বিশেষ-সংবাদ
সুবাস ছড়াচ্ছে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ গুড়ের হাট
শীতের হালকা কুয়াশা ভেদ করে ভোরের আলো ফুটতেই চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এক আলাদা ঘ্রাণ—খাঁটি খেজুর গুড়ের সুবাস। কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করা এই হাটে শীত এলেই ফেরে প্রাণচাঞ্চল্য।
মাটির ভাঁড়ে সাজানো ঝোলা গুড়, নলেন পাটালি আর ধামা-কাঠায় রাখা টাটকা গুড়ে ভরে ওঠে পুরো হাট এলাকা। গুড়ের মৌ মৌ ঘ্রাণে সুবাসিত হয়ে থাকে চারদিক। এরই মাঝে হাঁকডাক, দরকষাকষি আর ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততায় সরোজগঞ্জ হয়ে ওঠে চুয়াডাঙ্গার শীতকালীন অর্থনীতির এক জীবন্ত কেন্দ্র।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিনশ বছর ধরে চলমান সরোজগঞ্জ খেজুর গুড়ের হাট প্রতি সপ্তাহে বসে দুই দিন—সোমবার ও শুক্রবার। প্রতিটি হাটে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার বেশি গুড় কেনাবেচা হয়। চলতি মৌসুম শেষে এখানকার মোট লেনদেন ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা বাজার-সংশ্লিষ্টদের।
১ দিন আগে
মির্জাগঞ্জের পরিত্যক্ত সরকারি ভবন এখন মাদকসেবীদের আখড়া
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অধিভুক্ত আধাপাকা দুটি সরকারি ভবন মাদকসেবীদের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকির অভাবে ভবন দুটির দরজা-জানালা ও বারান্দার চালার অধিকাংশ টিন খুলে নিয়ে গেছে মাদকসেবীরা। ফলে ভবন দুটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় এই ভবনগুলোতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও জমিদাতাদের করা মামলার কারণে এবং ভবন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় দপ্তরটি ভাড়া বাসায় স্থানান্তর করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন কোনো তদারকি না থাকায় ভবন দুটি মাদক সেবন, জুয়া এবং নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি মাদক বেচাকেনার নিরাপদ স্থান হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা সদর সুবিদখালী থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তরে পশ্চিম সুবিদখালী–বটতলা সড়কের পাশে অবস্থিত ভবন দুটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সীমানাপ্রাচীর থাকলেও লোহার গেটের একটি দরজা ভেঙে পড়ে রয়েছে। দরজা-জানালা ও বারান্দার টিনের চালার অধিকাংশ টিন না থাকায় ভবন দুটি কঙ্কালে পরিণত হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের প্রায় প্রতিটি কক্ষে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের আলামত, মাদক ব্যবহারের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে এসব কক্ষে মাদক সেবনের পাশাপাশি জুয়ার আসর বসে। চলে অসামাজিক কার্যকলাপও। আবাসিক এলাকার ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় নারী, শিশু ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক জানান, রাত হলেই দলবেঁধে মাদকসেবীরা ভবনটিতে প্রবেশ করে। সীমানা প্রাচীর থাকলেও গেট ভাঙা থাকায় মূল ফটক দিয়েই তারা দলবল নিয়ে অবাধে ভেতরে ঢুকে আড্ডা বসিয়ে মাদক সেবন করে। আবাসিক এলাকা হওয়ার এখানে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৬-৮টি পরিবারসহ স্থানীয় প্রায় অর্ধশত পবিরারের বসবাস। মাদকসেবীদের মধ্যে ২-৪ জন যুবক প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছু বলতে পারি না।
তাদের দাবি, এখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবনসহ গুরুতর অপকর্ম চললেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং মাদকের ছোবল থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে জরুরি অভিযান প্রয়োজন।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মির্জাগঞ্জ ফাউন্ডেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার পরিত্যক্ত ভবন দুটি মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। বিষয়টি কখনোই কাম্য নয়। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে নিয়মিত টহল ও অভিযান জোরদার করে মাদকসেবী ও কারবারিদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
মির্জাগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহিদা বেগম (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, ‘ব্যবহার-অনুপযোগী হওয়ায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে অফিসটি ভাড়া বাসায় স্থানান্তর করা হয়। ভবনটির জমিদাতারা মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেছিলেন, যেখানে আমাদের পক্ষে রায় এসেছে। ইতোমধ্যে ভবনগুলোর সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানিয়েছি। মাদকসেবীদের আড্ডার বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছি।’
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আ. ছালাম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। আমার কাছে এ বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য নেই। কেউ অভিযোগ দিলে সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. মলিহা খানম বলেন, ‘সরকারি পরিত্যক্ত ভবনে মাদক সেবনের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। মাদক সেবন করা হচ্ছে—এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
২ দিন আগে
নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনে অচলাবস্থা, হতাশায় বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা
নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় প্রশাসনের তিন স্তরের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা চরম হতাশা ও ক্ষোভে ভুগছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পদোন্নতি প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের তফসিল নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। সময়মতো পদোন্নতি না হলে প্রশাসনিক কাজকর্মে স্থবিরতা তৈরি হবে। তারা বলছেন, এসব কর্মকর্তার কেউই নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট নন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়েই পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব। তা না হলে একটি হতাশাগ্রস্ত প্রশাসনের জন্ম হবে এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা এখনও পদোন্নতি পাননি। এতে তারা চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ। বঞ্চিতদের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদে অন্তত ৩৫০ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৩৪৫ জন এবং উপসচিব পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী আরও অন্তত ৮৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।
উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তার সংখ্যাও বাড়ছে। সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পাননি বিসিএস ৩০তম ব্যাচের ৭৯ জন কর্মকর্তা। তাদের প্রায় সবাই পুনরায় পর্যালোচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন।
সূত্র জানায়, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিসিএস ২৪তম ব্যাচের অন্তত ১৮৩ জন কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ মার্চ প্রশাসনের ১৯৬ জন কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও নিয়মিত ব্যাচের ৩২০ জনের মধ্যে মাত্র ১৩৭ জন পদোন্নতি পান। বাদ পড়েন পাঁচজন জেলা প্রশাসকসহ মোট ১৮৩ জন কর্মকর্তা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২০তম ব্যাচকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এবারের পদোন্নতিতে প্রশাসন ক্যাডারের ২৪৪ কর্মকর্তার পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডার থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এই ব্যাচের ৪৩ জন কর্মকর্তা শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং ৪০ জন মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তাদের পদোন্নতি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
২০তম ব্যাচের নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। তারা ২০১৯ সালে যুগ্ম সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও পদোন্নতি পান ২০২১ সালে। নিয়ম অনুযায়ী যুগ্ম সচিব হিসেবে দুই বছর চাকরি করলেই অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জিত হয়। সে হিসেবে ২০২৩ সালেই এই ব্যাচের কর্মকর্তারা যোগ্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে তাদের চাকরিজীবনের সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এসএসবি পদোন্নতির তালিকা চূড়ান্ত করলেও শেষ সময়ে এসে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারেনি সরকার।
এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে অন্যান্য ক্যাডারের দেড় শতাধিক কর্মকর্তা পদোন্নতিযোগ্য হলেও যুগ্ম সচিব হতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অধিকাংশই পুনরায় পর্যালোচনার আবেদন করেছেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে এসএসবি একাধিক বৈঠকও করেছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, দুদক বা বিভাগীয় মামলা চলমান, কিংবা ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) বা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব এহসানুল হক ইউএনবিকে বলেন, নিয়মিত পদোন্নতি না পাওয়াদের বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল আছি। আমরা তথ্য নিচ্ছি। এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই আসবে।
মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আবদুর রশীদ ইউএনবিকে বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি, বেশ কিছু আবেদন পেয়েছি। তার আলোকে কয়েকটি মিটিংও হয়েছে। দেখা যাক, এই সময়ের মধ্যে কতটুকু করতে পারি!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বঞ্চিত কর্মকর্তা বলেন, রিভিউ চেয়ে আবেদন করেছেন অনেকেই। আওয়ামী সরকারের মন্ত্রীর আস্থাভাজন পিএসরাও পদোন্নতি পেয়েছেন। তারা বঞ্চিতদের অনেকেই কারও পিএস ছিলেন না। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। তবু কেন বঞ্চিত হচ্ছে?
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার ইউএনবিকে বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। সময়মতো পদোন্নতি না হলে প্রশাসনিক কাজকর্মে স্থবিরতা তৈরি হবে। যাদের পদোন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তারা কেউই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নন। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়েই পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব। তা না হলে একটি হতাশাগ্রস্ত প্রশাসনের জন্ম হবে এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে।’
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া ইউএনবিকে বলেন, ‘সময়মতো পদোন্নতি না দিলে প্রশাসনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যোগ্যদের সময়মতো পদোন্নতি না দিলে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়, প্রশাসনিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হয়। নির্বাচনের তফসিল নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিয়ে হলেও সময়মতো পদোন্নতি দেওয়া উচিত। এখনও সময় আছে, সরকার চাইলে পদোন্নতি দিতে পারবে।’
৪ দিন আগে
‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ সাভারে ইট পোড়ানো থামাবে কে?
বায়ুদূষণ চরম মাত্রায় পৌঁছানোয় রাজধানী ঢাকায় প্রবেশের প্রধান পথগুলোর অন্যতম সাভার উপজেলাকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করেছিল সরকার। ওই ঘোষণার ফলে উপজেলাটিতে সব ধরনের ইটভাটায় ইট পোড়ানো ও প্রস্তুতের কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সেই আদেশ গ্রাহ্য করার কোনো লক্ষণ নেই উপজেলার ইটভাটাগুলোর।
