বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সফরকালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব অ্যান্ডা ফিলিপ বলেছেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদীয় ব্যবস্থা এবং শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনে সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনে আইপিইউর পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) জাতীয় সংসদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নারী ও তরুণ সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এবং চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বক্তব্য রাখেন।
নারীদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আইপিইউ মহাসচিব বলেন, নেতিবাচক সামাজিক রীতি, কুসংস্কার ও অনলাইন বিদ্বেষসহ নারীদের যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, তা মোকাবিলায় আইপিইউ কিছু কার্যকর উপায় তৈরি করেছে। তিনি সংসদে নারীদের মধ্যে সংহতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশের নারী সংসদ সদস্যদের আইপিইউর নারী ফোরাম, জাতিসংঘবিষয়ক স্থায়ী কমিটি ও অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, সংসদ এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থান, যেখানে বিভিন্ন জাতিগত ও সামাজিক সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর শোনা প্রয়োজন।
গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণদের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অ্যান্ডা ফিলিপ বলেন, সত্য ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি পুনর্মিলন ও ঐক্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি নতুন ‘রেইনবো নেশন’ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসন এবং নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। তিনি জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ৪০ জন নারী সংসদ সদস্য অংশ নেন এবং তাদের মধ্যে ছয়জন সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশে পূর্ববর্তী শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে আইপিইউর মহাসচিব ও তার প্রতিনিধিদলকে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হবে। তারা জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করবেন এবং নির্যাতিত সংসদ সদস্য, তাদের পরিবার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য না করে আইপিইউ মহাসচিব ও তার প্রতিনিধিদলকে ঘটনাগুলো সরাসরি দেখার এবং কূটনৈতিক সম্প্রদায়সহ অন্যান্য নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য জানার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এরপর বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পূর্ববর্তী সরকারের সময় জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনের কথাও উল্লেখ করেন এবং আইপিইউ মহাসচিব ও তার প্রতিনিধিদলকে প্রতিবেদনটি পড়ার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, এটি জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্বাধীন প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের এ প্রতিবেদন প্রণয়ন বা প্রকাশে কোনো ভূমিকা ছিল না।
অনুষ্ঠানে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, গণতন্ত্র পুনর্গঠনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। দেশের মানুষ অনেক কিছু হারিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষ হিসেবে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে এবং গণতন্ত্র পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তরুণদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলেও চিফ হুইপ উল্লেখ করেন।
এ সময় নূরুল ইসলাম মনি আইপিইউ মহাসচিব ও প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের জন্য ধন্যবাদ জানান।
মতবিনিময় সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, মোছা. তাহসিনা রুশদী, আখতার হোসেন, সানসিলা জেবরিন, মানসুরা আক্তার, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, মাধবী মার্মা, মারদিয়া মমতাজ এবং মোছা. নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি ফ্যাসিস্ট আমলের নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াসহ সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।