বিশেষ-সংবাদ
রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় মাত্র ৫ ডুবুরি, এক মাসে পানিতে ডুবে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি
নদ-নদী, পুকুর, খাল-বিলবেষ্টিত রংপুর বিভাগের আটটি জেলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। বিশাল এ অঞ্চলের জন্য এ সংখ্যা শুধু অপ্রতুলই নয়, বরং উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিভাগের কোনো জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির নির্দিষ্ট কোনো পদ নেই। ফলে পানিতে ডুবে কেউ নিখোঁজ হলে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের এই পাঁচ ডুবুরির ওপরই নির্ভর করতে হয় পুরো বিভাগের মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক মাসেই রংপুর বিভাগের আট জেলায় অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু ডুবুরি সংকটের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার আগেই নিভে যাচ্ছে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা।
রংপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও—এই আটটি জেলা ভৌগোলিকভাবে নদীমাতৃক অঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, নৌকাডুবি, বন্যা ও বিভিন্ন জলাশয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখানে বেশি। কিন্তু সেই ঝুঁকির তুলনায় উদ্ধার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের মতো দূরবর্তী জেলা থেকে জরুরি কল এলে রংপুর থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ততক্ষণে নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় উদ্ধারকর্মীদের।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ২২টি উদ্ধার-সংক্রান্ত কল পেয়েছে বিভাগীয় ডুবুরি দল। এসব ঘটনায় পানিতে ডুবে যাওয়া ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাস্তবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
গত এক মাসে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ৩ মে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নীরব নামে তিন বছরের এক শিশু, ১২ মে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশু, ১৬ মে তিস্তা নদীতে ডুবে দুই ভাই, ২০ মে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সাবিয়া জান্নাত (৬) ও সিয়াম (৪), ২৭ মে গঙ্গাচড়ায় রুশা মনি (১৫) ও তার ভাই সাইফ (৫), ২৮ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে মোমিন আলী, ২৯ মে রংপুরের তারাগঞ্জে অহিদ ইসলাম (১৫) ও মাসুদ রানা (১৬), ৩ জুন দিনাজপুরের খানসামায় আত্রাই নদীতে মান্না ইসলাম (৪৫) ও সাদ্দাম হোসেন (৩২), ৩১ মে কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে চার বছরের এক শিশু, ১ জুন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সৃজন কুমার (৬) ও বৃন্দা রানী (৫) এবং ৬ জুন সাদুল্লাপুরে সিনথিয়া আক্তার (১১) পানিতে ডুবে মারা যায়।
এছাড়া ৩ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে রংপুরের পীরগাছায় ছয় শিশু, ৫ জুন ঘাঘট নদীতে নেমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, ৭ জুন পঞ্চগড় সদর উপজেলায় দুই মাদরাসাছাত্র এবং একই দিনে নীলফামারীর ডিমলায় রুপাইয়া (৪) ও আশফিকা (৪) নামে দুই চাচাতো বোনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ৭ জুন লালমনিরহাটে ধরলা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে ২৫ সদস্যের একটি ডুবুরি ইউনিট গঠনের মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তাদের দেশের বিভিন্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে পদায়ন করা হয়। সে সময় রংপুরে দুইজন ডুবুরি দায়িত্ব পান। প্রায় তিন দশক দুই ডুবুরি দিয়ে কাজ চালানোর পর ২০১৯ সালে আরও তিনজন যোগ দিলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে। এরপর আর কোনো জনবল বাড়েনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়লেও ডুবুরি সংকট কাটেনি।
ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, পানি বহনকারী গাড়ি, ফোম টেন্ডার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির কোনো পদ সৃষ্টি না হওয়ায় সংকট আগের মতোই রয়ে গেছে।
বর্তমানে রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ডুবুরি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পঞ্চগড় থেকে কল এলে রংপুর থেকে যেতে অন্তত দুই-আড়াই ঘণ্টা লাগে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন, এত দেরি হলো কেন। কিন্তু দূরত্বের বাস্তবতা তো অস্বীকার করা যায় না।’
