ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাভার এনধোলো কুসুমো নামে মেয়েদের একটি ইসলামিক আবাসিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ উঠেছে স্কুলটির তত্ত্বাবধায়ক কিয়াই আশারির (৫৮) বিরুদ্ধে। এরপর স্কুলটি বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ হওয়ার পর গত ২ মে বিক্ষুদ্ধ জনতা ওই আবাসিক স্কুলটি ঘেরাও করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং ব্যানার হাতে বিক্ষোভ করেন।
তত্ত্বাবধায়ক আশারির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কয়েক বছর ধরে স্কুলটির বহু শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতন করে আসছেন। এসব শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান ও এতিম।
এই ঘটনাটি দেশটির ইসলামিক আবাসিক স্কুলগুলোতে যৌন নির্যাতনের দীর্ঘদিনের সমস্যাকে সামনে এনেছে।
এর আগে, আশারির বিরুদ্ধে মুখ খোলা একাধিক সাক্ষী নিজেদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। তবে, একজন ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী তার যৌন লালসার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীর আইনজীবী আলি ইউসরন বিবিসিকে বলেছেন, ‘যৌন সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ জন শিশু রয়েছে। আমি একজন ভুক্তভোগীর হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছি, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় আরও অনেক ভুক্তভোগীর তথ্য উঠে এসেছে। আমার মক্কেলই কিয়াই আশারির সব গোপন কর্মকাণ্ড প্রকাশ করে দিয়েছেন।’
গত ৪ মে ইন্দোনেশিয়া পুলিশ জানিয়েছিল, ২৮ এপ্রিল কিয়াই আশারিকে সন্দেহভাজন ‘যৌন নিপীড়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখনও তাকে আটক করা হয়নি, কারণ পুলিশ মনে করেছিল যে তিনি পালাবেন না। কিন্তু পরে পুলিশের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ওই দিনই আশারি পাতি এলাকা ছেড়ে পর্যায়ক্রমে বোগর, জাকার্তা ও সলো শহরে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে ৬ মে রাতে মধ্য জাভার ওনোগিরির একটি মসজিদ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এরপর ৭ মে পাতি পুলিশের প্রধান জাকা ওয়াহিউদি জানান, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে অন্তত ১০ বার অভিযোগকারী ওই ভুক্তভোগীকে নির্যাতন করেছেন আশারি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, আশারি শরীরে ম্যাসাজ চাওয়ার অজুহাতে ভুক্তভোগীর কক্ষে প্রবেশ করতেন। এরপর তিনি তাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করতেন। তার শরীরে স্পর্শ ও চুম্বনের মতো অশালীন কাজ করেছেন আশারি।
প্রায় দশবার তার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর ভুক্তভোগী বিষয়টি তার বাবাকে জানান। এরপর তার পরিবার থানায় অভিযোগ করে।
আগেও ছিল অভিযোগ
এবারই প্রথম নয়, এর আগেও আশারির বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।
এনধোলো কুসুমো স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আশারি। ২০২২ সাল থেকেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এসছে। এ ব্যাপারে আইনজীবী আলি ইউসরন বলেন, ভুক্তভোগীরা সকলেই নারী শিক্ষার্থী।
২০২৪ সালে কিয়াই আশারির বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ পায় পাতি পুলিশের নারী ও শিশু সেবা ইউনিট। তবে পরে অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে পাতি পুলিশের প্রধান জাকা বিবিসিকে বলেন, ২০২৪ সালে আশারির বিরুদ্ধে করা মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছিল। সে সময় তার ব্যাপারে সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদও হয়েছিল। কিন্তু তদন্তে নানা বাধা আসে।
তিনি জানান, পরে চারজন অভিযোগকারী তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। ভুক্তভোগীদের পরিবার বিষয়টি আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করতে চেয়েছিল। তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতে সম্মানহানি হবে, এমন উদ্বেগ থেকে কয়েকজন সাক্ষী পরে সাক্ষ্য দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
এর প্রায় দুই বছর পর গত মাসে আবারও কিয়াই আশারির বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন এক ভুক্তভোগী। এ মামলার পর পুলিশ আশারিকে ‘সন্দেহভাজন নিপীড়ক’ ঘোষণা করে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সমস্যা
