তেল সরবরাহ
সিলেটে ডিপো থেকেই কমেছে তেল সরবরাহ, সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলো
সিলেটে জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। পেট্রোল পাম্পগুলোতে এখনও চাহিদামাফিক পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্কটের কারণে কিছু পেট্রোল পাম্প জ্বালানি তেল বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছে।
সিলেটের পেট্রোল পাম্প ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ডিপো থেকে তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণে সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদামাফিক সরবরাহ পেলে সংকট কেটে যাবে।
রবিবার (৮ মার্চ) বিকেলে সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন থেকে সীমিত পরিমাণে জ্বালানি পাচ্ছেন যানবাহন চালকরা। আবার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকার কথা বলে বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
সিলেট নগরীর বন্দরবাজার-সংলগ্ন জালাবাদ পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে। সে সময় ওই পাম্পে মোটরসাইকেল নিয়ে তেল নিতে আসেন বিকাশের মার্চেন্ট এজেন্ট মিলন (২৮)। তিনি বলেন, শনিবার রাত থেকে তেল পাচ্ছি না, ডিউটি করব কীভাবে, আর যাতায়াত করব কীভাবে?
সন্ধ্যায় নগরীর পাঠানটুলার নর্থ ইস্ট পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, এই পাাম্পে সীমিত আকারে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
নগরীর আম্বরখানার জালালাবাদ পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে ২০০ বা ৩০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে অকটেন নিতে চাইলেও অকটেন নেই বলে জানান পাম্পের কর্মচারীরা।
এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে জালালাবাদ পাম্পের ব্যবস্থাপক বা মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি।
সিলেটের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এ অবস্থা চলছে গত শক্রবার থেকেই। ফিলিং স্টেশন মালিকরা জানান, গত বৃহস্পতিবার গ্রাহকদের তেল কেনার চাপ বেড়ে যাওয়ায় তেলে ঘাটতি দেখা দেয়। এ অবস্থায় গতকাল দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ফিলিং স্টেশন ব্যাবসায়ী সমিতির নেতারা।
বৈঠক শেষে সমিতির নেতাদের একজন জানান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নতুন নিয়মের নির্দেশনায় সিলেটের অনেক স্টেশনে তেল সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। আাশা করি, সোমবারের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
বৈঠকে তেলের সরবরাহ নিশ্চিতসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি হস্তান্তর করে ফিলিং স্টেশন ব্যবসায়ী নেতারা।
বৈঠক শেষে সিলেট পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াসাদ আজিম বলেন, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট নেই। দেশেই এগুলোর চাহিদামাফিক উৎপাদন হয়। কেবল ডিজেল আমদানি করতে হয়। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে সিলেটে সংকট দেখা দিয়েছে। ডিপো থেকে চাহিদামাফিক সরবরাহ মিলছে না।
তিনি বলেন, আজকে আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।
সিলেটের ফিলিং স্টেশন ও পেট্রোল পাম্প ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের বৈঠকের সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরকার আগেই ভেবেছে, যার কারণে একটু সমস্যা হয়েছে। মানুষ সম্ভাব্য সঙ্কটের কথা শুনেই ২ লিটারের জায়গায় ১০ লিটার কিনে নিচ্ছে বলে এ কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের সিলেটের ডিপোগুলো থেকে যেভাবে তেল সাপ্লাই দেওয়ার কথা, তা এখন চার ভাগের এক ভাগে চলে এসেছে। এটি মারাত্মক একটি বির্পযয়।
অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ না করার অনুরোধ জানিয়ে জনগণের উদ্দেশে এমদাদ হোসেন বলেন, ইতোমধ্যে জাহাজ আসছে। সরকার ডিজেল পেট্রলের দাম বাড়াচ্ছে না। হঠাৎ সারা দেশে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সিলেটে এই সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আপনারা দয়া করে বাড়তি তেল কিনে কৃত্রিম সংকট করবেন না।
সিলেট জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, তেলের ঘাটতি এখনও শুরু হয়নি দেশে। যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। তবে সম্ভাব্য ঘাটতির কথা বিবেচনায় রেখে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে প্রশাসন। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে, সিলেটের এই সংকট আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যে সমাধান হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার (৬ মার্চ) বিপিসির নির্দেশনায় জ্বালানি তেল সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লিটার তেল দেওয়া হবে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ ও মাইক্রোবাসের জন্য দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া পিকআপ বা স্থানীয় বাস প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাকের জন্য দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২৮ দিন আগে
