রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
আইসিইউর অপেক্ষায় রমেক হাসপাতালে মৃত্যুর মিছিল
একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে যেখানে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও শয্যা না থাকায় অপেক্ষমাণ তালিকাতেই থেকে যাচ্ছেন রোগীরা। শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে যাওয়ার আগেই কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে।
রংপুর বিভাগের আট জেলার ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন হাজার রোগী এখানে ভর্তি থাকেন। হাসপাতাল সূত্র বলছে, ভর্তি রোগীদের অন্তত ১০ শতাংশের আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয়। অথচ হাসপাতালটির আইসিইউতে শয্যা রয়েছে মাত্র ১০টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর জন্য আইসিইউ শয্যার অনুরোধ আসে। বিপরীতে ১০টি শয্যা থাকায় চাহিদার বড় একটি অংশই পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম লিখিয়েও শয্যা পাওয়ার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
আইসিইউ বিভাগের পরিদর্শক ডা. তৌহিদ সরকার ডলার বলেন, ‘প্রতিদিন বহু রোগীর আইসিইউর জন্য রিকোয়েস্ট আসে। আমরা সব রোগীর অনুরোধ রাখতে পারি না। অনেক রোগী আইসিইউ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেডের সঙ্গে আইসিইউতে জনবল এবং বিভাগের জায়গা বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে উত্তরবঙ্গের এই বিশাল জনগোষ্ঠী সেবা বঞ্চিত হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।’
১০ শয্যার আইসিইউতে বিপুল চাপ
ইউএনবির হাতে আসা রমেক হাসপাতালের আইসিইউতে অপেক্ষমাণ ১২ জন রোগীর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের অধিকাংশই আইসিইউ শয্যা না পেয়ে মারা গেছেন। তাদের কয়েকজনের স্বজনের সঙ্গে কথাও বলেছে ইউএনবি।
রংপুর নগরীর ধাপ সাতগাড়া এলাকার মহসেনা বেগমের মেয়ের জামাই শফিক জানান, বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে তার শাশুড়িকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
শফিক বলেন, ‘আইসিইউর রোগী ১০ মিনিট বাইরে রাখার সুযোগ নেই। অথচ তিন দিন অপেক্ষার পরও আইসিইউ বেড না পেয়ে প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। কয়েক দফা রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছি। গত বুধবার শাশুড়ি মারা গেছেন। আমার রোগীটা সময়মতো আইসিইউ সাপোর্ট পেলে হয়তো আরও কিছু দিন বেঁচে থাকতেন।’
কুড়িগ্রামের ৭২ বছর বয়সী রহিচা বেগম স্ট্রোকের পর প্রথমে রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাসেবায় অসন্তুষ্ট হয়ে স্বজনরা তাকে রমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ নেওয়া হয়।
তার ছেলে আরমান ফেরদৌস বলেন, ‘ভর্তির তিন দিন পর অচেতন অবস্থায় আমার মাকে কোনো কারণ জানানো ছাড়া রিলিজ দিয়ে বলা হয় আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে না। আবার এক দিন পর নেফ্রোলজির চিকিৎসকরা আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইসিইউতে সিট আর পাইনি। আমার মা মারা গেছে।’
কুড়িগ্রামের চিলমারীর রমনা গড়াতিপাড়া থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় ৪৫ বছর বয়সী বিউটি বেগমকে রমেক হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। গত ২ জুন জরুরি ভিত্তিতে তাকে অস্ত্রোপচার বিভাগে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, অস্ত্রোপচারের পর তাকে আইসিইউতে নিতে হবে এবং আইসিইউ শয্যা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়।
চিকিৎসকের অনুমতিপত্র নিয়ে দফায় দফায় চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা মেলেনি। পরদিন ৩ জুন দুপুর ১২টায় মারা যান বিউটি বেগম।
তার ভাতিজির জামাই নূর আলম বলেন, ‘আইসিইউ পেলে শাশুড়িকে বাঁচাতে পারতাম। বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে অনেক খরচ। রোগী মারা যাওয়ার পরও ওরা (বেসরকারি হাসপাতাল) রেখে দেয়। এ জন্য বাইরের হাসপাতালে নিয়ে যাইনি। আমার রোগী ভর্তি থাকা অবস্থায় তিনটা আইসিইউ বেড ফাঁকা হয়েছিল। কিন্তু আমার রোগীকে নেয়নি। যাদের বড় বড় লোক আছে, তারাই আইসিইউতে বেড পায়।’
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী এলাকার ৮০ বছর বয়সী মো. সোবহান সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাকে রমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। গত ১ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চিকিৎসক তাকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আইসিইউ শয্যা না পেয়ে পরদিন ২ জুন রাত ৩টায় মারা যান তিনি।
তার নাতনি হ্যাপি বেগম বলেন, ‘দাদুকে আইসিইউতে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। আমরা খুব চেষ্টা করেছি। কিন্তু আইসিইউ ফাঁকা ছিল না। সময়মতো আইসিইউতে নিতে না পারায় আমার দাদু মারা গেছে। এত বড় একটা হাসপাতাল। এখানে মাত্র ১০টা আইসিইউ দিয়ে কীভাবে চলে।’
৪ ঘণ্টা আগে