বিশেষ সংবাদ
দেড়শ কিলোমিটার দূরে ডুবুরি, কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে
নদীতে কেউ নিখোঁজ হয়েছেন। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছেছে ফায়ার সার্ভিসের দল। কিন্তু শুরু করা যাচ্ছে না উদ্ধার অভিযান। কারণ, কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসে নেই প্রশিক্ষিত ডুবুরি। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরত্বের খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যাতে সময় লেগে যায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।
নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীসহ জেলার ওপর দিয়ে ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত আটটি নদ-নদী বয়ে গেছে। এসব নদীর সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ নদীতে দুর্ঘটনা বা কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য কুষ্টিয়াকে নির্ভর করতে হয় খুলনার ওপর।
এর ফলে দুর্ঘটনার পরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ঘণ্টা কেটে যায় শুধু ডুবুরি দলের অপেক্ষায়। এতে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনি মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ঘটনায় স্বজনদের এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সেই চিত্রই সামনে এনেছে। শুধু আগস্ট মাসেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন নদীতে ডুবে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেন। স্থানীয়রা আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করলেও মোস্তাকিমকে সেদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় ব্যাহত হয় উদ্ধার অভিযান। পরে খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছালে পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার আগে ৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নদীতে পড়ে যায় পাঁচ বছরের নূরী খাতুন ও আট বছরের জামিলা খাতুন। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করলেও নূরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় পরদিন মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে।
১৪ আগস্ট কুমারখালীর শিলাইদহ পদ্মা নদীর ঘাটে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু আলিফ হোসেন। একই দিন সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল (৩৮)।
শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, এসব ঘটনায় উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে পানির নিচে উদ্ধার অভিযান চালাতে পারেন না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় উপকরণ নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প নয়।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেনের বক্তব্যে সমস্যাটির প্রশাসনিক দিকটিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। খবর পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে খুলনা থেকে ডুবুরি দলকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
ওয়াদুদ হোসেন বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খুলনার ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, সমস্যাটি যে নতুন নয়, তা ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব বক্তব্যেই স্পষ্ট। ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ, নিয়মিত দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘদিনের দাবির পরও কুষ্টিয়ায় কেন স্থায়ী ডুবুরি দল গঠন হয়নি—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামাজিক সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন বলেন, ‘যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতো প্রমত্তা নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়া জেলায় স্থায়ী ডুবুরি দল নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখন উদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তারা হতে পারেন না।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
মোস্তাকিমের মা শিউলি খাতুনের আহাজারিতেও সেই অপেক্ষার অসহায়তা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমার ছাওয়াল ছুটির দিন বন্ধুগোরে সাথে নদীর পাড়ে খেলতে যায়ে ডুবে গেল। এখনও ছাওয়ালটার খোঁজ পালাম না। খুলনা থেকে লোক আসপে, তারপরে উদ্ধার হবে—এই অপেক্ষা করতি হচ্ছে।’
কুষ্টিয়ার মতো নদীবেষ্টিত একটি জেলায় দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দেড়শ কিলোমিটার দূর থেকে ডুবুরি দলের আসার ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। আর ততদিন নদীতে নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি ঘটনায় স্বজনদের অপেক্ষার সময়টিই হয়ে থাকছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
১৫ ঘণ্টা আগে
পদ্মাপাড়ে অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা, হুমকিতে কৃষিজমি-পরিবেশ