পুলিশপ্রধান জাকা আরও বলেন, পুলিশ এখনও আশারির যৌন সহিংসতার শিকার মোট ভুক্তভোগীর সংখ্যার বিষয়ে তদন্ত করছে। তা বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি নারী শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তিকর মতবাদ শেখাতেন। তিনি নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে দাবি করতেন। নিজেকে নবীর বংশধর বলেও পরিচয় দিতেন তিনি।
পেনগুরুস বেসার নাহদলাতুল উলামার (পিবিএনইউ) যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ ইউনিটের সদস্য এবং জাতীয় নারী নির্যাতন কমিশনের সাবেক কমিশনার ইমাম নাহেই বলেন, ইসলামিক আবাসিক স্কুলগুলোতে যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো প্রায় একই ধরনের। এসব প্রতিষ্ঠানের যৌন নিপীড়করা প্রায়ই এমন ভুল মতবাদ শেখান যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তিনি বলেন, ‘তারা কেউ কেউ নিজেদের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক দাবি করেন। শিক্ষার্থীদের তারা এমনভাবে প্রলুদ্ধ করেন যেন তাদের কথা না মানলে জাহান্নামে যেতে হবে।’
ইমাম নাহেই জানান, অনেক আবাসিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। তার মতে, আবাসিক স্কুলগুলোর এই চুপ থাকার সংস্কৃতি যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে।
তিনি দেশটির সুমেনেপের একটি স্কুলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, স্কুলটিতে ২০১৭ সাল থেকে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চলে আসছিল, কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। এর মানে হলো, এতদিন ভুক্তভোগী ও আশপাশের মানুষেরা চুপ ছিলেন।
ইমাম নাহেই নিজেও একটি বড় ইসলামিক আবাসিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি জানান, তিনি সহকর্মীদের জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন, তারা যৌন নিপীড়ন কী, সেটাই বোঝেন না। তারা মনে করেন, যৌন নিপীড়ন মানেই কেবল ধর্ষণ বা শারীরিক মিলন। মৌখিক যৌন নিপীড়নকে তারা শুধু ‘পাপ’ মনে করেন। এক্ষেত্রে সরকারি নজরদারির ঘাটতিকে আরও বড় সমস্যা বলে মনে করেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয় ২০২২ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন সহিংসতা মোকাবেলায় আইন জারি করেছে। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক আবাসিক স্কুলগুলো এই আইনের বাইরে থেকে গিয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন হলে অভিযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামিক আবাসিক স্কুলে স্পষ্ট নীতিমালা ও টাস্কফোর্স গঠনে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে আরও জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। নতুন করে গড়ে ওঠা ইসলামিক আবাসিক স্কুলগুলোর ওপর মন্ত্রণালয় ও সমাজের তদারকি আরও কঠোর হওয়া জরুরি।
এনধোলো কুসুমো স্কুল বন্ধ ঘোষণা
এনধোলো কুসুমো আবাসিক স্কুলটি ২০২১ সাল থেকে অনুমোদন পেয়েছিল। স্কুলটিতে অন্তত ২৫২ জন শিক্ষার্থী ছিল। সাম্প্রতিক যৌন সহিংসতার এ অভিযোগের পর স্কুলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় দেশটির ধর্ম মন্ত্রণালয় স্কুলটির লাইসেন্স বাতিল করেছে।
অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে অনলাইন ক্লাস বা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে বলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ইসলামিক আবাসিক স্কুল বিভাগের পরিচালক বাসনাং সাঈদ জানান, তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করতে এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই স্কুলটি বন্ধ করা হয়েছে। এই সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্কুলটিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ থাকবে। একইসঙ্গে, স্কুলটিতে শিশু সুরক্ষা, তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মানদণ্ড পূরণ হচ্ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। যদি স্কুলটি এসব মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় আরও সুপারিশ করেছে, যেসব শিক্ষক বা তত্তাবধায়কের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠবে, তাদের অবিলম্বে বরখাস্ত ও আবাসিক ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করা হবে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্দোনেশিয়ার সব ইসলামিক আবাসিক স্কুলকে নতুন শিক্ষক নিয়োগের আহ্বানও জানিয়েছে সরকার। এসব শিক্ষককে দক্ষ ও নৈতিকভাবে সৎ হতে হবে বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে।