ডুবুরি
দেড়শ কিলোমিটার দূরে ডুবুরি, কুষ্টিয়ায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে
নদীতে কেউ নিখোঁজ হয়েছেন। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছেছে ফায়ার সার্ভিসের দল। কিন্তু শুরু করা যাচ্ছে না উদ্ধার অভিযান। কারণ, কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসে নেই প্রশিক্ষিত ডুবুরি। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরত্বের খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যাতে সময় লেগে যায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।
নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীসহ জেলার ওপর দিয়ে ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত আটটি নদ-নদী বয়ে গেছে। এসব নদীর সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ নদীতে দুর্ঘটনা বা কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য কুষ্টিয়াকে নির্ভর করতে হয় খুলনার ওপর।
এর ফলে দুর্ঘটনার পরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক ঘণ্টা কেটে যায় শুধু ডুবুরি দলের অপেক্ষায়। এতে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা যেমন কমে, তেমনি মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ঘটনায় স্বজনদের এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সেই চিত্রই সামনে এনেছে। শুধু আগস্ট মাসেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন নদীতে ডুবে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেন। স্থানীয়রা আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করলেও মোস্তাকিমকে সেদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় ব্যাহত হয় উদ্ধার অভিযান। পরে খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছালে পরদিন সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনার আগে ৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নদীতে পড়ে যায় পাঁচ বছরের নূরী খাতুন ও আট বছরের জামিলা খাতুন। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করলেও নূরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় পরদিন মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে।
১৪ আগস্ট কুমারখালীর শিলাইদহ পদ্মা নদীর ঘাটে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু আলিফ হোসেন। একই দিন সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল (৩৮)।
শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, এসব ঘটনায় উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে পানির নিচে উদ্ধার অভিযান চালাতে পারেন না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় উপকরণ নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব ব্যবস্থা প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প নয়।
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেনের বক্তব্যে সমস্যাটির প্রশাসনিক দিকটিও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, কুষ্টিয়া নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। খবর পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে খুলনা থেকে ডুবুরি দলকে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
ওয়াদুদ হোসেন বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খুলনার ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, সমস্যাটি যে নতুন নয়, তা ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব বক্তব্যেই স্পষ্ট। ঝুঁকিপূর্ণ নদীপথ, নিয়মিত দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘদিনের দাবির পরও কুষ্টিয়ায় কেন স্থায়ী ডুবুরি দল গঠন হয়নি—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামাজিক সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন বলেন, ‘যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতো প্রমত্তা নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়া জেলায় স্থায়ী ডুবুরি দল নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখন উদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তারা হতে পারেন না।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
মোস্তাকিমের মা শিউলি খাতুনের আহাজারিতেও সেই অপেক্ষার অসহায়তা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমার ছাওয়াল ছুটির দিন বন্ধুগোরে সাথে নদীর পাড়ে খেলতে যায়ে ডুবে গেল। এখনও ছাওয়ালটার খোঁজ পালাম না। খুলনা থেকে লোক আসপে, তারপরে উদ্ধার হবে—এই অপেক্ষা করতি হচ্ছে।’
কুষ্টিয়ার মতো নদীবেষ্টিত একটি জেলায় দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দেড়শ কিলোমিটার দূর থেকে ডুবুরি দলের আসার ওপর নির্ভরতা কতটা কার্যকর—এ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। আর ততদিন নদীতে নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি ঘটনায় স্বজনদের অপেক্ষার সময়টিই হয়ে থাকছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
