জিএইউ সয়াবিন
খরাপ্রবণ জমিতে আশার বীজ: গাকৃবির ‘জিএইউ সয়াবিন’
একদিকে লবণাক্ততা, অন্যদিকে অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়া—এসব মিলিয়েই বাংলাদেশের উপকূলীয় চরাঞ্চল। এমন পরিবেশে ফসল ফলাতে দীর্ঘদিন ধরে খরার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন সেখানকার কৃষকরা। বিশেষ করে সয়াবিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল চাষে খরা ছিল বড় প্রতিবন্ধকতা। সেই বাস্তবতায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গাকৃবি) উদ্ভাবিত উচ্চ খরা-সহনশীল সয়াবিনের নতুন ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে সম্প্রতি এ জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মাধ্যমে গাকৃবিতে উদ্ভাবিত মোট ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৪টি, যা দেশের কৃষি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
গবেষণার দীর্ঘ পথচলা
তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম নিয়ে টানা তিন বছর নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সেখান থেকেই খরা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ‘জিএইউ সয়াবিন’ নির্বাচিত হয়।
পরবর্তীতে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’-এর সহায়তায় নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় মাঠপর্যায়ে পাঁচ বছর ধরে সফল মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। মাঠের বাস্তবতায় পরীক্ষিত হওয়ার পর জাতীয় বীজ বোর্ড জাতটিকে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করে।
৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দেওয়ার সক্ষমতা এ জাতকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থায় অভিযোজন সক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ।
ফলনে শক্তিশালী, গুণে অনন্য
‘জিএইউ সয়াবিন’-এর প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল ধরে। বড় দানার কারণে এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় বেশি ফলনশীল এ জাত থেকে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর বীজে ট্রিপসিন ইনহিবিটরের মাত্রা তুলনামূলক কম। ফলে পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে। এ কারণে জাতটি পোল্ট্রি শিল্পের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়।
এই জাতের সয়াবিনের পরিপক্বতাও আসে দ্রুত। মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়, যা কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক।
পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা
সয়াবিন একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল। এতে রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮ থেকে ২০ শতাংশ তেল। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ এ ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষত উপকূলীয় চরাঞ্চলে যেখানে ফসলের বিকল্প সীমিত, সেখানে খরা-সহনশীল এ জাত খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কার্যকর অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষকের অনুভূতি
ড. এম এ মান্নান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন জাতটি আমাদের দীর্ঘ নিরলস গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি আর কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার যে কঠিন বাস্তবতা, এই জাত সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ ফলপ্রসূ। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এতদিন অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।’
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এ অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনতে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
খরা-আক্রান্ত জমি যেখানে একসময় অনিশ্চয়তার প্রতীক ছিল, সেখানে এখন সম্ভাবনার নতুন বীজ বপনের অপেক্ষা। ‘জিএইউ সয়াবিন’ সেই পরিবর্তনেরই এক প্রতীক হয়ে উঠতে চলেছে।
২ ঘণ্টা আগে