ভবদহ
জলাবদ্ধতায় কাজে আসেনি ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প, ডুবছে ভবদহ
খুলনা ও যশোর অঞ্চলের ভবদহ অববাহিকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। বরং অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের কারণে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, জোয়ার-ভাটার নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ রুদ্ধ করে খননকাজ পরিচালনা করায় খর্ণিয়া থেকে ভাটি অঞ্চলের প্রায় ৭ কিলোমিটার নদীপথ পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি সাগরে পৌঁছাতে না পেরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রীনদীর প্রায় সাড়ে ৮১ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্প সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ গত ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন হয়নি। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই এর বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, খর্ণিয়া সেতুসংলগ্ন এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে এক্সকাভেটর দিয়ে নদী খনন করায় জোয়ারের পানির সঙ্গে আসা বিপুল পলি নদীর তলদেশে জমতে থাকে। এতে খর্ণিয়া থেকে তেলিগাতি পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হয়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যে নদীর গভীরতা এক বছর আগেও প্রায় ৩০ ফুট ছিল, বর্তমানে তার অনেকাংশই প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এর ফলে খর্ণিয়ার বিল, বিল সিঙ্গা, ডোমবার বিল, বিল তাওয়ালিয়া, আগরঘাটি, ভায়না, বরুনা, সালাতিয়া, দহকুলা, নাদিয়া, জোয়ারেরডাঙ্গা, বামুন্দিয়া, গোনালীসহ যশোর ও খুলনা অঞ্চলের অন্তত ৩০টি বিল ও অর্ধশতাধিক গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। কৃষিজমি, মৎস্যঘের ও গ্রামীণ সড়কও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষক ওহিদ শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদী খননের নামে যে ক্ষতি হয়েছে, তা অন্য কোনো দুর্যোগেও হতো না। ‘জোয়ার-ভাটা বন্ধ করে নদী খননের এমন উদাহরণ আগে দেখিনি। এর মাশুল এখন সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।’
২৭ দিন আগে
ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার: প্রতিমন্ত্রী অমিত
যশোরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, ভবদহ অঞ্চলের মানুষকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
শনিবার (১৬ মে) সকালে যশোর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালার বিষয়বস্তু ছিল, যশোর জেলার ভবদহ এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিবসা ও পশুর নদীর অববাহিকায় পলি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন।
প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ভবদহ সমস্যা সমাধানে অর্থ বরাদ্দ হলেও তা লুটপাটের শিকার হয়েছে। সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি, যার ফলে জনগণের মধ্যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, কাজের মাধ্যমে জনগণের আস্থার সংকট দূর করতে চাই।
প্রতিমন্ত্রী জানান, তিনি নিজে ভবদহের সমস্যা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন।
ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর জোয়ারাধীন নদী ব্যবস্থাপনা (টিআরএম) প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবদহপাড়ের মানুষকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল এবং ভুক্তভোগীরা ২০১৩ সাল পর্যন্ত তার সুফল ভোগ করেছেন।
প্রতিমন্ত্রী নির্মোহভাবে ভবদহের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ প্রদান করেন, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, ভবদহ ও বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নদীতে অতিরিক্ত পলি জমা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অতীতে টিআরএম কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে ভবদহ রেগুলেটরে ২০টি পাম্প স্থাপন করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়।
বর্তমান সমীক্ষার আওতায় যশোর জেলার মনিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলা এবং খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রায় ৯৮ হাজার হেক্টর এলাকায় নদী, খাল ও বিলের জরিপ, গাণিতিক মডেলিং, কৃষি, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সমীক্ষায় ভবদহ ও বিল ডাকাতিয়া এলাকার জন্য স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদী খনন, অতিরিক্ত পাম্প স্থাপন, পাইলট চ্যানেল খনন, টিআরএম কার্যক্রম পুনরায় চালু, নদীর প্লাবনভূমি দখলমুক্ত করা এবং ভবদহ রেগুলেটরকে সেতু দ্বারা প্রতিস্থাপন করে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়াও বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জন্য নতুন সংযোগ খাল নির্মাণ, রেগুলেটর মেরামত ও নতুন অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সমীক্ষার সুপারিশসমূহ আরও পরিমার্জন করা হবে বলে জানানো হয়।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রছুল, যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোক্তার আলী, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার আজিম আহমেদ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রুহুল আমিন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাছরিন আক্তার খান।
১১৫ দিন আগে