মতামত
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের দেশপ্রেম ও সততা অবিস্মরণীয়: সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী
দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমম্বয় কমিটির সহ-সভাপতি, বাংলা একাডেমির সভাপতি, সৎ সাহসী, সত্যবাদী, নির্ভীক, নির্মোহ ও নিবেদিত দেশপ্রেমিক, দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর—এমন মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি বিরোধী জাতীয় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট সমাজকর্মী সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী।
রবিবার (৫ জুলাই) মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরে খেতে গিয়েছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে সেখানকার একটি হাসপাতালে দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম ও মা জাহানারা খাতুন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিমের মতো বিদগ্ধ শিক্ষকের সংস্পর্শে এসে প্রগতিশীল চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করেছেন। এ সময় তিনি শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন এবং ১৯৮২ সাল থেকে ‘লোকায়ত’ নামক প্রগতিশীল সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেছেন।
তিনি একুশটিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), নৈতিকতা : শ্রেয়োনীতি ও দুর্নীতি (১৯৮১), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা (২০০৪), রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ (২০০৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনুবাদ করেছেন বার্ন্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ এবং নবযুগের প্রত্যাশায়’। এছাড়া ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘স্বদেশচিন্তা ও আকবরের রাষ্ট্রসাধনা’ তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের দুই সন্তান অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। ছেলে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ, হতাশ এই বাবা সাংবাদিকদের তখন বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
এটি সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় বিচারব্যবস্থা নিয়ে। ফলে আবুল কাসেম ফজলুল হক শুধু একজন লেখক বা অধ্যাপক নন; তিনি ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, যিনি সাধারণ মানুষের মুক্তি ও সমাজের অগ্রগতি নিয়ে ভাবতেন। তার প্রবন্ধ, গবেষণা ও সম্পাদনা বাংলাদেশের চিন্তা জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি সমকালীন সমাজে প্রগতির আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।
সোমবার (৬ জুলাই) বাদ ফজর মিরপুরের পল্লবীর মসজিদুল আমান মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অধ্যাপক আবুল কাসেমের মরদেহ যথাক্রমে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা বাংলা একাডেমি, বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা শহিদ মিনার এবং দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অপরাজেয় বাংলায় রাখা হবে।
১৩ দিন আগে
২৫০ বছরে আমেরিকা: বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব ও আগামীর উদযাপন
আজ থেকে আড়াই শতাব্দী আগে, ১৭৭৬ সালে, আমাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তারা এমন এক বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, যা তাদের কাছে ছিল মানুষের জন্মগত ও মৌলিক অধিকার—নিজেদের শাসন করার অধিকার।
‘আমরা এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি যে, সব মানুষকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা তাদের এমন কিছু অধিকার দিয়েছেন, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অধিকার। আর মানুষের এই অধিকার রক্ষার জন্যই সরকার গঠিত হয়। জনগণের সম্মতিই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি।’
ইংল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগ ও মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা অর্জনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পর, আমাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই ঐক্যবদ্ধ উপনিবেশগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, এবং ন্যায়সঙ্গতভাবেই তাদের সেই মর্যাদা প্রাপ্য।’ এরপর তারা নিজেদের জীবন, সম্পদ এবং পবিত্র সম্মান বাজি রেখে সেই ঘোষণার প্রতি অটল থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন।
এ ছিল সাহসী এক ঘোষণা। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা যথার্থভাবেই বিশ্বজুড়ে মানুষের কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, ‘মাত্র এক টুকরো পার্চমেন্ট কাগজ এবং ৫৬টি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা করেছিল আমেরিকা।’
কিন্তু সেটি কেবল একটি ঘোষণা ছিল না। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্নকে আমেরিকানরা বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছিলেন।
আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী সেই ৫৬ জন সাহসী মানুষ জানতেন, তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
তারা জানতেন, সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ও কঠিন এক যুদ্ধ, যে যুদ্ধে তাদের অনেকে হয়তো বেঁচে ফিরবেন না। তবু তারা নিজেদের আদর্শে অটল ছিলেন এবং আমেরিকাকে সবার আগে রেখেছিলেন।
আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা আবারও আমেরিকা ফার্স্ট নীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
তখন যেমন, এখনও তেমনি—আমেরিকা ফার্স্ট মানে আমেরিকা একা নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা তাদের মিত্রদের কাছ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পেয়েছিলেন।
