নির্বাচনি আমেজ
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনি আমেজ, চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে শেষ সময়ে জমে উঠেছে নির্বাচনি আমেজ। এতে চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনি উত্তাপ। শেষ মুহুর্তের প্রচার ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা; চষে বেড়াচ্ছেন শহর থেকে গ্রামে; হাট-বাজার ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে করছেন ভোট প্রার্থনা।
প্রার্থীরা নিজের বিজয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছেন নির্বাচনি কৌশল। বিজয়ের জন্য প্রার্থীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দেশে ও বিদেশে থাকা সমর্থকরাও প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করছেন।
জগন্নাথপুর প্রবাসী-অধ্যূষিত উপজেলা হওয়ায় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভূমিকা সব সময়ই থাকে। এবারের নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় ভোটারদের অধিকাংশ প্রবাসী স্বজনদের কথায় ভোট দিয়ে থাকেন। তবে এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে চলছে নতুন সমীকরণ।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় দলটির সমর্থকদের ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।
স্থানীয়রা জানান, এই অঞ্চল সব সময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি ছিল। এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত জাতীয় নেতা আবদুস সামাদ আজাদসহ আরও কয়েকজন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের পকিল্পনামন্ত্রী ছিলেন এম এ মান্নান। তাদের কারণে এ আসনটি মর্যাদার আসন বলে পরিচিতি পায়।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে এবারের নির্বাচনে মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন: ইসলামী ঐক্যজোট তথা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী (রিকশা), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন (তালা), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম (ঈগল), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুস্তাক আহমদ (দেওয়াল ঘড়ি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার (টেবিল ঘড়ি) ও হোসাইন আহমদ (ফুটবল)।
এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ, সৈয়দ তালহা আলম ও শেখ মুস্তাক আহমদ জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। অপরদিকে, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন, মাহফুজুর রহমান খালেদ তুষার ও হোসাইন আহমদ শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।
নির্বাচনে ভোট দেওয়ার হিসাব-নিকাশে সব সময়ই আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের আমল থেকে দীর্ঘকাল জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে এম এ মান্নানের আমল থেকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সংসদ সদস্য ছিলেন। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই এলাকায় আঞ্চলিকতার প্রভাব পড়ে থাকে।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ভোটারদের সঙ্গে পৃথকভাবে নির্বাচনি আলোচনা হয়। এসব আলোচনায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটার তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী জমিয়তে থাকতে হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। তিনি আবদুস সামাদ আজাদ ও এমএ মান্নানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে বিগত নির্বাচনে দল বদল করে ‘সোনালী আঁশ’ প্রতীকে নির্বাচন করায় তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী হওয়ায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি।
এছাড়া কয়ছর এম আহমদ জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা হলেও রাজনীতি করেছেন যুক্তরাজ্যে। তিনি তার ক্ষমতার দাপটে নিজ পছন্দের নেতা-কর্মীদের নিয়ে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি সাজিয়েছেন। ফলে বঞ্চিত নেতা-কর্মীরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তবুও নির্বাচনি আলোচনায় তিনি প্রথম সারিতে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
অপরদিকে ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন ‘বিশেষ এক ব্যক্তির’ ছত্রছায়ায় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া কয়ছর আহমদের বিরোধিতা করে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীই তাকে সমর্থন করছেন। শুধু তাই নয়, বিএনপি থেকে মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন প্রার্থীও তাদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে আনোয়ার হোসেনের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ‘তালা’ প্রতীকের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী।
এবি পার্টির সৈয়দ তালহা আলম বিগত জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়ে সবাইকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিলেন। আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন নির্বাচনি ফলাফলে। এর ফলে স্থানীয় রাজনীতিতে তার ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছিল বটে, কিন্তু সম্প্রতি দল বদল করায় তার সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। তবুও এবারের নির্বাচনে ব্যক্তি হিসেবে ভোটারদের পছন্দের তালিকায় থাকায় তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে অ্যাডভোকেট মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী, কয়ছর এম আহমদ, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন ও সৈয়দ তালহা আলমের মধ্যে জমে উঠেছে চতুর্মুখী লড়াই। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সচেতন মহল ও সাধারণ ভোটারদের মত অন্তত তা-ই।
৩ ঘণ্টা আগে