৃদ্ধ গ্রহাণুর মালিকানা দাবির ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি শিল্পকর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যেটি নাসার একটি মিশনের লক্ষ্যকে ইঙ্গিত দেয়। দেশ ও কোম্পানিগুলো কীভাবে তেল ও অন্যান্য পণ্য আহরণ করে, শিল্পকর্মটি তার প্রতিফলন ঘটায়।
তবে চলমান এই যুদ্ধাবস্থা লোপেসকে তার শিল্পকর্ম নিয়ে দুবাইয়ে যোগ দেওয়ার বিষয়টি কঠিন করে তুলেছিল। এই শিল্পী বলেন, ‘তবে আমি বললাম, আমাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে এই অঞ্চলে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য এটিই উপযুক্ত জায়গা।’
বৈরুতের শিল্পী আলফ্রেড তারাজি উল্লেখ করেন, তার দাদা-দাদি দুটি বিশ্বযুদ্ধ পার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বযুদ্ধেও জীবন থেমে থাকে না। আমরা সহিংসতার বিরুদ্ধে সংস্কৃতি দিয়েই লড়াই করব।’
১৩ দিন আগে
নেতৃত্ব পরিবর্তনেই কি ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশের পরবর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিরোধী দলীয় নেতা নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ একজোট হয়েছেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনার কমতি না থাকলেও গাজা ও আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে তাদের তেমন কোনো মাথাব্যাথা নেই।
ইতোমধ্যে গাজায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবু দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনেট ও লাপিদ বাজি ধরছেন যে, অক্টোবরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলে তারা ইসরায়েলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।
এপ্রিলে সরকার গঠনের প্রচারণা শুরু করে চরম ডানপন্থি বেনেট ভোটারদের ‘সংশোধনের এক যুগের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার ভাষায় নেতানিয়াহুর আমলের বিভেদ ও একঘরে অবস্থার অবসান ঘটিয়ে ‘পেশাদার’ ও ‘ইসরায়েলের মঙ্গলে নিবেদিত’ নেতারা দেশ চালাবেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে একঘরে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। জাতিসংঘের একটি কমিশন গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউরোপে স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে।
শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্য থেকেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্থগিতের চাপ বাড়ছে। এমনকি ইসরায়েলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপেও দেখা গেছে, দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেই ইসরায়েলের একাধিক যুদ্ধ ও মার্কিন রাজনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (ইসিএফআর) পলিসি ফেলো বেথ অপেনহেইমের ‘ইসরায়েল ক্রমেই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে’ মন্তব্যটি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক বলা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জনমত জরিপের দিকে ইঙ্গিত করে আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আপাতত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর প্রকাশ্যে ‘বন্ধুত্ব’ বজায় আছে, তবে ইরান ও লেবানন যুদ্ধে সেই সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ট্রুথ সোশ্যালে ইসরায়েলকে লজ্জাজনক আদেশ দিচ্ছেন।’
এদিকে, ইউরোপে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। কেবল হলোকস্টের স্মৃতি এবং বাণিজ্য ও অস্ত্র চুক্তির স্বার্থগত হিসাব-নিকাশ ইউরোপকে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া থেকে আটকে রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
অথচ গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর অব্যাহত দখলদারত্বের বিষয়ে বেনেট ও লাপিদের কোনো উল্লেখযোগ্য সমালোচনা নেই। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা মনে করেন নেতানিয়াহু যথেষ্ট কঠোর হননি।
১৬ দিন আগে
লেবাননের মহাসড়কে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা, নিহত ৮
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণের একটি মহাসড়কে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে এক নারী ও তার দুই সন্তানও রয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৩ মে) তিনটি গাড়িতে এ হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননেরর কয়েকটি এলাকায় হিজবুল্লার অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, মহামলার কয়েক ঘণ্টা আগে তারা দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এদিকে, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ওয়াশিংটনে আরেকটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে এই প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো করার জন্য চাপ দিচ্ছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিবৃতিতে দেশটিতে ইসরায়েলর তিনটি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে মহাসড়কে চালানো এ হামলায় কোন গাড়িতে কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বুধবার ইসরায়েলি তিনটি ড্রোন হামলার মধ্যে দুটি হামলা বৈরুত থেকে দক্ষিণের একটি মহাসড়কে চালানো হয়। মহাসড়কটি বৈরুতের সঙ্গে বন্দরনগরী সিডনকে সংযুক্ত করেছে। অপরদিকে, তৃতীয় হামলাটি সাদিয়াত শহরের ব্যস্ত মহাসড়কে চালানো হয়।