জ্বালানি তেল না থাকায় ফাঁকা রংপুরের ডিপো
চট্টগ্রাম থেকে রংপুরের তিনটি ডিপোতে নিয়মিত তেল সরবরাহ না হওয়ায় রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকটই এর প্রধান কারণ।
রংপুরে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ডিপো থেকে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। গত আগস্ট মাসে মাসিক চাহিদা আড়াই কোটি লিটার থাকলেও সরবরাহ হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ লিটার। গত ছয় মাস ধরেই চলছে এমন পরিস্থিতি। ফলে তিন ডিপোর অধীনে থাকা পেট্রলপাম্প মালিক ও এজেন্টদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্ট অ্যান্ড পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, রেলওয়ের পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে তেলবাহী ওয়াগন সময়মতো ছাড়তে পারছে না। এ কারণে রংপুর ডিপোগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।
রংপুর জেলা পেট্রোলিয়াম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আজিজুর ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘পাঁচ মাস ধরে রংপুরের ডিপোতে চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল আসছে। রংপুর থেকে আমরা তেল পাচ্ছি না। আমরা চাই, আগের মতো নিয়মিত এখানে তেল সরবরাহ হোক। এভাবে তেল আসা বন্ধ থাকলে কৃষি, কলকারখানা থেকে শুরু করে সব খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।’
রংপুর নগরীর ফিলিং স্টেশনের মালিক মঞ্জুর আজাদ বলেন, রংপুর ডিপোতে তেল না থাকায় পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ী থেকে তেল আনতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ দ্বিগুণ হচ্ছে এবং সিরিয়াল মেনে তেল সংগ্রহ করতে দু–তিন দিন সময় লাগছে। এতে শুধু ব্যবসায়ী নয়; কৃষি ও পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নগরীর চারতলা মোড় এলাকার মিজান ফিলিং স্টেশনের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, ‘রংপুরের ডিপো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রেনের ওয়াগনে করে তেল না আসায় তেলের সংকট রয়েছে। আমরা চট্টগ্রাম, পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে তেল নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। এতে করে আমাদের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রংপুর ডিপো থেকে তেল পেলে খরচ অনেক কম হতো।’
আরও পড়ুন: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশের যথাযথ স্থানান্তরের আহ্বান জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের
এদিকে, জ্বালানি তেল পর্যাপ্ত না আসায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এই খাতের শ্রমিকেরা। এ প্রসঙ্গে রংপুর ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আলাউল মিয়া লাল্লু বলেন, ‘ডিপোতে তেল না থাকায় ছয় শতাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের জীবন এখন সংকটে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। কোনো কাজ হয়নি। দ্রুত নিয়মিত সরবরাহ না হলে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।’
রংপুরে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর এবং রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এতেও কোনো কাজ হয়নি।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপোর ইনচার্জ জাকির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘চট্টগ্রামে আমাদের পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। সেখান থেকে তেল পাঠাতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে, লোকোমোটিভ ইঞ্জিনের কারণে তেল পাঠাতে পারছে না। আমাদের মাসে ২৫ লাখ লিটার চাহিদা থাকলেও আমরা পাচ্ছি ৫ লাখ লিটার। এ সংকট নিরসনের জন্য হেড অফিস থেকে ডিজিএম, জিএম স্যাররা রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। রেল থেকে ইঞ্জিন সংকটের কথাই বলা হচ্ছে।’
পদ্মার পেট্রোলিয়াম ডিপোর ইনচার্জ আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দুটি ইঞ্জিন ছিল। আগে মাসে ৮ থেকে ১০ বার তেল আসত। দুটি থেকে একটি করল, তাতেও ৪ থেকে ৫ বার তেল আসত। কিন্তু সেই ইঞ্জিনও কেটে নিয়ে গেছে; যার কারণে এই গ্যাপ হয়েছে। রংপুরে তিন ডিপো মিলে প্রায় আড়াই কোটি লিটার তেলের চাহিদা। কিন্তু আমরা পাচ্ছি ৩০ লাখ লিটারের মতো।’
জ্বালানি তেল সংকটের কথা স্বীকার করে রংপুরের জেলা প্রশাসক রবিউল ফয়সাল বলেন, ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম থেকে তেল সরবরাহ বিঘ্ন হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
২১০ দিন আগে