ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
জোর করে কেন হরমুজ প্রণালি খুলতে পারছেন না ট্রাম্প?
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থলসেনা উপস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালি জোরপূর্বক খুলে দেওয়ার একটি ‘বিপজ্জনক’ সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ তেহরানের কঠোর পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও তৈরি করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের এ প্রণালিটি বন্ধের কৌশলগত অবস্থান তেলের দামকে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে নিয়ে গেছে। ফলে এটি ট্রাম্পের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট একদিকে কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে ইরানে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছেন। স্থানীয় সময় রবিবার (২৯ মার্চ) ট্রাম্প সরাসরি জানিয়েছেন যে, তিনি ইরানের তেল দখল করতে চান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলতে ট্রাম্পের সামনে দুটি সামরিক পথ খোলা আছে—ইরানের ভূখণ্ড দখল করা অথবা জলপথে নৌবাহিনী মোতায়েন করা। তবে সীমিত স্থল অভিযানও এমন প্রাণহানির কারণ হতে পারে যা একজন প্রেসিডেন্টের গদিও নড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের জন্য তাদের মাটিতে বিদেশি সেনার উপস্থিতি একটি ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক এমা সালিসবারি মনে করেন, ট্রাম্প পারস্য উপসাগরের কোনো একটি ইরানি দ্বীপ দখলের মাধ্যমে সংঘাতকে আরও উসকে দিতে পারেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি (ট্রাম্প) আগ্রাসী পথ বেছে নিয়েছেন। সৈন্য হাতে থাকলে তিনি অবশ্যই তা ব্যবহার করবেন, তবে তা ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হতে পারে।’
অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান একটি কঠোর বার্তা পাঠিয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা ঢুকলে তারা নিজেদের এলাকাতেই ব্যাপক বোমা হামলা করতে পারে, এমনকি অবকাঠামো ধ্বংস করতেও প্রস্তুত রয়েছে।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে তেহরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ বলেন, ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে আলোচনার কথা বললেও গোপনে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, তারা একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে। হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘালিবাফ বলেন, মার্কিন সেনারা এলে তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বীর সেনারা মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন, যাতে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায় এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের চিরতরে শিক্ষা দেওয়া যায়।
সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত শনিবার প্রায় ৫ হাজার মার্কিন নৌসেনার অর্ধেক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এরা জল-স্থল উভয় পথেই অভিযানে দক্ষ। আরও প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার (প্যারাসুট ব্যবহার করে বিমান থেকে নামা বিশেষ প্রশিক্ষিত সৈনিক) পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল ‘খার্গ দ্বীপ’ মার্কিন হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সীমিত সংখ্যক সৈন্য দিয়ে দ্বীপ দখল করা সহজ হলেও তা ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ ইরান তখন রকেট, মিসাইল এবং ড্রোন হামলা শুরু করবে।
আবার বড় ধরনের স্থল অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই সেনা সংখ্যা যথেষ্ট নয়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন প্রায় দেড় লাখ সেনা মোতায়েন করেছিল। আর ইরানের আয়তন তার তিন গুণেরও বেশি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী এবং আরও ১০ হাজার সৈন্য পাঠানোর কথা ভাবছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প আরও একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের কথা বিবেচনা করছেন। তা হলো, ইরানের মূল ভূখণ্ডে ঢুকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দখল করা। তবে এটি করতে বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজন হবে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করতেও পারি, আবার নাও পারি। আমাদের অনেক পথ খোলা আছে।
কিন্তু খার্গ দ্বীপটি উপসাগরের অনেক গভীরে হওয়ায় সেখানে লজিস্টিক সহায়তা পাঠানো এবং সৈন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে থাকা কিশ ও আবু মুসার মতো দ্বীপগুলো এ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, যা দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট মনে করেন, এই সেনা মোতায়েন মূলত আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি কৌশল বা ‘প্রদর্শনী’ হতে পারে। কারণ সামরিকভাবে কোনো দ্বীপ দীর্ঘসময় দখল করে রাখা মার্কিনিদের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর কিছু হবে না।
এছাড়া স্থল অভিযান হলেও ইরানের হুমকি পুরোপুরি দূর হবে না। প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক জাহাজে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা, মাইন অপসারণ ও আকাশ সহায়তার প্রয়োজন হবে। এ জন্য বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ দরকার, যা যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে তুলবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজও নেই।
তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী ইতোমধ্যে সংঘাতে যুক্ত হয়ে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তারা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথেও হামলা শুরু করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ রাখতে হতে পারে।
১০ দিন আগে
ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ধারাবাহিক কংগ্রেস শুনানিতে অংশ নিতে যাচ্ছেন। সেখানে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও ইরানের একটি স্কুলে প্রাণঘাতি হামলার বিষযয়ে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি করা হবে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সন্ত্রাসী হামলার হুমকি প্রতিরোধে এফবিআইয়ের সক্ষমতা নিয়েও জিজ্ঞসাবাদের মুখে পড়তে হবে তাদের।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ মার্চ) সিনেটে শুনানি শুরু হয়েছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত হাউসে এই শুনানি চলবে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে বার্ষিক বৈশ্বিক হুমকি বিষয়ক এই শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মিশিগানের একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) ও ভার্জিনিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
হাউস এবং সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির সামনে এই সাক্ষ্যগ্রহণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধই প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্চের শুরুর দিকে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ১৬৫ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ওই হামলার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও পুরনো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র ওই বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল বলে জানিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) থেকে ওই হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে কংগ্রেসে জানানো হয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেমস এইচ অ্যাডামসও শুনানিতে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের স্কুলে হামলার বিষয়টি নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে।
এছাড়া প্রশাসনের ভেতরে চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ নিয়েও শুনানিতে আলোচনা হতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সন্ত্রাস প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক জো কেন্ট এই সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। মঙ্গলবার কেন্ট বলেন, তিনি নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে এই যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেননি। তার মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে হুমকি ছিল না।
এর কয়েক ঘণ্টা পর জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক ভাষায় একটি পোস্ট করেন। তিনি বলেন, ইরান হুমকি কি না, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ট্রাম্পের। তবে তিনি এ ব্যাপারে নিজস্ব মতামত উল্লেখ করেননি। তুলসি গ্যাবার্ডের দপ্তরের অধীনেই কেন্ট কর্মরত ছিলেন। তুলসি গ্যাবার্ডও এই সপ্তাহের শুনানিতে উপস্থিত থাকবেন।
শুনানিতে ইরান-সম্পর্কিত গোয়েন্দা প্রতিবেদন নিয়ে ডিএনআই পরিচালক গ্যাবার্ড এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এর মধ্যে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে সরকার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। অপর একটি প্রতিবেদনে ইরান প্রথম হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল—এমন দাবির ওপর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
২২ দিন আগে