এ ছাড়াও, সিডনের উত্তরে বুধবার দুপুরের দিকে আরেকটি হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সে সময় তারা একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক আলোকচিত্রী লেবাননের উপকূলীয় শহর বারজা ও জিয়েহর কাছে এই দুটি হামলায় নিহত তিনজনের মরদেহ দেখতে পেয়েছেন।
এদিকে, দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইসরায়েলি বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারাও ইসরায়েলের দিকে হামলা চালাচ্ছে।
গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-হিজবুল্লার মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ শুরু হয় ২ মার্চ। এর দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এরপর হিজবুল্লা উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে।
লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরেদ্দিন স্থানীয় সময় গতকাল (মঙ্গলবার) সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৩৮০ জন নিহত এবং ১ হাজার ১২২ জন আহত হয়েছেন।
এ নিয়ে যুদ্ধ শুরু সময় থেকে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮২ জনে। এর পাশাপাশি আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৭৮৬ জন।
১৯ দিন আগে
ইরানের হয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৯ ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা
ইরানের হয়ে যুক্তরাজ্য ও আন্তজাতিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগে ৯ ব্যক্তি ও ৩টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির দাবি, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অবৈধ অর্থায়ন ও সহিংস তৎপরতার সঙ্গে জড়িত। তাদের এসব কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিভিন্ন দেশে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা জন্য তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করছে। এসব বাহিনী-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ অর্থায়নের মাধ্যমে ইরানের হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার মতো কার্যক্রমে সহায়তা করছে। তাদের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করেছে। তাদের থামাতেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান সরকারকে সমর্থন দেওয়া এই অপরাধী চক্রগুলো যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি অবৈধ অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যুক্তরাজ্য সরকার ইতোমধ্যে ৫৫০ জন ইরানি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, ইরান ব্রিটিশ ভূখণ্ডে হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য হামলার ষড়যন্ত্র করছে।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠী সাম্প্রতিক কয়েকটি ইহুদিবিদ্বেষী হামলার দায় স্বীকার করেছে। এসব হামলার মধ্যে ছুরিকাঘাত এবং উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগের চেষ্টার ঘটনাও রয়েছে।
অপরদিকে, ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ফাইভ জানিয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইরান-সমর্থিত ২০টির বেশি প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেছে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা জিন্দাশতি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অভিযোগ, তারা ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। এই গোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে ব্যক্তি বিশেষকে হুমকি দেওয়া, হামলার পরিকল্পনা বা সরাসরি হামলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রও এই নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, একজন মাদক পাচারকারী এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। তিনি ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইরানবিরোধী সমালোচকদের হত্যা ও অপহরণের কাজ করতেন।
এছাড়া, যুক্তরাজ্যে জারিংহালাম পরিবারের ৫ সদস্যকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ ব্যবহার করে যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।
গত বছর জারিংহালাম পরিবারের তিন ভাই মানসুর, নাসের ও ফাজলোলাহ জারিংহালাম যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, তারা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তাদের ছায়া ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরানের প্রধান পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক ও সামরিক খাতের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ইরানে পাচার করেছেন।
এছাড়া আরও ৪ ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। তাদের মধ্যে দুইজন ইরানি, একজন তুর্কি নাগরিক এবং একজন আজারবাইজানি নাগরিক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারীদের হুমকি দেওয়া, হামলার পরিকল্পনা এবং হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ।
২০ দিন আগে