থ্রি-আর কৌশল
বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাতিসংঘে থ্রি-আর কৌশল তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছেন, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের পর দেশ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরস্ত্রীকরণ, অভিবাসন ও প্রযুক্তিতে সমানাধিকার নিশ্চিত করতে আরও জোরালো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের অবসান ঘটেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হওয়া গুম ও হত্যা, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট এবং অর্থ পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এখন আবারও গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার বিশাল দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে এবং জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
বাংলাদেশ একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে উঠতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন প্রত্যাশা করেন। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরিতে চলতি অর্থবছরে সরকার ৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন চান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তাই দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের জন্য সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন নারীরা।
সরকার নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু নির্বাচনি গণতন্ত্র নয়, ‘অর্থনীতির গণতন্ত্র’ নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে।
এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা ফ্যামিলি কার্ডকে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে।’
এ সময় তিনি জানান, প্রতিটি খাতে সহায়তা দেওয়ার জন্য চালু করা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ। তার কার্যালয় আগেই জানিয়েছিল, তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন এবং তিনি বাংলাতেই ভাষণ দেন।
নিজের বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেন, তিনি বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় কথা বলছেন।
ভাষণের শুরুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের কথাও স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। জনগণই সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে অশান্তি, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ ও সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাত সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।’
তার মতে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থের সুরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা।
সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও মানবতার উন্নয়নে জাতিসংঘের উদ্যোগগুলোতে বাংলাদেশ সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
ভাষণের শুরুতেই আলোচিত ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য জোরালো সমর্থনের আহ্বান
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।
তারেক রহমান বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’
সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থনের আহ্বান জানান তারেক রহমান।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তিনি। সেই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
৬ ঘণ্টা আগে