তিস্তা ভাঙন
তিস্তার পানি বাড়া-কমায় পাকা ধান নিয়ে ১৮০ চরের কৃষকের দুশ্চিন্তা
উত্তরের তিস্তা নদীবেষ্টিত ১৮০টি চরের কৃষকের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। তিস্তার পানি কখনও বাড়ছে, আবার কখনও কমছে। পানির এমন ওঠানামায় রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলার চরাঞ্চলের কৃষকরা পাকা ধান নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন। ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে পানি বেড়ে গেলে নিচু জমির পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
কৃষি বিভাগ থেকে অবশ্য আগাম জাতের পাকা ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চরের কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পুরো চরাঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলেও জানান আঞ্চলিক কৃষি কর্মকর্তা আবু বকর সাইফুল ইসলাম।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, পাঁচ জেলার ১৮০টি চরে এবার ২২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। ফলনও হয়েছে বাম্পার। তিস্তার পানি ওঠানামা না করলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক কৃষি কর্মকর্তা আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, সাধারণত মধ্য অক্টোবরের পর তিস্তার পানি ওঠানামা করে। আগের বছরগুলোতে তিস্তার পানিতে পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বেকায়দায় পড়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবার কৃষকরা লাভবান হবেন।
চরাঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বিভিন্ন চরের জমিতে আমন ধান পাকতে শুরু করেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই এসব জমির ধান কাটার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে তিস্তার পানি ওঠানামা করায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। হঠাৎ পানি বাড়লে পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকরা জানান, চরাঞ্চলের অনেক জমি নদীর কাছাকাছি ও নিচু। ফলে হঠাৎ পানি বেড়ে গেলে এসব জমি দ্রুত প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাকা ধান পানিতে ডুবে গেলে ঘরে তোলার আগেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
হরিশ্বর গ্রামের কৃষক জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘যখন পানির দরকার হয়, তখন পানি পাওয়া যায় না। আবার যখন ফসল ঘরে তোলার সময় আসে, তখন পানি বাড়লে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। কয়েক দিন পর ধান কাটার কথা। তার আগ পর্যন্ত আতঙ্কেই থাকতে হচ্ছে।’
গদাই গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সারা বছর পরিশ্রম করে ধান ফলিয়েছি। এখন শুধু ঘরে তোলার অপেক্ষা। এই সময়ে নদীর পানি বেড়ে গেলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।’
কৃষকদের দাবি, আমন ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত তিস্তার পানির পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। পানিবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিলে চরাঞ্চলের কৃষকদের দ্রুত সতর্ক করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এতে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ফসল রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন তারা।
ভোটমারী চরের কৃষক সাহানুর রহমান জানান, গত বছর এই সময়ে তিস্তার পানিতে তার সাড়ে তিন বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবার তিনি চরে সাত বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আবহাওয়া খারাপ, তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। জানি না এবার কী হবে।’
এদিকে চর গড্ডিমারীর কৃষক মনিরুজ্জামান সরকারের জমিতে তিস্তার পানি উঠেছে। তিনি বলেন, ‘বড় চিন্তায় রয়েছি, কী হবে? পাকা ধান ঘরে তুলতে পারব কি না, তা নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে হতাশায় ভুগছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, তিস্তার চরাঞ্চলের পাকা ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধি বা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলে তাদের আগাম সতর্ক করা হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান ঘরে তোলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
১০ দিন আগে
চোখের সামনেই নদীগর্ভে বিলীন বসতবাড়ি, অসহায় তিস্তাপাড়ের মানুষ
উত্তরের পাঁচ জেলায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছে তিস্তার ভাঙন, জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলেও প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। গত সাত দিনে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তার ভাঙনে ৩৮৬টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেছেন, শুধু ভাঙনেই থেমে নেই, এই পাঁচ জেলার ১১৩টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে তেমন কোন বরাদ্দ না থাকায় ঠেকানো যাচ্ছে না। আমরা মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি জানিয়েছি।
তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে প্রতিদিনই বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সম্প্রতি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের সিংগীজানী ও ভোরের পাখি এলাকায় হঠাৎ ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন ধরে তিস্তা নদীতে স্রোতের চাপ বাড়ছিল। হঠাৎ স্রোতের তীব্রতা বেড়ে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে একের পর এক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ভাঙন এতটাই আকস্মিক ছিল যে অনেক পরিবার ঘরের আসবাবপত্র, ধান-চাল, কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পায়নি। চোখের সামনে বসতভিটা ও ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। কেউ কয়েকবার বসতভিটা পরিবর্তন করেছেন, আবার কেউ নদীর পাড়ে নতুন করে ঘর তুলেছেন। কিন্তু এবার আকস্মিক ভাঙনে অনেকের সেই শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে চলে গেছে।
৩১ দিন আগে
‘তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার বিপদ, নামি গ্যাইলেও বিপদ’
তিস্তা নদীর পানি বাড়লে দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি, আর পানি কমে গেলে দেখা দেয় ভাঙন পরিস্থিতি। বন্যা আর ভাঙনের কষাঘাতে চরম কষ্টে বসবাস করছেন রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের মানুষ। লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী বিপুল সংখ্যক পরিবারের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিণচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি জানান, গতকাল সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত তিস্তা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তাদের বাড়িঘরে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় গতকাল বিকেলেই তারা গবাদি পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছেন।
তিনি জানান, জমিতে লাগানো রোপা আমন ধানের চারা পানিতে তলিয়ে গেছে। ৪-৫ দিনের মধ্যে খেত থেকে নদীর পানি নেমে না গেলে ধান গাছের ক্ষতি হবে।
এই কৃষকের ভাষায়, ‘হামরাগুলা তিস্তাপাড়োত কষ্ট করি বাঁচি আছি। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ আর নাই। তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার কষ্ট আর পানি নামি গ্যাইলেও হামারগুলার কষ্ট। পানি বাড়লে বান হয় আর পানি নামি গ্যালি নদীভাঙন শুরু হয়। হামারগুলার খালি বিপদ আর বিপদ।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আকবর আলী জানান, গতরাতে তার বাড়িতে হাঁটু পানি ছিল। ফলে তারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদে চলে এসেছেন। আজ সকাল থেকে পানি কমছে। তবে আবারো তিস্তায় পানি বাড়তে পারে বলে ধারণা তার।
৭৩ দিন আগে
তিস্তা ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার দাবিতে রংপুর পাউবো ঘেরাও
রংপুরে চলতি বন্যা মৌসুমে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে জমি, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কার্যকর উদ্যোগ না থাকার অভিযোগ তুলে জিওব্যাগ ফেলার দাবিতে রংপুর পাউবো কার্যালয় ঘেরাও করেছেন তিস্তা পাড়ের শতাধিক বাসিন্দা।
রবিবার (২৬ জুলাই) দুপুরে রংপুর নগরীর আলমনগরে পাউবো কার্যালয়ের সামনে তারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে কার্যালয় ঘেরাও করে দ্রুত ভাঙনকবলিত এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে নদীভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানান।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে তিস্তা নদীতে কয়েক দফা ভাঙনে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা, আবাদি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা হারিয়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। কিন্তু বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী বা জরুরি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদীর চর বাগডোগরা, মিনা বাজার বিনবিনা কোলকন্দ এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে চর মিনাবাজারের আব্দুল গোফ্ফার হোসেন বলেন, আমার বাড়িঘর রক্ষা করার জন্য টাকা তুলে একটা বাঁধ বানিয়েছিলাম, কিন্তু এবারের বন্যায় সেই বাঁধটাও ভেঙে গেছে। সেই সঙ্গে কয়েকটা বাড়িও ভেঙে গেছে। এখন আমার বাড়িও ভেঙে যাবে। পানি উন্নয়নের কর্মকর্তারা আমার কোনো খোঁজখবর নেয় না। সেইজন্য আমরাই তাদের খোঁজ নিতে এসেছি।
বাগডোহরা চরের বাসিন্দা গোলজার আহম্মেদ বলেন, এবারের বন্যায় ভেঙে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। বাড়ি ভেঙে গেলে আমরা কোথায় থাকব সে চিন্তায় করছি। কিন্তু পাউবো কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমরা চাই চরগুলোর যেখানে ভাঙন দেখা দিয়েছে সেখানে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন বন্ধ করা হোক।
চর বিনবিনার মমিনুর রহমান বলেন, আমরা সবাই মিলে টাকা তুলে একটি বাঁধ দিয়েছিলাম। সেই বাঁধ এ বছর বন্যায় ভেঙে গেছে। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানালে তারা আমাদের কয়েকটা বস্তা দেয় শুধু। এলাকায় টাকা তুলে সেই বস্তা ভরে আমরা ভাঙন রোধের চেষ্টা করি। কিন্তু এত অল্প বস্তা দিয়ে এত বড় ভাঙন রোধ করা যায় না। আমরা চাই পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদার নিয়োগ করে বাঁধগুলো সংস্কার করে দিক।
গঙ্গাচড়া উপজেলার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের পকেট ভরা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। এদিকে তিস্তার ভাঙনে প্রতিদিন মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। সেদিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, বাঁ তীরে এবং ডান তীরে কোথাও গুরুতর ভাঙন দেখা দেয়নি। আর যেখানে কিছুটা ভাঙন দেখা দিয়েছে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলে তা রোধ করা হচ্ছে। বাঁ তীরের ভাঙনের যে অভিযোগ নিয়ে এসেছে, সেটি মূলত নদীর ভেতরের অংশ; সেখানে কিছু মানুষ বসবাস করে।
৮৪ দিন আগে