লবণদহ নদ
দখলে-দূষণে নিখোঁজ লবণদহ নদ
একসময় যার টলটলে জলে দুলত পালতোলা নৌকা, মাঝির গানে ভেসে উঠত আবহমান গ্রামবাংলার চিত্র, আজ যেন এক আহত দেহ নিয়ে দেশের মুমূর্ষু সব নদ-নদীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে গাজীপুরের লবণদহ নদ। দখল আর দূষণের করাল গ্রাসে এই নদ হারাতে বসেছে তার জৌলুস, আছে শুধু তার স্মৃতি আর নিঃশ্বাসহীন শরীর। লবণদহের এই মৃত্যু নিছক একটি নদীর গল্প নয়, এ এক অবহেলা, লোভ আর উদাসিনতার দীর্ঘ উপাখ্যান।
প্লাস্টিক দূষণ, শিল্প বর্জ্য ও পৌর বর্জ্যে এটি এখন দূষিত নদীর তালিকাতেও রয়েছে ওপরের দিকে লবণদহ। তাছাড়া এটিকে নদী না বলে এখন খাল বা নালা বলাই ভালো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে অপরিকল্পিত উন্নয়নের সব দায় গিয়ে পড়ছে নদ-নদীর জীবনে। দুঃখের বিষয়, প্রায় সব খাত থেকেই বর্জ্য ফেলার আদর্শ জায়গা ভাবা হচ্ছে নদ-নদীকে। আর জীবন্ত সত্তার জন্যই এসবের মৃত্যুর দায়ও গুনতে হবে মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার মাপকাঠিতে।
সম্প্রতি দেশের ৫৬টি প্রধান নদ-নদীর ওপর করা এক গবেষণার তথ্য বলছে, শীর্ষ তিন দূষিত নদীর একটি গাজীপুরের লবণদহ। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) উদ্যোগে ২০২২-২৩ সালে পরিচালিত গবেষণায় ৫৬টি নদীর পানির গুণাগুণ পরিমাপ করে দেখা গেছে, শুধু শহর বা উপশহরে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদীতেও প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। নদীতে জীববৈচিত্র্য ও জলজপ্রাণীর জীবন ধারণের জন্য যে চারটি গুণগত মান প্রয়োজন, লবণদহে তার সবই রয়েছে আশঙ্কাজনক অবস্থায়।
পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ১৯৯৭ অনুযায়ী, নদীর পানিতে মিশ্রণের অম্লতার (পিএইচ লেভেল) আদর্শ মান ৬ থেকে ৯ পর্যন্ত, সেখানে লবণদহের পিএইচ লেভেল ৫। মিশ্রণে অক্সিজেনের (সিওডি) পরিমাপের আদর্শ মাত্রা প্রতি লিটারে থাকতে হয় ২০০ মিলিগ্রাম, কিন্তু লবণদহের পানিতে সিওডির মাত্রা প্রতি লিটারে মাত্র ৪৬ মিলিগ্রাম। দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) আদর্শ মাত্রা প্রতি লিটারে সাড়ে ৪ থেকে ৮ মিলিগ্রাম হলেও লবণদহের পানিতে ডিওর মাত্রা লিটারে শূন্য দশমিক ২১ মিলিগ্রাম।
এছাড়া বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) বা পানিতে ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন অণুজীবের অক্সিজেন চাহিদার আদর্শ মান যেখানে প্রতি লিটারে ৫০ মিলিগ্রাম, সেখানে লবণদহে রয়েছে লিটারে মাত্র ৩৪.২ গ্রাম। এ সূচক থেকে প্রতীয়মান হয় যে, লবণদহ নদীর অবস্থা কতটা বিপর্যস্ত!
অথচ জনশ্রুতি আছে, একসময় লবণদহের ব্যাপ্তির কারণে একে বলা হত ‘লবলং’ সাগর। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ক্ষীরু নদীর সংযোগস্থল থেকে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সেখান থেকে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার ওপর দিয়ে এটি মির্জাপুরের কাছে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রমত্তা এ নদীকে গিলে খেল কে? কেনো আজ এটি একটি ছোট্ট নালায় পরিণত হয়েছে। এটি এখন হয়ে আছে কেবলই একটি ময়লার ড্রেন সদৃশ নালা।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক দূষণ কমন রোগ; তবে মূলত কারখানার বর্জ্য ও পৌর বর্জ্যই প্রমত্তা এ নদীকে শেষ করে দিয়েছে। লবণদহকে ঘিরে কারখানার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে হিসাবটা সহজে মিলে যাবে।
আরডিআরসির গবেষণায় পাওয়া তথ্য বলছে, এ নদীর তীরে ২৫০টি কারখানা পাওয়া গেছে। এর প্রতিটির কেমিকেল বর্জ্য এবং একইসঙ্গে শ্রীপুর পৌরসভার সব বর্জ্য গিয়ে পড়ছে এ নদীতে। শ্রীপুর অংশে প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে চলছে এ দূষণ। আর গাজীপুর অংশের আশপাশে গড়ে উঠেছে ৩৯টি শিল্পকারখানা যেগুলোর বর্জ্যের লাইন সরাসরি নদীতে সংযুক্ত। এছাড়া খালটিতে গড়ে উঠেছে ১৫টি পৌর পয়োনিষ্কাশন লাইন ও ১১টি ডাম্পিং স্টেশন।
তবে বেসরকারি সংস্থা ‘নদী পরিব্রাজক’ দলের তথ্য মতে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব মিলে প্রায় ২ হাজার কারখানা আছে লবণদহকে ঘিরে। ফলে এককালের প্রমত্তা এ নদী দখল ও ভরাট হতে হতে বর্তমানে খাল বা নালায় রূপ নিয়েছে। এছাড়া এটি হারিয়েছে মাছসহ জলজ জীব বেঁচে থাকার পরিবেশও।
৬ দিন আগে