২০২৬
শোকের আবহে নতুনের বারতা নিয়ে এসেছে ২০২৬
কালের পরিক্রমায় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি থেকে আরও একটি বছরের পাতা ছিঁড়ে গেল। শুরু হয়েছে নতুন একটি বছর, ২০২৬। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন বছরটি এমন এক সময়ে শুরু হলো, যখন শোকে বিহ্বল গোটা জাতি।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ‘আপোসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ পুরো দেশ। গতকালই লাখো মানুষের অশ্রু আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানো হলো। দেশে চলছে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, আর এর মধ্যেই নতুনের বার্তা নিয়ে উঁকি দিল নতুন বছরের নতুন সূর্য।
প্রতি বছর খ্রিস্টীয় সালকে বরণ করে নিতে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও আয়োজনের কমতি থাকে না। রাত ১২টায় নতুন বছর পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আতশবাজির ঝলকানিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে আঁধারে ঢাকা আকাশ। ফানুসের মলিন-মিষ্টি আলো দ্যুতি ছড়িয়ে যায় শত-সহস্র হৃদয়ে। বাজি আর পটকার কান ফাটানো শব্দে সদ্যজাত শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের নাভিশ্বাস উঠে যায়, নিদ্রাকাতর পাখপাখালি দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি করতে গিয়ে দেয় প্রাণ। ফানুসের আগুনে শীতের রাতে জ্বলে ওঠে কোনো কোনো বাসাবাড়ি; সর্বস্ব হারায় মানুষও।
তবে রাষ্ট্রীয় শোকের মাঝে ২০২৬ সালকে বরণ করে নিতে যথেষ্ট সংযমের পরিচয় দিয়েছে রাজধানী ঢাকাবাসী। আতশবাজির শব্দ থাকলেও তা অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম। পটকার শব্দও এবার তেমন শোনা যায়নি। তাছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনও এবার আড়ম্বরের সঙ্গে হয়নি।
রাষ্ট্র সংস্কারের নানা চেষ্টা, মব সন্ত্রাস, প্রাণঘাতী ভূমিকম্প, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মতো ঘটনার ভেতর দিয়ে বছর পেরিয়ে দেশ যখন বিজয়ের আনন্দে ডিসেম্বরে পদার্পণ করেছে, ঠিক সেই সময়ে, বিজয় দিবসের পর থেকেই একে একে আসতে থাকে শোক সংবাদ। আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে কয়েকদিন দেশ-বিদেশের চিকিৎসা নেওয়ার পরও মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় শরিফ ওসমান বিন হাদির। পরপারে পাড়ি জমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পাওয়া ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অন্যতম পাঞ্জেরির।
তরুণ এই নেতার আদর্শকে ধারণ করে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে চোখের জলে তাকে বিদায় জানাল বাংলাদেশ। এরপর এক বুক শোক নিয়েই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রস্তুতি চলছিল। ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমাদান শেষ হয়েছে। কিন্তু এরপর এলো সবচেয়ে বড় শোকের আঘাত। দীর্ঘদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ৩০ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন খালেদা জিয়া।
তার চলে যাওয়ায় দলতম নির্বিশেষে শোকে মুহ্যমান গোটা জাতি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদি শাসনের পর নতুন করে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই টালমাটাল সময়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ‘আপোসহীন’ এই নেত্রীর উপস্থিতি ছিল মাথায় ওপর ছায়া, নতুন হাঁটতে শেখা অদম্য শিশুর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকের মতো। সেই তার চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় বিশাল এক শূন্যতার সৃষ্টি করল, সেই শূন্যতা নেতৃত্বের শূন্যতার, ঝঞ্ঝাময় সময়ে একজন দক্ষ কাণ্ডারির অভাব।
তবে শোকের মাঝেও ২০২৬-এর পহেলা জানুয়ারি সকালে উঁকি দিয়েছে নতুন সূর্য। তাই নতুন বছরে আমাদের সব শোক কাটিয়ে উঠে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে ব্রতী হতে হবে। সকল জরা-জীর্ণতা, অবসাদ-বিষণ্নতা, আলস্য আর প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের লক্ষ্যের দিকে ছুটতে হবে। এই লক্ষ্য ব্যক্তির লক্ষ্য, এটি পারিবারিক, সামাজিক লক্ষ্য, এ লক্ষ্য রাষ্ট্রের, জাতি হিসেবে একটি সামগ্রিক লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে বছরের প্রথম দিন থেকেই মনোবল ফিরিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে; সমষ্টির লক্ষ্য অর্জনে সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে, পুরনো দ্বন্দ্ব ভুলে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজে নেমে পড়তে হবে।
২০২৬ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বছরই নয়, এই বছরের শুরুর ভাগেই রয়েছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, অংশগ্রহণমূলক আর উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের সূচনা হবে বছরের প্রারম্ভেই।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানা প্রতিকূলতা, সমস্যা পেরিয়ে আজ নতুন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতি। আগামীর বাংলাদেশ গতানুগতিক রীতিতেই চলবে নাকি নতুনভাবে গড়ে উঠবে, এই সময়টাই তা নির্ধারণ করে দেবে। তাই অদম্য প্রাণশক্তিতে জাতি আজ থেকেই তার নবগৌরবের ইতিহাস রচনার হালখাতা খুলুক—এই শুভকামনায় সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা!
৭ ঘণ্টা আগে