নদীভাঙন
হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর বাঁধে ফের ভাঙন, বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত
জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ পরিদর্শন করার পর পরই আবারও ভেঙে গেল খোয়াই নদীর বাঁধ।
রবিবার (২৩ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাঁধ মেরামত কাজ পরিদর্শনে যান জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ ৩ আসনের এমপি জি কে গউছ। এ সময় তিনি কাজের মান দেখে বাঁধ টিকবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এর আগে, গত ৯ জুলাই রাতে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ নামকস্থানে প্রবল স্রোতে নদীর ২০০ ফুট বাঁধ ভেঙে যায়। এতে আমন ধানের জমি, শাকসবজির খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রায় ৩০ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিববন্দি হয়ে পড়েন। জরুরি বাঁধ মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রায় এক কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হুইপ পরিদর্শনের আধ ঘণ্টা পরই পানির তোড়ে বাধ ভেঙে যায়। এতে পুনরায় পূর্বের জমি অন্যান্য স্থানগুলোতে পানি প্রবেশ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন জানান, বাঁধের কাজ খুবই নিম্নমানের হচ্ছে।
তবে ঠিকাদার টিপু আহমেদ কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে জানিয়ে বলেন, হঠাৎ ভারতের অংশে স্লইসগেট খুলে দেওযায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ৮৮ লাখ টাকার কাজের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের কাজ শেষ হয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।
তিনি আরও জানান, প্রায় ২০০ ফুট লম্বা, ৩০ ফুট প্রস্থ ও ৩০ ফুট উচ্চতার এ কাজটিতে মাটি ভরাট, জিও ব্যাগ, জিও কার্পেট বসানো হবে। কিন্তু হঠাৎ পানি বেড়ে যাওযায় বাঁধের সমস্ত মাটি ও বালু ভেসে গেছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
১১ দিন আগে
গাইবান্ধায় এক মাসে তিন নদীর পেটে ৯ স্কুল, ভাঙনের মুখে আরও ৬
ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই মাত্র এক মাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে গেছে ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এতে এসব বিদ্যালয়ের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও পাঠদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আরও ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের মুখে। সব মিলিয়ে ১৫টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গেল মঙ্গলবার সকালে তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলেছে। এতে লাখ লাখ টাকার বিল তোলা হলেও বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া বলেন, ‘স্কুলটি রক্ষার জন্য অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু কে শোনে কার কথা। সবাই ঘোরে টাকার পেছনে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রক্ষায় লোক দেখানো কাজ করে বিল তুলে চম্পট দেয়। শেষ পর্যন্ত তিস্তা নদীর পেটে চলে গেল স্কুল ভবন। এতে শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল।’
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পাউবোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানানো হয়েছিল। পরে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা ভাঙন ঠেকাতে পারেনি। এরই মধ্যে তিস্তার ভাঙনে বিদ্যালয় ভবনটি নদীগর্ভে চলে যায়।
এদিকে, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনেও চলতি মৌসুমে কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার চর চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর খাটিয়ারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদর উপজেলার মোল্লারচর এলাকার সীতাসতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ফুলছড়ি উপজেলার চর পিপুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গলনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কটকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট নয়টি বিদ্যালয় গত এক মাসে তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে।
ভাঙনে এসব বিদ্যালয়ের অনেক স্থাপনা ও আসবাবপত্র নদীতে চলে গেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের টিনের ছাউনি, বেঞ্চ ও অন্যান্য সামগ্রী স্থানীয় শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, নদীগর্ভে বিলীন হওয়া নয়টি বিদ্যালয়ের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থীর ত্রৈমাসিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। সরকারি হিসাবে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান অব্যাহত থাকার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।
