রংপুর
সাংবাদিক উৎস হত্যা: একজনের মৃত্যুদণ্ড, দুজনের যাবজ্জীবন
রংপুরে সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান হত্যা মামলায় এক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে এ মামলায় মূল অভিযুক্তকে খালাস দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মশিউর রহমান খান এ রায় দেন।
রায়ে রুবেল ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড এবং এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
এ মামলায় মূল অভিযুক্ত চিহ্নিত মাদককারবারি জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ। রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছে নিহত সাংবাদিক উৎস রহমানের পরিবার।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রংপুরের স্থানীয় দৈনিক যুগের আলো কার্যালয়ে যান সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান। এরপর রাতে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে নগরীর ধর্মদাস এলাকায় একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের মা নুরজাহান বেগম নুরী রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় পুলিশ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। পরে আদালত ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
১০ বছর ৯ মাসের বেশি সময় ধরে মামলাটির বিচারকার্য চলে। এ সময় ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে আজ (বুধবার) রায় ঘোষণা করেন আদালত।
এদিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন দাবি করে মামলার বাদী নুর জাহান বেগম জানান, এই রায়ে তারা সন্তুষ্ট না হওয়ায় উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তারা।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ বলেন, মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যা করিয়েছে। অথচ আদালত হত্যাকাণ্ডের সেই মাস্টার মাইন্ডকেই বেকসুর খালাস দিয়েছেন। এ রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার সংক্ষুব্ধ। এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। এভাবে হত্যার পর মূলহোতা পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
রায় নিয়ে সাংবাদিক সমাজেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের মতে এই রায় সন্তোষজনক নয়।
৫ দিন আগে
রংপুরে চার খুন: আসামিদের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি
রংপুর নগরীর গণপতি চক্রবর্তীসহ চার হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফল পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তাদের শরীরে কোনো অবৈধ মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার ১০ দিন পর নমুনা সংগ্রহ করায় পরীক্ষায় মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এদিকে, রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী। পরে বিচারক আসামিদের দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তারা চরম উন্মাদনা ও মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিল।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের আদেশে গত ৩০ আগস্ট রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করেন চিকিৎসকরা। পরে হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উভয় আসামির শরীরে ইয়াবা, গাঁজা বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে চিকিৎসকদের মতে, মাদক সেবনের পর মানবদেহে বা প্রস্রাবে এর উপস্থিতি সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা থেকে চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পর পরীক্ষা করায় স্বাভাবিকভাবেই শরীরে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী বলেন, এত বড় একটি ঘটনার এক-দুই দিন পরই ডোপ টেস্ট করা যেত। সেখানে ১০ দিন পর ডোপ টেস্ট করে নেগেটিভ এসেছে। এখন কী হবে, তা আপনারা দেখেন।
ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়া গেলেও এতে খুনের তদন্তের অন্য দিকগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে না। আসামিদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেই মামলার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, কারাগার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ১০ দিনের মাথায় ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে। যারা মাদক সেবন করেন, তাদের প্রস্রাবে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আরও কম সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে ভালো হতো।
তিনি বলেন, সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে তারা মাদকে আসক্ত কি না, তা বোঝা যেত। পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া যায়নি বলে তারা মাদকাসক্ত নন—এমনটা বলা যায় না। আবার ১০ দিন পর পরীক্ষা করায় তারা মাদকাসক্ত ছিলেন না, সেটিও বলা যাবে না।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, ডোপ টেস্টে তাদের ফলাফল নেগেটিভ এসেছে।
গত ২২ আগস্ট মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতি রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। ঘটনার পর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানায়।
৮ দিন আগে
রংপুরে চারজনকে হত্যাকাণ্ডে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস ত্রাণমন্ত্রীর
রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অধিকতর তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু।
তিনি বলেছেন, অন্য সব খুনের মতই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করবে সরকার।
রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণকে সজাগ থাকতে হবে, তবেই মাদক কারবারী ও সেবনকারীদের অপরাধ কমে আসবে।
