বৈদেশিক লেনদেন
ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক লেনদেন সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা
দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সেবা খাতকে সহায়তা করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ (এফইপিডি-১) এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি), বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) এবং অন্যান্য অনলাইন পেশাগত সেবার মতো অদৃশ্য (নন-ফিজিক্যাল) সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত ইএক্সপি ফরম জমা দিতে হবে না। তবে এসব সেবা থেকে অর্জিত রপ্তানি আয় দেশে আনা, তা দেশে ফেরত পাঠানো (রিপ্যাট্রিয়েশন) এবং রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফ্রিল্যান্সাররা বিদেশি ক্রেতার কাছে সেবা দেওয়ার পর অর্থ গ্রহণ করতে পারবেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত চালান বা শিপিং ডকুমেন্ট না থাকলেও ই-মেইল, অনলাইন চুক্তিপত্র, প্ল্যাটফর্ম স্টেটমেন্ট, ডিজিটাল ইনভয়েস, রেমিট্যান্স বার্তাসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ব্যাংক গ্রাহকের হিসাবে অর্থ জমা করতে পারবে। একই সঙ্গে যোগ্য ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটার (ইআরকিউ) হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার অনুমোদিত অংশ সংরক্ষণের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অর্থ পর্যন্ত রেমিট্যান্স গ্রহণের ক্ষেত্রে ফর্ম-সি জমা দিতে হবে না। তবে এর বেশি অর্থ এলে নির্ধারিত নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইন ফর্ম-সি (আইসিটি) জমা দিতে হবে, যদি না বিদ্যমান অন্য কোনো নির্দেশনায় ছাড় দেওয়া থাকে।
সার্কুলারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার (ওপিজিএসপি) ব্যবহার করে ক্ষুদ্র অঙ্কের সেবা রপ্তানি আয় দেশে আনার সুযোগও বহাল রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদেশে কোনো ন্যাশনাল হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখা যাবে না; সব অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এ ছাড়া যোগ্য ফ্রিল্যান্সারদের জন্য দ্বৈত মুদ্রাভিত্তিক ফ্রিল্যান্সার কার্ড ইস্যু, বিদেশি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের সঙ্গে সমন্বয়ে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিএসপি) মাধ্যমে রপ্তানি আয় দেশে আনা এবং ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার, ডেটা প্রসেসিংসহ আইসিটি খাতের সেবা রপ্তানিকারকেরা তাদের নিট রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রায় ইআরকিউ হিসাবে রাখতে পারবেন। অন্যান্য বৈধ সেবা রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে এই সীমা ৩০ শতাংশ। অবশিষ্ট অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে টাকায় রূপান্তর করে স্থানীয় হিসাবে জমা দিতে হবে। ইআরকিউ হিসাবের অর্থ বিদেশ ভ্রমণ, সফটওয়্যার নিবন্ধন, ডোমেইন ও হোস্টিং ফি, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বৈধ ব্যক্তিগত ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করা যাবে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী কর কর্তন ও পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সব লেনদেনে কেওয়াইসি, এএমএল/সিএফটি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। সেবা রপ্তানির অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে আনতে হবে এবং অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে বিদেশে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বা ভার্চুয়াল সম্পদের মাধ্যমে রপ্তানি আয় রেখে দেওয়া বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই নির্দেশনা ডিজিটাল বাণিজ্য ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে। প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার ফলে বৈদেশিক আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে আনার প্রবণতা বাড়বে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়িক মহলের মতে, এ উদ্যোগ ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বৈদেশিক লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সেবা রপ্তানিকে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
২ ঘণ্টা আগে