স্থানীয়রা জানান, কোনো কোনো বিদ্যালয়ের জন্য নির্জন স্থানে অস্থায়ীভাবে চালা তৈরি করা হলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষকদের উপস্থিতিও নেই। আবার চরাঞ্চলের প্রভাবশালীদের মধ্যে বিদ্যালয়গুলো কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়েও টানাপোড়েন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ভাঙনের মুখে থাকা আরও ছয়টি বিদ্যালয় নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এগুলো হলো: চর পশ্চিম খাটিয়ারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাউয়াবাদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কটিয়ারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর ডাকুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এসব বিদ্যালয়ের আঙিনা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি ও ভাঙন পৌঁছে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে বিদ্যালয়গুলো নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয়ের টিন, বেড়া ও খুঁটি খুলে অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলো রক্ষায় স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করা হলেও প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলার পর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয়টি তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, নদীভাঙনের কারণে ওই এলাকার অনেক মানুষ নিজেদের বসতভিটা, বাড়িঘর ও আবাদি জমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এখন বিদ্যালয়গুলোও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার দাস বলেন, ‘ভাঙনে বিলীন হওয়া স্কুলগুলো সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হয়েছে। যেসব স্কুলের ভবন সরানো সম্ভব হয়নি, সেগুলো শিক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগিরই স্থানান্তর করা হবে।’
নদীভাঙনে স্কুল বিলীন হলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটা স্বাভাবিক নয়। অনেক বিদ্যালয় নির্জন স্থানে অস্থায়ী চালার নিচে কার্যক্রম চালানোর কথা বলা হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় আসবাব নেই। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত যান না বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কেউ কেউ বিদ্যালয়ের জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
১৪ দিন আগে
নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী সমাধান: পানিসম্পদমন্ত্রী
পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর পান্থপথে পানি ভবনে ‘বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ’ বিষয়ক সভায় বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে। নদীর তীর, বাঁধের ঢাল, হাওরাঞ্চল ও ক্ষয়প্রবণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে বিন্না ঘাস রোপণের মাধ্যমে মাটির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বিন্না ঘাসের শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে শক্তভাবে মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। ফলে বৃষ্টির পানি, ঢেউ ও স্রোতের কারণে মাটির ক্ষয় কমাতে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নদী ও খালের তীর, বাঁধ, পাহাড়ি ঢল এবং হাওর অঞ্চলে এ ঘাসের ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে। বাংলাদেশে নদীর পাড় ও বাঁধের মাটি রক্ষায় বিন্না ঘাসের ব্যবহার বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় দেশের নদী, খাল, বাঁধ ও জলাধার সংরক্ষণে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী আজাদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি ও ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু কংক্রিটের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর না করে প্রকৃতিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব সমাধানকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিন্না ঘাস সেক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান তিনি।
সভায় বিন্না ঘাসের উপকারিতা ও সম্ভাবনা বিষয়ে ‘প্রেজেন্টেশন’ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। এ সময় মন্ত্রণালয় ও দপ্তর-সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
১৮ দিন আগে
সুরমার ভাঙনে বিলীন ছাতকের স্কুল-মসজিদ, আতঙ্কে বাউসা-কেশবপুরের হাজারো মানুষ
