বিশেষ-সংবাদ
তিস্তা প্রকল্পে ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয়, সুফল পাচ্ছেন ১০ লাখ কৃষক
দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলার কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে পানি পাওয়ায় স্বস্তিতে আছেন কৃষকরা। এতে উৎপাদন বৃদ্ধিরও প্রত্যাশা করছেন তারা।
চলমান বোরো মৌসুমে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দেশের অনেক স্থানে সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এই সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।
তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় উত্তরের চার জেলার প্রায় ১০ লাখ কৃষক কোনো ধরনের বাড়তি ভোগান্তি ছাড়াই বোরো আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। ডিজেল ও বিদ্যুচ্চালিত সেচের তুলনায় সাশ্রয়ী ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হওয়ায় প্রতি বছরই এ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে আবাদি জমির সংখ্যা। যদি তিস্তা খনন করে এই খালগুলোর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয় তবে কৃষকরা সুবিধা পাবেন, আর উৎপাদনও কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রংপুর পাউবোর উপপ্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৫-২৬) বোরো মৌসুমে উত্তরের চার জেলার মোট ১২ উপজেলার ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় এসেছে। প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী জেলার পাঁচটি উপজেলায় (সদর, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর) ৩২ হাজার হেক্টর, দিনাজপুর জেলার তিনটি উপজেলায় (খানসামা, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর) ৬ হাজার হেক্টর, বগুড়ায় ২৩ হাজার হেক্টর এবং রংপুর জেলার চারটি উপজেলায় (সদর, গংগাচড়া, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ) ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। তিস্তা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন খালের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, গঙ্গাচড়া উপজেলার সয়রা বাড়ি ও বাকপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার খালের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি এনে প্রায় ১৩০ একর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নদীতে ৮ থেকে ৯ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে, গত বছরের এ সময়ে যা ছিল মাত্র ৩ হাজার কিউসেক।
তিস্তা প্রকল্পের সেচব্যবস্থায় সন্তুষ্ট স্থানীয় কৃষকরা। এ বিষয়ে গংগাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, অন্য উৎস থেকে এক একর জমিতে সেচ দিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় সেচ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এক একর জমিতে ৮৫ থেকে ৯০ মণ ফলনের আশা করছেন।
কৃষকদের মতে, তিস্তার পানিতে থাকা পলি মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের পানি ব্যবস্থাপনা দলের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বলেন, তিস্তার পানিতে পলি থাকায় জমিতে একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা দীর্ঘক্ষণ পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার অনেক কমে আসে। ফলে অন্য সেচ ব্যবস্থার তুলনায় এখানে বিঘাপ্রতি তিন-চার মণ ফলন বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, তিস্তা প্রকল্পের সুবিধার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাকপুর পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মালেক জানান, ফেব্রুয়ারির আগে পানি না পাওয়ায় অনেককে বীজতলা তৈরির সময় বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হয়েছে। এছাড়া কাঁচা খালে ইঁদুরের গর্ত এবং উঁচু-নিচু জমিতে পানি পৌঁছানোর সমস্যাও রয়েছে।
অপরদিকে, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কিছু খালের সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। জানুয়ারির শুরু থেকেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান সমস্যা দূর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পাউবো রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে। চৈত্র মাসে আগাম বৃষ্টির কারণে এবার নদীতে পানি বেশি, জলবায়ু পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা।’
সেচের সময় এগিয়ে আনার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধান, তামাক, ভুট্টাসহ ভিন্ন ভিন্ন ফসলের কারণে সেচের সময় সমন্বয় করতে হয়। কৃষকরা যদি একই ধরনের ফসল আবাদ করেন, তবে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব। বেশকিছু খালের সংস্কারকাজ চলায় এ বছর জমির পরিমাণ আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি, তবে আগামী দুই মাস এ সরবরাহ অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
৯ দিন আগে
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি: নবায়নের আগে প্রয়োজন ‘বড় ধরনের সংস্কার’
চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে চলা বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিটি নবায়নের আগে এর ‘সার্বিক পর্যালোচনা ও সংস্কার’ প্রয়োজন। এ বিষয়ে পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ সঠিকভাবে বণ্টন না হলে এর ঝুঁকি বাংলাদেশের ওপরই বেশি পড়বে।
ইউএনবির সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রচুর কাজ (হোমওয়ার্ক) করতে হবে এবং তথ্য বিনিময়ই এখানে মূল বিষয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৯৬ সাল আর ২০২৬ সালের পরিস্থিতি এক নয়। বিষয়টিকে কেবল প্রকৌশল বা কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে চলবে না; পরিকল্পনায় অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
ঝুঁকি কোথায়?
ঢাকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি নতুন কোনো চুক্তি না হয়, তবে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জলবায়ুগত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়। ফলে চলতি বছরই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে চুক্তিটি সংশোধন ও নবায়নের সম্ভাব্য বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো আলোচনা শুরু হয়নি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার মতো আরও ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদী রয়েছে। এ সংক্রান্ত সব বিষয় আলোচনার জন্য দুই দেশের মধ্যে ‘যৌথ নদী কমিশন’ নামক একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, যেহেতু উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী, তাই গঙ্গার পানি বণ্টনে একটি ‘ন্যায্য ও জলবায়ু-সহিষ্ণু’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে এই সম্পর্কের অন্যতম প্রথম পরীক্ষা।
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং ইতোপূর্বে দেশটির লোকসভায় জানিয়েছেন যে, খাবার পানি ও শিল্প কারখানার পানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারসহ সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে, যা ভারত সরকারের অবস্থান নির্ধারণে বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
একটি কূটনৈতিক সূত্র ইউএনবিকে জানায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন অনুমোদিত প্রতিনিধি ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর, ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ ও ৩১ মে এবং ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাগুলোতে অংশ নেন, যেখানে ভারতের পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত অবস্থান তৈরি করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য টানাপোড়েন থাকলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে যৌথ নদী কমিশনের আওতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পানিবিষয়ক সকল কারিগরি সভা অব্যাহত রয়েছে।
সংস্কার ও নবায়নের আহ্বান
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শাহাব বলেন, ‘আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সংশোধন করতে হবে। এর সহজ কারণ হলো, চুক্তিটি প্রায় তিন দশক আগে করা হয়েছিল।’
চুক্তিটি যখন স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত বহুমাত্রিক সমস্যাগুলো বর্তমানের মতো এতটা স্পষ্ট ছিল না, যা চুক্তির মূল পাঠে প্রতিফলিত হয়েছে। এই চুক্তিতে ‘জলবায়ু-সহিষ্ণু পরিবর্তনের’ পক্ষে যারা মত দিচ্ছেন, অধ্যাপক শাহাব তাদের অন্যতম।
এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভূ-প্রকৃতি এবং অবশ্যই জলবায়ু-সংক্রান্ত ইস্যুগুলো বদলে গেছে। তাই বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তিতে চুক্তিটি পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি জোরালোভাবে পরামর্শ দেন যে, যৌথ নদী কমিশনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তথ্য বিনিময়ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে চুক্তিটি সম্পন্ন করা উচিত। এটি দুই দেশের মধ্যে ‘হাইড্রো-ডিপ্লোমেসি’ বা পানি-কূটনীতি এবং পানি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আস্থা বৃদ্ধি করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে আমাদের কেবল কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং প্রকৌশল, বিজ্ঞান এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অংশ নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
অধ্যাপক শাহাবের মতে, বিষয়টিকে কেবল কূটনীতি বা প্রকৌশল বিদ্যার ওপর ছেড়ে দিলে কোনো সামগ্রিক সমাধান পাওয়া যাবে না।
‘এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সরকারের যথেষ্ট কাজ (হোমওয়ার্ক) করা উচিত, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ— অর্থনীতিবিদ, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞানীদের যুক্ত করা প্রয়োজন,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন যে পরিবেশবাদীদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
অধ্যাপক শাহাব বলেন, ‘পানিকে কেবল পানি, অথবা কেবল কূটনৈতিক বা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ধারণাটি একটি পুরনো এবং সেকেলে পদ্ধতি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি দুই দেশের মধ্যে বাস্তববোধ কাজ করে, তবে তারা অবশ্যই একটি সমগ্রিক পর্যালোচনা ও সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি চুক্তির দিকে যাবে, যা এই সহস্রাব্দে জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।’
মরিশাসে নবম ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছিলেন, জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করে এমন একটি নতুন বা সংশোধিত চুক্তি দেখতে চায় বাংলাদেশ।
সম্মেলনের ফাঁকে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এগুলো অভিন্ন নদী এবং এখানে আমাদের অভিন্ন ঐতিহ্য ও স্বার্থ রয়েছে। আমি যেমনটি বলেছি, একটি টেকসই এবং জন-আস্থার প্রতিফলন ঘটায় এমন সমাধান খুঁজে বের করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। আগামী ২৫ থেকে ৫০ বছরের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর ইতোমধ্যে পার হয়েছে। তাই আমি মনে করি না যে আমাদের কেবল ৫ বা ১০ বছরের কথা ভাবা উচিত; আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। তাই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা বলা ভালো, জনকল্যাণমূলক নীতিতে পারস্পরিক জলবায়ু সহিষ্ণুতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি।’
১০ দিন আগে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুড়িগ্রামের জলাংকারকুঠির চর, ঝুঁকিতে একমাত্র স্কুল
ব্রহ্মপুত্র নদের অব্যাহত ভাঙনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার জলাংকারকুঠির চর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এতে চরের প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একইসঙ্গে হুমকির মুখে পড়েছে চরের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ স্কুল।
চরটি উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ও বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সীমান্তে অবস্থিত। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এসব পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে এই দুর্গম চরে আশ্রয় নিয়েছে।
উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখানে বসবাস করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন কোনো সুযোগ না থাকলেও তারা সংগ্রাম করে টিকে আছে।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে স্থানীয় উদ্যোগে ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাঁশ ও টিনে নির্মিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আশপাশের চরাঞ্চল থেকেও শিশুরা এখানে পড়তে আসে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোত ও ভাঙনে চরটির আয়তন দ্রুত কমে আসছে। ইতোমধ্যে বসতঘরের পাশ ঘেঁষে ভাঙন শুরু হয়েছে এবং নদী ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে যে কোনো সময় স্কুলসহ পুরো বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, নদীভাঙনের কারণে তাদের স্কুলটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করছে তারা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু সাইদ ও এনামুল হক বলেন, চরের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি এখন চরম ঝুঁকিতে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
চরের গৃহবধূ রজিবা বেগম বলেন, আগে বাচ্চাদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল না। এখন স্কুল হয়েছে, কিন্তু ভাঙন বন্ধ না হলে সেটিও টিকবে না।
এদিকে, চরের বাসিন্দা হায়দার আলী ও আবু বক্করসহ আরও কয়েকজন জানান, নদীভাঙনে তারা আগেই জমিজমা হারিয়েছেন। এখন আবারও উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, চরে ভাঙন রোধে স্থায়ীভাবে কাজ করার নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। তবে আবেদন পেলে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জলাংকারকুঠির চর বিলীন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি প্রজন্ম শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হবে।
১০ দিন আগে
পন্টুন সংকটে চাঁদপুরের পুরানবাজার, ঝুঁকিতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রমিক জীবন
চাঁদপুরের বাণিজ্যিক হাব পুরানবাজারে মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীতে পর্যাপ্ত পন্টুন না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও দিনমজুররা। এতে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
পুরানবাজারের নদীপাড়ের বিভিন্ন ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে পন্টুনের অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে মালামাল লোড-আনলোড করতে হচ্ছে শ্রমিকদের। ইতোমধ্যে এ কাজে গিয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে পুরানবাজার চাঁদপুরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীসংলগ্ন ভূঁইয়ার ঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানিকৃত পণ্য লোড-আনলোড করা হয়। তবে বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি পন্টুন রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে পন্টুনটি প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। নদীর পাড় প্রশস্ত হয়ে যাওয়ায় ট্রলার বা জাহাজ থেকে গুদামে মালামাল পরিবহনে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ বিষয়ে প্রবীণ চাল ব্যবসায়ী নকীব চৌধুরী, মাইনুল ইসলাম কিশোর, নাজমুল আলম পাটোয়ারী এবং লবণ ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় জানান, পুরানবাজারের ব্যবসা সম্প্রসারণে ২০১৭ সালের মে মাসে বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালকের কাছে দেওয়ানঘাট, ১ নম্বর ঘাট এবং জনতা লবণ মিল-সংলগ্ন এলাকায় তিনটি পন্টুন স্থাপনের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। সে সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, পন্টুনের অভাবে শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জনস্বার্থে দ্রুত নতুন পন্টুন স্থাপন জরুরি।
চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব নাজমুল আলম পাটোয়ারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
জনতা লবণ মিলসের মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভূঁইয়ার ঘাটের পন্টুনটি পুরানবাজারের ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এখান দিয়েই অধিকাংশ পণ্য লোড-আনলোড হয়। তাই দ্রুত নতুন পন্টুন স্থাপন প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বন্দর কর্মকর্তা কামরুজ্জামান জানান, বিষয়টি তিনি নতুনভাবে জেনেছেন। শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং সেখানে জেটি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের আশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পুরানবাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে আসবে।
বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার সবচেয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র পুরানবাজারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার চাল, ডাল, লবণ, তেল, চা পাতা, ভুষিসহ বিভিন্ন পণ্যের লেনদেন হয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই নৌপথ, রেলপথ ও সড়কপথে এই বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
১১ দিন আগে
ইরান যুদ্ধের আঁচ: তাপপ্রবাহের মাঝে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ ঝিনাইদহবাসী
বৈশাখের তীব্র তাপদাহে যখন প্রাণীকূলের জীবন হাঁসফাঁস করছে, তখন তীব্র লোডশেডিংয়ের ফলে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। আর এই বিপর্যয় নিয়ে দুঃসহ দিন পার করছেন ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) লাখো গ্রাহক।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছে জেলাজুড়ে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে ঝিনাইদহের কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
জানা গেছে, ঝিনাইদহের পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকোর মোট চাহিদা ১২৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ৭৫ মেগাওয়াট ও ওজোপাডিকোর ৫৪ মেগাওয়াট। কিন্তু এই দুই দপ্তর মিলে পাচ্ছে মাত্র ৭৭ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকছে ৫২ মেগাওয়াট।
ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) প্রকৌশলী নাজমুন নাহার জেরিন জানান, ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় বর্তমানে গ্রাহকের সংখ্যা ৪ লাখ ৪৫ হাজার ২৬৪। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ৩ লাখ ৯৯ হাজার ১২৬, বাণিজ্যিক ২৫ হাজার ৮৪৫, সেচ পাম্প ১০ হাজার ৮৯৫, হাসপাতাল ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫ হাজার ৬৭০ এবং শিল্প ও অন্যান্য স্থাপনায় ৩ হাজার ৭২৮টি সংযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কিছুটা কম পাওয়া যাচ্ছে। ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাহিদা ৭৫ মেগাওয়াট, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩৮ থেকে ৫৪ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ফিডারে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ইহছানুল ইসলাম নামে পল্লী বিদ্যুতের এক গ্রাহক বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রামের মানুষ প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। টানা বিদ্যুৎ বন্ধ না করে রেশনিং পদ্ধতি ও সমতার ভিত্তিতে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বহাল রাখার দাবি জানান তিনি।
সাবেক অধ্যক্ষ সায়েদুল ইসলাম জানান, বিদ্যুতের ঘাটতিতে জনজীবনে দুর্ভোগ ও ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। গরমে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় চরম বিঘ্ন ঘটছে। অনেক এলাকায় টানা এক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। মানুষ বুঝতে চাচ্ছে না এই দুর্ভোগ যুদ্ধের কারণে হচ্ছে।
ঝিনাইদহ চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, জেলার ছোটবড় কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় তারা এলাকাভেদে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিস্থিতির উন্নতি কবে হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বার্তা দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ওজোপাডিকোর ঝিনাইদহ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দ্বীন মোহাম্মদ মহিম জানান, ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় তাদের গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৫। ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ৫৪ থেকে ৬০ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৯ মেগাওয়াট। জেলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকোর প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতেও চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি অনেক কম। ফলে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে মানুষ।
১৩ দিন আগে
কুড়িগ্রামে বিদেশি আঙুর চাষে দুই উদ্যোক্তার সাফল্য দেশব্যাপী সাড়া ফেলেছে