তিনি বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক। এ ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। মাদকাসক্ত হয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই ওই বাড়িতে গিয়ে গণপতি চক্রবর্তীকে বিরক্ত করতেন। তাদের বাধা দিতে গিয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুলিশ মূল দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্তমান সরকার এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। রামিসা হত্যার ঘটনায় দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং এর বিচারকাজও শেষ হয়েছে।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আসাদুল হাবীব দুলু বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাই এ ঘটনায় আর সন্দেহের কিছু নেই।
এ সময় রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু ও রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় ও বাধা দেওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা দুজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই ঘটনায় দুজন সাক্ষীও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
৮ দিন আগে
রংপুরে ৪ খুন: মুচলেকা নিয়ে সিদ্ধার্থের বাবা-ভাইকে ছাড়ল ডিবি, নির্যাতনের অভিযোগ
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা ও ভাইকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে ডিবি পুলিশ। তবে ডিবির বিরুদ্ধে তাদের নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর সেন্ট্রাল রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাস সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।
এর আগে, গতকাল (শনিবার) বিকেলের দিকে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, ‘হত্যার ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানতে চেয়েছে পুলিশ। আমরা যতটুকু মিডিয়ায় বলেছি, ততটুকুই পুলিশকে জানিয়েছি।’
রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘বিকালে সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস এবং ভাই পার্থ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। যেহেতু পুলিশ তাদের এনেছিল ফলে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
তবে একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সিদ্ধার্থের ভাই পার্থ দাস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বের হচ্ছেন। তার স্বজনদের অভিযোগ, পার্থকে সুস্থ অবস্থায় ধরে নিয়ে গেল ডিবি আর এখন তিনি খুড়িয়ে খুড়িয়ে বের হয়ে এসেছেন।
নির্যাতনের ব্যাপারে ডিবির পক্ষ থেকে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি।
গত শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়া পাড়ার তালাবদ্ধ বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় পরের দিন রবিবার ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন। এ ঘটনায় সীমান্ত ও বিদ্যুৎ দাস নামে দুইজন সাক্ষীও আদালতের মাধ্যমে জবানবন্দি দেন।
৯ দিন আগে
চার খুনের রহস্য না কাটতেই অটোচালককে গলা কেটে হত্যা, আতঙ্কে রংপুরবাসী
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন না হতেই গলাকাটা অবস্থায় এক অটোচালকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জেলাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে গজঘণ্টা শান্তিপাড়া এলাকায় একটি বটগাছের নিচ থেকে মুখলেসুর রহমান (৬০) নামে ওই অটোরিকশা-চালকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মুখলেসুর রহমান গঙ্গাচড়া উপজেলার নবনীদাস গ্রামের মৃত হামিদুর রহমানের ছেলে ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শান্তিপাড়া এলাকায় নির্জন স্থানে বটগাছের নিচে মুখলেসুর রহমানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় এক যুবক চিৎকার করে ওঠেন। পরে আশপাশের লোকজন সেখানে জড়ো হয়ে পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ উদ্ধার করেন।
ঘটনাস্থলে মুখলেসুরের অটোরিকশাটি পাওয়া যায়নি। পুলিশ ধারণা করছে, অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। রিকশাটি উদ্ধারে এবং হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
নিহতের ভাতিজা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, মুখলেসুর গত ২০-২৫ বছর ধরে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি।
গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর সবুর বলেন, মুখলেসুরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
৪ খুনের আসামির পক্ষে লড়বে না রংপুর আইনজীবী সমিতি
এদিকে, রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে আইনজীবী সমিতি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা নিকৃষ্টতম। আইনজীবী সমিতি এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রয়েছে।
১০ দিন আগে
রংপুরে ৪ খুন: পুলিশের নতুন বয়ান—‘দিনের আলোয় খোলা ছাদেই খুন হন গণপতি পরিবার’
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বয়ান, তদন্ত ঘিরে নানা প্রশ্নের মধ্যে ফের নতুন তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
আদালতে আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, ঘটনার দিন (শুক্রবার) সকালে গণপতি চক্রবর্তী তার বাড়ির ছাদে হাঁটতে গেলে সেখানে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে দেখে ফেলেন এবং ধমক দেন। এরপর ছাদেই তাকে হত্যা করা হয়। শব্দ পেয়ে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাদেরও হত্যা করা হয়। পরে স্ত্রী-মেয়ের মরদেহ টেনে-হিঁচড়ে ছাদের সিঁড়ির কাছে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে এক ব্রিফিংয়ে আদালতের বরাতে এসব কথা জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
