ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত জগতে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল, ২০২৬) মুম্বাইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলী জেলায় জন্ম নেওয়া আশা ভোঁসলে ছোটবেলা থেকেই সংগীতময় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নাট্যসংগীত শিল্পী এবং বড় বোন লতা মঙ্গেশকর ভারতীয় সংগীতের আরেক কিংবদন্তি। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪০-এর দশকে বলিউডে প্লেব্যাক গানের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬ বছর বয়সে গণপত রাও ভোঁসলের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও সম্পর্কটি ছিল অশান্ত। পারিবারিক অমত, মানসিক চাপ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তিনি সংগীতকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণের সঙ্গে তার বিবাহ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রায় ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি ও ইংরেজিসহ বহু ভাষায় তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ও লেকে প্যাহলা প্যাহলা পেয়ার’, ‘পিয়া তু আব তো আযা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’, ‘ঝুমকা ঘিরা রে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান আজও শ্রোতাদের মনে অমলিন।
তার কণ্ঠকে বিশ্বের অন্যতম বহুমুখী কণ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্লাসিক্যাল, পপ, কাবারে থেকে লোকসংগীত—সব ধারাতেই তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্থান পান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি মাইকেল জ্যাকসন ও বয় জর্জের মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
সংগীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও ছিল তার গভীর আগ্রহ। দুবাইসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তার সন্তানদের মধ্যে আনন্দ ভোঁসলে ও নন্দিনী ভোঁসলে পরিচিত।
১১ এপ্রিল ২০২৬ মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে বুকে সংক্রমণ ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তাকে ভর্তি করা হয়। পরদিন, ১২ এপ্রিল দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষকৃত্য মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে অনুষ্ঠিত হবে।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শুধু বলিউড নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত অঙ্গন হারাল এক যুগস্রষ্টাকে। তার কণ্ঠ, সৃষ্টিকর্ম এবং সংগ্রামী জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত জগতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক