সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ১১ লাখ টাকার ভারতীয় গরু জব্দ
সুনামগঞ্জে পৃথক অভিযানে মধ্যনগর সীমান্ত এলাকা থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় ১৪টি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে বিজিবি।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ও গভীর রাতে বিজিবি ২৮ ব্যাটালিয়ন এসব অভিযান চালায়। জব্দ করা গরুগুলোর মোট বাজারমূল্য আনুমানিক ১১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে বিজিবি।
বিজিবি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান বিরোধী নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অভিযান দুটি মধ্যনগর উপজেলার দুটি ভিন্ন বিওপির অধীনে পরিচালিত হয়। রবিবার বিকেলে মাটিরাবন বিওপির একটি টহল দল সীমান্ত পিলার থেকে আনুমানিক ১৫০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কড়াইবাড়ী এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় সেখান থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় ৮টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। পরে একই উপজেলার উত্তর বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের কীর্তনছড়া এলাকায় গভীর রাতে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালনা করে বাংগালভিটা বিওপি। সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ গজ অভ্যন্তরে পরিচালিত এই অভিযানে ৬টি গরু আটক করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ বিজিবি ২৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল একেএম জাকারিয়া কাদির বলেন, ‘সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির আভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের এই কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।’
জব্দ করা গরুগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুনামগঞ্জ শুল্ক কার্যালয়ে জমা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
৭ দিন আগে
সুনামগঞ্জের পাঁচ আসনে জামায়াত-স্বতন্ত্রে বিপাকে বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারবিহীন প্রচারণায় ভাটা পড়েছে সুনামগঞ্জের নির্বাচনি আমেজ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ উঠান বৈঠক ও জনসভায় নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে মোট ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সবকটি আসনে আওয়ামী ঘরানার ভোট পার্থক্য গড়ে দিতে পারে বলে ধারণা অনেকের।
নির্বাচনি মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ-১, ২ ও ৫ আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই এবং সুনামগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনে বিএনপি, জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীরা জামায়াত ও স্বতন্ত্রে ধরাশায়ী হতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন স্থানীয় ভোটারদের অনেকে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা মো. বখতিয়ার বলেন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনে ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী তেমন সুবিধা করতে পারবে না। তবে সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী শিশির মনিরের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ–১
৫ লাখ ১ হাজার ৫৩০ ভোটারের সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসনে বিএনপি থেকে কামরুজ্জামান কামরুল (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা তোফায়েল আহমদ (দাঁড়িপাল্লা) এবং নেজামে ইসলাম থেকে মাওলানা মুজাম্মিল হক (বই) নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
ভোটারদের ধারণা, এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এই আসনে আনিসুল হক প্রথমে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও শেষদিকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বিএনপি থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান কামরুজ্জামান কামরুল। বিএনপির সব বলয়ের মধ্যে চলমান ঐক্য বজায় থাকলে ধানের শীষের প্রার্থী ভালো ব্যবধানে বিজয়ী হবে প্রত্যাশা কর্মী-সমর্থকদের।
জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী বলেন, ব্যক্তি কামরুলের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও এখানে ফ্যাক্টর জামায়াত প্রার্থী। সুশৃঙ্খল দল হিসেবে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা তেমন না। তবে তাদের ভোট বাড়ছে, এমনটা শোনা যাচ্ছে। দলমত নির্বিশেষে সকলের সমর্থনে কামরুলই এগিয়ে থাকবে আশা করছি।
বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ভোটের মাঠে আমি কোনো প্রার্থীকেই ছোট হিসেবে দেখছি না। আমাদের উভয় বলয়ের ঐক্য অটুট আছে। আমার বিশ্বাস, এই ঐক্যবদ্ধ বিএনপি ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত করবে।