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাউসা-কেশবপুর গ্রামে সুরমা নদীর ভয়াবহ ভাঙন যেন থামছেই না। একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শতবর্ষী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রতিদিনই নতুন করে ভাঙছে নদীর পাড়, আর সেই সঙ্গে ভেঙে পড়ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু নদীভাঙন নয়—এ যেন একটি জনপদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর গল্প। বর্ষা এলেই সুরমা নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। প্রবল স্রোত আর তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে নদীতীরের মাটি ধসে পড়ে নদীর বুকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভাঙনে বাউসা ও কেশবপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। অথচ স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, যে স্থানে আজ নদীর উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে, কয়েক বছর আগেও সেখানে ছিল সবুজ ধানের ক্ষেত, ফলের বাগান, শিশুদের খেলার মাঠ, মানুষের বসতঘর এবং গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। এখন সেখানে শুধু অথৈ পানি আর নদীর গর্জন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, একসময় নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন। কিন্তু নদী তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। জমি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, আবার কেউ শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে পরিবার চালাচ্ছেন। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
৩০ দিন আগে
ঝুঁকিতে খুলনা আতাই নদীর বাঁধ, ১০ গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার আতাই নদীর কূল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া কামারগাতি-পথের বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। সড়কটিতে একসময় ভ্যান, রিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, নসিমন, করিমনের পাশাপাশি বাসও চলাচল করত। কালিয়া, তেরোখাদা, গাজীরহাট, কোলা, আড়ুয়া আমবাড়ীয়া, কামারগাতী, লাখোয়াটি, মাধবপুর, রাধামাধবপুর, নন্দনপ্রতাপ, বারাকপুর, মোমিনপুর এলাকার মানুষের দৌলতপুর হয়ে শহরের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম সড়ক ছিল এটি। তবে গত এক যুগ ধরে আতাই নদীর করাল গ্রাসে ভাঙতে ভাঙতে সড়কটির দুই তৃতীয়াংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে; রূপান্তরিত হয়েছে বেড়িবাঁধে। বিকল্প সড়ক দিয়ে এখন যাতায়াত করছে মানুষ।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মোমিনপুর-হাজীগ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে সড়কের ওই অংশের বাঁধটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাঁধের উপর দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এতে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাটলের। ভেঙে যাওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা দেখে গতকাল (শুক্রবার) তাৎক্ষণিকভাবে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে জোয়ারের পানি কমলে সন্ধ্যার পর থেকে রাত অবধি আলো জ্বালিয়ে বাঁশ এবং মাটি দিয়ে সংস্কার করে প্রাথমিকভাবে ভেঙে পড়া থামিয়েছে। তবে এখনও কাটেনি ঝুঁকি।
তারা আরও বলেন, বাঁধটি ভেঙে গেলে দশটিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হবে। শত শত ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাবে। কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
তাদের দাবি, সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর আতাই নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় এ এলাকায় সরকারিভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কোনো সুফল মিলছে না।
৪৮ দিন আগে
লালমনিরহাটে তিস্তার পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ, নদীভাঙনের আশঙ্কা
উজানের ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। বরং পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে নতুন করে নদীভাঙনের আশঙ্কা। তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানির পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক শূন্য ৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে। গতকাল রাত ১০টায় এই পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
রাতভর ধীরে ধীরে পানি কমলেও বন্যার ক্ষত তেমন কোথাও দেখা যায়নি।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদীর পানি নেমেছে। তবে পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। উজানে আবার ভারী বৃষ্টি হলে নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বাড়ায় পাটগ্রাম উপজেলা এবং কালীগঞ্জে উপজেলার ভোটমারী ও কাকিনা ইউনিয়নের নিচু এলাকায় বন্যার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরে বাদামখেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