আজও আমরা এমন নীতি অনুসরণ করছি, যা আমেরিকার মানুষের কল্যাণে কাজ করে। একইভাবে বাংলাদেশের নেতারাও এমন নীতি নিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে সহায়ক।আর এভাবেই আমরা প্রায়ই এমন ক্ষেত্র খুঁজে পাই, যেখানে দুই দেশই লাভবান হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এবং মে মাসে স্বাক্ষরিত জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। এগুলো দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করছে। এটাই কূটনীতির মূল কথা।
তাই আজ, যখন আমরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন করছি, তখন আমরা শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শই স্মরণ করছি না। আমরা কূটনীতির দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকাও স্মরণ করছি, যা আমাদের জাতির পথচলা এবং বিশ্বপরিসরে আমেরিকার প্রভাব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
আমেরিকা প্রতিষ্ঠার এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপনে আমাদের আয়োজনগুলো ফ্রিডম ২৫০ বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, অর্থাৎ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মুক্তির চেতনাকে স্মরণ ও উদযাপন করা হচ্ছে।
ফ্রিডম ২৫০ শুধু অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর উপলক্ষ নয়; এটি ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক সূচনামঞ্চ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূরদর্শিতায় আমরা নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছি, উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিচ্ছি এবং কূটনীতির এক নতুন যুগের রূপরেখা তৈরি করছি, যা আগামী ২৫০ বছরের পথচলায় আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আমেরিকা যখন তার ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন আমরা বিশ্বের নানা প্রান্তের বন্ধুদের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তাদের মাঝে বাংলাদেশের মানুষও রয়েছেন। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে আমেরিকা সপ্তাহ এবং ২০২৬ সালজুড়ে আমাদের সঙ্গে আমেরিকার জন্মদিন উদযাপনে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই। আসুন, আমরা একসঙ্গে উদযাপন করি স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব এবং অভিন্ন ভবিষ্যতের যৌথ অঙ্গীকার।
১৫ দিন আগে
সশস্ত্র বাহিনীর সম্মান রক্ষাই রাষ্ট্রের মর্যাদা
স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মনিয়োগকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মর্যাদা সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। একজন সৈনিকের কাছে পদ-পদবি, ইউনিফর্ম কিংবা আর্থিক প্রাপ্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার পেশাগত সম্মান। সেই সম্মান যদি অন্যায়ভাবে ক্ষুণ্ন হয়, তবে এর প্রভাব কেবল ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার পরিবার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মনোবল এবং রাষ্ট্রের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়।
পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারামলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বৈষম্য, প্রতিহিংসা ও প্রশাসনিক অন্যায়ের শিকার হওয়ার অভিযোগে সশস্ত্র বাহিনীর বহু কর্মকর্তা বছরের পর বছর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমান সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্ত কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি, বকেয়া আর্থিক সুবিধা এবং পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও রাষ্ট্রনৈতিক পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—অতীতে যাদের প্রতি অন্যায় হয়েছে বলে সরকার পর্যালোচনার ভিত্তিতে মনে করেছে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায় বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্র এড়িয়ে যাবে না।
রাষ্ট্র অন্যায় করতে পারে, সরকারও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু একটি পরিণত রাষ্ট্রের মহত্ত্ব প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে অতীতের ভুল সংশোধনের সাহস দেখায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব জাতি নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের পথে হাঁটতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।
হাসিনা রেজিমের গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল তীব্র মেরুকরণ, অবিশ্বাস ও সংঘাতের আবহে আবদ্ধ। সেই সময়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, বৈষম্য এবং প্রতিহিংসার অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। হাসিনা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর মতো একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানকেও বিতর্কিত করেছিল। যা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একজন সেনা কর্মকর্তা তার কর্মজীবনের প্রতিটি দিন কাটান শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। সীমান্তে, দুর্গম পাহাড়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে তিনি দেশের পতাকাকে মর্যাদার সঙ্গে বহন করেন। সেই মানুষটিকেই যদি রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা কিংবা প্রশাসনিক বৈষম্যের কারণে প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে সেই ক্ষত কেবল তার ব্যক্তিগত নয়; সেটি রাষ্ট্রেরও ক্ষত।
এই বাস্তবতায় সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, তিন বাহিনীর সদর দপ্তর এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটির দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক আবেগের ফল নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে গৃহীত একটি পদক্ষেপ। এ ধরনের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। অর্থনৈতিক ক্ষতি একসময় পূরণ করা যায়, কিন্তু অন্যায়ভাবে হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। আজ যারা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি বা প্রাপ্য স্বীকৃতি পেলেন, তাদের অনেকেই হয়তো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় নীরবে পার করেছেন। তাদের সন্তানদের মনে হয়তো প্রশ্ন জেগেছিল—“আমার বাবার অপরাধ কী ছিল?” সরকারের এই সিদ্ধান্ত অন্তত সেই প্রশ্নের একটি নৈতিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে ন্যায়বিচারের ভিত্তির ওপর। নাগরিক যখন দেখেন, রাষ্ট্র অতীতের অন্যায় সংশোধনে আন্তরিক উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। এই আস্থা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও মূল্যবান। কারণ আস্থা ছাড়া শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না, আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়।
তবে এখানেই থেমে গেলে চলবে না। অতীতের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো কর্মকর্তা তার রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত মত কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের কারণে নয়; কেবল যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং পেশাগত সততার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবেন। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের মতো সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও এই নীতি অটুট থাকা অপরিহার্য।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে—প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারই একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিভক্ত সমাজে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্তই আস্থা পুনর্গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। অতীতের ক্ষত হয়তো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না, কিন্তু ন্যায়বিচার সেই ক্ষত নিরাময়ের পথ খুলে দিতে পারে।
বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে অতীতের অন্যায়কে আড়াল করা নয়; বরং নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের ভুল সংশোধন করতে জানে, সে রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্ত ভিত নির্মাণ করতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আজকের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু ১৫০ জন কর্মকর্তার নয়; এটি তাদের পরিবার, সহকর্মী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র যদি আন্তরিক হয়, তবে ন্যায়ের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায় না। আর এই বিশ্বাসই একটি জাতিকে আশাবাদী করে তোলে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি যদি সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ধারাবাহিক অংশে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, কোনো রাষ্ট্রের অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা অবকাঠামোগত সাফল্যে পরিমাপ করা যায় না; বরং তা নির্ধারিত হয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মাধ্যমে। বাংলাদেশও তখনই একটি আরও পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন কোনো সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন কর্মকর্তার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবিক চেতনা, ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকই-মেইল: [email protected]
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইউএনবির সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামত নাও মিলতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের।
১৬ দিন আগে
কিংবদন্তির বিদায়: আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে সংগীত জগতে গভীর শূন্যতা
ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত জগতে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল, ২০২৬) মুম্বাইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলী জেলায় জন্ম নেওয়া আশা ভোঁসলে ছোটবেলা থেকেই সংগীতময় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নাট্যসংগীত শিল্পী এবং বড় বোন লতা মঙ্গেশকর ভারতীয় সংগীতের আরেক কিংবদন্তি। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪০-এর দশকে বলিউডে প্লেব্যাক গানের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬ বছর বয়সে গণপত রাও ভোঁসলের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও সম্পর্কটি ছিল অশান্ত। পারিবারিক অমত, মানসিক চাপ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি সংগীতকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের সঙ্গে তার বিবাহ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ও লেকে প্যাহলা প্যাহলা পেয়ার’, ‘পিয়া তু আব তো আযা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’, ‘ঝুমকা ঘিরা রে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান আজও শ্রোতাদের মনে অমলিন।
তার কণ্ঠকে বিশ্বের অন্যতম বহুমুখী কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্লাসিক্যাল, পপ, কাবারে থেকে লোকসংগীত—সব ধারাতেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্থান পান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি মাইকেল জ্যাকসন ও বয় জর্জের মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
সংগীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও ছিল তার গভীর আগ্রহ। দুবাইসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তার সন্তানদের মধ্যে আনন্দ ভোঁসলে ও নন্দিনী ভোঁসলে পরিচিত।
