পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
রবিবার (৫ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপনের বিভিন্ন কর্মসূচি বিষয়ে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, নাম (শোভাযাত্রা) নিয়ে একটা বিতর্ক, আমরা এই বিতর্কের অবসান করতে চাই। আমরা আজকের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এটাকে আমরা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ও বলব না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ও বলব না। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে; এখানে সমস্ত সাংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য পোশাক-আশাক নিয়ে একটা আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী আনন্দ—যা কিছু, সবকিছুতে আমরা বৈশাখকে প্রাধান্য দিতে চাই। এটা আমাদের সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ নিয়ে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। হাজার বছরের পুরনো পহেলা বৈশাখ, ১৯৮৯ সালের এরশাদের আমলে এ শোভাযাত্রাটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে চালু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আসার পর তারা আনন্দ বাদ দিয়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে আবার এটার নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করে। এখন কেউ বলছে, শোভাযাত্রার নাম আনন্দই থাকতে হবে, আবার কেউ বলছে মঙ্গল হতে হবে।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জনগণ, জাতি ও দেশের কাছে এ সরকারের দায়বদ্ধ। আমরা চাই, অতীতের যা কিছু গ্লানি, সেটা নিয়ে তো আমরা আছিই, সেটা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু, আমরা আমাদের দেশে, সমাজে বিভাজন চাই না; মানুষের মাঝে অনৈক্য, সংঘাত—এগুলো আমরা চাই না। আমরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন আদর্শের বিভিন্ন ভাবনার লোক থাকবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের লোকও থাকবে। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।
নাম ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করায় ইউনেস্কোর স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে কিনা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা কি ইউনেস্কো দ্বারা পরিচালিত সরকার বা দেশ নাকি? যখন নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেস্কো ছিল, যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেস্কো ছিল। আমরা তাদের জানিয়ে দেব যে আমাদের দেশে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হবে, এটাই আমাদের ঐতিহ্য।
তিনি আরও বলেন, শোভাযাত্রার নামে ইউনেস্কো কোনো স্বীকৃতি দেয়নি, তারা দিয়েছে বৈশাখের উৎসবের ওপরে; তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। আমাদের সাংস্কৃতি কি শোভাযাত্রা শুধু? নানান ব্যাপার আছে।
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ১৯৮৯ সালে যে শোভাযাত্রার সূচনা করে, তখন এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরবর্তীতে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি নতুন তাৎপর্য পায়। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শুভ শক্তির আহ্বানের প্রতীক হিসেবে তখন এর নামকরণ করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
ক্রমে এই শোভাযাত্রা শুধু নববর্ষ উদযাপনের অংশ না থেকে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের একটি প্রতীকী মাধ্যমে পরিণত হয়। এর গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পায়, যখন ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
তবে গত বছর বাংলা নববর্ষ-১৪৩২ উপলক্ষে আয়োজকরা মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নাম ব্যবহার করেন। তাদের দাবি, এটি নতুন কিছু নয়; বরং ১৯৮৯ সালের মূল নামেই ফিরে যাওয়া।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। একদল মনে করে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ইতোমধ্যেই ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অংশ হয়ে উঠেছে, তাই এর নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, ভিন্নমতাবলম্বীরা মনে করেন, নামের পরিবর্তনের মাধ্যমে আয়োজনটির সর্বজনীনতা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
এমন পক্ষে-বিপক্ষে মতবিরোধের মধ্যেই এবার ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছে বর্তমান সরকার।