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় বিদেশি প্রজাতির (বাইকুনুর) লাল আঙুর চাষ করে সফলতা পেয়েছেন দুই কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলী। তাদের এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার আশা জাগিয়েছে।
উপজেলার গংগাহাট বাজারসংলগ্ন আজোয়াটারী এলাকায় দুই বিঘা জমিতে প্রায় এক দশকের পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে তাদের আঙুর বাগান। বর্তমানে সেখানে ৪৬০টি বাইকুনুর জাতের আঙুরলতা রয়েছে।
উদ্যোক্তারা জানান, ২০১৭ সালে মাত্র ৪০টি চারা দিয়ে তারা যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে সামান্য ফলন এলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর বিক্রি শুরু করেন তারা। ওই বছর ৫০টি গাছ থেকে প্রায় ৫ মণ আঙুর বিক্রি হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ১০ মণ, ২০২৪ সালে ১৫ মণ এবং ২০২৫ সালে ২০ মণ আঙুর বিক্রি করা হয়। চলতি বছর ৬০টি গাছ থেকে ৪০ থেকে ৪৫ মণ আঙুর উৎপাদনের আশা করছেন তারা, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা হবে বলে ধারণা তাদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানে বাইকুনুর ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশি জাতের আঙুরের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক ফলজ গাছ রয়েছে। বাগানটি এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আগ্রহীরা এখান থেকে আঙুরের চারা সংগ্রহ করছেন।
১৪ দিন আগে
রংপুরের কৃষিতে সৌর বিপ্লব, মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা, সরবরাহ শঙ্কা এবং দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিখাতেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে ডিজেলনির্ভর কৃষকদের উদ্বেগ এখন চরমে।
এমন বাস্তবতায় রংপুর অঞ্চলে আশার আলো হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে একেকটি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকেরা বলছেন, ডিজেল সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি ছাড়াই এখন সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ কমছে, বাড়ছে আবাদও।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত একটি ডাগওয়েলের দায়িত্বে আছেন আতিয়ার রহমান।
তিনি বলেন, এলাকায় ব্যাপকভাবে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। এই সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে নিয়মিত পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘ডিজেল পাওয়া না গেলে বা দাম বাড়লেও কৃষকদের এখন আর চিন্তা করতে হয় না। কারণ এই সেচযন্ত্র চলে সৌরবিদ্যুতে।’
পাশাপাশি তিনি একটি বড় সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, বছরে মাত্র চার মাস সেচকার্যে ব্যবহারের পর বাকি আট মাস সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক, প্রতিষ্ঠান ও সরকার—সবাই লাভবান হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৌর বিদ্যুতের প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি পাম্প চালিয়ে কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দিচ্ছে। কোথাও ডিজেলের ধোঁয়া নেই, নেই জ্বালানি সংগ্রহের দৌড়ঝাঁপ, নেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার উৎকণ্ঠা।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক সুধাম চন্দ্র সেন বলেন, তেলের চিন্তা নাই। সোলার থেকে বিদ্যুৎ হয়, পানি পাই। ফসলও ভালো হয়, খরচও কম লাগে।
তিনি আরও বলেন, আগে বিদ্যুৎ থাকত, আবার থাকত না। অনেক সময় জমিতে পানি দিতে দেরি হতো। এখন সোলারে সবসময় পানি পাওয়া যায়।
নদী বাঁচাও তিস্তা বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের লালমনিরহাট জেলা ইউনিটের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষিকে আধুনিক করার জন্য এ ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সৌরচালিত সেচ প্রকল্প আরও বাড়ানো দরকার।
বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ জানান, ২০২২ সালের পর নতুন কোনো সৌর সেচ প্রকল্প চালু হয়নি। তবে আগের স্থাপনাগুলো এখনও সচল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫৯৬টি সৌরচালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। প্রতিটি যন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরা হলে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট বা ৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একইসঙ্গে চার মাসের সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, তাদের আওতায় নতুন প্রকল্প না এলেও পুরোনো প্রকল্প চালু আছে। মাঠ পর্যায়ে দুটি নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এছাড়া অফিস ভবনের সৌর বিদ্যুৎও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মিজানুর রহমান বলেন, ডিজেলনির্ভর সেচ থেকে সৌরচালিত সেচে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে পারলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে টেকসই কৃষির কার্যকর পথ।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ সৌরচালিত সেচযন্ত্র পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে। তাই এসব স্থাপনায় নেট মিটারিং চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে বাস্তবায়ন সম্ভব।
