পেয়ারাবাগান
প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষায় ঝালকাঠির ভিমরুলি পেয়ারাবাগানে বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে দুর্ঘটনা
ঝালকাঠির সদর উপজেলার কীর্তিপাশা-ভিমরুলিসহ বিভিন্ন পেয়ারাবাগান এলাকায় পর্যটকদের চলাচল ও নৌভ্রমণে উচ্চশব্দে গান বাজানো, অশালীন আচরণ এবং বেপরোয়া ট্রলার চলাচল নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার নির্দেশনা ও সতর্কতা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। তবে প্রশাসনের এসব নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, বারবার আহ্বান ও বিধিনিষেধ জারি করা হলেও এক শ্রেণির ভ্রমণপিপাসু নির্ধারিত নিয়ম মানছেন না। ফলে এলাকার পরিবেশ, জনশৃঙ্খলা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুতগতির ট্রলারের সৃষ্ট ঢেউয়ে পেয়ারাবোঝাই ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া পর্যটকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভিমরুলি ভাসমান হাটে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। এ সময় অনেক ট্রলারে সাউন্ড বক্সে উচ্চশব্দে গান বাজানো হয় যা পুরো পরিবেশকে ভারী করে তোলে। দ্রুতগতির ট্রলারের ঢেউয়ে এরই মধ্যে পেয়ারাবোঝাই কয়েকটি ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
গত ১৭ জুলাই ভ্রমণে গিয়ে একটি আমগাছ থেকে খালে লাফ দিয়ে নিখোঁজ হয় সানি (১৩) নামে এক কিশোর। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো এবং পরিবেশ, প্রকৃতি, জনশৃঙ্খলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সম্প্রতি একটি নির্দেশনামূলক নোটিশ জারি করেছে ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেগুফতা মেহনাজ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলি পেয়ারাবাগান ও ভাসমান পেয়ারার বাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত একটি স্থান। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবেশগত ভারসাম্য (ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স) এবং স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে কয়েকটি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
নোটিশে বলা হয়েছে, পেয়ারাবাগান ভ্রমণের সময় ডিজে সিস্টেম, লাউডস্পিকার বা উচ্চমাত্রার শব্দের কোনো সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না, কারণ তা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এছাড়া ইঞ্জিনচালিত বড় ট্রলার নিয়ে ভাসমান পেয়ারার বাজার বা বাগানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, বড় ট্রলার বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে এবং জলজ ও স্থলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
পর্যটকদের ছোট ও মাঝারি আকারের ইঞ্জিনবিহীন নৌযান ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, পর্যটকদের সঙ্গে আনা খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ কোনো ধরনের বর্জ্য পানিতে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিটি নৌযানে অন্তত একটি করে ডাস্টবিন রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি ট্রলার বা নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নৌযানের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
নোটিশে অনুমতি ছাড়া পেয়ারাবাগানে প্রবেশ, পেয়ারা বা আমড়া সংগ্রহ এবং গাছের ডালপালা ভাঙা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের সুশৃঙ্খল আচরণ, শালীনতা বজায় রাখা, ইভটিজিং থেকে বিরত থাকা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ‘আসুন সবাই মিলে ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারা বাগানের পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব রাখি। এ বাগান আমাদের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় আসুন সবাই সচেতন হই। পর্যটন এলাকার সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সবার সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের নির্দেশনা সত্ত্বেও অনেক পর্যটক বিধিনিষেধ না মেনেই ভ্রমণ করছেন। অনেক নৌযানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং অশোভন আচরণের কারণে এলাকায় শব্দদূষণ বাড়ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের প্যাকেট, পানির বোতল, খাবারের মোড়কসহ বিভিন্ন বর্জ্য খাল, নদী ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত নৌচলাচল এবং প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্যের কারণে পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, শুধু সতর্কীকরণ নয়, নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পরিবেশ রক্ষা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ইউএনও সেগুফতা মেহনাজ বলেন, ‘পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিমরুলির পর্যটন আকর্ষণ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
৩ ঘণ্টা আগে