১১ এপ্রিল ২০২৬ মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে বুকে সংক্রমণ ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাকে ভর্তি করা হয়। পরদিন, ১২ এপ্রিল দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষকৃত্য মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে অনুষ্ঠিত হবে।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শুধু বলিউড নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত অঙ্গন হারাল এক যুগস্রষ্টাকে। তার কণ্ঠ, সৃষ্টিকর্ম এবং সংগ্রামী জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত জগতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক
৯৭ দিন আগে
দখলে-দূষণে নিখোঁজ লবণদহ নদ
একসময় যার টলটলে জলে দুলত পালতোলা নৌকা, মাঝির গানে ভেসে উঠত আবহমান গ্রামবাংলার চিত্র, আজ যেন এক আহত দেহ নিয়ে দেশের মুমূর্ষু সব নদ-নদীর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে গাজীপুরের লবণদহ নদ। দখল আর দূষণের করাল গ্রাসে এই নদ হারাতে বসেছে তার জৌলুস, আছে শুধু তার স্মৃতি আর নিঃশ্বাসহীন শরীর। লবণদহের এই মৃত্যু নিছক একটি নদীর গল্প নয়, এ এক অবহেলা, লোভ আর উদাসিনতার দীর্ঘ উপাখ্যান।
প্লাস্টিক দূষণ, শিল্প বর্জ্য ও পৌর বর্জ্যে এটি এখন দূষিত নদীর তালিকাতেও রয়েছে ওপরের দিকে লবণদহ। তাছাড়া এটিকে নদী না বলে এখন খাল বা নালা বলাই ভালো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে অপরিকল্পিত উন্নয়নের সব দায় গিয়ে পড়ছে নদ-নদীর জীবনে। দুঃখের বিষয়, প্রায় সব খাত থেকেই বর্জ্য ফেলার আদর্শ জায়গা ভাবা হচ্ছে নদ-নদীকে। আর জীবন্ত সত্তার জন্যই এসবের মৃত্যুর দায়ও গুনতে হবে মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার মাপকাঠিতে।
সম্প্রতি দেশের ৫৬টি প্রধান নদ-নদীর ওপর করা এক গবেষণার তথ্য বলছে, শীর্ষ তিন দূষিত নদীর একটি গাজীপুরের লবণদহ। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) উদ্যোগে ২০২২-২৩ সালে পরিচালিত গবেষণায় ৫৬টি নদীর পানির গুণাগুণ পরিমাপ করে দেখা গেছে, শুধু শহর বা উপশহরে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদীতেও প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। নদীতে জীববৈচিত্র্য ও জলজপ্রাণীর জীবন ধারণের জন্য যে চারটি গুণগত মান প্রয়োজন, লবণদহে তার সবই রয়েছে আশঙ্কাজনক অবস্থায়।
পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ১৯৯৭ অনুযায়ী, নদীর পানিতে মিশ্রণের অম্লতার (পিএইচ লেভেল) আদর্শ মান ৬ থেকে ৯ পর্যন্ত, সেখানে লবণদহের পিএইচ লেভেল ৫। মিশ্রণে অক্সিজেনের (সিওডি) পরিমাপের আদর্শ মাত্রা প্রতি লিটারে থাকতে হয় ২০০ মিলিগ্রাম, কিন্তু লবণদহের পানিতে সিওডির মাত্রা প্রতি লিটারে মাত্র ৪৬ মিলিগ্রাম। দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) আদর্শ মাত্রা প্রতি লিটারে সাড়ে ৪ থেকে ৮ মিলিগ্রাম হলেও লবণদহের পানিতে ডিওর মাত্রা লিটারে শূন্য দশমিক ২১ মিলিগ্রাম।
এছাড়া বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) বা পানিতে ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন অণুজীবের অক্সিজেন চাহিদার আদর্শ মান যেখানে প্রতি লিটারে ৫০ মিলিগ্রাম, সেখানে লবণদহে রয়েছে লিটারে মাত্র ৩৪.২ গ্রাম। এ সূচক থেকে প্রতীয়মান হয় যে, লবণদহ নদীর অবস্থা কতটা বিপর্যস্ত!
অথচ জনশ্রুতি আছে, একসময় লবণদহের ব্যাপ্তির কারণে একে বলা হত ‘লবলং’ সাগর। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ক্ষীরু নদীর সংযোগস্থল থেকে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সেখান থেকে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার ওপর দিয়ে এটি মির্জাপুরের কাছে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রমত্তা এ নদীকে গিলে খেল কে? কেনো আজ এটি একটি ছোট্ট নালায় পরিণত হয়েছে। এটি এখন হয়ে আছে কেবলই একটি ময়লার ড্রেন সদৃশ নালা।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক দূষণ কমন রোগ; তবে মূলত কারখানার বর্জ্য ও পৌর বর্জ্যই প্রমত্তা এ নদীকে শেষ করে দিয়েছে। লবণদহকে ঘিরে কারখানার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে হিসাবটা সহজে মিলে যাবে।
আরডিআরসির গবেষণায় পাওয়া তথ্য বলছে, এ নদীর তীরে ২৫০টি কারখানা পাওয়া গেছে। এর প্রতিটির কেমিকেল বর্জ্য এবং একইসঙ্গে শ্রীপুর পৌরসভার সব বর্জ্য গিয়ে পড়ছে এ নদীতে। শ্রীপুর অংশে প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে চলছে এ দূষণ। আর গাজীপুর অংশের আশপাশে গড়ে উঠেছে ৩৯টি শিল্পকারখানা যেগুলোর বর্জ্যের লাইন সরাসরি নদীতে সংযুক্ত। এছাড়া খালটিতে গড়ে উঠেছে ১৫টি পৌর পয়োনিষ্কাশন লাইন ও ১১টি ডাম্পিং স্টেশন।
তবে বেসরকারি সংস্থা ‘নদী পরিব্রাজক’ দলের তথ্য মতে, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব মিলে প্রায় ২ হাজার কারখানা আছে লবণদহকে ঘিরে। ফলে এককালের প্রমত্তা এ নদী দখল ও ভরাট হতে হতে বর্তমানে খাল বা নালায় রূপ নিয়েছে। এছাড়া এটি হারিয়েছে মাছসহ জলজ জীব বেঁচে থাকার পরিবেশও।
১০৩ দিন আগে
মহানায়িকা সুচিত্রা সেন: রূপ, প্রতিভা ও রহস্যে মোড়া এক কালজয়ী অধ্যায়
‘এমন বন্ধু আর কে আছে তোমার মতো মিস্টার’—এই কালজয়ী গানটি আজও বাঙালির আবেগে অনুরণিত হয়। ১৯৫৯ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্বীপ জ্বেলে যাই’-এ রাধা চরিত্রে সুচিত্রা সেনের অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। প্রেয়সী যেমন, তেমনি একজন সেবিকা হিসেবেও তার অভিনয় ছিল গভীর, সংযত ও আবেগময়। মহাকালের কষ্টিপাথরে সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো আজ খাঁটি সোনার মতোই দীপ্ত।
বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে সুচিত্রা সেন এক অনন্য নাম। আপামর বাঙালির মানসে উত্তম-সুচিত্রা জুটি আজও অবিস্মরণীয়। ‘মহানায়িকা’ উপাধিটি যেন কেবল তার জন্যই মানানসই—রূপ, প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের এক দুর্লভ সমন্বয়ে।
জন্ম ও পারিবারিক জীবন
সুচিত্রা সেনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশের পাবনা জেলার বেলকুচিতে। তার প্রকৃত নাম রমা দাশগুপ্ত। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত গৃহিণী। শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা পাবনাতেই সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে পরিবার কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়।