সুনামগঞ্জ-২
সুনামগঞ্জের হেভিওয়েট আসন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা)-এ ৩ লাখ ৬ হাজার ৪৮ ভোটার রয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে আইনজীবী শিশির মনির ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নিরঞ্জন দাস (কাস্তে) নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এখানে নাছির চৌধুরী ও শিশির মনিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে নাছির চৌধুরীই বিজয়ী হতে পারে বলে ধারণা অনেকের।
শাল্লা উপজেলার সুখলাইন গ্রামের এক ভোটার জানিয়েছেন, নাছির-শিশির দুজনেরই অবস্থান ভালো। প্রবীণ হিসেবে নাছির চৌধুরী খানিকটা এগিয়ে রয়েছেন। তবে কম সময়ের মধ্যে শিশির মনিরও ভোটের মাঠে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
সুনামগঞ্জ-৩
প্রবাসী-অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী রয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ ছাড়াও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে ১১ দলীয় জোট (উন্মুক্ত) প্রার্থী শাহীনুর পাশা চৌধুরী ‘রিকশা’, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন ‘তালা’ ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম ‘ঈগল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৬ ভোটারের এই আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেনকে সমর্থন দেওয়ায় বেকায়দায় পড়তে পারেন ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী। অনেকে আবার মনে করছেন, বিএনপির অনৈক্যের সুযোগে কপাল খুলতে পারে জোটপ্রার্থী শাহীনুর পাশার।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, জনসমর্থনে আমি এখন পর্যন্ত প্রথম সারিতে আছি। দলের মনোনয়নবঞ্চিত বলয়ও আমার পাশে আছে। প্রতিপক্ষ আমার কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। তবুও বিজয় আমারই হবে।
সুনামগঞ্জ-৪
৩ লাখ ৭২ হাজার ১৮৫ ভোটারের সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনে ধানের ‘শীষ প্রার্থী’ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নূরুল। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন হাছন রাজার বংশধর দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন (মোটরসাইকেল)। বিএনপির বহিষ্কৃত এই নেতার আছে নিজস্ব ভোটব্যাংক।
এছাড়া নির্বাচনে আছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শামছ উদ্দিন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাজমুল হুদা (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহীদুল ইসলাম (হাতপাখা)।
বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী নূরুল ইসলামের বিজয় অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতে পারে ধারণা অনেকের।
সুনামগঞ্জ-৫
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারা) আসনে ভোটার ৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৬ জন। এ আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় মিলন-মিজানের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণায় জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রতিযোগিতা।
তবে বসে নেই ১০ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালাম আল মাদানীও (দাঁড়িপাল্লা)। এছাড়া খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাদির ‘দেওয়াল ঘড়ি’, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ‘লাঙ্গল’ এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) প্রার্থী মো. আজিজুল হক ‘আম’ প্রতীকে প্রচারণায় থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বলে ধারণা করছেন আসনটির অনেক ভোটার।
ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসীম উদ্দিন সুমেন বলেন, মিলন-মিজান সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা জয়ের ভীত আরও শক্তিশালী করেছে। এখানে ‘ধানের শীষ’ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে।
১০ দিন আগে
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনি আমেজ, চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে শেষ সময়ে জমে উঠেছে নির্বাচনি আমেজ। এতে চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। শেষ মুহুর্তের প্রচার ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা; চষে বেড়াচ্ছেন শহর থেকে গ্রামে; হাট-বাজার ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে করছেন ভোট প্রার্থনা।
প্রার্থীরা নিজের বিজয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছেন নির্বাচনি কৌশল। বিজয়ের জন্য প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দেশে ও বিদেশে থাকা সমর্থকরাও প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।
