মোজতবা খামেনি
মোজতবা খামেনিই হলেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ পর তারই ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করেছে ইরান।
মোজতবা খামেনিকে এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হবে।
স্থানীয় সময় রবিবার (৮ মার্চ) ৫৬ বছর বয়সী মোজতবাকে ধর্মীয় নেতারা তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন। ইরানের প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতারা নতুন নেতার নাম ঘোষণার পরপরই তার প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের নিরাপত্তা কৌশল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি নতুন সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে অনুসরণ করা একটি ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্ব।
মোজতবা খামেনি কখনও কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি বা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হননি। তবে গত কয়েক দশক ধরে তিনি তার বাবার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং আইআরজিসির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবাকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থি অংশটিই ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক আলি হাশেম মোজতবাকে তার বাবার দ্বাররক্ষক হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইস্যুতে তিনি তার বাবার অবস্থানই বজায় রাখেন। তাই আমরা একজন আপসহীন নেতাকেই প্রত্যাশা করছি, কোনো নমনীয়তা নয়।
তিনি বলেন, যদি এই যুদ্ধ শেষ হয় এবং তিনি তখনও বেঁচে থাকেন এবং তিনি দেশ পরিচালনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তাহলে ইরানের জন্য নতুন পথ খুঁজে বের করার বিশাল সম্ভাবনা থাকবে।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের পাবলিক পলিসি ফেলো রামি খুরি বলেন, মোজতবার নিয়োগ ইরানের অবিচ্ছিন্নতা নির্দেশ করছে, তবে নতুন নেতা যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনার চেষ্টা করেন কি না সেটি দেখার বিষয়।
তিনি বলেন, যেকোনো দিকেই দেখ, এটি প্রতিরোধের একটি পদক্ষেপ। ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বলছে, ‘তোমরা আমাদের ব্যবস্থা ধ্বংস করতে চেয়েছিলে? দেখ, যাকে হত্যা করেছ, তার চেয়েও কট্টর একজনকে আমরা নেতা বানিয়েছি।’
সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনকারী অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য হায়দারি আলেকাসির বলেন, প্রয়াত খামেনির পরামর্শ ছিল, ইরানের শীর্ষ নেতা এমন হওয়া উচিত যাকে শত্রু ঘৃণা করবে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে বলেন, এমনকি ‘মহা শয়তান’ (যুক্তরাষ্ট্র) তার নাম উল্লেখ করেছে (যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন মোজতবা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নন)।
এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার আবারও ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের অনুমোদন ছাড়া ইরানের পরবর্তী নেতা বেশিদিন টিকবে না।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা এই হস্তক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, শুধুমাত্র ইরানিরা তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান মোজতবাকে মনোনীত করার সিদ্ধান্তে আরও ক্ষোভ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘এপস্টাইন গ্যাং’ নেতা নির্ধারণ করবে না
৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস রবিবার জানায়, আমেরিকা ও ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর নৃশংস আগ্রাসন সত্ত্বেও তারা নতুন নেতা নির্বাচনে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেনি। তারা জানায়, ইমাম খোমেনি ও শহিদ খামেনির পথই বেছে নেওয়া হয়েছে এবং মোজতবা খামেনির নাম অব্যাহত থাকবে।
এর আগে, গত শুক্রবার ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের দাবির পাল্টা সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের ভাগ্য কেবল গর্বিত ইরানি জাতি নির্ধারণ করবে, এপস্টাইন গ্যাং নয়। ( জেফরি এপস্টাইন ছিলেন একজন দণ্ডিত যৌন অপরাধী, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সম্পর্ক ছিল)।
মোজতবা খামেনি কুম শহরের রক্ষণশীল ধর্মগুরুদের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন এবং হুজ্জাতুল ইসলাম (মধ্যম পর্যায়ের ধর্মগুরু) মর্যাদা অর্জন করেছেন।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ৩৭ বছর ধরে ইরানের নেতৃত্বদানকারী আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই খামেনির যেকোনো বিকল্পকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ কেবল তখনই শেষ হতে পারে, যখন ইরানের সামরিক বাহিনী এবং নেতাদের নিশ্চিহ্ন করা হবে।
এবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন নেতা আমাদের কাছ থেকে যদি অনুমোদন না পান, তাহলে তিনি বেশিদিন টিকতে পারবেন না।
শুক্রবার ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবিকে উপহাস করেন।
অন্ধকার আকাশ
ইরানে যখন নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছিল, তখন তেহরানের আকাশ ছিল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ইসরায়েলি হামলায় রাজধানীর উপকণ্ঠের পাঁচটি তেল শোধনাগারে আগুন লাগার ফলে পুরো শহর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভরে যায়।
যুদ্ধের নবম দিনে আইআরজিসি দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের কাছে অন্তত ছয় মাসের সরঞ্জাম মজুত রয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি বলেন, ইরান এ পর্যন্ত কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের মিসাইল ব্যবহার করেছে, তবে সামনে আমরা আরও উন্নত ও দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করব।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি নাকচ করেননি এবং তিনি যুদ্ধ জয়ের দাবি করে যাচ্ছেন।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত থামার কোনো সহজ পথ নেই। এটি আরও মাসখানেক বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
১১ ঘণ্টা আগে