১৯৪৭ সালে অল্প বয়সেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিখ্যাত সেন পরিবারের সন্তান, শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। তাদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেন পরবর্তীতে জনপ্রিয় অভিনেত্রী হন। নাতনি রাইমা সেন ও রিয়া সেনও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে পাবনায় সুচিত্রা সেনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত এবং সেখানে একটি জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
অভিনয় জীবনের সূচনা ও উত্থান
সুচিত্রা সেনের অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। যদিও তার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ছিল ‘সাত নম্বর বাড়ি’। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উত্তম কুমারের সঙ্গে তার যুগলবন্দির ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩) থেকে ‘প্রিয় বান্ধবী’ (১৯৭৫) পর্যন্ত প্রায় ৩০টি ছবিতে এই জুটি একসঙ্গে কাজ করে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে।
তার অভিনয়ে ছিল নারীত্বের শক্তি, সৌন্দর্য, আত্মমর্যাদা ও আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রেও তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ
দ্বীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯)
এক মানসিক হাসপাতালের নার্স হিসেবে সুচিত্রা সেনের মানবিক অভিনয় প্রমাণ করে, তিনি কেবল রোমান্টিক নায়িকা নন—গভীর, সংবেদনশীল চরিত্রেও সমান দক্ষ।
সপ্তপদী (১৯৬১)
প্রেম ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দ্বন্দ্বে উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রকে উপহার দেয় চিরকালীন আবেদন।
সাত পাকে বাঁধা (১৯৬৩)
আধুনিক ও স্বাধীনচেতা নারীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর রৌপ্য পুরস্কার অর্জন করেন।
আন্ধি (১৯৭৫)
একজন নারী রাজনীতিকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন সুচিত্রা সেন অত্যন্ত সংযত ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ে তুলে ধরেন। ছবিটি তৎকালীন ভারতে রাজনৈতিক বিতর্কও সৃষ্টি করেছিল।
দেবদাস (১৯৫৫)
বিমল রায় পরিচালিত এই হিন্দি ক্ল্যাসিকে পার্বতী (পারো) চরিত্রে তার আবেগঘন অভিনয় তাকে সর্বকালের সেরা অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে যায়।
কালজয়ী গান ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্রের গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয়—‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘তুমি যে আমার’, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘ঝনক ঝনক কনক কাকন বাজে’, ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে’—এমন অসংখ্য গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রোতাদের আবেগে জড়িয়ে আছে।
অবসর, নির্জনতা ও প্রয়াণ
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ চলচ্চিত্রের পর সুচিত্রা সেন অভিনয় জগৎ থেকে অবসর নেন। ধীরে ধীরে তিনি জনসম্মুখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। জীবনের শেষ তিন দশক প্রায় সম্পূর্ণ নির্জনবাসে কাটান, যা তার ব্যক্তিত্বকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৭ জানুয়ারি ২০১৪ কলকাতায় তার মৃত্যু হয়। তার প্রয়াণে বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ গভীর শোক প্রকাশ করে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
অভিনয়শিল্পে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সুচিত্রা সেন দেশি-বিদেশি নানা সম্মান অর্জন করেন। তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অভিনয়ের জন্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর রৌপ্য পদক অর্জন তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
ভারত সরকার ১৯৭২ সালে তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১২ সালে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বঙ্গবিভূষণ প্রদান করে। ২০০৫ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য তাকে মনোনীত করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে জনসম্মুখে অনুপস্থিত থাকার নীতিগত অবস্থানের কারণে তিনি এ সম্মান গ্রহণ করেননি।
এই সব সম্মান ও স্বীকৃতি শুধু তার অভিনয় দক্ষতারই প্রমাণ নয়, বরং বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার স্থায়ী প্রভাব ও কালোত্তীর্ণ অবস্থানের স্বীকৃতিও বহন করে।
চরিত্র নির্বাচন, পরিচালক ও সহ-অভিনেতা বাছাইয়ে সুচিত্রা সেন ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে কাজের প্রস্তাব তিনি একচেটিয়া চুক্তিগত কারণে ফিরিয়ে দেন। রাজ কাপুরের সঙ্গেও ব্যক্তিত্বগত কারণে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
রূপ, অভিনয় ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বে সুচিত্রা সেন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির চিরকালের মহানায়িকা। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় সিনেমার পরিবর্তিত ধারার মধ্যেও তিনি নিজের লাবণ্য ও অভিনয়গুণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
মহানায়িকার দ্বাদশ প্রয়াণ দিবসে বাংলা চলচ্চিত্রের এই চিরসবুজ নক্ষত্রের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক
১৭৮ দিন আগে