জগন্নাথপুর প্রবাসী-অধ্যূষিত উপজেলা হওয়ায় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভূমিকা সব সময়ই থাকে। এবারের নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় ভোটারদের অধিকাংশ প্রবাসী স্বজনদের কথায় ভোট দিয়ে থাকেন। তবে এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে চলছে নতুন সমীকরণ।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় দলটির সমর্থকদের ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।
স্থানীয়রা জানান, এই অঞ্চল সব সময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি ছিল। এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত জাতীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদসহ আরও কয়েকজন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের পকিল্পনামন্ত্রী ছিলেন এম এ মান্নান। তাদের কারণে এ আসনটি মর্যাদার আসন বলে পরিচিতি পায়।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে এবারের নির্বাচনে মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন: ইসলামী ঐক্যজোট তথা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন (তালা), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুস্তাক আহমদ (দেওয়াল ঘড়ি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার (টেবিল ঘড়ি) ও হোসাইন আহমদ (ফুটবল)।
এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ, সৈয়দ তালহা আলম ও শেখ মুস্তাক আহমদ জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। অপরদিকে, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন, মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার ও হোসাইন আহমদ শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।
নির্বাচনে ভোট দেওয়ার হিসাব-নিকাশে সব সময়ই আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের আমল থেকে দীর্ঘকাল জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে এম এ মান্নানের আমল থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সংসদ সদস্য ছিলেন। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই এলাকায় আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ভোটারদের সঙ্গে পৃথকভাবে নির্বাচনি আলোচনা হয়। এসব আলোচনায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটার তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী জমিয়তে থাকতে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। তিনি আবদুস সামাদ আজাদ ও এমএ মান্নানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে বিগত নির্বাচনে দল বদল করে ‘সোনালী আঁশ’ প্রতীকে নির্বাচন করায় তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী হওয়ায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি।
এছাড়া কয়ছর এম আহমদ জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও রাজনীতি করেছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি তার ক্ষমতার দাপটে নিজ পছন্দের নেতা-কর্মীদের নিয়ে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সাজিয়েছেন। ফলে বঞ্চিত নেতা-কর্মীরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবুও নির্বাচনি আলোচনায় তিনি প্রথম সারিতে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
অপরদিকে ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন ‘বিশেষ এক ব্যক্তির’ ছত্রছায়ায় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া কয়ছর আহমদের বিরোধিতা করে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীই তাকে সমর্থন করছেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি থেকে মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন প্রার্থীও তাদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে আনোয়ার হোসেনের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ‘তালা’ প্রতীকের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
এবি পার্টির সৈয়দ তালহা আলম বিগত জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিলেন। আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন নির্বাচনি ফলাফলে। এর ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তার ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছিল বটে, কিন্তু সম্প্রতি দল বদল করায় তার সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ব্যক্তি হিসেবে ভোটারদের পছন্দের তালিকায় থাকায় তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন ও সৈয়দ তালহা আলমের মধ্যে জমে উঠেছে চতুর্মুখী লড়াই। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সচেতন মহল ও সাধারণ ভোটারদের মত অন্তত তা-ই।
১৩ দিন আগে
চার বছরেও প্রশাসনিক কাঠামো পায়নি মধ্যনগর উপজেলা, বঞ্চিত দেড় লাখ মানুষ
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলাকে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ঘোষণার চার বছর পার হলেও এখনো সেখানে গড়ে ওঠেনি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কাঠামো। নিজস্ব প্রশাসনিক ভবন নেই, নেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নেই পর্যাপ্ত জনবল। ফলে দেড় লাখ মানুষের বসবাস হলেও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সেবা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২২ সালের ২৪ জুলাই মধ্যনগর উপজেলায় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
বর্তমানে ২৩টি সরকারি দপ্তরের জন্য অনুমোদিত ২১২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। বাকি ২০৩টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অবকাঠামো ও জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের একতলায় অস্থায়ীভাবে। অধিকাংশ দপ্তরের কার্যক্রম পাশের ধর্মপাশা উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে নিয়মিত সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বর্তমানে মধ্যনগর উপজেলায় প্রকৌশলী, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, নির্বাচন কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ প্রথম শ্রেণির মাত্র চারজন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পাঁচজন কর্মচারী দিয়ে কোনোভাবে দাপ্তরিক কাজ চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও নাজুক। উপজেলায় নেই কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং নেই একজনও এমবিবিএস চিকিৎসক। যদিও দুটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোতেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাধারণ চিকিৎসা ও জরুরি সেবার জন্য এলাকাবাসীকে ধর্মপাশা উপজেলা কিংবা সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
২২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যনগর উপজেলায় রয়েছে চারটি ইউনিয়ন ও ১৪৭টি গ্রাম। এই উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা ঘোষণার পর কাঠামোগত উন্নয়ন কার্যত থমকে রয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
মধ্যনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘মধ্যনগরকে পূর্ণাঙ্গ ও মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু চার বছরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল কাইউম মজনু বলেন, ‘উপজেলা ঘোষণার চার বছর পরও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল না থাকা দুঃখজনক। প্রশাসনের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, প্রশাসনিক ভবন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ১৬ একর জমির প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
২৩ দিন আগে
ভোটের মাঠে অনড় সিলেট বিভাগীয় বিএনপির ৫ বিদ্রোহী প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গতকাল (মঙ্গলবার)। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে মোট ২৬ জন প্রার্থী এদিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির ৫ বিদ্রোহী শেষ দিনেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে অনড় রয়েছেন তারা।
ওই পাঁচ প্রার্থী হলেন— সিলেট-৫ আসনে জেলা বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন), হবিগঞ্জ-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত, মৌলভীবাজার-৪ আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া মধু, সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন এবং সুনামগগঞ্জ-৪ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে এই পাঁচ আসনে বিএনপি ও তাদের জোটের প্রার্থীদের বিপাকে পড়তে হতে পারে বলে মত স্থানীয় রাজনীতি-সচেতন মানুষের।
সিলেট জেলার মধ্যে একমাত্র বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ। যিনি চাকসু মামুন নামে পরিচিত। তিনি সিলেট-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় মামুনকে দল থেকে সম্প্রতি বহিষ্কার করা হয়েছে। এই আসনটি জোটসঙ্গী জমিয়ত ইসলামকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক এখানে প্রার্থী হয়েছেন।
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনে বিএনপি নেতা শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান মো. মহসিন মিয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আর এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য কয়ছর এম আহমদ। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন।
সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন।
তবে সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া।
২৬ দিন আগে
সুনামগঞ্জ–৫: দুই দশক পর ধানের শীষের প্রত্যাবর্তনের লড়াই
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে প্রায় দুই দশক পর ধানের শীষের ঘরে ফেরার লড়াই এখন নির্বাচনি মাঠে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু। একসময় বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ২০০৬ সালের পর আর কোনোদিন বিএনপির দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। হারানো আসন পুনরুদ্ধারে এবার ভিন্ন কৌশল ও বাড়তি উদ্যমে মাঠে নেমেছে দলটি।
এই প্রত্যাবর্তনের মুখ্য ভরসা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলন। শুরুতে তার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী। তার অনুসারীদের একটি প্রভাবশালী অংশ এলাকায় ‘ধানের শীষে ভোট যাবে না’—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়, যা দলের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত ও তারেক রহমানের নির্দেশে মিজানুর রহমান মাঠ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পুরো সমীকরণই বদলে গেছে। তার পরপরই পরিস্থিতি ঘুরে গেছে মিলনের দিকে। দুই উপজেলা মিলিয়ে প্রায় ২০০টি কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মিলনের নির্বাচন পরিচালনা কাঠামো এখন সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
হাটবাজার, চায়ের দোকান, পাড়া–মহল্লা—সর্বত্র ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার এখন স্পষ্ট। নেতা-কর্মীরা দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সততা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা মিলনকে আবারও ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত সৌজন্য তাকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তরুণ, কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রবাসী—সব শ্রেণির মানুষের কাছেই তিনি এখন ‘হৃদয়ের মানুষের’ প্রতীক।
জেলা বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিলন ভাই মাঠে থাকলে গরিবের দোরগোড়ায় সাহায্য পৌঁছে যায়। তিনি এলাকার সুখ–দুঃখের মানুষ। এবার তিনিই এগিয়ে আছেন।’
দোয়ারাবাজারের কৃষক মুহরম আলী সুমন বলেন, ‘দুই দশক পর মনে হচ্ছে ধানের শীষের সময় এসেছে। মিলনকে আবার সংসদে দেখতে চাই।’
ত্রিমুখী লড়াই, কওমিপন্থী ভোটে টানাপোড়েন
এবারের নির্বাচনে মাঠে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে। ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলনের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী এবং খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কাদির। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এলাকাগুলোতে তারা সক্রিয় রয়েছেন। বিশেষ করে সালাম আল মাদানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ভোটে প্রভাব আছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীর সংখ্যা যতই থাকুক, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যে।
জামায়াত প্রার্থী মাওলানা সালাম আল মাদানী বলেন, ‘যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি—এই চারটি সংকট ছাতক–দোয়ারাবাজারের বড় সমস্যা। নির্বাচিত হলে এগুলো সমাধানই হবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার।’
কেন্দ্র থেকে গ্রাম—মিলনের অগ্রযাত্রা
বিদ্রোহী ইস্যুর অবসানের পর বিএনপির ভোটব্যাংক আবারও সংগঠিত হচ্ছে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল ও কৃষক দলের সমন্বিত তৎপরতা মিলনের প্রচারণায় নতুন গতি এনেছে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সম্পাদক রিপন তালুকদার বলেন, ‘মাঠের চিত্র পুরো বদলে গেছে। ছাতক-দোয়ারাবাজারে ধানের শীষের পক্ষে সুবাতাস বইছে। গ্রাম থেকে মহল্লা—সবখানেই মিলনের গণজোয়ার।’
দীর্ঘদিন পর হাড্ডাহাড্ডি ভোটের আবহে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই বলছেন, এবার প্রতীক নয়, প্রার্থী দেখেই ভোট দেবেন। মানুষের পাশে যিনি থাকবেন, তাকেই ভোট দেবেন। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রাজনীতি, প্রতিশ্রুতির ফানুস আর মুখোমুখি দেখাটাই হবে এবার পরীক্ষার জায়গা।
ছাতকের রজব আলী নামের এক বৃদ্ধ ভোটার বলেন, ‘এবার প্রার্থী দেখেই ভোট দেব। যিনি এলাকার কষ্ট বোঝেন, তাকেই সুযোগ দেওয়া উচিত।’
শেষ মুহূর্তের সমীকরণ
ধানের শীষের প্রার্থী কলিম উদ্দিন মিলন বলেন, ‘সারা সুনামগঞ্জজুড়েই ধানের শীষের গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। পাঁচটি আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন—মানুষের সাড়া সেটাই প্রমাণ করে। আগামী ২২ তারিখ থেকে প্রচারণার নতুন অধ্যায় শুরু হলে সিলেটজুড়ে ধানের শীষের ঢেউ দেখা যাবে।’
মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও, আপাতত মাঠের চিত্র বলছে—দুই দশকের অপেক্ষা ঘোচাতে সুনামগঞ্জ-৫ আসনে ধানের শীষের সবচেয়ে বড় ভরসা কলিম উদ্দিন মিলন। দলীয় ঐক্য, ভোটারদের আগ্রহ ও বিদ্রোহী সংকট কাটিয়ে ওঠার ফলে এই আসনে নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দশকের খরা কাটিয়ে ধানের শীষের ভাগ্যে সত্যিই বিজয়ের সূর্য উদিত হচ্ছে কি না, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে।
৩০ দিন আগে
সুনামগঞ্জের হাঁসের খামারে লুট, হামলায় মালিকসহ আহত ৩