কৃষকদের দাবি, নতুন করে সৌর সেচ প্রকল্প চালু হোক, পুরোনো প্রকল্প সংস্কার হোক আর অব্যবহৃত সময়ের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হোক।
১৫ দিন আগে
সুনামগঞ্জের হাওরে চলছে না হারভেস্টার, ধান কাটা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কৃষকরা
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষক ও মেশিনমালিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিনে ডিজেল সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহের জটিল প্রক্রিয়াও সমস্যাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় ধান কাটা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে হাজারো কৃষকের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটা শুরু হলেও পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন সচল না থাকায় অনেক কৃষক শ্রমিক সংকট ও সময়মতো ফসল কাটার অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় ধান কাটা থেমে গেছে বা ধীরগতিতে চলছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর এলাকার কৃষক আবদুল্লাহ মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৯০ কেয়ার (৩০ একর) জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই দিনে কষ্ট করে কিছু ধান কাটতে পেরেছি। এখনও অনেক জমি বাকি। ধান পাকলেও কীভাবে কাটব চিন্তায় আছি।
একই এলাকার গোবিন্দপুরের কৃষক সাবেক ইউপি সদস্য ইকবাল আহমদ বললেন, হারভেস্টার মেশিনের মালিক-চালকরা বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) অনেকেই তেল নিতে এসে না পেয়ে ঘুরে গেছেন। পাম্পের লোকজন বলে দিয়েছে কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) প্রত্যয়ন আনতে হবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের হারভেস্টার মালিক আবদুল হক পাম্পে বিকেলে তেল নিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন, বুধবার থেকে করচার হাওরে ধান কাটা শুরু করেছি। মেশিনে তেল ছিল। প্রথম দিন কেয়ারে (তিন কেয়ারে এক একর) ১৯০০ টাকা হিসাবে কাজ করেছি, দুই কেয়ার ধান কাটতে পেরেছি। বৃহস্পতিবার চার–পাঁচ কেয়ার কাটা হয়েছে। শুক্রবার আর মেশিনে তেল থাকবে না।
তিনি বলেন, তেল কিনতে পাম্পে গেলে তারা জানায় কৃষি কর্মকর্তা ও ইউএনওর স্বাক্ষরযুক্ত স্লিপ লাগবে। বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটা থেকে এক ঘণ্টায় প্রথমে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার শনাক্তকরণ স্লিপ, পরে কৃষি কর্মকর্তা ও ইউএনওর স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়ন নিয়ে ২০০ লিটার তেলের অনুমতি পাই। এরপর শহরের ওয়েজখালির পাম্পে গেলে তারা জানায় ১০০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া যাবে না। বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সেখানে তেল না পেয়ে ২১ কিলোমিটার দূরের দিরাই সড়কমোড়ের পাম্পে গিয়ে তেল নিতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এভাবে ঘুরে ঘুরে তেল নিলে কীভাবে মেশিন চালাব, আর কীভাবে ধান কাটব।
শুধু আবদুল হক নন, বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তেলের স্লিপ নেওয়া আটজন হারভেস্টার মালিককেই একইভাবে একাধিক পাম্পে ঘুরতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
মালিক ও কৃষকরা জানান, এভাবে অফিস থেকে স্লিপ সংগ্রহের ঝামেলার কারণে অনেকেই আর তেল নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না, ফলে ধান কাটায় বিলম্ব হচ্ছে এবং কৃষকরা বিপাকে পড়ছেন। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়ে পাম্প বা ডিলার পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা ট্যাগ অফিসার উপস্থিত থেকে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা উচিত।
এদিকে, তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জানান, তিনি দুটি হারভেস্টার মেশিন দিয়ে স্থানীয় কৃষকদের ধান কাটার কাজ করেন, যা থেকেই তার জীবিকা নির্বাহ হয় এবং অনেক কৃষকও নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকটে তার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একটি মেশিন পুরোপুরি বন্ধ এবং অন্যটি পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং কৃষকরাও সময়মতো ধান কাটতে না পারায় উদ্বেগে রয়েছেন।
জামাল বলেন, আমার দুটি হারভেস্টার আছে। ডিজেলের কারণে একটি বন্ধ, আরেকটি সচল থাকলেও পুরো দিন চালাতে পারছি না। যা পাওয়া যায় তা অপ্রতুল। খোলা বাজারে ডিজেল পাওয়া যায় না, লুকিয়ে বিক্রি হলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তিনি জানান, ১০০ টাকার ডিজেল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বালিজুরি বাজারের ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলা হয় তেল নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য বাজার থেকে বেশি দামে তেল আনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষকের ধান কাটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
একই এলাকার হারভেস্টার মালিক মো. রফিক উদ্দিন বলেন, এবার মেশিন নিয়ে আমরা চরম বিপদে আছি।
এদিকে দিরাই ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার কৃষকরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শ্রমিক ও যন্ত্র দুটোই সংকটে পড়ায় ধান কাটার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
শান্তিগঞ্জের হারভেস্টার মালিক আবিদুর রহমান টিপু বলেন, আমাদের চারটি মেশিন আছে। কিন্তু ডিজেল সংকটে সেগুলো ঠিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে ৬০২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৫৫টি রিপার মেশিন রয়েছে। তবে জ্বালানি সমস্যার কারণে এসব যন্ত্রের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলায় প্রকৃত কোনো জ্বালানি সংকট নেই। তবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে জ্বালানি বিতরণে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে পাম্প থেকে তেল দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনিক সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। আগাম বৃষ্টিপাতে ইতোমধ্যে এক হাজার ৩৩১ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ মে’র মধ্যে পুরো জেলায় ধান কাটা সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
১৬ দিন আগে
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কবলে সিলেট, ভোগান্তিতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা
হঠাৎ করেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সিলেট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিগগিরই এর উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলেও জানান সিলেটের বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে লোডশেডিং বৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।
লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, এমনিতেই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। এর মধ্যে দিনভর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনমনে নাভিশ্বাস উঠছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের মধ্যে দিনব্যাপী ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ের কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে লোডশেডিং।
উৎপাদন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। তবে এর কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সিলেট জেলায় পিডিবির ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলেছে ১৩০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয়েছে ২৫ শতাংশ।
যদিও পিডিবির এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার তেমন মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৭ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মেলেনি। সেই হিসাবে লোডশেডিং হয়েছে কম হলেও ৫০ শতাংশ। কিন্তু পিডিবির হিসাব বলছে ২৫ শতাংশ লোডশেডিংয়ের কথা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, হঠাৎ চাহিদা বেড়েছে, সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি। ফলে সরবরাহ কম থাকায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আপাতত এই অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। কারণ জাতীয়ভাবে উৎপাদন না বাড়লে লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিং। নগরীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখা হলেও গ্রাম অঞ্চলে সারা দিনে গড়ে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না।
এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধসহ বেশ কিছু কৃচ্ছ্রসাধনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে আনা হয় পরিবর্তন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আংশিকভাবে অনলাইনে পরিচালনার কথাও বিবেচনায় আছে। এতকিছুর পরেও লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলছে না।
জানা গেছে, গত কয়েকদিন থেকে সিলেটে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় গরমে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ঘরে বাইরে কোথাও একটু স্বস্তি মিলছে না। দিনের বেলায় ১ ঘণ্টা পরপর থাকছে না বিদ্যুৎ। এমনকি রাতেও একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের তীব্রতা ও লোডশেডিংয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন বিপাকে। তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। অফিস-আদালতে কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের তেমন আশার বাণী শুনাতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে গরমে চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু সেই আলোকে উৎপাদন বাড়েনি। তাই সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। শহরে লোডশেডিং ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হলেও উপজেলা পর্যায়ে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গ্রামীণ এলাকায় দিনে গড়ে ৬-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না।
সিলেটের ব্যবসায়ী মতিউর রহমান জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে খরচ বৃদ্ধি পেলেও বাড়ছেনা উৎপাদন।
সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ে জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিদিন কমপক্ষে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেশি হয়। শহর থেকে গ্রাম, সবখানে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে রাত-দিন সমানতালে চলে লোডশেডিং।
এদিকে, নগরীর বিভিন্ন এলাকাগুলো পিডিবির অধীনে থাকায় অনেকটা রুটিন করে লোডশেডিং করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে থাকা গ্রামীণ জনপদের মানুষকে কঠিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গ্রামে ২৪ ঘণ্টার বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে বলে অভিযোগ করেন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা। গত রবিবার (১২ এপ্রিল) থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন গ্রামীণ জনপদের লোকজন।
এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা জাকারিয়া তালুকদার বলেন, এক সপ্তাহেরও কম সময় পর অর্থাৎ ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু। এখন যেভাবে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা আছে, এক ঘণ্টা পাওয়া গেলে দুই ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয়। এভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।
সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারস্থ একটি বিপণি বিতানের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। সকালে খুলতে খুলতে ১১টা বেজে যায়। এর মধ্যে সারা দিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
১৭ দিন আগে
রংপুরে সেতুর অভাবে দুর্ভোগে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হারিয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনেশ্বরী নদী। এর দুই পাশের চিলাপাক ও কালুরঘাটে স্থায়ী একটি সেতুর অভাবে ২৫ গ্রামের মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে। বিপাকে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিলাপাক-কালুরঘাট দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা খেয়াঘাটের ওপর নির্ভর করে চলাচল করছেন। শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে নদী পার হন গ্রামবাসী। কিন্তু বর্ষায় সেই সাঁকো তলিয়ে যায়। নদীর পানি বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন নৌকায় পার হতে হয় যা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। রাতে জরুরি প্রয়োজনেও নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নৌকা পাওয়া যায় না। নদীর স্রোত বেশি থাকলে মাঝিরাও পারাপারে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। এ অঞ্চলে ধান, আলু, ভুট্টা ও শাকসবজি উৎপাদন হলেও সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে লোকসানে পড়তে হয় তাদের। ফলে কৃষির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো পড়েন আর্থিক সংকটে।
এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে ও মাদরাসায় যেতে হয়। বর্ষায় ঝুঁকির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। ফলে পড়াশোনায়ও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
তারাগঞ্জের কুর্শা ইউনিয়নে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মতিনুজামান বলেন, আমার বাড়ি নদীর ওপারে। এখানে একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় এ এলাকার লোকজনের চলাচলে চরম কষ্ট করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ কষ্ট আরও বেড়ে যায়। তখন এ এলাকার লোকজনের চলাচল ভীষণ কষ্টকর । অসুস্থ রোগীদের জন্যও ঘাট যেন এক দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা শহরে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দেরিতে চিকিৎসা পাওয়ায় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে যায়।
চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ছেন। নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
হারিয়ারকুটি ও সয়ার ইউনিয়নের চিলাপাক, পাটানিপাড়া, দোলাপাড়া, বানিয়াপাড়া, উজিয়াল, মামুনপাড়া, মেনানগর, কালুরঘাট, ডাঙ্গাপাড়া, প্রামাণিক পাড়া, মণ্ডলপাড়া, মাসুয়াপাড়াসহ প্রায় ২৫ গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এ ঘাটের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে একাধিক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
হারিয়ারকুটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুমারেশ রায় এবং সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল ইবাদাত হোসেন পাইলট জানান, কালুরঘাটে স্থায়ী সেতু নির্মাণের বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা সমন্বয় সভায় উত্থাপন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই না হওয়ায় আমরাও হতাশ।
এলাকাবাসীর দাবি, কালুরঘাটে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে, এখানে শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে না, বরং এ অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
এ ব্যাপারে রংপুর এলজিইডির নিবার্হী প্রকৌশলী আবু মুসা বলেন, ওই সেতু নির্মানের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে । আশা করছি দ্রুত একটা ব্যবস্থা হবে।
১৮ দিন আগে