পশু ক্রয়
পশু ক্রয় থেকে মাংস সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান বাকৃবির বিশেষজ্ঞদের
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর হাটে ভিড় বাড়ছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড, গ্রোথ হরমোন ও ক্ষতিকর ওষুধ দিয়ে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজা করছেন। পাশাপাশি কোরবানির হাট থেকে অ্যানথ্রাক্সসহ প্রাণঘাতী রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে। আবার কুরবানির পর সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে মাংসের গুণগত মান। এসব বিষয়ে নিয়েই ইউএনবির বাকৃবি প্রতিনিধির কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) তিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক।
কৃত্রিম মোটাতাজা করা গবাদিপশু চেনার উপায়
বাকৃবির ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া জানান, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর নাক শুকনো থাকে, শরীর থলথলে হয় এবং দেহে অতিরিক্ত পানি জমে।
তিনি জানান, এসব গরু অল্প হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায়, দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেশি থাকে। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে শরীর দেবে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। রানের মাংস অস্বাভাবিক নরম হয় এবং হাড় তুলনামূলক দুর্বল থাকায় দুর্ঘটনায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ড. মোহাম্মদ আলম আরও জানান, এসব গরুর খাওয়ার আগ্রহ কম, জাবর কাটে না এবং মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা বা ফেনা বের হয়। দীর্ঘ পথ হেঁটে হাটে আসার পর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বসে গেলে সহজে উঠতে চায় না।
প্রাকৃতিক উপায়েও গরু মোটাতাজা করা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উপায়ে ২ থেকে ৪ বছর বয়সী সুস্থ গরু বেছে নিয়ে সুষম খাদ্য, নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স ব্যবহার এবং পরিষ্কার পরিবেশ নিশ্চিত করলে ৩ থেকে ৬ মাসেই গরু ভালোভাবে মোটাতাজা করা সম্ভব।
পশু কেনার সময় শুধু আকার নয়, আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, নাকের অবস্থা ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন তিনি। সন্দেহ হলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলেও জানান তিনি।
পশুরহাটে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি
বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিমুল এহসান জানান, সম্প্রতি রংপুর ও গাইবান্ধায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে চামড়ায় ক্ষত ও চোখ ফোলার মতো উপসর্গ দেখা গেছে। আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস বা দেহের যেকোনো অংশের সংস্পর্শে এলে এ রোগ মানুষের শরীরেও ছড়াতে পারে। নিয়মিত টিকাদান এবং হাটের প্রবেশপথে বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গেলে এ ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব বলে জানান তিনি।
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত পশু সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, পশু অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের আগেই মারা যায়। লক্ষণ দেখা দিলে পশুর তাপমাত্রা ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। মৃত্যুর পর নাক, মুখ ও পায়ুপথ দিয়ে আলকাতরার মতো কালো রক্ত বের হয় যা বাতাসের সংস্পর্শে স্পোর তৈরি করে দীর্ঘদিন সংক্রমণ ছড়াতে পারে। জীবিত পশুর ক্ষেত্রে জিহ্বা, নাক বা গলায় কালচে দাগ ও ফোসকা এবং অস্বাভাবিক উত্তেজনা বা অতিরিক্ত শান্তভাব লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
খুরা রোগকেও চিন্তার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বাতাসের মাধ্যমে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়াতে পারে এবং কোরবানির সময় মহামারি আকার নিতে পারে। দিনাজপুর বা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা একটি আক্রান্ত গরু পুরো পথজুড়ে এবং হাটের আশপাশের সব গরুর মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে।
কোরবানির পর অবিক্রিত পশু হাট থেকে আক্রান্ত হয়ে নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে সুস্থ পশুকেও সংক্রমিত করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। অসুস্থ পশু চিকিৎসা করে সুস্থ না করে হাটে আনা উচিত নয় বলে খামারিদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
অধ্যাপক আমিমুল এহসান আরও বলেন, হাটে যাওয়ার সময় শরীরে কোনো ক্ষত বা কাটা থাকলে ঢেকে যাওয়া জরুরি কারণ ক্ষতস্থান দিয়ে অ্যানথ্রাক্স বা টিটেনাসের জীবাণু সহজেই প্রবেশ করতে পারে। পশুর সংস্পর্শে আসার পর সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত-পা পরিষ্কার করা এবং হাটের বর্জ্য ও রক্ত যত্রতত্র না ফেলা নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান তিনি।
ভালো গরু চেনা ও মাংস সংরক্ষণ
বাকৃবির অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ ইউএনবিকে জানান, ভালো মাংসের গরুর শরীরে মাংসের বিন্যাস সমান ও মসৃণ হবে। রানে অতিরিক্ত মাংস জমা বা আঙুরের থোকার মতো অস্বাভাবিক ক্লাস্টার থাকলে সেই মাংস কম সুস্বাদু হয়। গলার নিচের ঝুলন্ত অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকলে তা শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত।
তিনি বলেন, ৩৫০ কেজির বেশি ওজনের গরুতে চর্বি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। গুণগত মানের মাংসের জন্য ২০০ থেকে ২৫০ কেজি ওজনের দুই দাঁতের দেশি গরু উপযুক্ত বলে তিনি মত দেন। দাঁত দেখতে না পেলে শিংয়ের গোড়া মোটা হলে বুঝতে হবে গরুটি ক্রয়যোগ্য।
মাংস সংরক্ষণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আজাদ বলেন, পশু জবাইয়ের পর মাংস সরাসরি মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ডিপ ফ্রিজে রাখা সঠিক পদ্ধতি নয়। এতে মাংসের স্বাভাবিক বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকে এবং পরে ডিপ ফ্রিজ করার সময় মাইক্রো স্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মাংস ছিবড়ে হয়ে যায়।
তিনি বলেন, জবাইয়ের পর মাংসের তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। এটি ধীরে ধীরে ১০–১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা এবং এরপর প্রোটিন ভেঙে অ্যামিনো এসিডে রূপান্তর হতে আরও ৮ ঘণ্টা সময় লাগে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে মাংস থেকে পুরোপুরি পুষ্টি পাওয়া যায় না।
সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, মাংস ১–২ কেজি করে প্যাকেট করে প্রথমে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সাধারণ ফ্রিজে ২৪–৪৮ ঘণ্টা রাখতে হবে। এই ধাপ সম্পন্ন হলে তারপর ডিপ ফ্রিজে স্থানান্তর করলে মাংস ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ভালো মানে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এছাড়া গরুর মাংসের আসল স্বাদ ও গন্ধ পেতে হলে জবাইয়ের অন্তত তিন দিন পর রান্না করা উচিত বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।
৫ ঘণ্টা আগে