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১: নারীদের সাহস ও আত্মত্যাগ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক ও গৌরবোজ্জ্বল। তাঁরা কেবল সহায়ক হিসেবে নয়, বরং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, গোপন তথ্য আদান–প্রদান, চিকিৎসা সেবা এবং রসদ সরবরাহের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এ যুদ্ধে বহু নারী মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে সরাসরি গেরিলা অভিযানে অংশ নেন। তাঁরা অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরণ ঘটানো এবং শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন, গোপন বার্তা বহন করেন এবং অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্য সরবরাহে সহায়তা করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নারী সমাজের আরেকটি বড় ভূমিকা ছিল চিকিৎসা ও সেবামূলক কার্যক্রম। চিকিৎসক, নার্স এবং সাধারণ গৃহিণীরা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পরিচর্যায় এগিয়ে আসেন। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় দুই লাখ নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের “বীরাঙ্গনা” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
উল্লেখযোগ্য নারী মুক্তিযোদ্ধারা
তারামন বিবি: কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর এলাকার বাসিন্দা। কিশোর বয়সেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে অংশ নেন এবং ১১ নম্বর সেক্টরের গেরিলা অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি “বীর প্রতীক” খেতাব লাভ করেন।
কাঁকন বিবি: খাসিয়া সম্প্রদায়ের একজন নারী, মুক্তিযুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন। ‘মুক্তিবেটি’ নামেও পরিচিত কাঁকন বিবি তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র পরিবহন এবং গোপন অভিযানে অংশ নেন। ১৯৯৭ সালে তাঁকে “বীর প্রতীক” উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
শিরিন বানু মিতিল: পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পুরুষের পোশাক পরে গেরিলা অভিযানে অংশ নেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
ডা. সিতারা বেগম: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে “বীর প্রতীক” খেতাব দেওয়া হয়।
২১৩ দিন আগে
৭১–এর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ২৪ বারবার ফিরে আসবে: অধ্যাপক কামরুল আহসান
১৬ ডিসেম্বর—বাঙালি জাতির গৌরব, আত্মপরিচয় ও বিজয়ের দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দিনে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও গণতন্ত্র, ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ চর্চা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
মহান বিজয় দিবসে এমন বাস্তবতা নিয়ে ইউএনবির সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। সাক্ষাৎকারে উপাচার্য বিজয় দিবসের তাৎপর্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি, মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা, ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং তরুণ প্রজন্মের করণীয় নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইউএনবির জাবি প্রতিনিধি যোবায়ের হোসেন জাকির।
বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তিতে এ দিনের তাৎপর্য আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
এই দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, বাংলাদেশ একটি গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান প্রতিরোধের জায়গা ছিল জনগণের নির্বাচনি ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করা। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব—এই তিনটি বিষয়ের মধ্যেই নিহিত। এ দেশের মানুষের অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই ছিল আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।
বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে?
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে গত বছরের মতো এবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ, প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক হলসহ বিভিন্ন দপ্তরে আলোকসজ্জা, উন্নত খাবারের ব্যবস্থা।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ও নথিবদ্ধকরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিশেষ উদ্যোগ কি আছে?
আমরা চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করে একটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেছি। একইসঙ্গে ওরাল আর্কাইভে ২৪–এর ঘটনাবলী সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। চব্বিশের জন্ম হয়েছে একাত্তরের মধ্য দিয়েই। ১৯৭১–এর পর যে অপূর্ণতা ছিল, সেখান থেকেই ২৪–এর আবির্ভাব। তাই ২৪–কে ধারণ করার পাশাপাশি লালন করাও জরুরি। ৭১–এর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ২৪ বারবার ফিরে আসবে।
পাঠক্রমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে শক্তিশালী করতে নতুন কোনো কোর্স বা উদ্যোগ কি নেওয়া হচ্ছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ তাদের কোর্স কনটেন্ট পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এ বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস না জানার কারণে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছে। আমাদের আনুভূমিক ও উল্লম্ব—দুই ধরনের ইতিহাস রয়েছে। ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলমানদের বঞ্চনার ইতিহাস কিংবা উপমহাদেশের মুসলিম চিন্তাবিদদের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।
ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নতুন কোনো প্রকল্প আছে কি?
আমাদের ক্যাম্পাসে অমর একুশে, শহীদ মিনার, সংশপ্তকসহ ৫২, ৭১ ও ২৪–কে ধারণ করা বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। সম্প্রতি ২৪–এর স্মরণে ‘অদম্য–২৪’ উদ্বোধন করেছি। তবে এগুলো যথেষ্ট নয়। ৭১ ও ২৪–কে স্মরণে রাখতে আরও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন। অতীত স্মরণে ব্যর্থতার ফলেই আমরা দীর্ঘ স্বৈরশাসন দেখেছি।
আপনার মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা কি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানছে?