তিস্তায় পানি বাড়ায় নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে অন্তত হাজারখানেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। অনেক বাড়িঘরে এখনও পানি রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, রান্নার সমস্যা এবং গবাদিপশু নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন দুর্গতরা।
এদিকে, পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার তীব্র স্রোতে বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি দ্রুত নেমে গেলে ভাঙনের তীব্রতায় বসতভিটা, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
লালমনিরহাট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় তিস্তার পানি কমছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে উজানে আবার ভারী বৃষ্টি হলে পানি বাড়তে পারে, তাই সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক পরিবার এখনও পানিবন্দি। শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে মানুষ চরম দুর্ভোগে আছে। যদি আবারও পরিস্থিতি খারাপ হয়, তখন তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
আদীতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, তিস্তা তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও নতুন করে পানি বৃদ্ধি বা নদীভাঙনের মতো ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫১ দিন আগে
তিস্তার তীররক্ষা বাঁধের শতাধিক স্থানে ধস, আতঙ্কে গাইবান্ধার লক্ষাধিক মানুষ
ভারী বর্ষণে গাইবান্ধার কামারজানি থেকে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত তিস্তানদীর তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ১৮ কিলোমিটার এলাকায় শতাধিক স্থানে বড় ধরনের ধস শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে ভাঙনও বেড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালে ৯৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধে মাটির পরিবর্তে বালু ব্যবহার করায় বর্তমানে বাঁধের বিভিন্ন অংশে নতুন করে ধস শুরু হয়েছে। এতে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় তিস্তা তীরবর্তী লক্ষাধিক মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল ইসলাম বাঁধ রক্ষায় কংক্রিট ব্লক বসানোর কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেন। নিয়ম অনুযায়ী দূর থেকে মাটি এনে বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পাউবো কর্মকর্তা হাফিজুল ইসলাম বাঁধের পাশ থেকেই ভেকু দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণের সুযোগ করে দেন।
তিনি বলেন, সে কারণে ঠিকাদার যেনতেনভাবে বাঁধ নির্মাণ করে জুলাই আন্দোলনের আগে হাজার কোটি টাকার বিল তুলে চলে যান। নির্মাণের বছরই তিস্তা নদীতীর রক্ষা প্রকল্পের কংক্রিট ব্লক নদীতে ধসে যেতে শুরু করে। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকাবাসীর চাপে পাউবো তড়িঘড়ি করে বাঁধের ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৪০ লাখ টাকার আলাদা বিল করেন। পরে সেই বিল অন্য ঠিকাদারের নামে তুলে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজুল ইসলাম রংপুরে বদলি হয়ে চলে যান।
এ বছর বর্ষার শুরুতে ভারী বর্ষণে তিস্তা ও যমুনার তীররক্ষা বাঁধের কামারজানি থেকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর মওলানা ভাসানী ব্রিজ পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার বাঁধের শতাধিক স্থানে ছোটবড় গর্ত ও খাদের সৃষ্টি হয়েছে। এসব খাদ ও গর্ত দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তাতে বাঁধ আরও ভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাঁধের এই ১৮ কিলোমিটার এলাকায় পশ্চিম পাশে খুব কাছে অন্তত লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করে। ইতোমধ্যে বাঁধের খুব কাছে গর্ত করে বালু উত্তোলন করে সেই বালু বাঁধে ব্যবহার করায় তিস্তা নদী তীর রক্ষার বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া, শ্রীপুর, হরিপুর, চণ্ডীপুর, বেলকা, কছিমবাহার, বাবুর বাজার, লাল চামার, পুটিমারী, দত্তের খামার, গাছুর বাজার, জয়বাংলা ও বটতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় তিস্তা নদীর ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ভাঙন যত প্রবল হচ্ছে, বাঁধের পাশের বাসিন্দারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। নদী ভাঙনের পাশাপাশি নদী তীররক্ষা প্রকল্পের বাঁধ ধসের কারলে আতঙ্কিত স্থানীয়রা দিনরাত বাঁধ এলাকায় পাহারা বসিয়েছেন।
পোড়ার চরের বাসিন্দা রেজাউল মেম্বার জানান, অনেক পরিবার নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধের ওপর এসে বসে থাকছেন।
কাপাসিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনজু মিয়ার অভিযোগ, তিস্তায় নদীরক্ষা বাঁধ যখন নির্মাণ করা হয় তখন আমরা বাধা দিয়েছি, কারণ কাজ হয়েছে নিম্নমানের। যেখানে মাটি দেওয়ার কথা, সেখানে বালু দেওয়া হয়েছে। মোটকথা, বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করে ওপর দিয়ে শুধু মাটি ছিটিয়ে দিয়ে হাজার কোটি টাকা বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এলাকার লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা কোনো কথা বলতে গেলেই পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল ও ঠিকাদারের মাস্তান বাহিনী সাধারণ মানুষকে কোনো পাত্তা দেয়নি।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, তখন যদি বালু না দিয়ে মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হতো, তাহলে আর ধসের মুখে পড়তে হতো না। নদীর তীররক্ষা বাঁধের কংক্রিট ব্লকের বিভিন্ন অংশে ভাঙন শুরু হতো না। কিন্তু কাজটি করা হয়েছে শুধু লুটপাটের জন্য; পেট ভরেছে ঠিাকাদার আর কর্মকর্তাদের। এখন ভুগতে হচ্ছে আশে পাশের লাখ লাখ মানুষের। সারা রাত মানুষ বাঁধে বসে থাকে, কখন বালুর বাঁধ নদীর প্রবল স্রোতে ধসে যায়, সেই আতঙ্কে।
এ ব্যাপারে গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ৬০টি পয়েন্টে ভাঙন শুরু হয়েছে। এছাড়া ১৮ কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা বাঁধে রেইন কাট হয়েছে। তবে ভাঙন প্রতিরোধ ও ধসে যাওয়া অংশে মেরামতের কাজ শুরু করা হয়েছে।’
৫১ দিন আগে
পাঁচ নদীর তাণ্ডবে ভয়াবহ বিপর্যয়ে কুড়িগ্রাম, ৩৬ পয়েন্টে ভাঙন, ঘরছাড়া ৫ শতাধিক পরিবার
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই একদিকে আকস্মিক বন্যা, অন্যদিকে তীব্র নদীভাঙনের দ্বিমুখী আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার প্রধান পাঁচটি নদ-নদী—ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার ও কালজানী নদীতে একযোগে শুরু হওয়া আগ্রাসী ভাঙনে প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও গাছপালা। জনপ্রতিনিধিদের তথ্যমতে ইতোমধ্যে জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৩৬টি পয়েন্টে মোট ১১ দশমিক ২৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বর্তমানে তীব্র ভাঙন চলছে। ভাঙন আতঙ্কে নদীপাড়ের বাসিন্দারা রাত জেগে ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচটি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙনের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ:
দুধকুমার নদী: এই নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতে সদর উপজেলার খাড়ুয়ারপাড় ও বানিয়াপাড়া; নাগেশ্বরীর বেপারীর চর, সাপখাওয়া, মাঝিপাড়া, কুটিরচর, মণ্ডলপাড়া, বলরামপুর ও দামালগ্রাম এলাকায় প্রতিনিয়ত ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।
ধরলা নদী: সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সাটকালুয়া ও জগমনের চর, ফুলবাড়ী উপজেলার গোরকমণ্ডপ এবং বড়ভিটার পশ্চিম ধনিরাম এলাকায় তীব্র ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ: সদর উপজেলার গোয়াইলপরী ও পার্বতীপুর; নাগেশ্বরীর ঝাউকুটি, পাগলার বাজার ও বালারহাট; উলিপুরের দইখাওয়ার চর, রসুলপুর ও জলঙ্গারকুটি; চিলমারীর কাচকোল; রৌমারীর সোনাপুর, গেন্দার আলগা, খেদাইমারী ও সুখেরবাতি এবং রাজিবপুর উপজেলার সাজাই, পাইকানটারী ও বল্লবপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন চলছে।
তিস্তা নদী: রাজারহাট উপজেলার হাঁসারপাড়, রামহরি, চর বিদ্যানন্দ এবং উলিপুর উপজেলার হোকডাঙ্গা ও গোড়াইপিয়ার এলাকায় নদীর আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে।
কালজানী নদী: ভূরুঙ্গামারী উপজেলার উত্তর ধলডাঙ্গা ও বউবাজার এলাকায় নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এছাড়া সদরের সারোডোব ও ভূরুঙ্গামারীর পাইকডাঙ্গাসহ বেশ কিছু নতুন এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ভাঙনের মুখে পড়া মানুষের মাঝে চরম হাহাকার দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার সাটকালুয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘প্রতিদিন নদী কয়েক হাত করে এগিয়ে আসছে। ঘরের টিন খুলে রেখেছি। কখন বাড়িটা নদীতে চলে যায়, সেই ভয়ে পরিবার নিয়ে রাত জেগে থাকি।’
একইভাবে নিজের ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন উলিপুরের গোড়াইপিয়ার এলাকার কৃষক নুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জমি নদীতে গেছে, এখন বাড়িও যাবে। আমাদের মতো মানুষের বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।’