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাওরে একটি হাঁসের খামারে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বাধা দিতে গেলে খামারের মালিকসহ তিনজনের ওপর হামলা করা হয়েছে।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) বিকাল ৩টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের হাতিরঘাটা হাওরে এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন—খামারের মালিক শিপন মিয়া (৩৫), তার ভাই হৃদয় মিয়া (২০) এবং খামারের কর্মচারী সাকিব মিয়া (২৪)। তারা উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের লামাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা।
এ ঘটনায় আজ (সোমবার) সকালে আহত শিপন মিয়া তাহিরপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগপত্রে উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের পানিয়াখালি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৫০), জমসেদ মিয়া (৩৬), তামজিদ মিয়া (৩০), মুনছুর মিয়া (৩২), আকিক মিয়া (৩৪), ছয়ফুল মিয়া (৩২) ও সামরান মিয়ার (৩৪) নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, রবিবার বিকেল ৩টার দিকে পূর্ব শত্রুতার জেরে অভিযুক্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিপনের হাঁসের খামারে হামলা চালান। এ সময় খামারের কর্মচারী সাকিবকে মারধর করে বেঁধে রেখে প্রায় ৬৫০টি দেশি হাঁস লুট করে নিয়ে যান হামলাকারীরা, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি ৫টি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লুটপাটের সময় বাধা দিতে গেলে শিপন ও হৃদয়কে দা, রড ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করেন অভিযুক্তরা।
ঘটনার পর আহতদের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে হৃদয়ের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে জেলার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
৩৫ দিন আগে
উদ্বোধনের ৩ সপ্তাহেও শুরু হয়নি কাজ, হাওরের বাঁধ নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
সুনামগঞ্জে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ এখনও শুরু হয়নি। গত ১৫ ডিসেম্বর নিয়মরক্ষার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হলেও তারপর পেরিয়ে গেছে ২২ দিন। অথচ, মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়ে না।
হাওর থেকে পানি নামতে দেরি হওয়ায় কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন দাবি করলেও কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা বলছেন ভিন্ন বাস্তবতার কথা।
রবিবার (৪ জানুয়ারি) তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও জামালগঞ্জ উপজেলার একাধিক হাওর ঘুরে দেখা যায়, বাঁধের ভাঙা অংশ বন্ধ করা ও মেরামতের জন্য হাওরের অধিকাংশ এলাকাই কাজ শুরুর উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের একাংশ এবং তাহিরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের প্রায় অর্ধশত প্রকল্প এলাকায় কাজ শুরুর কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়েনি। যদিও এসব হাওরের কয়েকটি অংশ দিয়ে পানি নামছে, তবে প্রাক্কলিত বাঁধের অধিকাংশ স্থানেই কাজ করার মতো পরিবেশ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) অধ্যুষিত শাল্লা ও ধর্মপাশা ছাড়াও মধ্যনগর, তাহিরপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জসহ একাধিক উপজেলায় এখনও বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। কোথাও কোথাও এখনো পিআইসি গঠন প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা।
নীতিমালা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু কাজ শুরু তো দূরের কথা, অনেক উপজেলায় এখনো পিআইসি গঠনই শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এতে কৃষকসহ হাওরাঞ্চলের সচেতন মানুষের মাঝে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জেলায় এ বছর প্রায় ৫৩টি হাওরে ৭০২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। চলতি মৌসুমে ৫৮৫ কিলোমিটার প্রাক্কলিত বাঁধের মধ্যে ১০৪টি স্থানে ভাঙা অংশ (ক্লোজার) রয়েছে। হাওরের কৃষক ও ফসলের নিরাপত্তায় সরকার প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দিয়ে আসছে। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবারও যথাসময়ে কাজ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে পানি নামার কারণে কাজে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল একফসলি এলাকা। বছরে একবারই এখানে বোরো ধান উৎপাদন হয়। এই একমাত্র ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে হাওরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশার শেষ থাকে না। এখানকার বোরো ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে কারণেই সরকার প্রতি বছর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে থাকে। কিন্তু গাফিলতির কারণে কাজ পিছিয়ে পড়লে বড় ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।
ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরপাড়ের কৃষক চন্দন তালুকদার বলেন, ‘আমরার হাওরে বান্ধের কাজটাজ এখনও শুরু হইছে না। ঠিক টাইমে কাজ করলে মাডি বয় ভালা (বসে ভালো), বাঁনও (বাঁধও) শক্তিশালী হয়। শেষ সময়ে আইয়া তাড়াহুড়া কইরা মাটি কাটব, বাঁন থাকব দুর্বল, পানির ধাক্কা খাইলেই বাঁন ভাইঙা যে শ্রম-ঘাম দিছি সব তলাইয়া যাইব।’
তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের দুই পিআইসি সভাপতি সোহেল মিয়া ও নূর মিয়া জানান, বাঁধ নির্মাণের কাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে তারা নিজেরাও নিশ্চিত নন। তাদের ভাষ্য, এখনও বাঁধের কাজের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এমনকি নিজেদের পিআইসি নম্বরও তারা জানেন না।
শাল্লা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, ‘১৫ ডিসেম্বর উদ্বোধনের পর এখানকার কোনো বাঁধেই এখনও কাজ শুরু হয়নি। ছয়টি হাওরে শতাধিক প্রকল্প রয়েছে। এখনও পিআইসি গঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। পিআইসি নেওয়ার জন্য তদবির চলছে। এ অবস্থায় সময়মতো কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’
হাওর পরিদর্শন শেষে হাওর বাঁচাও আন্দোলন জামালগঞ্জ উপজেলা সভাপতি রফিকুল বিন বারী বলেন, ‘গত রবিবার হালির হাওর ঘুরেও পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। কাজ কখন শুরু হবে, কখন শেষ হবে—তা বলা মুশকিল। এভাবে চললে শেষ পর্যন্ত কৃষকরাই বিপদে পড়বে। তখন দৌড়ঝাঁপ করে কোনো লাভ হবে না। সময় থাকতে কাজে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।’
এ বিষয়ে কাবিটা প্রকল্প তদারক কমিটির সভাপতি ও শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ‘অনেকগুলো বাঁধে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কিছু মেশিন হাওরে ঢুকেছে। দু–একদিনের মধ্যেই পুরোপুরি কাজ শুরু হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চার-পাঁচটি পিআইসি এখনও গঠন হয়নি। সেগুলো সরেজমিনে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ‘হাওরের অনেক জায়গা দিয়ে এখনও নদীতে পানি নামছে। পানি নামার কারণেই কাজে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে।’
৪১ দিন আগে
সুনামগঞ্জে সরিষায় স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠ এখন যেন এক বিশাল হলুদের চাদর। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সরিষা ফুলের মনকাড়া দৃশ্য। শীতের সকালের নরম রোদে ঝলমল করছে হলদে ফসলের মাঠ। আর সেই হলুদের আভা নতুন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে এসেছে স্থানীয় চাষিদের মনে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলি মাঠ ও হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ সরিষা ফুলের সুবাসে মুখরিত। বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের সাথে মৌমাছির অবিরাম গুঞ্জন এক নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করেছে। কেবল কৃষি উৎপাদনই নয়, এই দৃশ্য এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও এক অনন্য আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন মাঠের ধারে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং রোগবালাই কম হওয়ায় দোয়ারাবাজারে সরিষার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় চাষিদের চোখে-মুখে এখন কেবলই প্রত্যাশার ছাপ।
মাঠের আইলে দাঁড়িয়ে থাকা চাষিরা জানান, সরিষা চাষ যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি এটি অল্প সময়ে ঘরে তোলা যায়। বোরো ধান চাষের আগে এই মধ্যবর্তী ফসলটি চাষিদের কাছে বাড়তি আয়ের এক বড় মাধ্যম।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দোয়ারাবাজারে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক রোগ দমনের পরামর্শ দিয়ে মাঠ পর্যায়ে সহযোগিতা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে সরিষার এই হলুদ বিপ্লব স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
দোয়ারাবাজারের এই হলুদ রাজ্য কেবল কৃষি সমৃদ্ধির কথা বলে না, বরং তা বাংলার গ্রামীণ শাশ্বত রূপ ও মেহনতি মানুষের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতি আর পরিশ্রমের এই মেলবন্ধনে এবার দোয়ারাবাজারের কৃষকদের গোলা ভরে উঠবে সরিষায় - এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
৪২ দিন আগে
মাটি পরীক্ষার সুফল অধরা, কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের কৃষকেরা
সুনামগঞ্জে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট হাওরের কৃষি উন্নয়নে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়ার কথা থাকলেও কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না। মাটি পরীক্ষার পর সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষক তা মানছেন না। তাছাড়া মাটি পরীক্ষা করে কৃষির উন্নয়নে কৃষকেরা উদ্যোগী হবেন—এই কার্যক্রমের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায়ও স্বাভাবিক গতি কমতে দেখা গেছে।
চাষবাসের উন্নয়নে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে কোন মাটিতে কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়, এ বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার কথা রয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের।
সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, হাওরের কৃষক ও অন্যান্য উপকারভোগীদের মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও সার বিশ্লেষণ সেবা এবং মৃত্তিকা নমুনা বিশ্লেষণের ফলাফল অনুসারে স্থানভিত্তিক ফসল চাষের জন্য সার প্রয়োগের সুপারিশ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়া জেলার মাটির উর্বরতা এবং ভূমির উৎপাদন কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে ফলাফলও যথাযথভাবে প্রয়োগ করার কথা।
মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফল, মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ফসল চাষে সার প্রয়োগের বিশেষ সুপারিশ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়াও মাটির উর্বরতা অবক্ষয় সমস্যা, ফসলের পুষ্টি উপাদানের সমস্যা, মৃত্তিকা রসের অভাব এবং ফসল উৎপাদনে বাধা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় পৌনে চার লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই হাওরের বোরো জমির ওপর নির্ভরশীল। সনাতন পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা চাষবাস করে আসছেন। এখনো আধুনিক কৃষির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়নি। তাই কৃষির ফলনে তারা পিছিয়ে আছেন।
এদিকে ২০২১ সালে হাওর জেলা সুনামগঞ্জে কার্যক্রম শুরুর পর সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ৪ হাজার ৪৬০ জন কৃষককে সার প্রয়োগের সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। কখনো মাঠ থেকে, কখনো কৃষকরা মাটির নমুনা অফিসে নিয়ে এসে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করাচ্ছেন। এই পরীক্ষার আলোকে ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য সংশ্লিষ্টরা কৃষকদের সার প্রয়োগের সুপারিশ করছেন। এজন্য তাদের বিশেষ কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি অনলাইনেও কৃষকরা পূর্ণ ঠিকানা নিবন্ধন করলে অফিসের লোকজন মাঠে গিয়ে মাটির নমুনা এনে পরীক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও কৃষি অফিসের মাধ্যমে জেলার সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জগন্নাথপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগারে প্রশিক্ষণ ও মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব উপজেলায় ৫০ জন করে কৃষককে গবেষণাগার পরিদর্শন করিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্টরা।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কার্যক্রম চালুর পর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কৃষকদের সার সুপারিশ সেবার পরিসংখ্যান বেশি দেওয়া হলেও এখন এই গতি কমে এসেছে। চলতি বছর মাত্র ৪৬০ জন কৃষককে সার সুপারিশ কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
তালিকা ধরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা উপজেলা কৃষি অফিসে মাটির নমুনা দিয়ে মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তারা কোনো পরামর্শ পাননি। তাই পরীক্ষার পর তাদের কী করতে হবে, এ বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নন।
দিরাই উপজেলার শরিফপুর গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন বলেন, আমি বছরখানেক আগে দিরাই কৃষি অফিসে খেতের মাটি দিয়ে এসেছিলাম। তারপরও আমাকে তারা কিছুই জানায়নি। আমি আগে যেভাবে চাষ করতাম, এখনও একইভাবে চাষ করতেছি।
ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, আমি দুই বছর আগে মাটি দিয়ে আসছিলাম। পরে আমাকে কিছু জানায়নি। আমি আমার মতো করে চাষ করি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, আমি মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলাম, কিন্তু তারা জমিতে যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করার কথা বলেছে, তা দিলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
প্রতি শতাংশে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম সার প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের হিসাব মানলে প্রতি কেয়ারে (প্রতি ৩০ শতাংশে এক কেয়ার) ৪০ কেজির ওপর সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। তাই তাদের সুপারিশ না মেনে নিজের মতো করে চাষ করছি।
সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা সার প্রয়োগ সুপারিশ করে থাকি। এটা মানলে ফলন বেড়ে যাবে এবং রোগবালাইও প্রতিরোধ হবে। তবে কেউ না মানলে তো আমাদের কিছু করার নেই।
তবে পরীক্ষা করার পরও যারা সুপারিশ কার্ড পাননি, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
৪৭ দিন আগে