তিনি বলেন, আসামিদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন কিছু তথ্য যুক্ত হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে যাওয়ার কারণ ছিল সেখানে ইয়াবা সেবনের সুবিধা। তার ভাষ্যে, ‘বাসার ছাদে গিয়েছিল। এর কারণ হলো যে দেবুদের বাসার ছাদ ফাঁকা, সেখানে বাতাস আছে। ইয়াবা সেবন করতে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, সেটা বাতাসে না থাকলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। আর গণপতি স্যারের বাসার ছাদে ওয়াল (দেওয়াল) রয়েছে, যে ওয়ালের ফাঁকে বাইরে থেকে দেখা যায় না।’
কমিশনার আরও বলেন, ‘বাসার ছাদে এরা পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। তারা খেয়াল করেনি যে ভোরের আলো ফুটেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেই রাতে তারা দুইজনে আটটা ইয়াবা সেবন করে। এটা সিদ্ধার্থের জবানবন্দি। জীবনে কখনও তারা এত বেশি ইয়াবা সেবন করে নাই। সর্বোচ্চ দুইটা ইয়াবা একসঙ্গে সেবন করেছিল।’
মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘সকালে গণপতি স্যার ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখে ফেলেন। দেখে ফেলে ধমক দেন এবং জোরে জোরে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ তখন তাদের মাথা কাজ করছিল না। আত্মসম্মানের ভয়ে মুগ্ধ দাস এবং সিদ্ধার্থ দাস গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান মেরে গণপতিকে মেরে ফেলেন।’
মেয়ে ও স্ত্রীকে হত্যার বর্ণনায় পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘স্যারের মরদেহ টান দিয়ে ঢেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সম্ভবত স্যারের স্ত্রী এবং মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে চলে আসে। তাদের দেখে চিল্লাতে লাগলে মুগ্ধর হাতে স্যারের গামছা ছিল, সেই গামছা দিয়ে স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরে আর সিদ্ধার্থ দাস স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরে। একহাতে মেয়ের গলা চেপে ধরে, আরেকহাতে মুখ চেপে ধরে। মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীকে মারার পর সেই গামছা দিয়ে আবার দুইজনে একসঙ্গে মেয়ের গলায় পেঁচায়। তাতে মেয়ে না মরলে পাশে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে এসে মেয়েটার গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেয়।’
এরপর আসামিরা গণপতির ঘরে ঢুকলে তার ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায় বলে জানান পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাটা সিদ্ধার্থকে দেখে বলে, সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন? দেবুদের বাসার কেউ শব্দ শুনে টের পেয়ে যায় কি না এই ভয়ে বাচ্চাটাকে তারা কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মেরে ফেলে।’
পুলিশ কমিশনার জানান, এর আগে পুলিশ যে তথ্য দিয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটির ওপর হামলা করা হয়। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থের বক্তব্যে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে তাকে দেখে ফেলার বিষয়টি এসেছে।
মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও দুটি বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রথমত, সিদ্ধার্থ দাসের জবানবন্দি অনুযায়ী জানা গেছে, নিহত পরিবারটি তার পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিল। সম্ভবত একটু বেশি মূল্যে কেনা ওই জমির টাকা সব অংশীদার বা শরিকরা আনুপাতিক হারে সমানভাবে পায়নি। এই অর্থ বণ্টন নিয়ে শরিকদের মনে কোনো ক্ষোভ ছিল কিনা, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ব্যবধানের বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। আবদুল মাবুদ বলেন, মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ মানুষ দাস সম্প্রদায়ের হলেও নিহত গণপতির পরিবার ছিল ব্রাহ্মণ। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ বা সাধারণ মেলামেশা থাকলেও একে অপরের বাড়িতে আসা-যাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা ছিল না। এই সামাজিক দূরত্বের কারণেও কারও মনে কোনো ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করতে থাকলেও কোনো উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে যান পুলিশ কমিশনার।
এর আগে, পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে শব্দ পেয়ে ছাদে উঠে ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় খুন হন গণপতি। মা ও মেয়েকে সিঁড়িতে খুন করা হয়েছিল। এরপর মামলার এজাহার, আলামত ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ ঘটনাটি ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
গত শনিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা হয় এবং থানা থেকে তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
১১ দিন আগে
কোটি টাকার ইজারা দিয়েও চিলমারী নদীবন্দরে নেই প্রত্যাশিত যাত্রীসেবা
হাজারো যাত্রীর পদচারণায় প্রতিদিন মুখর থাকে কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চিলমারী নদীবন্দর। রৌমারী, রাজীবপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের নৌপথে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ঘাট এটি। তবে দীর্ঘদিনেও এখানে নিশ্চিত হয়নি ন্যূনতম যাত্রীসেবা। নেই যাত্রীছাউনি, গণশৌচাগার কিংবা পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নারী, শিশু ও বয়স্কদের।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত চিলমারী নদীবন্দর একসময় দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এর জৌলুস কিছুটা কমলেও গুরুত্ব কমেনি একটুও। প্রতিদিন রৌমারী, রাজীবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নৌপথে যাতায়াতের জন্য এই ঘাট ব্যবহার করেন।