সরকারি আদেশকে কেবল ‘কাগুজে ঘোষণা’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ইটভাটার মালিকরা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। অনেকে আবার সরকারি অভিযান ঠেকাতে আদালতের অনুমতি নিয়েছেন বলে ভাটার সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। গেল বছরের শেষ দিকে বেশ কয়েকটি ইট ভাটার চিমনি ভেঙে দেওয়া হলেও আবার তা গড়ে নিয়ে চলছে ইট তৈরির কর্মযজ্ঞ।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাভার উপজেলায় মোট ৮৬টি ইটভাটা ছিল। এর মধ্যে বৈধ ইটভাটা ছিল ৫৯টি আর অবৈধ ইটভাটা ২৭টি। শুষ্ক মৌসুমে এসব ইটভাটার দূষিত বায়ু ঢাকা শহরে ঢুকে শহরের বায়ুদূষণের তীব্রতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। দূষিত বায়ু ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এ কারণে বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর ক্ষমতাবলে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট সরকার সমগ্র সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে পরিপত্র জারি করে। পরিপত্র অনুযায়ী, ঘোষিত এলাকায় সব ধরনের ইটভাটায় ইট পোড়ানো ও ইট প্রস্তুতের কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা।
তবে সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারের নির্দেশনা মানার কোনো বালাই নেই ইটভাটাগুলোর। সাভারের আশুলিয়া বাজারের অদূরে তুরাগতীরে আশুলিয়া ব্রিকস ও এমসিবি ব্রিকসে ইট পোড়াতে দেখা যায়। ভাটাদুটিতে এবারের মৌসুমের শুরু থেকে ইট পোড়ানো হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
৫ দিন আগে
নিষেধাজ্ঞার ১৫ মাস পরও বাজারে পলিথিনের দাপট
কাঁচাবাজারে সরকারের পলিথিন নিষিদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ১৫ মাসেরও বেশি সময়; কিন্তু বাস্তব চিত্র তার পুরো উল্টো। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব হাট-বাজারেই দেদারছে চলছে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার। ক্রেতা-বিক্রেতা কারও মধ্যেই নেই কোনো বাছবিচার বা সচেতনতার ছাপ। বাজারে খালি হাতে ঢুকে ক্রেতারা ফিরছেন পলিথিনের ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে।
অথচ দুই দশকের বেশি সময় ধরে আইন থাকলেও পলিথিন আজও বাজার থেকে উধাও হয়নি। অভিযান, জরিমানা আর ঘোষণার বাইরে গিয়ে বিকল্প উৎপাদন, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে পলিথিন বন্ধের উদ্যোগ বারবারই মুখ থুবড়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ রক্ষার এই লড়াইয়ে কেবল আইন নয়, দরকার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, মাছ, মাংস, সবজি, ফল, মুদি পণ্য—সবকিছুই বিক্রি হচ্ছে পলিথিনে। বিক্রেতারা বলছেন, পলিথিন সস্তা, সহজলভ্য এবং বিকল্পের তুলনায় ঝামেলাহীন। ক্রেতাদেরও বাড়তি খরচ নেই। ফলে কাগজ, কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহারে কারও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তবে বর্তমানে রাজধানীর সুপারশপগুলোতে পলিথিনের ব্যবহার কিছুটা কমেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার পলিথিন নিষিদ্ধে অভিযানে যাওয়ার আগে পরিবেশ উপদেষ্টার সঙ্গে অংশীজনদের কয়েক দফা আলোচনা হয়। ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সময় দিয়ে পলিথিনবিরোধী অভিযানও চালানো হয় বাজার-কারখানায়। তবে অভিযানের পরও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। বড় মার্কেট, হাট-বাজারসহ অলিগলিতে মিলছে পলিথিন। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, বিকল্প না থাকায় পলিথিন ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পলিথিন ব্যবহার বন্ধে চেষ্টার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
পরিবেশ সুরক্ষায় পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ প্রথম নিষিদ্ধ করা হয় ২০০২ সালে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার সে বছর সাধারণ পলিথিন ব্যাগ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে নতুন করে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে। ওই দিন থেকে সারা দেশের সুপারশপগুলোতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী সব ধরনের হাট-বাজার ও দোকানে পলিথিন উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু ঘোষণা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকছে কাগজে-কলমেই। অভিযানের শুরুতে কিছুটা কড়াকড়ি থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা শিথিল হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাপটের সঙ্গে বাজারে ফিরে আসে পলিথিন।
পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহতা
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় তিন হাজার কারখানায় প্রতিদিন কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদিত হচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন জমা হয় প্রায় দুই কোটি পলিথিন ব্যাগ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার করছে। ফলে প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে উৎপাদন হচ্ছে পলিথিন
উৎপাদন নিষিদ্ধ হলেও পুরান ঢাকার দেবীদাসঘাট লেন, গণি মিয়ার হাট ও লাড়কিপট্টি এলাকায় শত শত পলিথিন কারখানা চলছে কোনো রাখঢাক না করেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাভিত্তিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে এসব কারখানা চালু রেখেছে।
গত বছর চকবাজারে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানায় অভিযান শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা সেই শক্তিশালী চক্রের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তখন হামলায় গুরুতর আহত হন অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট পরিচালক মুহাম্মদ শওকত আলী।
বিকল্প আসবে কবে
কারওয়ান বাজার, কিচেন মার্কেট, মুসলিম বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব দোকানেই পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, বিকল্প না থাকায় পলিথিন ছাড়া ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়।
এক সবজি বিক্রেতার ভাষায়, ‘আমি না দিলে কাস্টমার অন্য দোকান থেকে নেবে। পাট বা কাগজের ব্যাগ তো বাজারেই নেই।’