তিনি জানান, অনেক সময় পঞ্চগড়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ শেষ করে গাইবান্ধায় যেতে হয়। আবার সেখান থেকে লালমনিরহাট বা অন্য জেলায় ছুটতে হয়। কখনও টানা পাঁচ থেকে সাত দিন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় উদ্ধার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ডুবুরির সংখ্যা বাড়লে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
রংপুর নগরীর কটকিপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক রোভার স্কাউট সদস্য সাব্বির আহমেদ বলেন, ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পঞ্চগড়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রংপুর থেকে ডুবুরি পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এ সময়ে একজন মানুষের পানির নিচে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকে না। ফলে ডুবুরিরা গিয়ে কেবল মরদেহ উদ্ধারের কাজই করতে পারেন। এ অবস্থায় ডুবুরির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট অযৌক্তিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডুবুরি সংকটের পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও পানিতে ডুবে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। শিশুদের একা না রাখা, জলাশয়ের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো এবং সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, সাঁতার না জেনে পানিতে নামা উচিত নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের কোনো অবস্থাতেই একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশ স্কাউটসের লিডার ট্রেইনার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ডুবুরি না থাকায় পানির নিচে উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হয় না। রংপুর বা অন্য জেলা থেকে ডুবুরি আসতে যে সময় লাগে, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মতে, রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ ডুবুরি ইউনিট থাকা প্রয়োজন, যেখানে পাঁচ থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত ডুবুরি থাকবেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা জরুরি। অন্যথায় ডুবুরি সংকটের এই মূল্য রংপুরবাসীকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হবে।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডুবুরিদের কোনো জেলা পর্যায়ের পদ নেই। তারা বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত থাকেন এবং সেখান থেকেই বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান জনবল দিয়ে এত বড় অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন ডুবুরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে তারা জেনেছেন।
রংপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘বারবার ডুবুরি চেয়ে অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এখনও সংকট কাটেনি। তবে আশা করছি, খুব দ্রুতই নতুন ডুবুরি পাওয়া যাবে।’
১৩৮ দিন আগে
বাণিজ্যিক আম চাষে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে ফরিদপুর
একসময় ধান ও পাট উৎপাদনের জন্য পরিচিত ফরিদপুর এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক আম চাষের সম্ভাবনাময় অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা এবং লাভজনক বাজার ব্যবস্থার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে আমের বাগান। ফলে কৃষকদের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তারাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন এই ফল চাষে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর প্রায় ২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১৬ কোটিরও বেশি টাকা। উৎপাদিত আম স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।
জেলার মধুখালী, বোয়ালমারী ও ফরিদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ আমবাগান। বর্তমানে এসব বাগানে গাছে গাছে ঝুলছে পাকা ও আধাপাকা আম। কৃষি বিভাগের পরামর্শে উন্নত জাতের আম চাষ এবং আধুনিক পরিচর্যার ফলে উৎপাদন ও গুণগত মান দুটোই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধুখালীর জাহাপুর এলাকার আমচাষি কামাল হোসেন বলেন, অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় আম চাষে উৎপাদন খরচ কম হলেও লাভের সম্ভাবনা বেশি। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এ কারণে প্রতিবছর নতুন নতুন কৃষক ও উদ্যোক্তা আম চাষে যুক্ত হচ্ছেন।
১৪১ দিন আগে
ঈদের পর চাঙা হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজার
বরেন্দ্রভূমির প্রখর রোদ, আমবাগানের ছায়া আর গাছভর্তি পাকা ফলের সুবাস—সব মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। দেশের ‘আমের রাজধানী’ খ্যাত এ জেলায় বাজারে উঠতে শুরু করেছে মৌসুমের প্রথম দিকের গোপালভোগ, খিরসাপাত ও গুটি আম। তবে আমের মৌসুম শুরু হলেও এখনও পুরোপুরি প্রাণ ফিরে পায়নি জেলার ঐতিহ্যবাহী আম বাজারগুলো।
বর্তমানে মানভেদে গোপালভোগ ও খিরসাপাত আম প্রতি মণ ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গুটি আম ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগে রয়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে অন্যান্য জেলা থেকে পাইকারদের আগমন বাড়লে আমের সরবরাহ ও বেচাকেনা দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আমই চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল। জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এখানে ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি, আশ্বিনা, বারি-৪ ও গুটি আমসহ প্রায় আড়াইশ’ জাতের আম উৎপাদিত হয়। জেলার আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা পূরণ করে, পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়।
প্রতি বছর আমের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভিড় করেন। তখন জেলার আম বাজারগুলো হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। জেলা শহরের পুরাতন আম বাজার, কানসাট, রহনপুর ও ভোলাহাটের বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য। এর মধ্যে কানসাট আম বাজারকে জেলার সবচেয়ে বড় আম বাজার হিসেবে ধরা হয়।
তবে মৌসুমের শুরুতে সেই চেনা ব্যস্ততা এখনও চোখে পড়ছে না। বর্তমানে বাজারে গোপালভোগ, খিরসাপাত ও গুটি আমের সরবরাহ থাকলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় পাইকারদের উপস্থিতি সীমিত। ফলে খুচরা ও পাইকারি—২ বাজারেই বেচাকেনা তুলনামূলক কম।
সদর উপজেলার আম চাষি আব্দুর রাকিব বলেন, ‘এবার মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রচুর মুকুল এসেছিল। পরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছু গুটি ঝরে গেলেও ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে মানভেদে গোপালভোগ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা, খিরসাপাত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গুটি আম ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। বেচাকেনা বাড়লে দামও বাড়বে বলে আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বছর বাগান পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হয়েছে। আমের দাম না বাড়লে খরচ তোলা কঠিন হবে। এ নিয়ে চাষিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।’
আরেক আম চাষি কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের অবস্থা ভালো না। এভাবে দাম থাকলে উৎপাদন খরচই উঠবে না।’
১৪২ দিন আগে
নওগাঁয় মৌসুমে নষ্ট হচ্ছে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার আম, আমভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার দাবি
থোকায় থোকায় গাছে ঝুলছে আম। বাগানে শেষ সময়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষিরা। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে এবারও ভালো ফলনের আশা করছেন নওগাঁর কৃষকরা। চলতি মাসের মাঝামাঝি কিংবা শেষ দিকে বাজারে আসতে শুরু করবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত আম্রপালি জাতের আম।
দেশের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁ। তবে বিপুল উৎপাদন হলেও এই খাতকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি কোনো বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতিবছর মৌসুমে বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা।
আমচাষিদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়ছে না আমের দাম। আবার ফলন বেশি হলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে বাজারমূল্য কমিয়ে দেয়। এতে কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে আম বিক্রি করতে হয়। বড় ধরনের সংরক্ষণাগার বা আমভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার আম নষ্ট হয়ে যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন। গত বছর ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন।
১৪৩ দিন আগে
কালজানির ভাঙনে তিন দিনে বিলীন ৭০ বসতভিটা, ঘুম উড়েছে দুই গ্রামের মানুষের
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকায় কালজানি নদীর তীব্র ভাঙনে গত তিন দিনে অন্তত ৭০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অর্ধশতাধিক পরিবার। ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে অনেক পরিবার এখন বসতঘর সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সীমান্তঘেঁষা উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকায় নদীর স্রোত সরাসরি আঘাত হানায় কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতীরজুড়ে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। কেউ টিন খুলছেন, কেউ ঘরের খুঁটি উপড়ে অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেশি।
স্থানীয়দের মতে, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কালজানি নদীর পানি বেড়েছে। এর সঙ্গে তীব্র হয়েছে নদীভাঙন।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কালজানি নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে প্রতি বর্ষায় নদীতীরবর্তী মানুষকে ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে উত্তর ঢলডাঙ্গা ও কাজিয়ার চর এলাকার আরও অনেক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
ভাঙনের শিকার তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ‘এর আগেও কয়েকবার নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছি। কষ্ট করে আবার ঘর তুলেছিলাম। এখন আবার নদী ঘরের কাছাকাছি চলে এসেছে। কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচব, বুঝতে পারছি না।’
আরেক বাসিন্দা শাজাহান আলী বলেন, ‘দিনরাত ঘর সরানোর কাজ করছি। নদী কখন কী নিয়ে যায়, সেই ভয়ে আছি। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না।’
১৪৫ দিন আগে
তাপপ্রবাহের দাপটে বিপর্যস্ত কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলের জনজীবন
কয়েকদিনের টানা তীব্র তাপপ্রবাহে উত্তরাঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড রোদ ও ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তারা টানা এক ঘণ্টাও টিকতে পারছেন না। কিছুক্ষণ কাজ করেই গাছের ছায়া কিংবা খড়ের গাদার পাশে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এতে কৃষিকাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমেছে শ্রমিকদের দৈনিক আয়ও।
বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের মাঠে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি কাটা ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে তাপপ্রবাহের কারণে এসব কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা চাঁপারতল গ্রামের কৃষিশ্রমিক এন্তাজ আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কয়েকদিন আগেও টানা বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারিনি। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত পাঁচ দিন ধরে এমন গরম পড়েছে যে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে টানা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে ওঠে। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।’
একই গ্রামের কৃষিশ্রমিক আলম মিয়া বলেন, ‘এখন ধান ও ভুট্টা কাটার মৌসুম চলছে। আমরা চুক্তিভিত্তিক জমিতে ধান ও ভুট্টা কাটার কাজ করি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ছয়জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটতে পারে। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে এখন একই কাজ করতে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে আয়ও কমে গেছে। মাঠে কিছুক্ষণ কাজ করলেই ছায়ায় গিয়ে বসতে হচ্ছে।’
১৪৭ দিন আগে
সাব-রেজিস্টারশূন্য লালমনিরহাট: ভাড়াটে কর্মকর্তায় চলছে ৫ অফিস
জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল সম্পাদন এবং এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন সাব-রেজিস্টার। অথচ লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই বর্তমানে স্থায়ী সাব-রেজিস্টারবিহীন। ফলে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সেবাপ্রার্থীরা।
সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস জমি ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিভিন্ন কর। এসব কর আদায়ের জন্য দলিল নিবন্ধনের দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সাব-রেজিস্টাররা। কিন্তু জেলার পাঁচ উপজেলার পাঁচটি সাব-রেজিস্টার পদই বর্তমানে শূন্য। ফলে অন্য জেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে অফিসগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে।
সপ্তাহে পাঁচ দিন কর্মদিবস থাকলেও কর্মকর্তা সংকটের কারণে অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোনো কোনো অফিসে গুরুত্বপূর্ণ এ পদটি দীর্ঘ আট থেকে নয় বছর ধরে শূন্য রয়েছে। পদায়নের বিষয়টি যেন কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে চলে গেছে।
সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে শূন্য রয়েছে পাটগ্রাম উপজেলা সাব-রেজিস্টার পদ। জেলা রেজিস্টারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এ উপজেলায় ২০১৭ সালে সাব-রেজিস্টার রতন অধিকারী বদলি হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো কর্মকর্তা পদায়ন করা হয়নি। প্রায় নয় বছর ধরে অফিসটি চলছে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে।
বর্তমানে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সাব-রেজিস্টার রাশেদুজ্জামান সপ্তাহে এক দিন পাটগ্রামে দায়িত্ব পালন করেন। একইসঙ্গে তিনি লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্টারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। অর্থাৎ নিজের কর্মস্থল রাজারহাট ছাড়াও তিনি লালমনিরহাট সদর এবং প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের পাটগ্রাম—এই তিনটি অফিসের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা সাব-রেজিস্টার আহসান হাবিব ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল বদলি হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। একই দিনে কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার সাব-রেজিস্টার রাশেদুজ্জামানও বদলি হন। এরপর থেকে এ দুই কার্যালয়ে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা নেই।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বিসিএস ক্যাডারে নির্বাচিত হয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা সাব-রেজিস্টার আরিফ ইশতিয়াক অন্যত্র যোগদান করেন। এরপর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে, একমাত্র আদিতমারী উপজেলায় সাব-রেজিস্টার শিউলী খাতুন পদায়ন থাকলেও বর্তমানে দুই মাসের প্রশিক্ষণে রয়েছেন তিনি।
এভাবে লালমনিরহাটের পাঁচটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসই কার্যত স্থায়ী কর্মকর্তাশূন্য অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সাব-রেজিস্টার কামরুন নাহার আদিতমারী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাব-রেজিস্টার সিরাজুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন হাতীবান্ধা অফিসে। আর কালীগঞ্জের তুষভান্ডার অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সাব-রেজিস্টার রিপন চন্দ্র মণ্ডল।
অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ কর্মস্থলের পাশাপাশি এসব অফিসে সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন সময় দিতে পারছেন। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগীরা জানান, সাব-রেজিস্টার না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজ না করেই ফিরে যেতে হয়। সপ্তাহে মাত্র এক দিন সাব-রেজিস্টার অফিসে এলে সেদিন আবার অনেক দাতা বা বিক্রেতা ছুটি পান না। ফলে দলিল নিবন্ধনের কাজ পিছিয়ে যায়। অনেক বিক্রেতা মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও সময়মতো জমি বিক্রি করতে পারছেন না।
তারা আরও বলেন, দীর্ঘ ভোগান্তির পর সাব-রেজিস্টার ও দলিলদাতা উভয়কে একসঙ্গে পাওয়া গেলেও নতুন সমস্যা দেখা দেয়। এক দিনে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্টারদের পক্ষে প্রতিটি দলিল যথাযথভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ভুলত্রুটি থেকে যাওয়ার এবং ভুলভাবে দলিল সম্পাদনের ঝুঁকি তৈরি হয়। সপ্তাহের পাঁচ দিনের কাজ এক দিনে সম্পন্ন করতে গিয়ে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাব-রেজিস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে দলিল নিবন্ধন, নকল সরবরাহ, পুরোনো দলিল সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যায়, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে সাব-রেজিস্টার পদায়ন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা রেজিস্টার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জেলার পাঁচটি কার্যালয়ে সাব-রেজিস্টার পদে বাইরের জেলার কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনভোগান্তি কমাতে সাব-রেজিস্টার পদায়নের জন্য কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সাব-রেজিস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকলে অফিসের সার্বিক কার্যক্রম গতিহীন হয়ে পড়ে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত পদায়ন হলে এ জনদুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