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ভাঙন প্রতিরোধে ইতোমধ্যে ৩ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ লাখ বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ চালানো হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও জরুরি বরাদ্দের প্রয়োজন।
কুড়িগ্রামের চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন—এই দুই দুর্যোগে চরাঞ্চলের মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। উন্নত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারানোর পরও অনেক সময় কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজির রহমান জানিয়েছেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তা হিসেবে জেলায় নদী ভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২৭৫ টন চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার (যার মধ্যে চাল, ডাল, সয়াবিন তেল ও বিভিন্ন ধরণের মশলা রয়েছে) বরাদ্দ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, ‘শুধু সাময়িক জিওব্যাগ ফেলে এই স্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামকে বাঁচাতে স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হোক।’
৬৬ দিন আগে
নদীভাঙনে ১০ বছরে গৃহহীন এক লাখ মানুষ, পৃথক মন্ত্রণালয় ও বাজেট চায় চরাঞ্চলের মানুষ
বর্ষা এলেই নদীর পাড়ে বসবাসকারী হাজারো মানুষের জীবনে ফিরে আসে পুরোনো আতঙ্ক। এক রাতে নদী গিলে নেয় বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা; কখনও আবার পুরো একটি গ্রাম। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো নতুন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়ায়, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয় শহরমুখী হতে। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে এমন বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার গল্প বহু বছরের।
এই প্রেক্ষাপটে চরাঞ্চলের মানুষের টেকসই উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন এবং জাতীয় বাজেটে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা ও স্থায়ী বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কুড়িগ্রাম দেশের অন্যতম বৃহৎ চরাঞ্চল অধ্যুষিত জেলা। জেলায় প্রায় ৪০০টি চর রয়েছে, যার মধ্যে আড়াই শতাধিক চরে মানুষের বসবাস। এসব চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত জীবনযাপন করছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে কুড়িগ্রামে প্রায় এক লাখ মানুষ নদীভাঙনের কারণে গৃহহীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শুধু বসতভিটাই হারায়নি, হারিয়েছে জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাও। প্রতিবছর নতুন নতুন পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে কুড়িগ্রাম জেলার অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের শিকার হয়। এছাড়া গত পাঁচ বছরে নদীভাঙনের কারণে প্রায় দুই হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকা, ঠাকুরগাঁও ও পার্বতীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে গেছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। এই বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়নের মূলধারা থেকে এখনও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
৯০ দিন আগে
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন, এক সপ্তাহে গৃহহীন ৫০ পরিবার, ঝুঁকিতে শতাধিক
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও ঘুঘুমারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙনে গত এক সপ্তাহে অন্তত ৫০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভাঙনের ফলে প্রায় ৪০০ মিটার এলাকাজুড়ে বসতভিটা ও শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। তবে নতুন করে আরও শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভুক্তভোগী সিরাজুল ইসলাম (৪৫) বলেন, নদীভাঙনে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না।
স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম আলী (৫৫) বলেন, এক এক করে সব জমি-ঘর নদীতে চলে যাচ্ছে, আমরা এখন নিঃস্ব।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের পানির স্তর কমে গেলে ভাঙনের প্রবণতা বেড়ে যায়। নদীর চ্যানেল সরু হয়ে যাওয়া এবং পাড়ের মাটির গঠন দুর্বল থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি ভাঙনকবলিতদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
রৌমারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইমান আলী বলেন, ইতোমধ্যে ৫০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে এবং আরও শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে বিষয়টি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে জানানো হয়েছে।
১৬১ দিন আগে