পদ্মাপাড়ে দিনের বেলায় সুনসান নীরবতা। তারই মাঝে চোখে পড়ে সবুজ রঙের ত্রিপল দিয়ে ঘেরা একটি পরিত্যক্ত জায়গা। তবে রাতের গভীর ওই ত্রিপলের আশপাশের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। তখন সেখানে উন্মুক্তভাবে ভাঙা হয় শত শত পুরাতন ব্যাটারি। তাতে আবার কয়লা ও কাঠের আগুন জ্বালিয়ে বের করা হয় বিষাক্ত সিসা, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
পদ্মা নদীর পাড়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চরসাদিপুর ইউনিয়নের সাদিপুর নৌকাঘাট-সংলগ্ন দেলোয়ার হোসেনের ইটভাটা এলাকায় প্রতিদিন বিকেল ও মধ্যরাতে এই বিপরীত দৃশ্যের দেখা মিলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, পাবনার মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তি কারখানাটি পরিচালনা করছেন। প্রায় দেড় মাস ধরে সেখানে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কাজ চলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিত ও অনিরাপদভাবে পরিচালিত কারখানাটিতে পুরাতন ব্যাটারি ভেঙে ও পুড়িয়ে সিসা বের করা হচ্ছে। এতে সিসাযুক্ত ধোঁয়া, দূষিত ধূলিকণা ও অ্যাসিডের মতো ভয়ানক রাসায়নিক পদার্থ মাটি, পানি ও বাতাসে মিশে চারপাশ দূষিত করছে। প্রায় দুই মাস ধরে প্রকাশ্যে এমন কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে নদীপাড়ের শত শত বিঘা কৃষিজমি ও বিভিন্ন ধরনের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে জানতে ইটভাটার মালিক দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, পাবনার মনির স্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করছেন। এ জন্য তিনি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন দেলোয়ার।
তিনি আরও বলেন, ‘এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে; ফসল নষ্ট হচ্ছে। বারবার নিষেধ করার পরও এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।’ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করার কথা স্বীকার করেছেন মনির হোসেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সবাইকে ম্যানেজ করেই দেড় মাস ধরে কারখানা চলছে।’ তবে বাতাসের কারণে অধিকাংশ দিনই কারখানা বন্ধ রাখতে হয় বলে তিনি দাবি করেন। ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, দিনের বেলায় সেখানে কোনো কাজ হয় না। রাত সাড়ে ১১টার পর ট্রাকে করে পুরাতন ব্যাটারি আনা হয়। রাত ১২টার দিকে জ্বালানো হয় আগুন।
তার অভিযোগ, চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা, বিএনপির কর্মী জালাল ও হযরতের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ কারখানাটি চলছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীপাড়ের কলা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
তবে, অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান টিক্কা বলেন, ‘কারা কী করছে জানিনে। আমি এসবে নাই। আপনারা মনিরের সাথে মিলতাল করে নেন।’
অবৈধ ব্যাটারি কারখানার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন বলে দাবি করেছেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজম। তিনি বলেন, ‘দিন পনেরো আগে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কারখানার লোকদের দৌড়ানি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চলে কি না, তা জানা নেই।’
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (জ্যেষ্ঠ রসায়নবিদ) হাবিবুল বাসার বলেন, ব্যাটারির ভেতরে সালফিউরিক অ্যাসিড থাকে। উন্মুক্তভাবে ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করার ফলে বাতাসে সিসা ও লেডের মাত্রা বেড়ে যায় যা পরিবেশ ও মাটির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে দ্রুত অবৈধ ব্যাটারি কারখানায় অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন কুমারখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার।
২ দিন আগে
মতলবে দেড় মাসে ২৫ ট্রান্সফরমার চুরি, ভোগান্তিতে লক্ষাধিক গ্রাহক
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ধারাবাহিকভাবে পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় উদ্বেগ ও জনভোগান্তি বেড়েছে। গত জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত দেড় মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
চুরি যাওয়া এসব ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এগুলো নষ্ট বা চুরি হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বিপাকে পড়ছেন উপজেলার প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার গ্রাহক।
পল্লী বিদ্যুৎ মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম এমডি ওয়াহিদুজ্জামান ইউএনবিকে বলেন, ‘গত জুলাই মাস থেকে চলতি আগস্ট মাসের ২৪ তারিখ পর্যন্ত মতলব উত্তরের ছেংগারচর, সুজাতপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এসব ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।’
তিনি বলেন, ‘আসলে গত জানুয়ারি মাস থেকেই মতলব উত্তরে দুই-একটি করে ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পুরো চোরচক্র শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে, ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় চোরচক্র শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গেল শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে উপজেলার বাগানবাড়ী ইউনিয়নের নবীপুর বালুঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পিকআপভ্যানসহ ট্রান্সফরমারের ভেতরে ব্যবহৃত তামার তার ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে পিকআপ ও মালামাল জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় আনোয়ার হোসেন ওরফে ‘টানা আনোয়ার’ (৪২) নামে নিশ্চিন্তপুর এলাকার এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে।
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘এলাকায় ধারাবাহিক ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধ ও চোরচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কিছুদিন আগে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়।’
এসআই জীবন চৌধুরী ও এএসআই রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ওই টিমের অভিযানে প্রথমে আনোয়ারকে আটক করা হয় জানিয়ে ওসি বলেন, পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, আনোয়ার ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত অথবা চুরি করা মালামাল তার কাছে বিক্রি করা হতে পারে।
পরে চুরি করা মালামাল একটি পিকআপে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার তথ্য পায় পুলিশ। স্থানীয় সোর্স, পুলিশ ও পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পিকআপটির অবস্থান শনাক্ত করে সেটি জব্দ করা হয়।
ওসি বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পিকআপে তল্লাশি চালিয়ে ট্রান্সফরমারের ভেতরে কয়েল তৈরিতে ব্যবহৃত তামার তারসহ বিভিন্ন মালামাল পাওয়া যায়। পরে কর্মকর্তারা এসব মালামাল পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারের অংশ হিসেবে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে তিনটি মামলা করেছে জানিয়ে কামরুল হাসান বলেন, ‘চোরচক্রের সঙ্গে আর কারা জড়িত, এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
আটক আনোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার চাঁদপুর আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানান ওসি।
পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারগুলো প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে চুরি প্রতিরোধে ব্যাপক মাইকিং, প্রচার-প্রচারণা এবং স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ কাজে পুলিশও সহযোগিতা করছে।
তিনি বলেন, ‘ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ সরঞ্জাম রাষ্ট্রীয় সম্পদ, যার মালিক জনগণ।’
মতলব উত্তর উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। উপজেলায় ট্রান্সফরমার রয়েছে ৪ হাজার ৬০০টির বেশি।
ধারাবাহিক চুরি বন্ধে পুলিশ ও পল্লী বিদ্যুতের অভিযান আরও জোরদার এবং চক্রের হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ওসি কামরুল হাসান বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি রোধে থানার পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
৩ দিন আগে
লালমনিরহাটে কৃষকের ‘সোনালি আঁশের’ স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন
লালমনিরহাটে চলতি মৌসুমে পাটের আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় হতাশ কৃষকেরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কা। ফলন ও দাম—দুই দিক থেকেই ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন জেলার পাটচাষিরা।
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের দাম না পেলে গত কয়েক বছরের মতো এবারও লোকসান গুনতে হবে। এতে আগামী মৌসুমে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
জেলার আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে। ধানসহ অন্যান্য ফসল ভালো হয় না—এমন জমিতেও এবার পাট চাষ করেছেন কৃষকেরা।
তবে আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় এখন ভালো দাম পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা পাট কাটার পর তা ডোবা, নালা, পুকুর ও খাল-বিলে পানিতে স্তূপ করে জাগ দিচ্ছেন। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন পর পাট পচে গেলে সেখান থেকে আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হয়। অনেক কৃষকের পাট এখনও পুরোপুরি পচেনি; তবে কয়েক দিনের মধ্যে আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
৪ দিন আগে
ফেলে দেওয়া মাছের আঁশেই বাড়তি টাকা গুনছে নড়াইলের জেলেরা
একসময় মাছ কাটার পর আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হতো আঁশ। সেই আঁশই এখন নড়াইলের জেলে পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস। মাছ বিক্রির পাশাপাশি আঁশ সংগ্রহ, পরিষ্কার, শুকানো ও বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন অনেক পরিবারের সদস্য। এতে বাড়ছে পারিবারিক আয়, পাশাপাশি মাছের আঁশ বর্জ্য হিসেবে ফেলে না দেওয়ায় কমছে পরিবেশদূষণও।
নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের পংকবিলা জেলেপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির উঠান ও চিত্রা নদীর পাড়ের খোলা জায়গায় রোদে শুকানো হচ্ছে ছোটবড় বিভিন্ন মাছের আঁশ। কোথাও বাঁশের চাটাই, কোথাও পলিথিনের ওপর, আবার কোথাও পরিষ্কার মাটিতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সেগুলো। পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যদের কেউ আঁশ পরিষ্কার করছেন, কেউ শুকাতে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকানো আঁশ উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন।
পংকবিলা জেলেপাড়ায় প্রায় ৯০ থেকে ১০০টি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার গত পাঁচ থেকে ১৬ বছর ধরে মাছের আঁশ সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। মাছের ব্যবসার পাশাপাশি আঁশ বিক্রি এখন এসব পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, মাছের আঁশ বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ওষুধ ও পোলট্রি ফিড তৈরিতে এর চাহিদা রয়েছে। দেশীয় চাহিদার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাত এসব মাছের আঁশ বিদেশের বাজারেও পাঠানো হচ্ছে। জাপান, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
পংকবিলা গ্রামের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী টিকান্তু সরকার বলেন, ‘আগে মাছ কাটার পর আঁশ ফেলে দেওয়া হতো। এখন আমরা সেগুলো আলাদা করে সংগ্রহ করি। বাড়িতে এনে পরিষ্কার করে কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে রাখি। পরে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। এতে মাছ বিক্রির পাশাপাশি বাড়তি কিছু আয় হয়।’
অপর জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী সুপল বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি মাছের আঁশ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের আঁশ হলে কেজিপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তিন-চার মাস পরপর যশোর, নওয়াপাড়া ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখানে এসে আঁশ কিনে নিয়ে যান।
পংকবিলা এলাকার বাসিন্দা দয়াল শিল শুভ বলেন, এলাকার অনেক জেলে পরিবার মাছ বিক্রির পাশাপাশি আঁশ সংগ্রহ করে। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই এ কাজে যুক্ত থাকেন। আঁশ বিক্রির টাকা দিয়ে তারা সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যয়ও চালাচ্ছেন।
জেলে পরিবারের কয়েকজন গৃহিনী জানান, আগে আঁশগুলো আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেওয়া হতো। এখন সেগুলো আলাদা করে পরিষ্কার, শুকিয়ে জমিয়ে রাখা হয়। পরে বিক্রি করে পাওয়া টাকা সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে কাজে লাগে। এতে পরিবারের আয় বাড়ার পাশাপাশি নারীরাও সরাসরি আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারছেন।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, মাছের জাত ও আকার অনুযায়ী আঁশের চাহিদা ও দাম ভিন্ন হয়। বড় আকারের রুই, কাতলা, গ্রাস কার্প ও ব্ল্যাক কার্পের আঁশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বড় মাছের আঁশ আকারে বড় হওয়ায় তা সংগ্রহ, পরিষ্কার ও শুকানোও সহজ।
নড়াইল সদর উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান বলেন, মাছের আঁশ এখন আর বর্জ্য নয়, এটি মূল্যবান সম্পদ। রূপগঞ্জ মাছবাজারে পংকবিলার জেলে সম্প্রদায় মাছ রান্নার উপযোগী বা ‘রেডি টু কুক’ করার সময় আঁশ সংগ্রহ করেন। এসব আঁশ প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এবং বিভিন্ন শিল্পে এর চাহিদা বাড়ছে।
তিনি বলেন, জেলেদের এ বিষয়ে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে তারা এ খাতে আরও সম্পৃক্ত হতে পারেন এবং এটিকে টেকসই আয়ের উৎসে পরিণত করতে পারেন।
৪ দিন আগে
কোটি টাকার ইজারা দিয়েও চিলমারী নদীবন্দরে নেই প্রত্যাশিত যাত্রীসেবা
হাজারো যাত্রীর পদচারণায় প্রতিদিন মুখর থাকে কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চিলমারী নদীবন্দর। রৌমারী, রাজীবপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের নৌপথে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ঘাট এটি। তবে দীর্ঘদিনেও এখানে নিশ্চিত হয়নি ন্যূনতম যাত্রীসেবা। নেই যাত্রীছাউনি, গণশৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারী, শিশু ও বয়স্কদের।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত চিলমারী নদীবন্দর একসময় দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এর জৌলুস কিছুটা কমলেও গুরুত্ব কমেনি একটুও। প্রতিদিন রৌমারী, রাজীবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নৌপথে যাতায়াতের জন্য এই ঘাট ব্যবহার করেন।
সরেজমিনে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নৌকার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন। তীব্র রোদ কিংবা বৃষ্টিতে তাদের জন্য নিরাপদ কোনো অপেক্ষালয় নেই। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অসুস্থ, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে।
শুধু যাত্রীছাউনির অভাবই নয়, চিলমারী নদীবন্দরে কোনো গণশৌচাগারও নেই। রৌমারী কিংবা রাজীবপুরের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে দুই-তিন ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে ঘাটে আসা যাত্রীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ হয় সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজনের সময় অনেককে বাধ্য হয়ে আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। আবার কেউ কেউ লোকলজ্জা এড়িয়ে খোলা জায়গায় শৌচকর্ম সারতে বাধ্য হচ্ছেন।
রৌমারী উপজেলা থেকে আসা বেলাল হোসেন বলেন, ‘অনেক দূর থেকে নৌকায় করে আসি। ঘাটে এসে বসার বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কোনো টয়লেট নেই। নারীদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টের। এত বড় ঘাটে অন্তত একটি গণশৌচাগার থাকা উচিত।’
একই উপজেলার শাহারিয়ার নাজিম বলেন, ‘নৌকার জন্য অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের নিয়ে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীদের জন্য দ্রুত ছাউনি ও বসার ব্যবস্থা করা দরকার।’
ঘাট-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিলমারী নদীবন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০টি নৌকা চলাচল করে। প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল থাকলেও পর্যাপ্ত আসন, সুপেয় পানি কিংবা শৌচাগারের সুবিধা নেই।
চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি থেকে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হলেও যাত্রীসেবায় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবছর ঘাট থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হচ্ছে। অথচ যাত্রীদের বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। এত বড় একটি ঘাটে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
এদিকে, চিলমারী নদীবন্দর উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৪ শতাংশ বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে চিলমারী নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, আলাদাভাবে গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত আপাতত নেই। তবে প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেটির কাজ শেষ হলে টার্মিনালটি চালু করা হবে এবং তখন যাত্রীরা সব সুবিধা পাবেন।
ঈদের আগেই টার্মিনালটি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুর হাসান বলেন, ‘চিলমারী নদীবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’
৭ দিন আগে
ভারী যান চলাচল বন্ধ, পুরোপুরি কাজ আসছে না ১২৪ কোটির দ্বিতীয় তিস্তা সেতু
বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের চার উপজেলার সঙ্গে বিভাগীয় নগরী রংপুরের যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তা নদীর ওপর ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘দ্বিতীয় তিস্তা সেতু’। সেতুটির সঙ্গে রংপুর নগরীকে যুক্ত করতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কও। কিন্তু সেতু ও সড়ক নির্মাণের পরও এর সুফল পাচ্ছে না পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলো।
সেতুর ওপর দিয়ে বাস ও ট্রাকসহ ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী যানকে লালমনিরহাট জেলা সদর হয়ে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে পরিবহন খরচ ও সময়, যার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ ভোক্তার ওপরও।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা এলাকার সঙ্গে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরকে যুক্ত করা ৮৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে রংপুরের যোগাযোগ সহজ করাই ছিল এই সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। কিন্তু ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন প্রত্যাশিত কাজে আসছে না।
লালমনিরহাট এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সেতুটির উদ্বোধন করা হলেও নাজুক সড়কের কারণে প্রথম চার বছর ভারী যান চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। পরে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সব ধরনের যানবাহনের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সদস্যরা ভারী যান চলাচল বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
আন্দোলনের মুখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে সেতুর উত্তর প্রান্তে প্রতিবন্ধক খুঁটি বসিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক মহাসড়কটি পুনর্নির্মাণ করে ভারী যান চলাচলের উপযোগী না করা পর্যন্ত প্রতিবন্ধক বহাল থাকবে। তা না হলে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপে সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে ভারী যান চলাচল বন্ধের প্রায় দেড় বছর পার হলেও সড়কটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সড়ক নির্মাণের পরও কেন বন্ধ ভারী যান চলাচল?
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর কার্যালয় জানায়, প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বুড়িরহাট থেকে শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হয়।
দরপত্র অনুযায়ী, কার্পেটিং করা পাকা সড়কটির প্রস্থ ১৮ ফুট। এর দুই পাশে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট ইট বিছানো এবং আরও ৩ ফুট করে দুই পাশে মোট ৬ ফুট মাটি বিছানোসহ সড়কটি প্রশস্ত করা হয়।
নির্মাণের পর ভারত থেকে আমদানি করা পাথরসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ভারী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস চলাচলও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে সড়কের দুই পাশের ইট ও মাটি ধসে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর আবারও ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির প্রভাব ও সিন্ডিকেটের কারণেও সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, সড়কটি ভারী যান চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করছেন।
অতিরিক্ত পথে বাড়ছে পরিবহন খরচ
সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর এলাকায় সংযোগ সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে প্রতিবন্ধক তৈরি করা হয়েছে। ফলে ওই সড়ক দিয়ে বাস বা ট্রাক চলাচল করতে পারছে না।
পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস কোনোরকমে চলাচল করলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসগুলোকে কাকিনা বাজার হয়ে লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ী ও ট্রাক-ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, বুড়িমারী থেকে রংপুরের দূরত্ব মহিপুরের দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ব্যবহার করলে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে লালমনিরহাট শহর হয়ে রংপুরে যেতে পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুরে আসতে একটি ট্রাকের ভাড়া পড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অথচ দ্বিতীয় তিস্তা সেতু দিয়ে এলে ভাড়া পড়ত ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। অতিরিক্ত পথের কারণে ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের প্রায় দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হচ্ছে।
ট্রাকচালক সাকিব বলেন, সড়কটি বন্ধ থাকায় তাদের ভোগান্তি বেড়েছে। সবার দিক বিবেচনা করে সড়কটি খুলে দেওয়া উচিত।
রংপুর নগরীর চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়ী রাজ মাহমুদ বলেন, শতকোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও সেটি ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দ্রুত ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া দরকার।
সেতুটি কি শুধু ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য?
রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, তারা আশা করেছিলেন মহিপুর সেতু হলে শ্রমিকদের কষ্ট কমবে। কিন্তু সেতু হওয়ার পরও তারা এর সুবিধা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘সেতুটি কি শুধু পথচারী, ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য করা হয়েছে? ভারী যানবাহন কেন বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই আমাদের স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। জনস্বার্থ ও শ্রমিক-মালিকদের সুবিধার্থে এটি অবিলম্বে খুলে দেওয়া উচিত।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, হাতীবান্ধা-রংপুর রুটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দরিদ্র মানুষ থ্রি-হুইলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাইওয়েতে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা বিকল্প এই রুট ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পথটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তাদের সমস্যা তৈরি করেন। এর আগেও সড়কটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। তখন বাস-ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক ভেঙে যায় এবং ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করা হলে বাস-ট্রাক চলায় আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
এই পরিবহন শ্রমিক নেতার দাবি, বর্তমান অবস্থায় ভারী যান চলাচল শুরু হলে পাঁচ থানার হাজার হাজার রোগী যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ভারী যানবাহন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে এলজিইডি লালমনিরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওছার আলম বলেন, আন্দোলনের পর বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতু বা সড়কের মূল কাঠামোতে কোনো সমস্যা নেই।
ফলে, একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতু ও সংযোগ সড়ক পড়ে রয়েছে ভারী যান চলাচলের বাইরে, অন্যদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্যবাহী যানকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে যে উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ও আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
৮ দিন আগে
মান্দায় খাল পুনঃখনন প্রকল্পের শ্রমিক মজুরির ৫০ লাখ টাকা নিয়ে প্রশ্ন
দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য নেওয়া নওগাঁর মান্দা উপজেলার দুই ইউনিয়নের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে প্রায় ৫০ লাখ টাকার শ্রমিক মজুরি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া ৪০ দিন মেয়াদি এ প্রকল্পে কাগজে-কলমে প্রতিদিন ২৫০ জন অতিদরিদ্র শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের পুরো সময়ে কোনো দিনমজুরকে খাল খননের কাজে দেখা যায়নি।
সরকারের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় কুসুম্বা ও ভারশো ইউনিয়নে ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের এ প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় কুসুম্বা ইউনিয়নের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল সেতু থেকে বাদলঘাটা সেতু এবং ভারশো ইউনিয়নের বাকাপুর মৌজার বাকাপুর দফাদার মোড় থেকে প্রধান সড়ক হয়ে বিল উথরাইল পর্যন্ত খাল পুনঃখননের কথা ছিল।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি, জলাবদ্ধতা কমানো এবং অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রকল্পের মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকা শ্রমিকদের মজুরি এবং বাকি অর্থ এক্সকাভেটর পরিচালনা, বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বরাদ্দ ছিল।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। তবে খাল পুনঃখননের চেয়ে এখন শ্রমিকদের তালিকা ও মজুরির হিসাব নিয়েই বেশি প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে প্রকৃত অতিদরিদ্র শ্রমিকদের পরিবর্তে স্বচ্ছল ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, মুদি দোকানদার, সচ্ছল কৃষক ও রাজনৈতিক কর্মীদের নাম শ্রমিকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাস্তবে শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়েই প্রতিদিন দুই ইউনিয়নে ১২৫ জন করে মোট ২৫০ জন শ্রমিক কাজ করেছে দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
অবশ্য প্রকল্পের ৪০ দিনে ১০ হাজার শ্রমিক-দিবসের মধ্যে মাত্র ৬১ শ্রমিক-দিবস অনুপস্থিত দেখিয়ে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। তবে জেলার অন্যান্য উপজেলায় একই ধরনের প্রকল্প শেষে ফেরত দেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা।
কাজে শ্রমিক দেখেননি স্থানীয়রা
প্রকল্প এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে শ্রমিক দিয়ে খাল খননের বিষয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
ভারশো গ্রামের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান দেওয়ান বলেন, তিনি প্রকল্প এলাকা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করেন। প্রকল্পের কাজ চলার এক মাসের বেশি সময়ে তিনি কোনো দিনমজুরকে খাল খননের কাজ করতে দেখেননি।
১০ দিন আগে
কুমারখালীর একমাত্র খেলার মাঠ এখন জলাভূমি, হারিয়ে যাচ্ছে খেলাধুলার পরিবেশ
একটা সময় সকাল-বিকেল মুখর থাকত কুমারখালী উপজেলা পরিষদের একমাত্র খেলার মাঠটি। শোনা যেত বুটের শব্দ। ফুটবল, ক্রিকেট আর ভলিবলের উত্তেজনায় সারা বছর সরগরম থাকত মাঠ। ব্যায়ামপ্রেমীদেরও নিয়মিত আনাগোনা ছিল। ঈদ এলে এখানেই অনুষ্ঠিত হতো উপজেলার সবচেয়ে বড় জামাত। সরকারি সভা-সেমিনার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবকিছুরই প্রাণকেন্দ্র ছিল মাঠটি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন মাঠে নেই খেলার বল, নেই খেলোয়াড়দের ছোটাছুটি। আছে পানি, কচুরিপানা আর হাঁটুসমান আগাছা। বছরের প্রায় আট মাসই থাকে জলাবদ্ধতা। পানিতে ডুবে আছে ঈদগাহের মিনার। মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়ায় গরু-ছাগল। আর মাঠের পাশের সড়কে বসে তরুণরা মোবাইল ফোনে গেম খেলে সময় পার করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারাচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এই খেলার মাঠটি।
উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার উত্তরে দুর্গাপুর এলাকায় মাঠটির অবস্থান। এর এক পাশে দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অন্য পাশে কুমারখালী আদর্শ মহিলা বিদ্যালয় ও আবুল হোসেন তরুণ অডিটোরিয়াম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠটির পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো ড্রেন নেই। আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও পুকুর খননের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ। ফলে প্রতি বর্ষায় মাঠটি তলিয়ে যায়। বর্ষা শেষ হলেও মাঠ থেকে পানি সরতে সময় লাগে আরও কয়েক মাস। এ কারণে বছরের বড় একটি সময় মাঠটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠের বুকজুড়ে স্থির পানি। কোথাও কোথাও পানির ওপর কচুরিপানায় ফুটে আছে সাদা-বেগুনি রঙয়ের ফুল। মাঠের বিভিন্ন অংশে বড় বড় দুর্বা ঘাস ও আগাছার জঙ্গল। কেউ কেউ গবাদিপশুর জন্য সেখান থেকে ঘাস কাটছেন। মাঠের এক কোণে নানা বয়সী কয়েকজনকে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যায়।
১২ দিন আগে
গাইবান্ধায় এক মাসে তিন নদীর পেটে ৯ স্কুল, ভাঙনের মুখে আরও ৬
ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই মাত্র এক মাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে গেছে ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে এসব বিদ্যালয়ের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও পাঠদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আরও ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের মুখে। সব মিলিয়ে ১৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গেল মঙ্গলবার সকালে তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলেছে। এতে লাখ লাখ টাকার বিল তোলা হলেও বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া বলেন, ‘স্কুলটি রক্ষার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা। সবাই ঘোরে টাকার পেছনে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রক্ষায় লোক দেখানো কাজ করে বিল তুলে চম্পট দেয়। শেষ পর্যন্ত তিস্তা নদীর পেটে চলে গেল স্কুল ভবন। এতে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল।’
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পাউবোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানানো হয়েছিল। পরে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা ভাঙন ঠেকাতে পারেনি। এরই মধ্যে তিস্তার ভাঙনে বিদ্যালয় ভবনটি নদীগর্ভে চলে যায়।
এদিকে, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনেও চলতি মৌসুমে কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার চর চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর খাটিয়ারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদর উপজেলার মোল্লারচর এলাকার সীতাসতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ফুলছড়ি উপজেলার চর পিপুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গলনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কটকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট নয়টি বিদ্যালয় গত এক মাসে তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে।
ভাঙনে এসব বিদ্যালয়ের অনেক স্থাপনা ও আসবাবপত্র নদীতে চলে গেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের টিনের ছাউনি, বেঞ্চ ও অন্যান্য সামগ্রী স্থানীয় শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, নদীগর্ভে বিলীন হওয়া নয়টি বিদ্যালয়ের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থীর ত্রৈমাসিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। সরকারি হিসাবে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান অব্যাহত থাকার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।
স্থানীয়রা জানান, কোনো কোনো বিদ্যালয়ের জন্য নির্জন স্থানে অস্থায়ীভাবে চালা তৈরি করা হলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষকদের উপস্থিতিও নেই। আবার চরাঞ্চলের প্রভাবশালীদের মধ্যে বিদ্যালয়গুলো কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়েও টানাপোড়েন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ভাঙনের মুখে থাকা আরও ছয়টি বিদ্যালয় নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এগুলো হলো: চর পশ্চিম খাটিয়ারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাউয়াবাদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কটিয়ারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর ডাকুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এসব বিদ্যালয়ের আঙিনা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি ও ভাঙন পৌঁছে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে বিদ্যালয়গুলো নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ের টিন, বেড়া ও খুঁটি খুলে অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করা হলেও প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলার পর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয়টি তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙনের কারণে ওই এলাকার অনেক মানুষ নিজেদের বসতভিটা, বাড়িঘর ও আবাদি জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এখন বিদ্যালয়গুলোও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাস বলেন, ‘ভাঙনে বিলীন হওয়া স্কুলগুলো সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হয়েছে। যেসব স্কুলের ভবন সরানো সম্ভব হয়নি, সেগুলো শিক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগিরই স্থানান্তর করা হবে।’
নদীভাঙনে স্কুল বিলীন হলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটা স্বাভাবিক নয়। অনেক বিদ্যালয় নির্জন স্থানে অস্থায়ী চালার নিচে কার্যক্রম চালানোর কথা বলা হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় আসবাব নেই। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত যান না বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কেউ কেউ বিদ্যালয়ের জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
১৩ দিন আগে