প্রায় চার দশক ক্ষমতায় থাকার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তিনি নিহত হওয়ার পরপরই দেশের উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, যা জটিল এবং গভীর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
অস্থায়ী কাউন্সিলের দায়িত্বভার গ্রহণ
রবিবার (১ মার্চ) সংবিধানের রূপরেখা অনুযায়ী ইরান দেশ পরিচালনার জন্য একটি কাউন্সিল গঠন করেছে। এ কাউন্সিল ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এই সদস্যকে বেছে নেয় ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল যা সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেয় এবং পার্লামেন্টের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি করে।
ইরানের সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং কট্টরপন্থি বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলামহোসেইন মহসেনি এজেয়ি এ কাউন্সিলের সদস্য, যারা সাময়িকভাবে নেতৃত্বের সমস্ত দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে আলেমদের প্যানেল
অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব কাউন্সিল দেশ শাসন করবে। তবে ইরানের আইন অনুযায়ী, ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ নামক ৮৮ সদস্যের একটি প্যানেল যত দ্রুত সম্ভব একজন নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে।
এ প্যানেলটি সম্পূর্ণভাবে শিয়া আলেমদের নিয়ে গঠিত, যারা প্রতি আট বছর অন্তর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তবে তাদের প্রার্থিতা অনুমোদিত হতে হয় ইরানের সাংবিধানিক নজরদারি সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিল দ্বারা। এই সংস্থাটি বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করার জন্য পরিচিত। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে এ প্যানেলের নির্বাচনে লড়তে বাধা দিয়েছিল।
খামেনির ছেলে সম্ভাব্য প্রার্থী
উত্তরাধিকার নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা ও কৌশলগুলো সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটে থাকে। ফলে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী কে হতে পারেন তা আগে থেকে বলা যায় না।
আগে ধারণা করা হতো, খামেনির শিষ্য কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এই দায়িত্ব নিতে পারেন। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। এর ফলে খামেনির ছেলে ৫৬ বছর বয়সী শিয়া আলেম মোজতবা খামেনি একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। তবে এর আগে, তিনি কখনও সরকারি কোনো পদে ছিলেন না।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে বাবার পর ছেলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ইরানিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারে। অনেকে একে ইসলাম-বহির্ভূত এবং ১৯৭৯ সালে মার্কিন সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পর একটি নতুন ‘ধর্মীয় রাজবংশ’ তৈরির চেষ্টা হিসেবে দেখতে পারেন।
আগে একবারই ঘটেছে
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক বা সর্বোচ্চ নেতার পদে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা আগে মাত্র একবারই ঘটেছে।
১৯৮৯ সালে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার। ইরাকের সঙ্গে আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই নেতা।
বর্তমান এ ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ২০২৫ সালের জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা
ইরানের জটিল শিয়া ধর্মতন্ত্রের কেন্দ্রে থাকেন সর্বোচ্চ নেতা এবং রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয়ে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
তিনি দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রেভল্যুশনারি গার্ড হলো একটি আধাসামরিক বাহিনী যেটিকে ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
খামেনি তার শাসনামলে এই বাহিনীকে ব্যাপক শক্তিশালী করেছিলেন। এ বাহিনীটি ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিত্র নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দেয়। ইরানে তাদের বিশাল সম্পদ ও ব্যবসায়িক মালিকানা রয়েছে।