পৌষ সংক্রান্তি
পৌষ সংক্রান্তিতে নড়াইলে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড়, দর্শনার্থীর ঢল
টগবগিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটছে গ্রামের একঝাঁক তরুণ। প্রথম পুরস্কার নেওয়ার আশায় অংশগ্রহণকারীদের চেষ্টার যেন কোনো কমতি নেই। যে যেভাবে পারছে তার ঘোড়া নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই ঘোড়দৌড়ের মাধ্যমে চলে তাদের প্রতিযোগিতা।
সম্প্রতি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার দেখা মিলেছে নড়াইল সদর উপজেলা বিছালী চাকই গ্রামে। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেলে এই ঘোড়দৌড়ের আয়োজন করেন বিছালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিমায়েত হুসাইন ফারুক।
দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে পৌষ সংক্রান্তি উদ্যাপন উপলক্ষে প্রতি বছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ঘৌড়দৌড় উপলক্ষে একপ্রকার মেলা বসে সেখানে। বাহারি জিনিসের পসরা সাজিয়ে দোকান নিয়ে বসেন ক্ষুদ্র দোকানিরা। ঘোড়দৌড় উপভোগ করতে মাঠের দুই পাশে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার হাজারো নারী-পুরুষ ভিড় করেন। এবারের প্রতিযোগিতায় মোট ১২টি ঘোড়া অংশ নেয়।
যশোরের অভয়নগর থেকে ঘোড়দৌড় দেখতে আসা মুহিম বলেন, আমি প্রতি বছর এই দিনের জন্য অপেক্ষা করি। এ প্রতিযোগিতা হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
বিছালী গ্রামের রেজাউল ইসলাম জসিম বলেন, কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামবাংলার অন্যতম ঐতিহ্য ছিল ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা যা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে নড়াইলের বিছালী ইউনিয়নের চাকই এলাকায় এখনও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা ও পৌষমেলা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি তিন দিনব্যাপী পৌষমেলার আয়োজন করা হয়েছে।
আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় জারিগান এবং আগামীকাল শুক্রবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষা, বিনোদন ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে এ আয়োজনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
বিছালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিমায়েত হুসাইন ফারুক বলেন, চাকই রুখালী গ্রামের ঘোড়দৌড় প্রায় ৪ থেকে ৫ শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। পৌষ মাসের শেষের দিন প্রতি বছর এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকে রয়েছে। আমরা যতদিন এই জনপদে আছি ততদিন এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে এটিকে আরও বড় করে করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। রাস্তার দৌড়ানোর যে অংশ, সেটিও আমি সংস্কার করেছি যাতে এই অঞ্চলে উৎসবটি টিকে থাকে। লাখো মানুষের পদচারণায় আমাদের উৎসব সফল হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটির সদস্য মোরাদ হোসেন শেখ বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন বয়সের প্রতিযোগীরা অংশ নিয়েছেন। এ বছর নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সদর বিএনপি সভাপতি মুস্তাফিজুর রহমান আলেক, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. কাজী হাসরাত, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম মোল্যা, মো. আমিনুল ইসলাম, মাজাহারুল ইসলাম, পারভিন বেগম, মুরাদ হোসেন প্রমুখ।
১২ দিন আগে
এক বাঘাইড় মাছের দাম দেড় লাখ
পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পইলের মাছের মেলা।
সোমবার (১৫ জানুয়ারি) দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের মাছ উঠেছে মেলায়।
তবে আব্দুল খালেকের বাঘাইড় মাছটিই মেলার প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠেছে। ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের বৃহৎ এ মাছটি দাম চাওয়া হয়েছে দেড় লাখ টাকা।
আরও পড়ুন: বাগেরহাটে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ৮ হাজার মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত
বিক্রেতা আব্দুল খালেক জানান, পইল মাছের মেলায় বিক্রির জন্য সুরমা নদী থেকে তিনি এই বিশাল বাঘাইড় মাছটি সংগ্রহ করেছেন। মাছটি তরতাজা ও খেতে ভালো লাগবে। দেড় লাখ টাকা চাইলেও এক লাখ হলেও তিনি মাছটি বিক্রি করবেন।
মেলায় আসা ক্রেতাদের আগ্রহ শেষ পর্যন্ত মাছটি কত দিয়ে বিক্রি হয়।
শাহজাহান মিয়া নামে অপর বিক্রেতা জানান, তিনি ২৬ কেজি ওজনের একটি কাতলাসহ বেশ বড় বড় মাছ নিয়ে মেলায় এসেছেন। বড় কাতলাটির দাম তিনি চাইছেন ৬০ হাজার টাকা। ৪০ হাজার টাকা পেলে তিনি সেটি বিক্রি করে দেবেন।
জিলু মিয়া নামে আরও এক মাছ বিক্রেতা বলেন, এখনও কেনা বেচা তেমন হয়নি তবে রাতের বেলায় বাড়বে।
যুক্তরাজ্য থেকে আসা সদর উপজেলার আলাপুর গ্রামের কামাল আহমেদ মাছের মূল্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মেলার সময় প্রতি বছর দেশে আসি। আমরা তো মাছ কিনতে এসেছি। মূল্য বেশি হাঁকা হচ্ছে। যে কারণে অনেক মাছ অবিক্রিত থেকে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে সহায়তা দিতে রাষ্ট্রপতির আহ্বান
এদিকে সরেজমিনে মেলা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই হবিগঞ্জের সদর উপজেলার পইল গ্রামের মাঠে ক্রেতা-বিক্রেতারা ভিড় জমিয়েছেন। প্রায় ২৫০ মৎস্য বিক্রেতার পাশাপাশি হাজার হাজার ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা মেলায় ভিড় জমিয়েছেন। এবারের মেলায় বোয়াল ও আইড় মাছ সবচেয়ে বেশি উঠেছে।
এছাড়াও বাঘাইড়, রুই, কাতল, চিতল, গজার, গ্রাস কার্প, মৃগেল, সিলভার কার্প, ব্রিগেড, পোয়া, টেংরা, পুটি, শিং, কই, শোল, বাইম, চাপিলা, চান্দা, কাকিয়াসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।
মাছের মেলা ঘিরে কৃষি, গৃহস্থালি, ভোগ্যপণ্য, আখ ও শিশুদের খেলনা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাই মেলায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের ব্যাপক সমাগম দেখা গেছে। এ মেলা নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবে ধারণ করেন পইল গ্রামসহ এর আশপাশের লোকজন।
আরও পড়ুন: মাছের আঁশ: রপ্তানি বৈচিত্র্যে আশা জাগানো নতুন পণ্য
পইল গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি শেখ মহরম আলী বলেন, এই মেলা মানেই মিলনমেলা। এ মেলা ঐতিহাসিক। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে এই মেলায় দেশ-বিদেশ থেকে বড় বড় মাছ আসে। এলাকাবাসী এই মেলায় আনন্দ করেন। এই উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। যে কারণে এই কয়দিন আমরা আনন্দের সঙ্গে কাটাই।
এ ব্যাপারে পইল বাজার কমিটির সভাপতি ও পইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঈনুল হক আরিফ জানান, পইল মাছের মেলা আমাদের জন্য ঐতিহ্যের একটি মেলা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বাগ্মী নেতা বিপিন চন্দ্র পালের জন্মভূমি পইল গ্রামে প্রতি বছর এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
আরও পড়ুন: শরীয়তপুরে মাছের ঘেরে মিলল ৮ ফুট কুমির
৭৪৩ দিন আগে