অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচি সঠিক পথে রয়েছে এবং জুলাইয়ে এর পরবর্তী মূল্যায়ন হবে। একইসঙ্গে আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সচিবালয়ে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন। তার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন।
বৈঠকের আলোচনার বিষয় জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে আমাদের এই কর্মসূচি তো বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। এটা আবার পরবর্তী মূল্যায়নেও যাবে, তাতে অসুবিধা নাই। এই সময়ে অর্থনীতির যে অবস্থা, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রোগ্রামগুলো আছে… এই সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে, সেগুলো আমরা আলাপ করেছি।
তিনি বলেন, এরকম একটা অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে গেলে আমাদের অনেকগুলো সংস্কার দরকার, অনেক জটিল নিয়মকানুন শিথিল করা (ডিরেগুলেশন) দরকার। ব্যাংকিং খাত তো অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে, শেয়ার বাজার খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। কর-জিডিপি অনুপাতও কঠিন অবস্থায় রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এগুলো থেকে উত্তরণ করতে হলে ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা একটার পর একটা পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছি এবং বাকিগুলো শিগগিরই নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সামাজিক খাতে অনেক কাজ শুরু হয়েছে; ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যে ‘অর্থনৈতিক সংকটে’ থমকে গেছে, সে কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনেক কিছু থমকে গেছে, এগুলোকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আর তা করতে গেলে সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা বলে আসছি—ডিরেগুলেশন, সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ এবং ব্যবসার খরচ কমানো জরুরি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব এবং এর প্রতিফলন বাজেটে দেখা যাবে।
আইএমএফের অর্থ ছাড়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে জুলাইয়ে পরবর্তী মূল্যায়নের সময় আলোচনা হবে। এর মধ্যে আমরা বাজেটের প্রস্তুতি নেব।
জুনের মধ্যে ১৩০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেটি জুলাইয়ের মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
অতিরিক্ত সহায়তা চাওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। ওয়াশিংটনে এপ্রিল মাসে যে বৈঠক হবে, সেখানে বিষয়টি আলোচনা করা হবে।
বৈঠক শেষে বাংলাদেশে অর্থায়ন করা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইএমএফ কর্মকর্তা কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেন, অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা নীতিনির্ধারণী সংলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তা সরকারের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থায়ন নিয়ে যে কোনো আলোচনা নীতিগত আলোচনার ভিত্তিতেই হয়, আর আজ সকালে মন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সেটিই হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব দেশই এখন খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ প্রতিটি দেশের জন্যই এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন।’
এক্ষেত্রে আইএমএফ কীভাবে সহায়তা করবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এই বিষয়গুলো নিয়েই আমরা মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করছি এবং আমরা এ নিয়ে আরও কাজ করব।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের মাত্র এক মাস হয়েছে। এই এক মাসের মধ্যে রমজান মাস ছিল, এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও পরিবহনে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের সময় সবাই বাড়িতে যেতে পেরেছে, ভাড়া বাড়েনি, দ্রব্যমূল্যও স্থিতিশীল ছিল।
তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাতে প্রতি বছর ঈদের আগে যে সমস্যাগুলো হয়, এবার তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল। আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে পুরো রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তেলের বড় সংকট থাকা সত্ত্বেও তেলের অভাবে কোনো পরিবহন বন্ধ ছিল না এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন সময়মতো দেওয়া হয়েছে; কোনো অস্থিরতা ছিল না।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু সরকার একা পারবে না। আমরা দেশবাসীর কাছে আবেদন করব—সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে, আমাদের মধ্যে সংযম আনতে হবে।
তার ভাষ্যে, যেহেতু যুদ্ধ কোনো সরকারের হাতে নেই, যুদ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়, এর প্রভাব আমরা ভোগ করছি। এজন্য আমাদের সংযমী হতে হবে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলে আমরা সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারব এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।