সরেজমিনে ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নৌকার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন। তীব্র রোদ কিংবা বৃষ্টিতে তাদের জন্য নিরাপদ কোনো অপেক্ষালয় নেই। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অসুস্থ, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে।
শুধু যাত্রীছাউনির অভাবই নয়, চিলমারী নদীবন্দরে কোনো গণশৌচাগারও নেই। রৌমারী কিংবা রাজীবপুরের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে দুই-তিন ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে ঘাটে আসা যাত্রীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ হয় সবচেয়ে বেশি। প্রয়োজনের সময় অনেককে বাধ্য হয়ে আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। আবার কেউ কেউ লোকলজ্জা এড়িয়ে খোলা জায়গায় শৌচকর্ম সারতে বাধ্য হচ্ছেন।
রৌমারী উপজেলা থেকে আসা বেলাল হোসেন বলেন, ‘অনেক দূর থেকে নৌকায় করে আসি। ঘাটে এসে বসার বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কোনো টয়লেট নেই। নারীদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টের। এত বড় ঘাটে অন্তত একটি গণশৌচাগার থাকা উচিত।’
একই উপজেলার শাহারিয়ার নাজিম বলেন, ‘নৌকার জন্য অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের নিয়ে খুব কষ্ট হয়। যাত্রীদের জন্য দ্রুত ছাউনি ও বসার ব্যবস্থা করা দরকার।’
ঘাট-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চিলমারী নদীবন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০টি নৌকা চলাচল করে। প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই ঘাট দিয়ে যাতায়াত করেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল থাকলেও পর্যাপ্ত আসন, সুপেয় পানি কিংবা শৌচাগারের সুবিধা নেই।
চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি থেকে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হলেও যাত্রীসেবায় কোনো দৃশ্যমান উন্নতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবছর ঘাট থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হচ্ছে। অথচ যাত্রীদের বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই, পানির ব্যবস্থা নেই। এত বড় একটি ঘাটে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
এদিকে, চিলমারী নদীবন্দর উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্পের কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৪ শতাংশ বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে চিলমারী নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, আলাদাভাবে গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত আপাতত নেই। তবে প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেটির কাজ শেষ হলে টার্মিনালটি চালু করা হবে এবং তখন যাত্রীরা সব সুবিধা পাবেন।
ঈদের আগেই টার্মিনালটি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুর হাসান বলেন, ‘চিলমারী নদীবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’
১২ দিন আগে
চুরি দেখে ফেলায় কিশোরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টা, যুবক আটক
রংপুর নগরীর পূর্ব শালবন শিক্ষাঙ্গন এলাকায় গভীর রাতে চুরি করতে ঢুকে এক কিশোরীকে ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা মোহাম্মদ আশিক (২২) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশে দিয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দিবাগত রাত আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। আশিক তাঁতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে পূর্ব শালবনে ভাড়া থাকেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, রাতে ভেন্টিলেটর (ঘুলঘুলি) দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন অভিযুক্ত আশিক। এরপর তিনি ঘরের কোণে থাকা কাপড় রাখার একটি বড় ঝুড়ির ভেতরে লুকিয়ে থাকেন। ওই পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে পড়লে তিনি বাইরে বের হন। এ সময় কিশোরী বিষয়টি টের পেয়ে জেগে উঠলে আশিক তার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে সজোরে টান দেন।
স্থানীয় মুসলিম উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজার রহমান জানান, ফজরের নামাজে যাওয়ার সময় দেখি চোর ধরা পড়েছে। মেয়েটা টের পেয়ে উঠে দাঁড়ালে ওই ছেলে ওড়না দিয়ে গলায় প্যাঁচ দিয়ে টান দেয়। মেয়েটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে যুবককে ধরে ফেলেন। পরে প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যরা ওই যুবককে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, চুরি করতে ঘরে ঢোকার পর কিশোরী তাকে দেখে ফেলায় শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত আশিক বর্তমানে পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’
এর আগে, নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন করে ঘরের ভেতরে ঢুকে এই হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
১২ দিন আগে
রংপুরে ৪ খুন: আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত, আসামিদের সঙ্গে মিলেছে বর্ণনা
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামের এক যুবক। তিনি এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান দুই আসামির বন্ধু।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সাক্ষী সীমান্তের বর্ণনায় ইয়াবা সেবনের বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা যে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া সীমান্ত চন্দ্র দাস নগরের মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু এবং নগরের একটি মার্কেটে কাপড়ের দোকানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, ‘সাক্ষী হিসেবে সীমান্ত তার বাবার সঙ্গে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বিচারক ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।’
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত তার জবানবন্দিতে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে মিলেছে। আসামিরা তার বাড়িতে ইয়াবা সেবনের যে তথ্য দিয়েছিলেন, সীমান্তও আদালতে একই কথা জানিয়েছেন।
এর আগে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তারের পর গেল রবিবার সংবাদ সম্মেলনে আরএমপি কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই দুই আসামি সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
এদিকে, আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হবে কি না—এ প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, ‘ডোপ টেস্টের জন্য সোমবার সকালে ডকেট পেয়েছি। ইতোমধ্যে ডোপ টেস্টের জন্য আবেদন করেছি। বুধবার (আজ) তা চলে যাবে।’
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য, তথ্যে অমিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খোঁজা হবে। এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে যতগুলো প্রশ্ন আছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার উত্তর খোঁজা হবে। এ মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গেল রবিবার আরএমপির কোতোয়ালি থানায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই দিন রাতে গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এ মামলায় প্রথমে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জিকে তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়। পরদিন সোমবার মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা-পুলিশের কাছ থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। পরে গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এরপর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ এখনও শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর ধরে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন গণপতি।
গেল শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামের এক যুবক। তিনি এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান দুই আসামির বন্ধু।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা যে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে মামলার এজহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ঘটনার প্রকৃত সত্যতা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এদিকে, গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় সীমান্তের। পরে স্বাক্ষীকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় রবিবার ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়।
ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।
১৩ দিন আগে
ভারী যান চলাচল বন্ধ, পুরোপুরি কাজ আসছে না ১২৪ কোটির দ্বিতীয় তিস্তা সেতু
বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের চার উপজেলার সঙ্গে বিভাগীয় নগরী রংপুরের যোগাযোগ সহজ করতে তিস্তা নদীর ওপর ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘দ্বিতীয় তিস্তা সেতু’। সেতুটির সঙ্গে রংপুর নগরীকে যুক্ত করতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কও। কিন্তু সেতু ও সড়ক নির্মাণের পরও এর সুফল পাচ্ছে না পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলো।
সেতুর ওপর দিয়ে বাস ও ট্রাকসহ ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী যানকে লালমনিরহাট জেলা সদর হয়ে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে পরিবহন খরচ ও সময়, যার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ ভোক্তার ওপরও।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা এলাকার সঙ্গে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরকে যুক্ত করা ৮৫০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে রংপুরের যোগাযোগ সহজ করাই ছিল এই সেতু নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। কিন্তু ভারী যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন প্রত্যাশিত কাজে আসছে না।
লালমনিরহাট এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সেতুটির উদ্বোধন করা হলেও নাজুক সড়কের কারণে প্রথম চার বছর ভারী যান চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। পরে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সব ধরনের যানবাহনের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সদস্যরা ভারী যান চলাচল বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।
আন্দোলনের মুখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে সেতুর উত্তর প্রান্তে প্রতিবন্ধক খুঁটি বসিয়ে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, আঞ্চলিক মহাসড়কটি পুনর্নির্মাণ করে ভারী যান চলাচলের উপযোগী না করা পর্যন্ত প্রতিবন্ধক বহাল থাকবে। তা না হলে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপে সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে ভারী যান চলাচল বন্ধের প্রায় দেড় বছর পার হলেও সড়কটি পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সড়ক নির্মাণের পরও কেন বন্ধ ভারী যান চলাচল?
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর কার্যালয় জানায়, প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বুড়িরহাট থেকে শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কটির নির্মাণকাজ ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হয়।
দরপত্র অনুযায়ী, কার্পেটিং করা পাকা সড়কটির প্রস্থ ১৮ ফুট। এর দুই পাশে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট ইট বিছানো এবং আরও ৩ ফুট করে দুই পাশে মোট ৬ ফুট মাটি বিছানোসহ সড়কটি প্রশস্ত করা হয়।
নির্মাণের পর ভারত থেকে আমদানি করা পাথরসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ভারী ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস চলাচলও শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরে সড়কের দুই পাশের ইট ও মাটি ধসে পড়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর আবারও ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির প্রভাব ও সিন্ডিকেটের কারণেও সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, সড়কটি ভারী যান চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করছেন।
অতিরিক্ত পথে বাড়ছে পরিবহন খরচ
সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর এলাকায় সংযোগ সড়কের ওপর আড়াআড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে প্রতিবন্ধক তৈরি করা হয়েছে। ফলে ওই সড়ক দিয়ে বাস বা ট্রাক চলাচল করতে পারছে না।
পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস কোনোরকমে চলাচল করলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসগুলোকে কাকিনা বাজার হয়ে লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ী ও ট্রাক-ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, বুড়িমারী থেকে রংপুরের দূরত্ব মহিপুরের দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ব্যবহার করলে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। কিন্তু বর্তমানে লালমনিরহাট শহর হয়ে রংপুরে যেতে পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুরে আসতে একটি ট্রাকের ভাড়া পড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অথচ দ্বিতীয় তিস্তা সেতু দিয়ে এলে ভাড়া পড়ত ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। অতিরিক্ত পথের কারণে ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের প্রায় দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হচ্ছে।
ট্রাকচালক সাকিব বলেন, সড়কটি বন্ধ থাকায় তাদের ভোগান্তি বেড়েছে। সবার দিক বিবেচনা করে সড়কটি খুলে দেওয়া উচিত।
রংপুর নগরীর চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়ী রাজ মাহমুদ বলেন, শতকোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও সেটি ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দ্রুত ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া দরকার।
সেতুটি কি শুধু ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য?
রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, তারা আশা করেছিলেন মহিপুর সেতু হলে শ্রমিকদের কষ্ট কমবে। কিন্তু সেতু হওয়ার পরও তারা এর সুবিধা পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, ‘সেতুটি কি শুধু পথচারী, ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য করা হয়েছে? ভারী যানবাহন কেন বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই আমাদের স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। জনস্বার্থ ও শ্রমিক-মালিকদের সুবিধার্থে এটি অবিলম্বে খুলে দেওয়া উচিত।’
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, হাতীবান্ধা-রংপুর রুটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দরিদ্র মানুষ থ্রি-হুইলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাইওয়েতে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা বিকল্প এই রুট ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পথটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তাদের সমস্যা তৈরি করেন। এর আগেও সড়কটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। তখন বাস-ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক ভেঙে যায় এবং ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করা হলে বাস-ট্রাক চলায় আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
এই পরিবহন শ্রমিক নেতার দাবি, বর্তমান অবস্থায় ভারী যান চলাচল শুরু হলে পাঁচ থানার হাজার হাজার রোগী যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়বেন। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ভারী যানবাহন বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে এলজিইডি লালমনিরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওছার আলম বলেন, আন্দোলনের পর বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতু বা সড়কের মূল কাঠামোতে কোনো সমস্যা নেই।
ফলে, একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেতু ও সংযোগ সড়ক পড়ে রয়েছে ভারী যান চলাচলের বাইরে, অন্যদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্যবাহী যানকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে রংপুরে যেতে হচ্ছে। এতে যে উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ও আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
১৩ দিন আগে