ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা সোমবার একটি বিল অনুমোদন করেছেন যার মাধ্যমে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এই ট্রাইব্যুনাল ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলায় অংশ নেওয়ায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের বিচার করার এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। ওই হামলার মাধ্যমেই সর্বশেষ গাজা যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল।
স্থানীয় সময় সোমবার (১১ এপ্রিল) এই বিল অনুমদিত হয়।
১২০ আসনের পার্লামেন্টে বিলটি ৯৩-০ ভোটে পাস হয় যা ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই হামলার জন্য দায়ীদের শাস্তির বিষয়ে ব্যাপক জনসমর্থন প্রতিফলিত করে। বাকি ২৭ জন আইনপ্রণেতা অনুপস্থিত ছিলেন অথবা ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, ইসরায়েল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে অত্যন্ত সহজ করে তুলবে এবং একটি সুষ্ঠু বিচারের অধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলোকে বাতিল করবে। বিবাদীরা তাদের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন, তবে সেই আপিলগুলো সাধারণ আপিল আদালতের পরিবর্তে একটি পৃথক বিশেষ আপিল আদালতে শুনানি করতে হবে।
যেহেতু এই বিলটি বিচারকদের একটি প্যানেলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করে এবং এসব বিচার জেরুজালেমের একটি আদালত কক্ষ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ বিলকে ১৯৬২ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী আডলফ আইখম্যানের বিচারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তার বিচার প্রক্রিয়াও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল।
আইখম্যানকে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল ইসরায়েলে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা। যদিও প্রযুক্তিগতভাবে গণহত্যা, যুদ্ধকালীন গুপ্তচরবৃত্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু সন্ত্রাসী অপরাধের জন্য ইসরায়েলের আইনে এখনও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিলের বিরোধীরা আরও বলছেন যে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বিচারপ্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার করা একটি তামাশা বা লোক দেখানো অনুষ্ঠান। তারা উপস্থাপিত হতে যাওয়া প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এসব প্রমাণ কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে আদায় করা হয়ে থাকতে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১,২০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করার মাধ্যমে এই যুদ্ধের শুরু হয়। গাজায় ইসরায়েলের পরবর্তী বিধ্বংসী হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৬২৮ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই প্রাণ গেছে অন্তত ৮৪৬ জনের।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, নিহতদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। হামাস-নেতৃত্বাধীন সরকারি এই মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যানগুলো জাতিসংঘ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের কাছে সাধারণত নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটের অংশ এবং এই বিলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সিমচা রথম্যান বলেছেন, ইসরায়েলি আইনপ্রণেতারা একটি ‘সাধারণ লক্ষ্য’ অর্জনে একত্রিত হতে পারেন।
হামোকড, আদালাহ এবং ইসরায়েলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাবলিক কমিটিসহ বেশ কয়েকটি ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী গতকাল (সোমবার) জানায়, ‘৭ অক্টোবরের ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার একটি বৈধ এবং জরুরি বাধ্যবাধকতা’ হলেও, অপরাধের যেকোনো জবাবদিহিতা অবশ্যই এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা উচিত যা ‘ন্যায়বিচারের নীতিগুলো বর্জন না করে বরং অন্তর্ভুক্ত করে।’
এই বিলটি গত মার্চ মাসে পাস হওয়া একটি আইন থেকে পৃথক, যে আইনে ইসরায়েলিদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো সেই পদক্ষেপটিকে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক অ্যাখ্যা দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিল।
মার্চের সেই আইনটি ভবিষ্যতের মামলাগুলোর জন্য প্রযোজ্য এবং এটি পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর নয়, তাই এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারত না।
ইসরায়েলে নির্যাতনের বিরুদ্ধে পাবলিক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটি এখনও তাদের আটক কেন্দ্রে গাজার প্রায় ১ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনিকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রেখেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অন্তত ৭ হাজার গাজাবাসী ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে ৫ হাজার জনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ১ হাজার ৩০০ জনের মধ্যে তারা অন্তর্ভুক্ত নয় যারা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা বা জিম্মি করে রাখার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক রয়েছেন।