দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আগামী এক দশকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম, সরকারি অবকাঠামো উন্মুক্ত করা, একক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক আধুনিক নীতিকাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন টেলিকম খাতের বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে মূলত ডিজিটাল সেবা ভোগকারী বাজারে পরিণত হলেও উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উৎপাদন এবং উচ্চমূল্যের ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে এখনই সমন্বিত নীতি সংস্কার জরুরি।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘টেলিকমের ভবিষ্যৎ ও নতুন সরকারের ভাবনা’ শীর্ষক পলিসি সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও রবি আজিয়াটার কোম্পানি সচিব ব্যারিস্টার শাহেদ আলম।
মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, টেলিকম খাতের নতুন যুগে প্ল্যাটফর্ম ও সংযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গত এক দশকে দেশে ডেটা ব্যবহারে ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে মোবাইল ব্যবহার বেড়েছে ৪৪ শতাংশ, ইন্টারনেট ৫৫ শতাংশ এবং ডিজিটাল ওয়ালেট ৫০ শতাংশ। একই সময়ে মানুষে-যন্ত্রে যোগাযোগ এবং তরঙ্গ ব্যবহারের পরিমাণও চার গুণ বেড়েছে।
তিনি জানান, দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ডিজিটাল ব্যবহারে এখনও বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। দেশে ইউনিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার এখনও অর্ধেকের নিচে এবং স্মার্টফোন ব্যবহারও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিক দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী সাবমেরিন ক্যাবল, ফাইবার নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার ও ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উপস্থাপনায় বলা হয়, আগামী দশকে এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং, পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল প্রযুক্তি (৫জি) এবং আইওটি ব্যবহারের কারণে দেশে ডেটার চাহিদা কয়েকগুণ বাড়বে। সেই বাস্তবতায় এখন থেকেই নতুন জাতীয় টেলিকম নীতি, নতুন ব্রডব্যান্ড নীতি এবং সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো নীতি গ্রহণ জরুরি।
শাহেদ আলম বলেন, বর্তমান নীতিকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির চাহিদা মোকাবিলা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, টেলিকম খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো, জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজ করা, কর কাঠামো আধুনিকায়ন এবং স্পেকট্রামের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অবকাঠামো টেলিকম অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করা, ফাইবার স্থাপনে একক অনুমোদন ব্যবস্থা চালু এবং অবকাঠামো শেয়ারিং বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
শাহেদ আলম আরও বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল ডেটার দাম তুলনামূলকভাবে কম হলেও ব্যবহার বিশ্ব গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এর অন্যতম কারণ মানসম্মত ব্রডব্যান্ড সেবার সীমাবদ্ধতা এবং ডিভাইসের উচ্চমূল্য। এজন্য ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন, গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনটেন্ট ও মোবাইলভিত্তিক সেবাকেন্দ্রিক। কিন্তু ভবিষ্যতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এআই, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড সেবা, উন্নত সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা, স্টার্টআপ বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
শাহেদ আলম মনে করেন, সঠিক নীতি সহায়তা ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ শুধু ডিজিটাল ভোক্তা বাজার নয়, বরং আঞ্চলিক ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আসিফ আসাদ রেহান ও বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারীসহ অন্যান্য বক্তারা।