আমার মনে হয়, খুব সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী ছাড়া অধিকাংশই সঠিক ইতিহাস জানে না। বিভিন্ন সরকার নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী ইতিহাস উপস্থাপন করেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পুনরাবৃত্তি না হয়। ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তাকে ততটুকুই ন্যায্যভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তা না হলে আবারও ২৪–এর মতো পরিস্থিতির জন্ম হতে পারে।
নতুন প্রজন্ম ইতিহাস থেকে যথেষ্ট শিক্ষা পাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে। বস্তুনিষ্ঠতার অভাবই এর মূল কারণ। ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের সাক্ষাৎকার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ওরাল আর্কাইভ এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি করা গেলে সচেতনতা বাড়বে।
স্বাধীনতার মূল চেতনা আপনার দৃষ্টিতে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
আমরা এখনো বিভাজনের রাজনীতিতে ব্যস্ত। ২৪ সংঘটিত হয়েছে দেড় বছর হলো, অথচ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে পরস্পরের প্রতি বিষোদগার থামেনি। এতে করে আমরা ৭১ ও ২৪—দুটোকেই হারানোর ঝুঁকিতে আছি। বিভাজনের হাজার কারণ থাকলেও ঐক্যের একটি কারণ থাকলে সেটিকেই গ্রহণ করতে হবে। ৭১ ও ২৪–এর মতো জাতি–ধর্ম–বর্ণ–লিঙ্গ নির্বিশেষে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ কী?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় মাধ্যমভিত্তিক বিভাজন রয়েছে—বাংলা, ইংরেজি, মাদ্রাসা ও কারিগরি। এগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে হবে। শিক্ষাখাতে বাজেট অত্যন্ত কম। আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে ৪–৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়, সেখানে আমরা দিচ্ছি ১–২ শতাংশ। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। শিক্ষা কমিশন গঠন ও আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
একাডেমিক উন্নয়ন ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছি এবং ভালো গবেষকদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক গবেষণায় আমাদের অবস্থান শক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়েও আমরা একাধিকবার দেশের শীর্ষে ছিলাম। এখন শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্যও বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজয় দিবসে শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
ইতিহাস বলে, গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা। অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের উদ্যম—এই দুইয়ের সমন্বয়েই দেশ এগিয়ে যাবে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ও পাঠকক্ষে বেশি সময় দিয়ে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে, যেন ভবিষ্যতে তারা দেশকে নেতৃত্ব দিতে পারে।
২১৫ দিন আগে
বিদায় ‘বাঘবন্ধু’ আন্দ্রে কার্সটেনস
বছরখানেক আগে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত আন্দ্রে কার্সটেনসের সঙ্গে আমরা যখন দেখা করি, তখনও বুঝতে পারিনি যে সুন্দরবন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার এত গভীরভাবে তার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। সে সময় তিনি কেবল সুন্দরবন ঘুরে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তবে সেই ইচ্ছা কাজে রূপ নিতে সময় লাগেনি।
সেই একবারই নয়, দুই দুবার তিনি সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। সেই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং বাঘ বাঁচাতে তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গাড়িতে বসে আয়েশি ভ্রমণ ছেড়ে দু’চাকার সাইকেলে প্যাডেল ঘুরিয়ে বনবিলাসও করেছেন। না, এগুলো শুধু লোক দেখানো কর্মকাণ্ড ছিল না, সত্যিকার অর্থেই উল্লিখিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করেছেন তিনি।
সত্যিকার অর্থে, বাঘ ভালোবেসেই এসব করেছেন কার্সটেনস। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন ‘বাঘবন্ধু’।
৩৪৫ দিন আগে
৪ আগস্ট রাতে যেভাবে গুজব রুখে দিয়েছিল একটি ছবি
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল প্রথমে কোটা সংস্কারের আন্দোলন। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ধাপে ধাপে এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দেশের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের অভিন্ন আন্দোলনে পরিণত হয় এটি।
তবে এই আন্দোলন রুখতে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের চেষ্টার কমতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলন যতটা খাটো করে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা যায়, তার প্রচেষ্টাও ছিল অবিরত। একটা পর্যায় থেকে তো ইন্টারনেট সেবাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনের সেই সময়টায় ছাত্রজনতাকে বিভ্রান্ত করতে তৎকালীন সরকারপক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল গুজব। ৫ আগস্ট আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার আগের রাতে, অর্থাৎ ৪ আগস্ট রাতে তেমনভাবেই আরও একবার গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে একটি ছবি সেই সময় গুজবের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
