ইনসাইট ইন্টারন্যাশনাল
ভোট পড়তে পারে ৬৮ শতাংশ: ইনসাইট ইন্টারন্যাশনালের জরিপ
দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। এখন কেবলই ভোটের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা। উৎসবমুখর পরিবেশে আগামীকাল (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। তবে ভোটের মাঠে ভোটারদের উপস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিয়ে অনেকের মনে রয়েছে সংশয়।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসাইট ইন্টারন্যাশনাল দিয়েছে আশাব্যঞ্জক তথ্য। প্রতিষ্ঠানটির একটি জরিপ বলছে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে না থাকলেও ভোটার উপস্থিতির হার হতে পারে ৬৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।
মডেলভিত্তিক এই অনুমান বহুস্তরীয় বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে (এমআরপি) তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ২৪ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের এ জরিপে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন জেলার ২ হাজার ৪৩৪ জন ভোটার।
জরিপে জেলা পর্যায়ে ভোটার উপস্থিতির সম্ভাবনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ধরা পড়েছে। তুলনামূলক বেশি ভোটার জরিপে অংশ নেওয়া জেলাগুলোতে ভোটার উপস্থিতির পূর্বাভাস মোটামুটি স্থিতিশীল হলেও স্বল্প ভোটার অংশগ্রহণকারী জেলাগুলোতে অনিশ্চয়তা বেশি ধরা পড়েছে। উপস্থিতির হিসাবে শীর্ষে রয়েছে ফরিদপুর (৮৫.৫ শতাংশ), সাতক্ষীরা (৮০.৭ শতাংশ) এবং ঢাকা (৭২.২ শতাংশ)।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষক জাহিদ হাসান জানান, এই হার সরাসরি জরিপের মৌলিক সংখ্যা নয়, বরং বয়স, লিঙ্গ ও জেলা কাঠামো অনুযায়ী পরিসংখ্যানগত সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনসংখ্যা-স্তরের বিশ্লেষণধর্মী পূর্বাভাস।
গবেষণায় ভোটদানে আগ্রহ বৃদ্ধির সঙ্গে কয়েকটি সম্পর্কিত বিষয় পাওয়া গেছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির উপাত্ত বিশ্লেষক আরমান হোসেন। তিনি বলেন, তরুণ ও প্রথমবার হওয়া ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের আগ্রহ অধিক হারে লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ভোট দেওয়ার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ভোটদানের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে বলে জরিপের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দেখা গেছে, যারা আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে উপস্থিতির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি; বিপরীতে যারা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেননি বা অনুসরণ করেননি, তাদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ অপেক্ষাকৃত কম।
ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকির বিষয়টিও জরিপে স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে। নির্বাচনের দিন সহিংসতার আশঙ্কা ভোটদানে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে উঠে এসেছে এই গবেষণায়। যেসব উত্তরদাতা ভোটকেন্দ্রে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তাদের মধ্যে ভোটদানের ইচ্ছাও তুলনামূলক কম।
মডেলভিত্তিক পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় প্রতি ১০ জনে একজন উত্তরদাতা বলেছেন, ভোটের দিন নিজ ভোটার এলাকায় থাকা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন ভ্রমণ ব্যয়, কাজের চাপ, সময়ের অভাব ও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ের মতো কিছু বিষয়। শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এই আশঙ্কা ও অনীহা বেশি দেখা গেছে।
জরিপের গবেষকরা বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের চূড়ান্ত উপস্থিতি নির্ভর করবে মূলত তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়ের ওপর—একেকটি কেন্দ্রে বেশি সংখ্যক ভোটার দেখা যাচ্ছে কিনা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরাপদ পরিবেশ। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বেশি থাকলে অনিচ্ছুক ভোটাররাও ভোট দিতে যেতে উৎসাহিত হবে। আবার ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ নিরাপদ থাকলে ভোটারদের উপস্থিতিও বাড়বে।
ভোটারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়াতে গবেষণায় কয়েকটি বিষয় সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ভোটকেন্দ্রে দৃশ্যমান নিরাপত্তা জোরদার, ভোটার তথ্য প্রচার বৃদ্ধি এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ সহজ করতে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ ভোটার উপস্থিতি কেবল তাদের অংশগ্রহণের প্রতিফলন নয়; এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা ও জনগণের ম্যান্ডেটকেও শক্তিশালী করে।
রাত পোহালেই ঐতিহাসিক এক নির্বাচনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। তবে ইনসাইট ইন্টারন্যাশনালের এই জরিপ আরও একবার মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তা ও আস্থার প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কত ভোটার তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করবেন।
২ দিন আগে