পুরোনো বছরের সব গ্লানি, দুঃখ, অপশক্তিকে দূর করে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে মারমা জনগোষ্ঠীর ‘জলকেলি উৎসব’।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে বাংলা নববর্ষ ও সাংগ্রাই উৎসব উপলক্ষে ‘জিনামেজু অনাথ আশ্রম’ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এই উৎসব।
উৎসবের উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন। উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা জিনামেজু অনাথ আশ্রমের পরিচালক উ. নন্দ মালা মহাথেরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ও মারমা স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়।
এ উৎসবের মধ্য দিয়ে উপজেলায় শেষ হলো মাহা সাংগ্রাই। এর আগে উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পাড়ায় পাড়ায়ও এ উৎসব পালন করা হয়।
এদিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আগত মারমা তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দুই লাইনে দাঁড়িয়ে মারমা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীরা সামনে পাত্রভর্তি পানি, আর সেই পানি একে অপরের গায়ে অবিরাম বর্ষণ করেন। এর পাশাপাশি বাজনা ও গানের তালে তালে নেচে গেয়ে মেতে ওঠেন মারমা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীরা। এতে সম্মিলন ঘটে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের।
জনশ্রুতিতে রয়েছে, জলকেলি উৎসবের মাধ্যমে মারমা যুবক-যুবতীদের একে অন্যের সহচর্যে আসার সুযোগ হয়। এ সময় তারা তাদের প্রিয় মানুষটিকে বেছে নেওয়ার কাজটিও সফলভাবে করে নেন। এ উৎসবে মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচ পরিবেশন করা হয়।
আনাই মারমা নামের এক নারী বলেন, পুরোনো বছরের সকল দুঃখ, কষ্ট, বেদনাকে ভুলে গিয়ে একে অন্যের প্রতি শুদ্ধতা আর সুন্দর আগামীর বার্তা দিতেই এমন পানি বর্ষণ। তিনি বলেন, জলকেলি উৎসবে যুবক-যুবতীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ও বাজনার তালে তালে নেচে গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন।
সাংগ্রাই এখন শুধু মারমা সম্প্রদায়ের নয়, এটি পাহাড়ের সব জাতি-গোষ্ঠীর সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইউএনও মো. মঈন উদ্দিন।
জীনামেজু অনাথ আশ্রমের পরিচালক উ. নন্দ মালা মহাথের জানান, সাংগ্রাই উৎসব পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব যা সম্প্রীতি, আনন্দ ও নতুন বছরের বার্তা বহন করে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ১২ মাসের দেশ, ছয় ঋতুর দেশ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এটি মারমা সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও পাহাড়ের সকল জাতিগোষ্ঠি এই উৎসবে শামিল হয়েছেন।’
এই উৎসবে সরকারি মাতামুহুরী কলেজের সাবেক অধ্যাপক অংথিং রাখাইন, ডা. সাইনপ্লানু মার্মা, জিনামেজু অনাশ আশ্রমের দাতা সদস্য বাবু প্রুমং রাখাইন, আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অং থোয়াইহ্লা মারমা, আশ্রমের জমিদাতা সদস্য মো. জসিম উদ্দিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিকরা অতিথি ছিলেন।
প্রসঙ্গত, প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষ বরণ উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুররা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, রাখাইনরা চাংক্রান, অহমিয়া জনগোষ্ঠী বিহু এবং অন্যান্য সম্প্রদায় নিজ ভাষা-সংস্কৃতির নামে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব পালন করেন। ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ঘরে ঘরে তিন দিনের উৎসব শেষে ১৫ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন এলাকায় জলকেলির আয়োজন করে মারমা সম্প্রদায়।