সেদিন রাতে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু মিলে তোলা একটি ছবি তাই আজ হয়ে গিয়েছে ইতিহাসের অংশ।
গণঅভ্যুত্থান চলাকালে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সাংবাদিক টিএসসির অতিথি কক্ষে অবস্থান নিয়ে সারা দেশে মানুষের কাছে ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টায় ব্রতী ছিলাম।
এর মাঝে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে আমাদের ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। পরের দিন ৪ আগস্ট সারা দিনের প্রোগ্রাম কভার করে রাতে ক্লান্ত শরীরে গিয়েছিলাম বিশ্রাম নিতে। এ সময় ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে দেখি, আওয়ামী লীগ–ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গুজবমূলক পোস্টে সয়লাব ফেসবুকের ফিড।
সেসবের মধ্যে অন্যতম ছিল— সারা দেশ থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও শাহবাগে অবস্থান নিয়ে পুরো এলাকার দখল নিয়েছে। ওই দাবির সত্যতা প্রমাণে পুরনো একটি ভিডিও শেয়ার করে তারা, যার শিরোনাম ছিল, ‘৭ মিনিটে টিএসসি-শাহবাগ দখল।’
এসব ভিডিও দেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফোন দিয়ে ঘটনার সত্যতা জানতে চান। দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারের শাসনে অতিষ্ট এসব মানুষের মনে মুক্তির যে সম্ভাবনার কুঁড়ি পাপড়ি মেলতে শুরু করেছিল, তা বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়েই একের পর এক ফোন দিচ্ছিলেন নানাজন।
অথচ, সারা দিন বাইরে ঘুরে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতে হোস্টেলের কক্ষে ফেরার আগে আমি যা দেখেছি, সেই সত্যের পুরোপুরি বিপরীত ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ওইসব পোস্ট ও ভিডিও। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সেই রাতে কোনো মানুষ ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় ছিল পিনপতন নীরবতা।
ফলে এমন একটি আন্দোলন গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে তার পথ হারাবে, গতি হারাবে, তা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। তাই সহকর্মী-বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জানাই এবং এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করার বিষয়টি আমাদের আলোচনায় উঠে আসে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, ফেসবুকের ওই গুজবকে উন্মোচন করে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের ষড়যন্ত্র রুখে দেব।
এরপর আজকের পত্রিকার ঢাবি প্রতিনিধি ছিদ্দিক ফারুক, দৈনিক সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি যোবায়ের আহমদ, দৈনিক নয়া দিগন্তের হাসান আলী, আমাদের সময়ের আশিকুল হক রিফাত, ইত্তেফাক পত্রিকার নেসার উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে আমি টিএসসিতে আসি। এরপর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিনিধি জোবায়ের হোসেনের তোলা ছবিটি আমরা নিজেদের প্রোফাইল থেকে শেয়ার করি। সেইসঙ্গে লিখে দিই, আমরা ছাড়া টিএসসিতে আর কেউ নেই। পাশাপাশি, কেউ যেন গুজবে বিভ্রান্ত না হয়, সেই আহ্বান জানাই।
মুহূর্তের মধ্যে ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। বিভিন্ন গ্রুপ, পেজ ও প্রোফাইলে ছবি ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে খবর বের হয়।
আমাদের ওই ছবিটি শেয়ার করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা দেশের সকল স্তরের মানুষকে ভয় না পেয়ে রাস্তায় নেমে আসার ঘোষণা দেন।
ফেসবুকে এ ছবি দেওয়ার পর বিভিন্নজনের কাছ থেকে সাধুবাদ পেলেও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে আমরা পাই নানা ধরনের হুমকি। ছবিটি আপলোড করার পর থেকেই গণহারে আমাদের আইডিগুলোকে রিপোর্ট করা শুরু হয়। মৃত্যুর হুমকিসহ অসংখ্য গালাগালপূর্ণ মেসেজে ভরে যায় ইনবক্স।
তবে এতকিছু করেও সত্যকে চাপা দিতে পারেনি তারা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারপর গণভবন অভিমুখে জনস্রোত শুরু হলে একপর্যায়ে দেশে ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে।
মুক্তিকামী মানুষের মনোবল জোগাতে আমদের সেই ছবিটি যে একটি মাইলফলক ছিল, গণঅভ্যুত্থানের অংশীদার অনেকেই তা স্বীকার করেন আজও। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়করা, অংশগ্রহণকারীরা দেখা হলেই ছবিটির প্রসঙ্গ তোলেন; আমাদের উপস্থিত বু্দ্ধির প্রশংসা করেন। নিজেদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প বলেন।
শুধু এই ছবিটি নয়, এমন অনেক ছবি, গল্প ও ভিডিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এগিয়ে নিয়েছিল, দিয়েছিল পূর্ণতা।
তবে শহীদদের রেখে যাওয়া আমনত রক্ষা, তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নই গণঅভ্যুত্থানের সত্যিকারের ফসল ঘরে তুলতে পারার মহৌষধ হিসেবে কাজ করবে। আজ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমাদের চাওয়াও কেবল সেটিই।
৩৪৮ দিন আগে