বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে এবং এর প্রভাব পড়বে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর।
শনিবার (২৯ আগস্ট) কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সাংবাদিক ইউনিয়ন, কক্সবাজারের বার্ষিক সাধারণ সভায় তিনি এ কথা বলেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা ছাড়া দেশ ও গণতন্ত্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের সুরক্ষার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় সাংবাদিকদের মধ্যেও ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। তবে চ্যালেঞ্জ শেষ হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও পেশাগত অনিরাপত্তাসহ নানা কারণে দেশের সাংবাদিকতার পরিবেশ এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে, তেমনি অপসাংবাদিকতা ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। আবার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমন চাপ তৈরি করা হয় যা সাংবাদিকদের নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য সাংবাদিকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি ন্যায্য বেতন, ভালো কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ গণমাধ্যম ওয়েজ বোর্ড মেনে বেতন দেয় না। অনেক গণমাধ্যমে সাংবাদিকদের বেতন মালিকের ড্রাইভারের বেতনের চেয়েও কম। এসব বন্ধ করতে হবে। বিএফইউজের পক্ষ থেকে সরকারকে “নো ওয়েজ বোর্ড, নো মিডিয়া” নীতি কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। এ নীতি কার্যকর করা গেলে গণমাধ্যমের অভ্যন্তরের অনেক নৈরাজ্য দূর করা সম্ভব হবে।’
সাংবাদিকতা নিছক চাকরি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, সব ধর্ম-বর্ণ ও গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং বৈষম্য দূর করতে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গণমাধ্যম উচ্চকণ্ঠ না থাকলে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও শক্তিশালী অবস্থান ছাড়া গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা যায় না। অথচ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা এখনো মামলা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতাই এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা সরকারকে সত্য কথা বলতে পারে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যাচাই করার সুযোগও সরকারের রয়েছে।
সাংবাদিকদের ‘জাতির বিবেক’ উল্লেখ করে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, সাংবাদিকের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কলম। সেই কলম থামিয়ে দেওয়া মানে শুধু একজন সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ করা নয়, সত্য প্রকাশের পথও সংকুচিত করা। সাংবাদিকের ওপর আঘাত মানে বিবেকের ওপর আঘাত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, একজন সাংবাদিক দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস, অব্যবস্থাপনা কিংবা মানুষের ওপর অন্যায়ের ঘটনা তুলে ধরলে তা বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে কাজ করে। সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিক হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হলে তার প্রভাব অন্য সাংবাদিকদের মধ্যেও পড়ে এবং তাদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়।
‘মনে রাখবেন, কলমকে থামানো যায়, সত্যকে নয়,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকের কলম মানুষের কষ্টের কথা বলে, অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে এবং মানবিক বাংলাদেশের কথা তুলে ধরে। তাই সাংবাদিকদের লিখতে দেওয়া, ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের জন্যই কল্যাণকর।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ন্যায়বোধ, মানবিকতা, জবাবদিহি ও সত্য বলার সাহসই জাতির প্রকৃত শক্তি।
সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিকদের স্বার্থ নয়, সাধারণ মানুষের জানার অধিকার রক্ষারও অংশ বলে মন্তব্য করেন তিনি। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার সমাধান করতে হবে; হামলা, ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।
সাংবাদিক ইউনিয়ন, কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএফইউজের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান, প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এস এম আমিনুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি, সহ-সভাপতি কামাল হোসেন আজাদ, যুগ্ম সম্পাদক ইকরাম চৌধুরী টিপু, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মাহবুবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাফর বক্তব্য দেন।