৫ দিন আগে
শীতলক্ষ্যায় স্পিডবোট থেকে পড়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি নিখোঁজ
নারায়ণগঞ্জে নিজেদের পন্টুনের সামনের কচুরিপানা পরিষ্কার করার সময় স্পিডবোট থেকে পড়ে গিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিখোঁজ হয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের এক সদস্য।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে নগরীর নিতাইগঞ্জের ফায়ার ঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানান নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন।
নিখোঁজ সাদিক (২৬) নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি। পানিতে ডুবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারই ছিল তার কাজ।
গত মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের লেকে গোসলে নেমে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের কাজেও ছিলেন সাদিক। তার বাড়ি রাজবাড়ি জেলার গোয়ালনন্দ বাজারের কুমরাকান্দি গ্রামে। ঐ গ্রামের আশরাফ উদ্দিনের ছেলে সাদিক গত বছর সেরা ডুবুরি হিসেবে ফায়ার সার্ভিস পদক পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা।
আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের জেটির সামনে কচুরিপানা জমে থাকে। এসব কচুরিপানা পরিষ্কারে কাজ করছিলেন নিখোঁজ সদস্যসহ তিনজন। স্পিডবোটের সামনের দিকে থাকা সাদিক ঢেউয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যান।
তার সঙ্গে থাকা অপর দুই সদস্যের বর্ণনা অনুযায়ী, সামনের দিকে থাকা সাদিক পড়ার সময় মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন বলে ধারণা করছি। কেননা, তিনি প্রশিক্ষিত ডুবুরি, কোনো আঘাত না পেলে তিনি এভাবে নিখোঁজ হতেন না। নিখোঁজ সহকর্মীকে খুঁজতে ফায়ার সার্ভিস ছাড়াও কোস্টগার্ডের সদস্যরাও শীতলক্ষ্যা নদীকে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন।
তবে বিকেল ৪টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাদিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে সাদিকের পরিবারের সদস্যরা শীতলক্ষ্যা নদীর ডালপট্টি ফায়ার ঘাটে এসেছেন।
বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামাল। তাকে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়।
৫৪ দিন আগে
রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় মাত্র ৫ ডুবুরি, এক মাসে পানিতে ডুবে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি
নদ-নদী, পুকুর, খাল-বিলবেষ্টিত রংপুর বিভাগের আটটি জেলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। বিশাল এ অঞ্চলের জন্য এ সংখ্যা শুধু অপ্রতুলই নয়, বরং উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিভাগের কোনো জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির নির্দিষ্ট কোনো পদ নেই। ফলে পানিতে ডুবে কেউ নিখোঁজ হলে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের এই পাঁচ ডুবুরির ওপরই নির্ভর করতে হয় পুরো বিভাগের মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক মাসেই রংপুর বিভাগের আট জেলায় অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু ডুবুরি সংকটের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার আগেই নিভে যাচ্ছে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা।
রংপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও—এই আটটি জেলা ভৌগোলিকভাবে নদীমাতৃক অঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, নৌকাডুবি, বন্যা ও বিভিন্ন জলাশয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখানে বেশি। কিন্তু সেই ঝুঁকির তুলনায় উদ্ধার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের মতো দূরবর্তী জেলা থেকে জরুরি কল এলে রংপুর থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ততক্ষণে নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় উদ্ধারকর্মীদের।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ২২টি উদ্ধার-সংক্রান্ত কল পেয়েছে বিভাগীয় ডুবুরি দল। এসব ঘটনায় পানিতে ডুবে যাওয়া ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাস্তবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
গত এক মাসে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ৩ মে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নীরব নামে তিন বছরের এক শিশু, ১২ মে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশু, ১৬ মে তিস্তা নদীতে ডুবে দুই ভাই, ২০ মে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সাবিয়া জান্নাত (৬) ও সিয়াম (৪), ২৭ মে গঙ্গাচড়ায় রুশা মনি (১৫) ও তার ভাই সাইফ (৫), ২৮ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে মোমিন আলী, ২৯ মে রংপুরের তারাগঞ্জে অহিদ ইসলাম (১৫) ও মাসুদ রানা (১৬), ৩ জুন দিনাজপুরের খানসামায় আত্রাই নদীতে মান্না ইসলাম (৪৫) ও সাদ্দাম হোসেন (৩২), ৩১ মে কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে চার বছরের এক শিশু, ১ জুন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সৃজন কুমার (৬) ও বৃন্দা রানী (৫) এবং ৬ জুন সাদুল্লাপুরে সিনথিয়া আক্তার (১১) পানিতে ডুবে মারা যায়।
