বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা সবাই গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু গণতন্ত্র চর্চা করি না। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, বরং দিনের পর দিন এখানে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিরোধে লিপ্ত হয়েছি।… তবে নেতিবাচক চিন্তা করলে হবে না। সহনশীলতার মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র চর্চা করে এগিয়ে যেতে পারলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’
শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মাঠে অর্থনীতি বিভাগের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনামলের কথা উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কী করুণ সময় গেছে দেখুন! আমরা ভোট দিতে পারিনি। আমাদের বিশ্বাস, এখানে যারা বসে আছে, ভোট কী জিনিস তারা দেখতে পায়নি। ১৫ বছর গেছে তারা ভোট দিতে পারেনি। এ কেমন গণতন্ত্রের কথা, স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা, যেখানে মানুষ প্রতি বছর একটা সুযোগ পায় তার অধিকারটি প্রয়োগ করার, সেই সুযোগটি হারিয়েছে?’
আরও পড়ুন: অনির্বাচিত সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা উচিৎ নয়: ফখরুল
দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদিও স্বাধীনতার পরে একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল, ক্রিয়েটিভ (সৃজনশীল) কিছু করা যেত। আজকে আমরা যারা রাজনীতি করছি, আমাদের ব্যর্থতা— ৫৩ বছরেও বাংলাদেশকে একটা সুখী, শান্তিময়, প্রেমময়, ভালোবাসাময় দেশ হিসেবে গড়তে পারলাম না।’
‘আমরা রাজনীতি নিয়ে সংকীর্ণতায় ভুগি। আমরা নৈতিকতার সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গেছি। আমাদের গর্ব করে বলার কথা যে আমরা গর্বিত জাতি। কিছুদিন আগেও আমরা সেটা বলতে পারিনি।’
তবে নতুন করে আবার সেই আশা জেগে উঠেছে জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা আবার একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। সেই স্বপ্নটি হচ্ছে সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন একটা সুখী, সুন্দর, প্রেমময়, গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশকে নির্মাণ করার আমরা চেষ্টা করেছি। আমরা ৭১ সালের যুদ্ধে ছিলাম, এরপর গণতান্ত্রিক যুদ্ধেও ছিলাম।’
স্বৈরাচার পতনে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা জীবন দিয়েছে, রাজনৈতিক কর্মীরা জীবন দিয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক কর্মীরা দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক-অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছে। ৮০০ নেতা কর্মীকে গুম করা হয়েছে। ৬০ লাখেরও অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছে। এই একটা অবস্থা আমরা পার হয়েছি।’
‘আজ নতুন একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে; কিন্তু কেন জানি না আমরা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি না। আমি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আবেদন জানাব যে, আমরা উঠে দাঁড়াই, আমাদের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে সুস্পষ্ট সত্য সুন্দর একটা পথ নির্ধারণ করি। যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়িত করি। নতুন বাংলাদেশ গড়ে আমাদের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এসে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
আরও পড়ুন: দেশে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক চর্চাই হয়নি: ফখরুল
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘আজকে দুঃখ হয়, একটা টেলিভিশন চ্যানেলে একটা কর্মসূচি হচ্ছে জেন জি। একটা কর্মসূচি হচ্ছে- তারা সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণ ছাত্রদের দেশ সম্পর্কে মতামত নিচ্ছে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ সম্পর্কে মতামত নিচ্ছে, আমি দেখলাম এত অমিত সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েরা। তারা অত্যন্ত দেশপ্রেম নিয়ে কথা পরিবর্তনের কথা বলছে; অনেকে আমাকে অভিভূত করেছে তারা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ নির্মাণ করবার একটা পথও তারা দেখাতে পারে।’
‘এই জায়গাগুলো আমাদের ধরতে হবে। নেতিবাচক চিন্তা করলে হবে না। আমাদের পরস্পরকে সহনশীলতার মধ্যে দিয়ে আনতে হবে, সম্মান করতে হবে। আমি যে রাজনৈতিক চিন্তাই করি না কেন; দেশপ্রেম যদি আমার থাকে, দেশের প্রতি ভালোবাসা যদি থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই আজকে যে সুযোগ এসেছে, সেই সুযোগের যেন সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের দেশের সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। সেই হিসাবে গত ১৫ বছরে প্রায় ২৮০ বিলিয়নের উপরে পাচার হয়েছে। এরা কারা? এরা তো এ দেশেরই মানুষ!’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এ সময় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তোমাদের সামনে অনেক বড় দায়িত্ব আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খুব সংকটের সামনে, বিপর্যয়ের সামনে। ফ্যাসিবাদী সরকার ১৫ বছরে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই অর্থনীতিকে সচল করার জন্য যে নীতি নির্ধারণ করা দরকার, তোমাদের মধ্য থেকেই অনেকে বেরিয়ে আসবে; পলিসি মেকার তৈরি হবে; অর্থনীতিবিদ তৈরি হবে, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সঠিক খাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করতে সক্ষম হবে। এটাই আমার প্রত্যাশা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক বয়স হয়েছে। আমরা এখন যাওয়ার পথে। আমরা এখন এই বয়সে দেখতে চাই— বাংলাদেশটা সত্যিকার অর্থে প্রেমময় ভালোবাসার দেশ হয়েছে।’
দিনাজপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহেদা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর একেএম আল আব্দুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আ ন ম গোলাম রব্বানী, দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল জব্বার ও যশোর এমএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক তসলিম উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে দিনাজপুর সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আইয়ুব আলী, দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. মোফাজ্জর হোসেন দুলাল, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুরাদ আহমেদ, আইনজীবী আব্দুস সাঈদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।