১৪৮ দিন আগে
চার দশকের সাধনায় আইনজীবী শাহাদাতের ‘আমের স্বর্গরাজ্য’
পেশায় আইনজীবী হলেও হৃদয়ে তিনি কৃষক। আদালতের ব্যস্ততার পাশাপাশি গত চার দশক ধরে আম চাষকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা সদরের দেবনগর মৌজায় গড়ে তোলা তার ‘ম্যাংগো হ্যাভেন’ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘আমের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবেই পরিচিত।
পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমি ও নিজস্বভাবে কেনা জমি মিলিয়ে প্রায় ৩৯ বিঘা এলাকায় বিস্তৃত এই বাগানে রয়েছে বসতবাড়ি, পুকুর, বাঁশবাগান এবং ১ হাজার ২০০ ফলন্ত আমগাছ। এ বছর প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে। হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, মল্লিকা, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগো ও কাটিমন জাতের আমে ভরে উঠেছে বাগান।
শাহাদাত হোসেনের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া ও স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি বজায় থাকলে এ বছর বাগান থেকে প্রায় এক হাজার মণ আম উৎপাদন হবে। এতে বিক্রি হতে পারে প্রায় ২০ লাখ টাকার আম।
এই আইনজীবী জানান, ছোটবেলা থেকেই কৃষির প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। এসএসসি পাসের পর পৈত্রিক জমিতে গাছ লাগানো শুরু করেন। পরে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর আম চাষে আরও মনোযোগী হন।
তিনি বলেন, ‘পুষ্টিকর ও উন্নতমানের আমের আঁটি সংগ্রহ করে চারা তৈরি করতাম। পরে সেগুলো থেকে কাটিং করে গাছ রোপণ শুরু করি। গত ৪০ বছরে ১ হাজার ২০০টিরও বেশি আমগাছ লাগিয়েছি। এ বছর সব গাছেই আম ধরেছে।’
কৃষিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রপতি পদক এবং ২০১১ সালে বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রী পদক লাভ করেন।
তার বাগানে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের দুটি গাছ রয়েছে যেগুলো প্রায় ৬০ বছর বয়সী। এই দুটি গাছ থেকেই প্রতিবছর প্রায় ২০ মণ আম উৎপাদন হয় বলে জানান তিনি।
১৪৯ দিন আগে
হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের নতুন লেন চালু: উত্তরবঙ্গের ঈদযাত্রায় স্বস্তি
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের বগুড়া-রংপুরগামী ফ্লাইওভার লেনটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গুরুত্বপূর্ণ এই লেনটি চালু হওয়ায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের চিরচেনা যানজটের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাটিকুমরুল গোলচত্বর ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। এই গোলচত্বর থেকেই মূলত ঢাকা-পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া ও রংপুরমুখী যানবাহনগুলো পৃথক লেনে বিভক্ত হয়ে নিজস্ব গন্তব্যে যায়। স্বাভাবিক সময়ে যানবাহনের চাপ নিয়মিত থাকলেও ঈদ মৌসুমে এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন দূরপাল্লার বাসসহ প্রায় ৫২ হাজার যানবাহন চলাচল করে।
বিগত বছরগুলোতে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিমপাড় সংযোগ মহাসড়ক থেকে হাটিকুমরুল গোলচত্বর পর্যন্ত অংশে ঈদযাত্রায় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হতো। ফলে উৎসবের আনন্দ বিষাদে রূপ নিত এবং যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এই পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে নিরসনে নির্মাণাধীন ইন্টারচেঞ্জের এই বিশেষ লেনটি গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের ঈদযাত্রায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসের চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় হাটিকুমরুল মোড় ছিল এই রুটের যাত্রী ও চালকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম। তবে নতুন লেনটি চালু হওয়ায় এবারের ঈদযাত্রা অনেকটাই নির্বিঘ্ন ও সময়সাশ্রয়ী হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করছেন।
সাসেক-২ প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক সরফরাজ হোসাইন বলেন, ‘উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের প্রায় ৬০ শতাংশই এখন এই নতুন লেন ব্যবহার করে চলাচল করছে। এতে ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ হবে।’
তিনি আরও জানান, প্রায় ৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এই হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুল ইসলাম এবং হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি ইসমাইল হোসেন জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের আগে পশুবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস একসঙ্গে চলায় এই চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের নতুন লেনটি চালু হওয়ায় এবার মহাসড়কে গাড়ির গতিশীলতা স্বাভাবিক রয়েছে এবং ইতোমধ্যে চাপ কমতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি মহাসড়কের নিরাপত্তায় সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তারা জানান।
জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের সার্বিক নিরাপত্তায় মহাসড়কের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের একাধিক টিম সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যরা মহাসড়ককে যানজট ও অপরাধমুক্ত রাখতে সমন্বিতভাবে সক্রিয় রয়েছেন।
১৫৬ দিন আগে
উচ্চ হাসিল ও রাখার বিড়ম্বনায় খামারমুখী কুমিল্লার ক্রেতারা
গরুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল, নিরাপত্তাহীনতা, যাতায়াত ও পশু রাখার বিড়ম্বনা এড়াতে খামারমুখী হচ্ছেন কুমিল্লা নগরীর কোরবানিদাতারা। খামার মালিক ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরাসরি খামারে গিয়ে কোরবানির পশু কেনার এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।
সরেজমিনে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার কমলাপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কুমিল্লা-সুয়াগাজী সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে ‘ফরিদ অ্যাগ্রো ফার্ম’। সম্পূর্ণ দেশীয় খাবার খাইয়ে প্রাকৃতিকভাবে এখানে গরু পালন করা হচ্ছে। খামারটিতে বর্তমানে বিক্রির উপযোগী প্রায় ৩০টি গরু রয়েছে, যার সবগুলোই দেশি শাহীওয়াল জাতের।
এই খামারটিতে ৩ লাখ থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা দামের গরু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গরুটির নাম রাখা হয়েছে ‘রাজাবাবু’। ১ হাজার কেজিরও বেশি ওজনের এই গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। মূলত পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পশু পালন ও সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে খামারটি সহজেই ক্রেতাদের নজর কাড়ছে।
ফরিদ অ্যাগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক খালেদ মনসুর ইমন বলেন, নগরীর বাসা-বাড়িতে গরু রাখা ও খাবারের ব্যবস্থা করা বেশ কঠিন। এই ঝক্কি এড়াতেই ক্রেতারা খামারের দিকে ঝুঁকছেন। আমাদের বেশ কয়েকটি গরু ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে কোনো গরু ঈদের আগের দিন, আবার কোনোটি ঈদের দিন বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে জেএইচ অ্যাগ্রো পার্কের পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হক লিটু বলেন, সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের ধনুয়াখলায় আমাদের খামার। গত বছরের তুলনায় এবার আমাদের খামার থেকে গরু বিক্রি অনেক বেড়েছে। এর প্রধান দুটি কারণ হতে পারে—প্রথমত, কোরবানির আগে পশু রাখার সমস্যা এবং দ্বিতীয়ত, খামারে সুস্থ ও রোগমুক্ত পশুর শতভাগ নিশ্চয়তা।
সরাসরি খামার থেকে পশু কেনা কুমিল্লা ক্লাবের সেক্রেটারি আহমেদ শোয়েব সোহেল নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটে গিয়ে দেখেশুনে পশু কিনতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় হাটে অসুস্থ পশুও গছিয়ে দেওয়া হয়। এর বাইরে শহর এলাকায় গরু এনে রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের একটা বড় সমস্যা তো আছেই। তাই ঝামেলার অবসান ঘটাতে একটি খামার থেকে আগেভাগেই পশু কিনে রেখেছি। তারা ঈদের দিন সকালে সরাসরি আমার বাসায় গরু পৌঁছে দেবে।’
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন জানান, পশুর হাটে যাতে কোনোভাবেই অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশু বিক্রি হতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। এবার জেলার চার শতাধিক হাটে মোট ৮৫টি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করছে।
হাটের অতিরিক্ত ভিড় ও কোলাহল এড়াতে সৌখিন ক্রেতারা সরাসরি খামার থেকে পশু ক্রয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সার্বিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জাল নোটের কারবার প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও মহাসড়কের পাশে কোনো পশুর হাট না বসাতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, হাটে নির্ধারিত মূল্যের বেশি হাসিল আদায় করা যাবে না। কেউ এই নিয়ম অমান্য করলে বা কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৫৭ দিন আগে