এছাড়া ৩ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে রংপুরের পীরগাছায় ছয় শিশু, ৫ জুন ঘাঘট নদীতে নেমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, ৭ জুন পঞ্চগড় সদর উপজেলায় দুই মাদরাসাছাত্র এবং একই দিনে নীলফামারীর ডিমলায় রুপাইয়া (৪) ও আশফিকা (৪) নামে দুই চাচাতো বোনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ৭ জুন লালমনিরহাটে ধরলা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে ২৫ সদস্যের একটি ডুবুরি ইউনিট গঠনের মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তাদের দেশের বিভিন্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে পদায়ন করা হয়। সে সময় রংপুরে দুইজন ডুবুরি দায়িত্ব পান। প্রায় তিন দশক দুই ডুবুরি দিয়ে কাজ চালানোর পর ২০১৯ সালে আরও তিনজন যোগ দিলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে। এরপর আর কোনো জনবল বাড়েনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়লেও ডুবুরি সংকট কাটেনি।
ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, পানি বহনকারী গাড়ি, ফোম টেন্ডার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির কোনো পদ সৃষ্টি না হওয়ায় সংকট আগের মতোই রয়ে গেছে।
বর্তমানে রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ডুবুরি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পঞ্চগড় থেকে কল এলে রংপুর থেকে যেতে অন্তত দুই-আড়াই ঘণ্টা লাগে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন, এত দেরি হলো কেন। কিন্তু দূরত্বের বাস্তবতা তো অস্বীকার করা যায় না।’
তিনি জানান, অনেক সময় পঞ্চগড়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ শেষ করে গাইবান্ধায় যেতে হয়। আবার সেখান থেকে লালমনিরহাট বা অন্য জেলায় ছুটতে হয়। কখনও টানা পাঁচ থেকে সাত দিন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় উদ্ধার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ডুবুরির সংখ্যা বাড়লে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
রংপুর নগরীর কটকিপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক রোভার স্কাউট সদস্য সাব্বির আহমেদ বলেন, ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পঞ্চগড়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রংপুর থেকে ডুবুরি পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এ সময়ে একজন মানুষের পানির নিচে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকে না। ফলে ডুবুরিরা গিয়ে কেবল মরদেহ উদ্ধারের কাজই করতে পারেন। এ অবস্থায় ডুবুরির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট অযৌক্তিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডুবুরি সংকটের পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও পানিতে ডুবে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। শিশুদের একা না রাখা, জলাশয়ের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো এবং সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, সাঁতার না জেনে পানিতে নামা উচিত নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের কোনো অবস্থাতেই একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশ স্কাউটসের লিডার ট্রেইনার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ডুবুরি না থাকায় পানির নিচে উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হয় না। রংপুর বা অন্য জেলা থেকে ডুবুরি আসতে যে সময় লাগে, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মতে, রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ ডুবুরি ইউনিট থাকা প্রয়োজন, যেখানে পাঁচ থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত ডুবুরি থাকবেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা জরুরি। অন্যথায় ডুবুরি সংকটের এই মূল্য রংপুরবাসীকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হবে।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডুবুরিদের কোনো জেলা পর্যায়ের পদ নেই। তারা বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত থাকেন এবং সেখান থেকেই বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান জনবল দিয়ে এত বড় অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন ডুবুরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে তারা জেনেছেন।
রংপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘বারবার ডুবুরি চেয়ে অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এখনও সংকট কাটেনি। তবে আশা করছি, খুব দ্রুতই নতুন ডুবুরি পাওয়া যাবে।’
৮৮ দিন আগে