বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পোর্ট বিষয়ক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে, এমন ধারণা ভুল। বিদেশি অপারেটররা শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে, মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের কাছেই।
রবিবার (১৬ নভেম্বর) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, ‘বন্দরের মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। লালদিয়া চরে নিজস্ব অর্থায়নে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস বিশ্বমানের একটি নতুন টার্মিনাল নকশা ও নির্মাণ করবে। নির্মাণকাল তিন বছর। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময় তারা অপারেট করবে। সময় শেষে সব আমাদের বুঝিয়ে দেবে। মনে করুন, গাড়িটা আমাদের, তারা শুধু ড্রাইভার। তাহলে গাড়িটা কি তার হয়ে গেলো?’
গ্লোবাল অপারেটরের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে আশিক বলেন, বাংলাদেশের বন্দরের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি ও দীর্ঘ ওয়েটিং টাইম। প্রতিযোগী দেশগুলো, বিশেষ করে ভিয়েতনাম—গ্লোবাল অপারেটর দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা চালু করে কাই মেপ বন্দরকে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ৭ম স্থানে তুলেছে।
‘আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে ৪০৫টি বন্দরের মধ্যে ৩৩৪তম স্থানে। তাই এমন অপারেটর দরকার যারা প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রক্রিয়াগত উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত ফল দিতে পারবে,’ তিনি বলেন।
আশিক আরও জানান, দেশের তরুণ জনশক্তি এপিএম-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে ভবিষ্যতে দেশ-বিদেশে বন্দর পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত বন্দর পাবার আশা করতে পারি,’ তিনি যোগ করেন।
এপিএম টার্মিনালস এপি মোলার-মেয়ার্স্ক গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যারা বিশ্বের শীর্ষ ২০টির মধ্যে ১০টি বন্দর পরিচালনা করছে। বর্তমানে ৩৩টি দেশে ৬০টির বেশি টার্মিনাল তারা অপারেট করে।
আশিক জানান, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল একটি পূর্ণাঙ্গ পিপিপি প্রকল্প, যার প্রধান দিকগুলো হলো:
• সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগ: সাইনিং মানি ২৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণে মোট প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এপিএম। সরকারি অর্থায়ন বা গ্যারান্টি নেই।
• ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি: শর্ত মেনে চললে মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
• রাজস্ব কাঠামো: অপারেটর যত কনটেইনার হ্যান্ডেল করবে, প্রতিটির জন্য সরকার নির্দিষ্ট ফি পাবে। ভলিউম কম হলেও ন্যূনতম একটি নির্ধারিত ভলিউমের ভিত্তিতে ফি প্রদান করতে হবে।
• নিয়ন্ত্রক সংস্থা: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পুরো প্রক্রিয়ার রেগুলেটর হিসেবে থাকবে।
তিনি বলেন, ভারতের মুম্বাই পোর্টে ২০১৮ সালে ৬০ বছর, চীনের সাংহাইয়ে ৫০ বছর এবং ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দরে ৫০ বছরের পিপিপি চুক্তি হয়েছে। সেই তুলনায় লালদিয়ার ৩০ বছর মেয়াদকে মাঝারি বলা যায়।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী পিপিপি কাঠামোর চুক্তিপত্র আইনগত কারণে প্রকাশ করা হয় না।
“চুক্তির বাণিজ্যিক ও অপারেশনাল তথ্যগুলো গোপনীয়তার শর্তে সুরক্ষিত। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি-ও সম্পূর্ণ দলিল নয়, বরং সারাংশ প্রকাশের পরামর্শ দেয়,” তিনি বলেন।
আশিক বলেন, জনগণের অবগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেমন মালিকানা, আয় কাঠামো—ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে।
জি-টু-জি পদ্ধতিতে টেন্ডার, প্রাকযোগ্যতা যাচাই, টেকনিক্যাল ও ফিনান্সিয়াল মূল্যায়ন এবং ডিউ ডিলিজেন্সের মাধ্যমে অপারেটর নির্বাচন করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার, আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হয়েছে এবং আন্তমন্ত্রণালয় টেন্ডার কমিটি কাজ করেছে।
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ইস্যুর তুলনায় তিনি বলেন, লালদিয়া প্রকল্পে কোনো ঋণ নেওয়া হয়নি—এটি সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগ।
“হাম্বানটোটা চীনা ঋণে নির্মিত এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে শ্রীলঙ্কা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়। লালদিয়ায় মালিকানা রাষ্ট্রের থাকবে, এবং অর্থনৈতিক কাঠামো ঝুঁকিমুক্ত রাখতে রিস্ক শেয়ারিং, ট্রাফিক স্টাডি, কারেন্সি রিস্ক এবং স্টেপ-ইন রাইট নিশ্চিত করা হয়েছে।”
অপারেটর ব্যর্থ হলে বা চুক্তি ভঙ্গ করলে পারফরম্যান্স ভিত্তিক KPI, পেনাল্টি, স্টেপ-ইন রাইট, টার্মিনেশন ও হ্যান্ড-ব্যাক প্রভিশনের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনীয় সময়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে তিনি বলেন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ সব নিরাপত্তা সংস্থার প্রটোকল অপরিবর্তিত থাকবে।
ডেটা লোকালাইজেশন, সাইবার সিকিউরিটি, ব্যাকগ্রাউন্ড স্ক্রিনিং ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোল সরকারের অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
সব মিলিয়ে দেশের যা লাভ
• বছরে অতিরিক্ত ৮ লাখ TEU ধারণক্ষমতা যুক্ত হবে—বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৪৪% বেশি।
• আমদানি-রপ্তানি দ্রুত হবে, খরচ কমবে।
• এখনকার তুলনায় দ্বিগুণ বড় কনটেইনার জাহাজ ভিড়তে পারবে।
• দূরবর্তী দেশের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ যোগাযোগ সম্ভব হবে।
• ৫০০–৭০০ জনের সরাসরি, এবং আরও কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
• স্থানীয় প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবেন।
• ডিজিটাল অপারেশন সিস্টেম ও আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা চালু হবে।
• লালদিয়া হবে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব গ্রিন পোর্ট।