হামাস-ইসরায়েল সংঘাত
হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে গাজায় ফের যুদ্ধ শুরুর হুমকি ইসরায়েলের
গাজায় খান ইউনিস ও দেইর আল বালাহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি ড্রোনের গর্জন এবং বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিদিনই মনে দেয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ কখনো থামবে না।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গত অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনের পরিবারগুলো এখনও ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৮২৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে, নতুন করে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কয় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা। কারণ, হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
স্থানীয় সময় রবিবার (৩ মে) জেরুজালেমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তা মন্ত্রিষভার বৈঠক হঠাৎ কর বাতিল করেন। তার পরিবর্তে তিনি যুদ্ধের বিষয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা করেছেন।
একই সময়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর জন্য চাপ বাড়িয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইসরায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল ১৫-কে জানান, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির মধ্যে নিরাপত্তা তদারকি ও চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বহুজাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সও ব্যর্থ হয়েছে। এসব কারণে নতুন করে যুদ্ধ তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের আর্মি রেডিও জানিয়েছে, ভূমিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত ইয়েলো লাইন ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গাজার ৫৯ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। একইসঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি মধ্যেও তারা দখল আরও স্থায়ী করছে। ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন সীমান্ত থেকে অতিরিক্ত সেনা এনে গাজা ও পশ্চিম তীরে মোতায়েন করছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের ফাঁদ
কায়রোতে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নতুন একটি কাঠামো মেনে নেওয়ার জন্য তীব্র চাপ দিচ্ছেন। এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বোর্ড অব পিসের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ।
এ বিষয়ে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আবদুল জব্বার সাঈদ ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম আল্ট্রা প্যালেস্টাইনকে জানান, ম্লাদেনভ এমন একটি কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যেখানে ২৮১ দিনের মধ্যে ৫টি ধাপে হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র হতে হবে।
এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। কাঠামোতে ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা, উপত্যকার পুনর্গঠন এবং গাজার সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণকে শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা আল জাজিরাকে বলেন, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত নতুন টেকনোক্র্যাটিক সংস্থা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজাকে (এনজিএসি) ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী তাদের নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছে।
আবদুল জব্বার সাঈদ আরও জানান, হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনসহ সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী একযোগে এই নিরস্ত্রীকরণের শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর বদলে তারা ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ পুরোপুরি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে যুদ্ধবিরতির মধ্যে প্রতিদিন ফিলিস্তিনে ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করার চুক্তি থাকলেও ইসরায়েল ট্রাক প্রবেশেও বারবার বাধা দিয়েছে।
ফিলিস্তিনের নিরাপত্তার প্রশ্ন
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা আল জাজিরাকে বলেন, হামাস কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে নিরাপত্তার বিষয়টিকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার বলে মনে করে।
তিনি জানান, প্রতিরোধ আন্দোলন করা গোষ্ঠীগুলো মনে করে, তাদের নিরস্ত্র করা হলে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসান কখনোই সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাজনৈতিক সমাধানে না এসে ফিলিস্তিনের অস্ত্রের বিষয়টিকে সামনে আনছে। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কোনো নিশ্চয়তা না দিয়ে মানবিক সহায়তাকে শর্ত দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ করছেন তারা।
কৌশলগত ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধ ফের শুরুর এই আলোচনা করে ইসরায়েল তাদের কৌশলগত কিছু ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মামুন আবু আমের আল জাজিরাকে বলেন, এসব হুমকি মূলত একটি ধোঁয়াশা তৈরির কৌশল। হুমকির মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন গাজায় যুদ্ধ থামিয়ে একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। এখন গাজায় আবার যুদ্ধ আবার শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া শান্তি উদ্যোগ ভেঙে পড়বে। আর ইরানকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আবার একাধিক দেশে সংঘাতে জড়িয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও চাপের মধ্যে রয়েছে। ইসরায়েলি সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান ইসরায়েল জিভের বক্তব্য উল্লেখ করে আবু আমের বলেন, ২০২৬ সালে ইসরায়েলি সেনাদের গড়ে বছরে ৮০ দিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ ফলে তাদের সেনাবাহিনীর ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ লেবাননের সংকট ইসরায়েলের জন্য এখনও ক্ষত হয়ে আছে। এই অবস্থায় গাজায় নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য বড় কৌশলগত ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে, গাজায় আটকে থাকা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন কোনো স্বস্তি বয়ে আনছে না। স্থানীয় সময় শনিবার (২ মে) প্রকাশিত ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ৬০৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সর্বশেষ রবিবার বিকেলে ইসরায়েলি হামলায় আরও ৩ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে গাজার মানুষ এখন একদিকে দীর্ঘস্থায়ী ইসরায়েলি দখলদারত্ব, অন্যদিকে নতুন আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন।
২ ঘণ্টা আগে