স্পেকট্রাম নীতি
স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়ে স্পেকট্রাম নীতির আহ্বান
স্পেকট্রামকে শুধু সরকারি রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
তারা বলেছেন, সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘স্পেকট্রাম ফর এ কানেকটেড বাংলাদেশ: এনাব্লিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রাম বরাদ্দের মূল্য এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উন্নত ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে স্পেকট্রামের মূল্য অর্ধেক বা তারও বেশি কমিয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী ।
টিআরএনবির সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিয়াদ সাতারা, বাংলালিংক সিইও ইয়োহান বুসে, গ্রামীণফোন সিইও ইয়াসির আজমান, এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এবং এফআইসিসিআইয়ের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর টিআইএম নূরুল কবীর।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান এবং স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।
স্পেকট্রাম নবায়ন প্রসঙ্গে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, এ বিষয়ে অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নেটওয়ার্কের মান, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল, সেবার সক্ষমতা ও গ্রাহকের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন না হয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
টেলিযোগাযোগ খাতে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে এককালীন রাজস্ব আয়ের পরিবর্তে গ্রাহকসেবা, অপারেটরদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ‘সুইট পয়েন্ট’ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী।
তিনি বলেন, টেলিকম নীতি ও স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে।
আগামী নভেম্বরে বড় পরিসরে স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে না নিয়ে সংবেদনশীল ও জাতীয় পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক কাঠামোর বৈষম্য ও স্পেকট্রাম ঘাটতির কথা তুলে ধরে এমদাদ উল বারী বলেন, বিশ্বমান অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ২ থেকে ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে এ হার মাত্র ২ দশমিক ২৯ মেগাহার্টজ।
২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রয়োজন হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ৪৬০ থেকে ৪৬২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী বছর আরও ৪০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা রয়েছে।
এমটব প্রেসিডেন্ট জিয়াদ সাতারা বলেন, স্পেকট্রামের প্রকৃত মূল্য শুধু সরকারের রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা উচিত নয়। বরং এর মাধ্যমে যে উন্নত সংযোগ, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হয়, সেগুলোর ভিত্তিতেই এর মূল্যায়ন করা উচিত।
তিনি বলেন, স্পেকট্রামের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হলে অপারেটরদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের পরিবর্তে স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় করতে হতে পারে। এতে শেষ পর্যন্ত সেবার মান এবং গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘সাশ্রয়ী মূল্যে স্পেকট্রাম নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু অপারেটরদের সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো উন্নততর সংযোগ নিশ্চিত করা, অধিক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা,’ বলেন তিনি।
বাংলালিংক সিইও ইয়োহান বুসে বলেন, গত ১০ বছরে দেশে টেলিকম খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, যদিও এই খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই সাশ্রয়ী মূল্যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হলে সেবার মান বাড়বে, দেশের উন্নয়ন হবে এবং এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে এবং সঠিক সমাধান ও করণীয় নির্ধারণে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, টেলিকম শিল্পের কাঠামো ও বাস্তবতা মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ভয়েস কলের মিনিট ২৫ শতাংশ কমেছে এবং এআরপিইউ (ARPU) অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, গত পাঁচ বছরে জাতীয় রাজস্ব কোষাগারে এ খাতের অবদান বেড়েছে, কিন্তু বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্ত রিটার্ন কমেছে।
‘এই প্রেক্ষাপটে আমাদের আরও বিবেচনা করতে হবে, স্পেকট্রাম নবায়নের অর্থনৈতিক কাঠামো অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সক্ষমতা বজায় রাখার সুযোগ দেবে কি না,’ বলেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান বলেন, ২০০৮ সালে স্পেকট্রাম বরাদ্দের সময় ১৮ বছরের জন্য স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছিল এবং তখন থেকে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আহরণ করা।
তিনি বলেন, গত ১৫ থেকে ১৮ বছরের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, টেলিযোগাযোগ খাত দীর্ঘদিন ধরে সীমিত স্পেকট্রাম হোল্ডিং, অপর্যাপ্ত ফাইবার অবকাঠামো, টাওয়ার সাইটে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং স্পেকট্রামের উচ্চমূল্যের মতো বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।
‘এসব সীমাবদ্ধতা শেষ পর্যন্ত সেবার মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সক্ষমতাকেও সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৩তম অবস্থানে ছিল,’ বলেন তিনি।
মুনির হাসান বলেন, সমমানের অন্যান্য বাজারের বৈশ্বিক উদাহরণগুলো দেখায় যে আরও প্রগতিশীল স্পেকট্রাম নীতি—বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে বেশি পরিমাণ স্পেকট্রাম এবং দ্রুততম সময়ে বরাদ্দ—নেটওয়ার্কের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে।
উন্নত কানেক্টিভিটির মাধ্যমে বৃহত্তর ডিজিটাল অর্থনীতিতে ডিজিটাল সেবা, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্পেকট্রাম থেকে তাৎক্ষণিক রাজস্বের বাইরে তাকিয়ে জাতীয় ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত স্পেকট্রামের অর্থনৈতিক মূল্য সীমিত। অন্যদিকে, স্পেকট্রামের মূল্য অতিরিক্ত বেশি নির্ধারণ করা হলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতে বিনিয়োগের পরিবর্তে স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে মূলধনের বড় অংশ ব্যয় করতে হতে পারে।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহও বাড়তে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম না থাকায় ঘাটতি পূরণ করতে অপারেটরদের অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি কিনতে হয়।
‘একটি ভিন্ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল তৈরি করতে পারে—স্পেকট্রামের খরচ কমানো, আরও বেশি স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা এবং তা দ্রুত ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা। এর ফলে অপারেটররা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, সেবার মান উন্নত হবে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমজুড়ে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে,’ বলেন মুনির হাসান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, পাকিস্তান, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ সম্প্রতি ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ফি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছাড়াই স্পেকট্রামের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ফলে দেড় দশক আগের মূল্য নির্ধারণের যুক্তি বর্তমান বাস্তবতায় আর প্রযোজ্য নয়।
তারা আরও বলেন, দেশের বিরাট অংশের মানুষ এখনও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। পাশাপাশি ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের হাতেও এখনও স্মার্টফোন নেই। গড়ে একজন গ্রাহক মাসে আট গিগাবাইটের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না।
এ অবস্থায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার ঘটাতে সাশ্রয়ী ব্যয়ে উন্নত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন তারা।
১১ দিন আগে