যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আজ বুধবারই একটি চুক্তি হতে পারে। এদিকে, ইরান ও ওমান ওই জলপথ পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে, যা চলমান যুদ্ধের অবসানেও সহায়ক হতে পারে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে তেহরানের সরকারকে উৎখাত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসানকে যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করলেও বর্তমানে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। ইরানের হামলা ও হুমকির কারণে ওই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস একসময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে অজনপ্রিয় এ যুদ্ধের ইতি টানার চাপেও রয়েছেন ট্রাম্প।
বুধবারই ঘোষণা আসতে পারে
ক্যালিফোর্নিয়ায় সফরকালে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় সাংবাদিকরা অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, বুধবার হরমুজ প্রণালি নিয়ে ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটা হতে পারে। আগামীকাল (বুধবার) বা তার পরের দিন। অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’
সম্ভাব্য চুক্তির আশায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৪৩ ডলারে নেমে আসে।
গত জুনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তবে পরে আবারও হামলা শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প একদিকে বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
ইরান ও ওমানের নিয়ন্ত্রণে পৃথক নৌপথের প্রস্তাব
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, আলোচনায় যে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা উঠে এসেছে, তাতে জাহাজগুলো পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করবে ইরানের নিয়ন্ত্রিত নৌপথ দিয়ে এবং বের হবে ওমানের নিয়ন্ত্রিত পথ দিয়ে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সেবা ফি নেওয়া হবে।
সংবেদনশীল আলোচনা হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এসব তথ্য দেন।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে যায়, এমন কোনো চুক্তি তারা মেনে নেবে না।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে এটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত জলপথ ছিল।
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও প্রণালিতে টোল আরোপের বিরোধিতা করে বলেন, ‘আমি তাদের টোল নিতে দেব না। যদি কেউ টোল নেয়, তাহলে আমরাই নেব।’
তবে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনা এখনও চলছে এবং চূড়ান্ত চুক্তির ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি বন্দর অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও এ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অগ্রগতির কথা বলছে ওয়াশিংটন ও তেহরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মঙ্গলবার বলেন, হরমুজ প্রণালিকে নৌযানের ‘নিরাপদ প্রবেশ ও বহির্গমন নৌপথ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ওমানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।
তার ভাষায়, এসব নৌপথ ‘ইরান ও ওমানের সার্বভৌম অধিকার বজায় রাখার পাশাপাশি উভয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেবে।’ তিনি বলেন, ‘আলোচনা শেষ হলে এর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-ও আলোচনা এগোনোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি বলেন, এখনও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
এর আগে রুবিও সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে গেলে তা বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথের জন্যও ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির’ তৈরি করবে।
দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে বলেন, ‘আজ বা আগামীকালের মধ্যেই প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সংঘাতকে আরও স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
এর আগে, সোমবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং এটিই তেহরানের জন্য ‘শেষ সুযোগ’; অন্যথায় তাদের নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে।
তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তেহরানের দাবি, আলোচনা কেবল ওমানের সঙ্গেই চলছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘প্রথম ধাপ হলো প্রণালি খুলে দেওয়া। দ্বিতীয় ধাপ হবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। আর সেটি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগবে।’