ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক
ট্রাম্পের ইরান হামলার নেপথ্যে
ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ অভিযানে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যে, তারা একসঙ্গে দেশটির শীর্ষ নেতা এবং আলেমদের লক্ষ্য করতে পারবে।
দুইজন পরিচিত সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, ইসরায়েলিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চলাচল পর্যবেক্ষণ করছিল। এরই মধ্যে তারা দেখতে পায়, শীর্ষস্থানীয় আলেম ও কমান্ডারদের একত্রিত অবস্থায় হামলা চালানোর একটি সুযোগের জানালা খোলা রয়েছে।
ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) খামেনির প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত হলেও তাদের ধারণা ছিল যে, খামেনির মৃত্যুর পর কেউ তার উত্তরসূরীর প্রতি একইভাবে অনুগত থাকবে না।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, তেহরানের একটি স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলায় খামেনি এবং ৫ থেকে ১০ জন শীর্ষ ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প পরে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন যে, খামেনি নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনাও তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
ওইদিন এক ভিডিওবার্তায় কয়েক দিনব্যাপী চলতে পারে—এমন এই অভিযানের ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প কেন যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা শুরু করেছে, তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ বলেননি। তবে খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগটি হামলার সময়সীমাকে ত্বরান্বিত করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার প্রেক্ষাপট
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। ওমান দুই দেশের আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে সহায়তা করছিল। এক্স পোস্টে তিনি বলেন, আমি হতাশ। সক্রিয় ও গুরত্বপূর্ণ আলোচনা পুনরায় ব্যর্থ হয়েছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বা বৈশ্বিক শান্তির জন্য ভালো নয়।
হামলাগুলো ঘটেছে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, যখন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জেরাড কুশনার জেনেভায় ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। তারা বুঝতে চেষ্টা করছিলেন যে ইরান আলোচনায় বিলম্ব করছে কি না।
গত বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী চলা আলোচনায় উইটকফ এবং কুশনার ইরানকে তাদের তিনটি প্রধান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ফোরডো, ইসফাহান এবং নাতাঞ্জ ধ্বংস করতে চাপ দেন। এ কেন্দ্রগুলো গত বছর ট্রাম্পের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। এ ছাড়াও অবশিষ্ট মজুদ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান তারা।
তারা বলেছিলেন, যেকোনো চুক্তি হতে হবে স্থায়ী। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় করা চুক্তির মতো কোনো ‘সানসেট প্রোভিশন’ (যে ধারার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর বিধিনিষেধ উঠে যায়) রাখা যাবে না। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু দিনশেষে উইটকফ এবং কুশনার হতাশ হন। পরবর্তীতে ট্রাম্পকে তার সামরিক বিকল্পগুলো সম্পর্কে ব্রিফ করেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার।
কুপার এই হামলার সাফল্যের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ছিলেন।
হামলার পেছনের যুক্তি
শনিবার ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প অনেক কারণ বিবেচনা করে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার মধ্যে প্রধান কারণ ছিল ইরানের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রসমূহ।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করেছে। তারা এমনকি আমাদের সঙ্গে বা আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলতে চায়নি।
অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ‘শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে’—ইরানের এমন দাবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চিরস্থায়ীভাবে বিনামূল্যে পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে।
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে ইরান তাদের সেই পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো পুনর্নির্মাণ করছে যা গত বছর ট্রাম্পের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ধ্বংস হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করত, ইরান আংশিক সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ করছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা কোনো চুক্তি চায় না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সত্যি বলতে প্রেসিডেন্টের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করতে পারি না, যেখানে এই লোকগুলোর কাছে কেবল ক্ষেপণাস্ত্রই নেই, বরং প্রতি মাসে ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে। আমরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকব না এবং আমাদের আগে তারা আমাদের আঘাত করুক, সেটি হতে দেব না।
২০ ঘণ্টা আগে