ক্রেতারাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, আইন করে নিষিদ্ধ করলেই হবে না, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প বাজারে আনতে হবে। সুপারশপে পাওয়া বিকল্প ব্যাগের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ক্যাপস পরিচালক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ইউএনবিকে বলেন, পলিথিন তিনভাবে ক্ষতি করে—মাটি দূষণ, ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অকার্যকর করে। পোড়ালে বাতাস বিষাক্ত হয়, পানিতে মিশলে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। খাদ্যের সঙ্গে শরীরে ঢুকে ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকিও তৈরি করে।
তার মতে, পলিথিন কমাতে হলে আগে বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। সস্তা, সহজে বহনযোগ্য ও ভেজা পণ্যের উপযোগী না হলে কোনো বিকল্পই কার্যকর হবে না।
প্রস্তুতির ঘাটতিতে ব্যর্থতা
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান ইউএনবিকে বলেন, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়াই ব্যর্থতার মূল কারণ। বাজারে বিকল্প নেই, প্রশাসনিক সক্ষমতা সীমিত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল সমন্বয়—সব মিলিয়ে সরকার এবারও সফল হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, পলিথিন চিরতরে বন্ধ করতে হলে সহজলভ্য ও সস্তা বিকল্প আনতেই হবে। পাটের ব্যাগের দাম দ্বিগুণ হলে সাধারণ মানুষ কখনোই তা গ্রহণ করবে না।
কী বলছে সরকার
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ইউএনবিকে বলেন, পলিথিন নিষিদ্ধে আমরা আইনটি বাস্তবায়নে চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে রাজধানীর সুপারশপগুলোতে পলিথিন দিয়ে পণ্য দিচ্ছে না। এটি আমরা বন্ধ রতে পেরেছি। দেশের সব জায়গা থেকে এই সময়ের মধ্যে এটা বন্ধ করা একটু কঠিন। আমরা একটা জায়গা থেকে শুরু করতে পারলাম। আমরা শুরু করে দিয়ে গেলাম। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করছি। তবে দেশের সকল হাট-বাজারে বন্ধে আরও সময় লাগবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের অভিযানের পাশাপাশি সকল নাগরিকের সচেতনতা জরুরি। পলিথিনের ক্ষতির দাম তার সস্তা দামের চেয়েও অনেক বেশি। ‘পলিথিনমুক্ত প্রতিদিন’ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জিয়াউল হক ইউএনবিকে বলেন, যেকোনোভাবেই হোক পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আমরা আসলে দুভাবে কাজ করছি—একটি সচেতনতা, অন্যটি মোবাইল কোর্ট; এগুলো সারা দেশেই চলছে। সঙ্গে আমরা সাপ্লাই চেইনটাও বন্ধ করার চেষ্টা করছি। ঢাকা থেকে বিভিন্ন জায়গায় পলিথিন যায়, এ রকম বেশ কিছু ট্রাক আটকানো হয়েছে। কারখানাও বন্ধ করেছিলাম। দ্রুতই এই অভিযান আবার শুরু হবে।
৯ দিন আগে
ঝিনাইদহ সীমান্তে ১০ বছরে ঝরেছে ২৯ বাংলাদেশির প্রাণ
ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে আগ্রাসী হয়ে উঠেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী—বিএসএফ। বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি নির্বিচারে সীমান্তের মানুষদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যা করছে তারা।
গত ১০ বছরে বিএসএফের দ্বারা হত্যার এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ভারতীয় এই বাহিনী গুলি করে ও অপহরণের পর পিটিয়ে অন্তত ২৯ বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে বিএসএফের হাতে কয়েকশ মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবি সুত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহ জেলার সঙ্গে ভারতের ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া ছাড়াই উন্মুক্ত রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ অংশে মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর, মান্দারবাড়ীয়া, শ্যামকুড়, নেপা, কাজীরবেড় ও স্বরূপপুর ইউনিয়ন রয়েছে ভারত সীমান্তঘেঁষা।
বিজিবি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মহেশপুরের কাজীরবেড় সীমান্তের বিপরীতে হাবাসপুর ও সুন্দরপুর, বাঘাডাঙ্গা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের বর্ণবাড়ীয়া, শীলবাড়ীয়া, গৌড়া, মাইলবাড়ীয়া সীমান্তের বিপরীতে পাখিউড়া, স্বরুপপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের নোনাগঞ্জ ও বেণীপুর, খোসালপুরের বিপরীতে রামনগর ও কুমারী এবং শ্যামকুঁড় সীমান্তের বিপরীতে ভারতের ছুটিপুর, ফতেপুর ও ভজনঘাট সীমান্তের বিএসএফ ক্যাম্প রয়েছে।
ভারতের সীমান্তে দেশটির ১৪টি বিএসএফ ক্যাম্প গত ১০ বছরে ২৯ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। নিহতদের মধ্যে ২৫ জনের নাম ঠিকানা পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত ২৯ নভেম্বর ভারতের টুঙ্গি বিএসএফ সদস্যরা শহিদুল নামে এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে। ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পর গত ৬ ডিসেম্বর শহিদুলের লাশ ফেরৎ দেয় বিএসএফ। এর আগে, গত ৩ নভেম্বর মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তে বাউলি গ্রামের আবুল কাসেমের ছেলে আব্দুর রহিমকে ভারতের নদীয়া জেলার ধানতলী থানার হাবাসপুর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যদের গুলি চালিয়ে হত্যা করেন।
বিজিবির তথ্য অনুসারে, গত ১০ বছরে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আলম মিয়া, ওয়াসিম আলী, আব্দুল মান্নান ও আত্তাব আলী; তিন সহোদর ফজলুর রহমান, আবু সালেহ ও লিপু হোসেন; সলেমানপুর গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন ও মিজানুর রহমান; খোসালপুর গ্রামের দুই ভাই সোহেল ও রাশিদুল; মাটিলা গ্রামের আশা মিয়া, হারুন মিয়া ও জসিম উদ্দীন; শ্যামকুড় গ্রামের নাসির উদ্দীন, লেবুতলা গ্রামের লান্টু মিয়া, আমিরুল ইসলাম, আন্টু মিয়া, জলুলী গ্রামের খয়জেল হোসেন, গোপালপুর গ্রামের ওবাইদুর রহমান, যাদবপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম, বাঁকোশপোতা গ্রামের হাসান আলী, বাগাডাঙ্গা জিনজিরাপাড়ার আব্দুল খালেক মিয়া, কাজীরবেড় গ্রামের আশাদুল ইসলাম ও মাইলবাড়িয়া গ্রামের শফিউদ্দিন।
বিজিবির একটি সূত্র দাবি করেছে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় ৫৮ বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের পরে সীমান্ত হত্যা কিছুটা কমেছে। আগে দুরত্বের কারণে সীমান্তে নজরদারি ব্যবস্থা ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। এখন নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে সর্তক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।
সীমান্তের একটি সুত্র জানায়, বাংলাদেশিরা অবৈধ পথে ভারতে প্রবেশ করে মাদক, গরু, অস্ত্র ও সোনা পাচার করতে গিয়ে বিএসএফের গুলির মুখে পড়ে। অনেক সময় আবার বাংলাদেশিদের হাতে বিএসএফ সদস্যদের জখম হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
এসব বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল আলম জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনীর অনমনীয়তার কারণেই সীমান্ত হত্যা বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হলেই কেবল সীমান্ত হত্যা রোধ করা সম্ভব।
কাজীরবেড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইয়ানবী জানান, সীমান্তের ভারতীয় অংশে প্রতি কিলোমিটারে একটি করে বিএসএফ ক্যাম্প রয়েছে। অথচ সেখানে বাংলাদেশের আছে প্রতি ৪ কিলোমিটারে একটি। অনেকসময় বাংলাদেশিরা ভুল করে সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করলেই বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, সীমান্ত হত্যা ও সীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবি বরাবরই শক্ত অবস্থানে আছে। তারা নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও সীমান্ত এলাকার মাননুষকে সচেতন করে সীমান্ত হত্যা বহুলাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে আগের চেয়ে এখন সীমান্তের পরিস্থিতি অনেক ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১০ দিন আগে
আলু নিয়ে বেকায়দায় চাঁদপুরের চাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ
আলুর বাজারদরে ধস নামায় চাঁদপুরের আলুচাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু তারা যেমন তুলতে পারছেন না, তেমনি গত মৌসুমে বাকিতে কেনা আলুবীজের ধারদেনাও মেটাতে পারছেন না। এতে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুচাষির সংখ্যা ৫৬ হাজার ৮৬০ জন। সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় চাঁদপুর সদর, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রত্যেকটিতে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক হাটবাজারে এখনো পুরোনো আলু মাত্র ৭–৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে শহর ও গ্রামীণ হাটবাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবুজ শাকসবজির দাম কমেছে। শিম, বরবটি, করলা ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে, টমেটো ৪০ টাকা কেজিতে। মাত্র ১৫–২০ দিন আগেও এসব সবজির দাম ছিল ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
আলুর দাম কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ে এবার জেলায় অনেক চাষি আলু চাষে বিমুখ হয়েছেন। তারপরও জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন মৌসুমে অনেক চাষিকে আবার আলু বপনে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। সদর, কচুয়া ও মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোবারক হোসেন ইউএনবিকে বলেন, এবার আলুর বাজারে কোনো সিন্ডিকেট না থাকায় দাম কমই থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের ৮০ টাকা কেজিতে আলু কিনতে হয়েছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই।’
কচুয়া উপজেলায় হিমাগারে আলু রাখা চাষিরা মারাত্মক সংকটে আছেন। একইভাবে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও। উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত আছে। বাজারদর পানির দরে নেমে আসায় প্রকৃত চাষিরা আলু বের করছেন না। ফলে হিমাগারের ভাড়া আদায় করতে পারছেন না কর্মচারীরা।
দুই হিমাগার ব্যবস্থাপক মঙ্গল খান ও ইয়াছিন মিয়া জানান, চাষিরা আলু না তুললে বা ফেরত না নিলে সেগুলো বিক্রি করেও ভাড়ার টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হাটবাজারে আলুর দাম অত্যন্ত কম।
গত মৌসুমে জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পুরোনো আলু ৮–১০ টাকা কেজিতে এবং নতুন আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাকিলা বাজারে প্রবীণ আলুচাষি ও বিক্রেতা বাচ্চু মিজি বলেন, ‘আমার জমিতে ১০০ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, পুরোটাই লস।’
তিনি ও অন্য চাষিরা জানান, সামনে তারা আর আলু চাষ করতে চান না।
সদরের শাহ মাহমুদপুর এলাকার চাষি বাবুল, মকবুল, জহুরুল হক, হানিফ পাটোয়ারি ও তার ছেলেরাও একই হতাশার কথা জানান।
হানিফ পাটোয়ারি বলেন, ‘গত মৌসুমের আলুবীজের টাকাই এখনো দিতে পারিনি। যে লস খেয়েছি, সামনে আর আলু চাষ করব না।’ তিনি আরও জানান, বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর হিমাগারে রাখা তার ৩৩ বস্তা (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) আলু বস্তাপ্রতি মাত্র ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কচুয়া উপজেলাতেও আলুচাষিদের অবস্থা ভালো নয়। লাভের আশায় তারা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে আলু ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের বেশি আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে কচুয়ার হিমাগার কর্তৃপক্ষের হতাশাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলা সদর, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অধিকাংশ মাঠে আলু রোপণ ও বপনের কাজ চলছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে আলু রোপণ ও বপনে ব্যস্ত চাষিরা।
সদরের বাগাদীর শামসুল ইসলাম ও ধনপর্দির ইসমাইল হোসেন ও সুরুজ মিয়া জানান, গত বছর তারা আলুর ন্যায্য দাম পাননি। তাই এবার কম বা অর্ধেক জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের আশা করছেন, তবে ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে তারা সন্দিহান।
অতি সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ থেকে নৌপথে চাঁদপুরের বাজারে নতুন আলু আসতে শুরু করেছে। তবে নতুন আলুর দাম ৭০ টাকা কেজি থেকে নেমে ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে ৫ কেজি নতুন আলু ১০০ টাকা, আর ১০ কেজি পুরোনো আলু ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিবিদ মোবারক হোসেন আরও জানান, জেলায় বর্তমানে ১০টি হিমাগার চালু রয়েছে। এতে মোট ৮০ হাজার ১৬৯ টন আলু সংরক্ষিত আছে। এসব হিমাগারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ২৫০ টন। তার মতে, যদি সিন্ডিকেট থাকত, তাহলে বাজারে আলুর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে উঠত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের ইউএনবিকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর, যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার হেক্টর কম। এর প্রধান কারণ হলো, চাষিরা আলুর প্রকৃত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং আগের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখেছেন, দাম ভালো পেলে চাষিরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ফসল চাষে আগ্রহী হন।
১৭ দিন আগে
শোকের আবহে নতুনের বারতা নিয়ে এসেছে ২০২৬
কালের পরিক্রমায় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি থেকে আরও একটি বছরের পাতা ছিঁড়ে গেল। শুরু হয়েছে নতুন একটি বছর, ২০২৬। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন বছরটি এমন এক সময়ে শুরু হলো, যখন শোকে বিহ্বল গোটা জাতি।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ‘আপোসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ পুরো দেশ। গতকালই লাখো মানুষের অশ্রু আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানো হলো। দেশে চলছে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, আর এর মধ্যেই নতুনের বার্তা নিয়ে উঁকি দিল নতুন বছরের নতুন সূর্য।
প্রতি বছর খ্রিস্টীয় সালকে বরণ করে নিতে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও আয়োজনের কমতি থাকে না। রাত ১২টায় নতুন বছর পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আতশবাজির ঝলকানিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে আঁধারে ঢাকা আকাশ। ফানুসের মলিন-মিষ্টি আলো দ্যুতি ছড়িয়ে যায় শত-সহস্র হৃদয়ে। বাজি আর পটকার কান ফাটানো শব্দে সদ্যজাত শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের নাভিশ্বাস উঠে যায়, নিদ্রাকাতর পাখপাখালি দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করতে গিয়ে দেয় প্রাণ। ফানুসের আগুনে শীতের রাতে জ্বলে ওঠে কোনো কোনো বাসাবাড়ি; সর্বস্ব হারায় মানুষও।
তবে রাষ্ট্রীয় শোকের মাঝে ২০২৬ সালকে বরণ করে নিতে যথেষ্ট সংযমের পরিচয় দিয়েছে রাজধানী ঢাকাবাসী। আতশবাজির শব্দ থাকলেও তা অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম। পটকার শব্দও এবার তেমন শোনা যায়নি। তাছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনও এবার আড়ম্বরের সঙ্গে হয়নি।
রাষ্ট্র সংস্কারের নানা চেষ্টা, মব সন্ত্রাস, প্রাণঘাতী ভূমিকম্প, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মতো ঘটনার ভেতর দিয়ে বছর পেরিয়ে দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে ডিসেম্বরে পদার্পণ করেছে, ঠিক সেই সময়ে, বিজয় দিবসের পর থেকেই একে একে আসতে থাকে শোক সংবাদ। আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে কয়েকদিন দেশ-বিদেশের চিকিৎসা নেওয়ার পরও মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় শরিফ ওসমান বিন হাদির। পরপারে পাড়ি জমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাওয়া ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম পাঞ্জেরির।
তরুণ এই নেতার আদর্শকে ধারণ করে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে চোখের জলে তাকে বিদায় জানাল বাংলাদেশ। এরপর এক বুক শোক নিয়েই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রস্তুতি চলছিল। ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমাদান শেষ হয়েছে। কিন্তু এরপর এলো সবচেয়ে বড় শোকের আঘাত। দীর্ঘদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ৩০ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন খালেদা জিয়া।
তার চলে যাওয়ায় দলতম নির্বিশেষে শোকে মুহ্যমান গোটা জাতি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনের পর নতুন করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই টালমাটাল সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘আপোসহীন’ এই নেত্রীর উপস্থিতি ছিল মাথায় ওপর ছায়া, নতুন হাঁটতে শেখা অদম্য শিশুর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকের মতো। সেই তার চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় বিশাল এক শূন্যতার সৃষ্টি করল, সেই শূন্যতা নেতৃত্বের শূন্যতার, ঝঞ্ঝাময় সময়ে একজন দক্ষ কাণ্ডারির অভাব।
তবে শোকের মাঝেও ২০২৬-এর পহেলা জানুয়ারি সকালে উঁকি দিয়েছে নতুন সূর্য। তাই নতুন বছরে আমাদের সব শোক কাটিয়ে উঠে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে ব্রতী হতে হবে। সকল জরা-জীর্ণতা, অবসাদ-বিষণ্নতা, আলস্য আর প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের লক্ষ্যের দিকে ছুটতে হবে। এই লক্ষ্য ব্যক্তির লক্ষ্য, এটি পারিবারিক, সামাজিক লক্ষ্য, এ লক্ষ্য রাষ্ট্রের, জাতি হিসেবে একটি সামগ্রিক লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে বছরের প্রথম দিন থেকেই মনোবল ফিরিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে; সমষ্টির লক্ষ্য অর্জনে সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে, পুরনো দ্বন্দ্ব ভুলে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে।
২০২৬ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বছরই নয়, এই বছরের শুরুর ভাগেই রয়েছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, অংশগ্রহণমূলক আর উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের সূচনা হবে বছরের প্রারম্ভেই।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানা প্রতিকূলতা, সমস্যা পেরিয়ে আজ নতুন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতি। আগামীর বাংলাদেশ গতানুগতিক রীতিতেই চলবে নাকি নতুনভাবে গড়ে উঠবে, এই সময়টাই তা নির্ধারণ করে দেবে। তাই অদম্য প্রাণশক্তিতে জাতি আজ থেকেই তার নবগৌরবের ইতিহাস রচনার হালখাতা খুলুক—এই শুভকামনায় সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা!
১৯ দিন আগে
উত্তরে বাড়ছে দুর্ঘটনা, ১১ মাসে সড়কে ঝরেছে ২৪৩ প্রাণ
চলতি বছর উত্তরের ৮ জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছে আরও শত শত মানুষ।
এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ১১ মাসে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় আশঙ্কাজনকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। এই সময়ে ৪১০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৩ জন নিহত এবং ৪৮৭ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনাজনিত এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৯৪টি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক আইন অমান্য করায় বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার ৭৫৮টি মামলা করেছে হাইওয়ে পুলিশ, যা থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে।
রংপুর হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিজিয়নের আওতায় তেঁতুলিয়া, বোদা, সাতমাইল, তারাগঞ্জ, বড়দরগা, গোবিন্দগঞ্জ ও হাতীবান্ধা এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের থানা রয়েছে। এসব থানার আওতায় রয়েছে ৩৭৩ কিলোমিটার মহাসড়ক এবং ১৩৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক। প্রতিদিন এসব সড়ক দিয়ে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নপ্রান্তে যাত্রীপরিবহন ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। যানবাহনের চাপ, সড়কের কিছু অংশের নাজুক অবস্থা এবং বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোসহ অসতর্কতা-অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
দুই মাস আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শিকার হন নাট্যকার ও ভাওয়াইয়া গবেষক আশরাফুজ্জামান বাবু। তিনি রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে শহরের দিকে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। তার মুখে ও ঠোঁটে বেশ কয়েকটি সেলাই পড়েছে।
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে এক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা যুবক রাশেদ এখন হুইলচেয়ারে বন্দি। একসময় যে মানুষটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল, আজ সে বোঝা হয়ে গেছে নিজের কাছেই।
রংপুর নগরীর নজিরেরহাট এলাকার আব্দুর রহিম অনিক গত ২৪ সেপ্টেম্বর বদরগঞ্জ রোডে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও সন্তানসহ গুরুতর আহত হন। চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। পারিবারিকভাবে অসচ্ছল অনিকের পরিবার ধারদেনা করে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এখন একদিকে ঋণ পরিশোধের চিন্তা অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয়।
বাবু-রাশেদ-অনিকের মতো এমন অনেকই আছেন আড়ালে, যাদের দুর্ঘটনার খবর থাকে অজানা। অথচ ভোরের আলো ফোটার আগেই রংপুরের মহাসড়কগুলো জেগে ওঠে। কেউ যায় জীবিকার খোঁজে, কেউ ফেরে আপন নীড়ে। কিন্তু এই পথই অনেকের জন্য হয়ে উঠছে শেষ গন্তব্য। প্রতিদিনের যাত্রার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনিশ্চিত মৃত্যু, অশ্রু আর নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প।
এ অবস্থা থেকে উত্তোরণ ও দুর্ঘটনা রোধে সড়কগুলোতে নিয়মিত টহল, যানবাহন তল্লাশি ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করছে হাইওয়ে পুলিশ। পাশাপাশি চালক ও যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণসহ প্রচারণামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন তারা। সেই সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও যানবাহন চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের সড়ক আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করছে হাইওয়ে পুলিশ।
সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কে নিয়মিত নজরদারি থাকলেও চালকদের একাংশ আইন মানতে অনীহা দেখাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ চালকের অভাব, বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো এবং যান্ত্রিক ত্রুটিও দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠছে।
তারা মনে করেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, চালকদের মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাও জরুরি। বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানো, অদক্ষ চালক দিয়ে যানবাহন পরিচালনা এবং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালানোর প্রবণতা বন্ধ না হলে এই মৃত্যু মিছিল থামবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
হাইওয়ে পুলিশ রংপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার আবু তোরাব মো. শামছুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অদক্ষ চালকই অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ। রংপুর রিজিয়নের আওতাধীন ৩৭৩ কিলোমিটার মহাসড়ক ও ১৩৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কে নিয়মিত টহল এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভবিষ্যতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। দুর্ঘটনা কমাতে গতি নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানোর পরিকল্পনাও পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত নভেম্বর মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩১৭ জন। আগের মাস অক্টোবরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিলেন ১৪ দশমিক ২২ জন। নভেম্বর মাসে নিহত হয়েছেন ১৬ দশমিক ১ জন। সেই হিসেবে নভেম্বর মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৩১টি জাতীয় মহাসড়কে, ২৪৫টি আঞ্চলিক সড়কে, ৮২টি গ্রামীণ সড়কে এবং ৭১টি শহরের সড়কে এবং ৫টি অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনাগুলোর ১২২টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৩৭টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৯টি পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেওয়া, ৫৯টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ৭টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্ম ঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজিকে।
নিরাপদ সড়ক চাই রংপুরের সহ-সভাপতি চঞ্চল মাহমুদ বলেন, অদক্ষ চালক আর অপ্রশস্ত সড়কের কারণেই প্রতিনিয়তই বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা । এ ব্যাপারে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব কাঠামো কে আরো সক্রিয় ভুমিকা পালন করতে হবে।
৩০ দিন আগে
উপকূলে অশনিসংকেত: কয়রায় অসময়েও ভাঙছে বাঁধ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে নদী ভাঙনে প্রতি বছর প্লাবিত হওয়া খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে কয়রার মানুষ চরম আতঙ্কে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন, জোয়ার-ভাটার তীব্রতা এবং নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা উপকূলীয় এই অঞ্চলের প্লাবন-ঝুঁকিও বাড়ছে।
এদিকে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অনুমোদন আশার আলো জাগালেও কাজের ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগে স্থানীয়দের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। মেগা প্রকল্পে যথেষ্ট বরাদ্দ থাকার পরও অবৈধভাবে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী থেকে বালু উত্তোলন করে তা বাঁধ নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়া গাছ কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে নদী চরের সবুজ বনায়ন। যার ফলে বাঁধের স্থায়িত্ব কমছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
জানা যায়, গেল শনিবার (৬ ডিসেম্বর) রাতে কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নের দোশহালিয়া থেকে হোগলার মধ্যকার একটি অংশের বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। স্থানীয়রা সেখানে মাটি দিয়ে মেরামত করেন। এ ছাড়া নদীতে পানির চাপ ও কোনো প্রকার ঝড়ো বাতাস ছাড়াই গত ৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে হঠাৎ করে কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের মাটিয়াভাঙ্গা এলাকার বেড়িবাঁধের প্রায় ২০০ মিটার ধসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বাঁধটির বিশাল অংশ নদীতে ভেঙে পড়ে প্লাবিত হয় সংলগ্ন এলাকা। পরের দিন ভাটার সময় স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হলেও তাদের আতঙ্ক এখনো কাটেনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত ১১টার পর থেকেই নদীর পাড়ের মাটি সরে যাওয়ার অস্বাভাবিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পরে সেখানে গিয়ে দেখেন, বাঁধের বড় বড় খণ্ড নদীতে ধসে পড়ে ২০০ মিটারের মতো বাঁধ ভেঙে এলাকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করেছে।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বাঁধের স্থায়ী সংস্কার এবং নদী খননে অবহেলার কারণে এই অঞ্চলে ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ধানচর, শামুকপোতা, কুতুবেরচর, গাবতলা ও খোলপেটুয়া পাড়ের বেশ কয়েকটি এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
মাটিয়াভাঙ্গার বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ সেদিন রাতের ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে বাঁধটা নদীতে চইলে গেল। মনে হচ্ছিল, আজই বুঝি সব শেষ; বাড়িঘর সবকিছুই বুঝি তলাই যাবেনে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, ‘প্রতিদিনই নদী এগিয়ে আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি বাড়ি নদীতে চলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে জরার্জীণ থাকলেও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
মাটিয়াভাঙ্গা বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশটি মেগা প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দুই বছর যাবৎ বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ চলমান থাকলেও তাতে রয়েছে চরম ধীরগতি। মাটিয়াডাঙ্গার ওই অংশটি দীর্ঘদিন ধরে নাজুক অবস্থায় থাকলেও সংস্কারে গুরুত্ব দেননি ঠিকাদার।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় কয়রা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের দুটি পোল্ডারে (১৪/১ ও ১৩–১৪/২) প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি, ঢাল সংরক্ষণ, নদীশাসন ও চরবনায়নের কাজ করা হচ্ছে। মাটিয়াভাঙ্গার ভাঙনকবলিত এলাকাটিও এই প্রকল্পের অংশ।
দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘সুন্দরবনঘেঁষা আড়পাঙ্গাসিয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের মোহনার পাশে থাকা এ বাঁধটিতে এক মাস আগেই ফাটল দেখা গিয়েছিল। বিষয়টি আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানালেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’ তার ভাষ্যে, ‘অল্প কিছু বস্তা ডাম্পিং করে দায়সারা কাজ করা হয়েছিল তখন। তাই গতরাতে আগের ফাটলটা হঠাৎ বড় রূপ নিয়ে ধসে গেছে।’
রাতে গ্রামবাসী ও পাউবো মিলে বিকল্প রিং বাঁধ দিয়ে এলাকা প্লাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। কিন্তু নদীর ভাঙন ঠেকাতে রিং বাঁধ কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, রিং বাঁধের স্থায়িত্ব খুব স্বল্প। যেকোনো মূহুর্তে সেটি ভেঙে যেতে পারে। দ্রুত যদি মূল বাঁধ সংস্কার করা না হয়, তাহলে ধ্বসের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের আহ্বায়ক এম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যেখানে বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে, তার আশপাশ থেকেই বালু উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া নদীর চর থেকে মাটি কেটে বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। এতে করে নদীর চরের গাছ কেটে বনায়ন নষ্ট করা হচ্ছে।’ এসব বিষয় উল্লেখ করে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাগরিক সমাজের এই নেতা।
তিনি আরও বলেন, ‘২০০৯ সালের ঘুর্ণিঝড় আয়লার পর থেকে প্রত্যেক বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কোনো না কোনো এলাকা ভেঙে যেতে দেখা যাচ্ছে। এ বছর বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে এলাকা প্লাবিত হাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও শীত মৌসুমে প্লাবিত হলো। শীতকালে এমন ভাঙন এর আগে কখনো দেখিনি।
‘আমাদের প্রাণের দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ। আমাদের দাবির কথা বিবেচনা করে সরকার বরাদ্দ দেওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ, কিন্তু বরাদ্দের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
বিষয়টি কি শুধুই প্রকৃতির তাণ্ডব, নাকি বাঁধের কাঠামোগত দুর্বলতাও—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সচেতন মহল।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশীর মাটিয়াডাঙ্গা এলাকার মেগা প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে রয়েছে পাউবোর সাতক্ষীরা–২ বিভাগ। ওই বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর কবির বলেন, ‘কাজ চলমান অবস্থায়ই বাঁধটি ভেঙে গেছে। এতে কংক্রিট ব্লক নির্মাণের সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাতেই বিকল্প রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে পারায় এলাকা প্লাবিত হয়নি। সকাল থেকে জোরেসোরে আমাদের বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে।’
৪১ দিন আগে