বিশেষ সংবাদ
চীনা বিনিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদে আশাব্যঞ্জক নয়
চলতি বছর মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশে বিনিয়োগে দেশটির ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করা। এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময় বাড়ছে চীনের বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ। তবে এ নিয়ে ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
চলতি বছর হংকংভিত্তিক কোম্পানি হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চীনা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। শুরুতে তারা ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশ্বাস দিলেও, পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ২৫০ মিলিয়ন ডলারে উত্তীর্ণ করেছে কোম্পানিটি। হান্ডা মূলত দেশের টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ করবে। কোম্পানিটির দেওয়া দুটি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং একটি নিট অ্যান্ড ডাইং প্রতিষ্ঠানে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
আরেক চীনা কোম্পানি খিয়াশি চট্টগ্রামের মিরসারাইয়ে বেপজা ইকোনোমিক জোনে ৪০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটি বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে আন্ডারগার্মেন্টেসের ব্যবসা করছে, যেখানে ৩ হাজার ৭০০ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত আছে। এর অংশ হিসেবে মিরসারাইয়েও বড় আকারে আন্ডার গার্মেন্টেসের নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা খিয়াশির।
চীনের বিখ্যাত কোম্পানি চায়না লেসো গ্রুপ বাংলাদেশে ৩২.৭৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে ন্যাশনাল স্পেশাল ইকোনোমিক জোনে কোম্পানিটিকে সাড়ে ১২ একর জমিও লিজ দিয়েছে বাংলাদেশ ইকনোমিক জোন অথরিটি (বেজা)।
এর আগের দুই কোম্পানি পোশাক খাতভিত্তিক বিনিয়োগ করলেও লেসো গ্রুপের বিনিয়োগ মূলত পিভিসি পাইপ, পিইএক্স পাইপ, সোলার প্যানেল, কিচেন ইকুইপমেন্ট, স্যানিটারি ওয়্যার, ওয়াটার পিউরিফাইয়ারসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরিতে।
আরও পড়ুন: ইউনানে বাংলাদেশিদের জন্য উচ্চমানের চিকিৎসাসেবার প্রতিশ্রুতি চীনের
বাংলাদেশে যখন অন্য কোনো দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আসছে না, সেখানে চীনের বিনিয়োগ আশার আলো, নাকি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তা নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ‘১৯ খাতকে চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কাজ চালাচ্ছে বিডা। সেখানে ক্যাটাগরি ‘এ’-তে থাকা অ্যাপারেল, অ্যাডভান্স টেক্সটাইল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে চীন। চীনের লেসো গ্রুপ যে বিনিয়োগ করেছে, এ ধরনের বিনিয়োগ তারা আগে বাংলাদেশে করেনি।’
ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে চীনের অনেক কাজ থাকলেও বাংলাদেশে বেসরকারি চীনা কোম্পানির তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। এ খাতে চীনের বিনিয়োগ দেশে দক্ষ মানবসম্পদ এবং কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে সাহায্য করবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে অনেক দেশই কাজ করছে, তারা দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে চায়। চীনের এই বিনিয়োগ সফল হলে অন্যান্য দেশও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ হবে।’
তবে হঠাৎ করে বাংলাদেশে চীনের এমন আগ্রহকে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আঙ্গিকে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। এর বাইরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং ফিলিপাইনে যে ধরনের বিনিয়োগ হয় তার তুলনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ অপ্রতুল বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে ১.২৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে যা ছিল ১.৪৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক বিনিয়োগ কমেছে ১৯৩.৭৪ মিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ এসেছে ২০৮.২৩ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৬.৪০ শতাংশ। ২০২৩ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৩০.২৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বেশিরভাগ চীনা কোম্পানির বিনিয়োগই টেক্সটাইল এবং তৈরি পোশাকভিত্তিক।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
অন্যদিকে, পোশাকখাতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামে চীনের বিনিয়োগ কয়েকগুণ বেশি। চীনের স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভিয়েতনামে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে বিনিয়োগ করেছে চীন। ২০০৪ সাল থেকে ভিয়েতনামে প্রতি বছর চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে ১৩.৫ শতাংশ।
এশিয়ার আরেক দেশ কম্বোডিয়ার বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রায় ৫০ শতাংশের জোগানদাতা চীন। কাউন্সিল ফর দ্য ডেভলপমেন্ট অব কম্বোডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, বিগত এক দশকে দেশটিতে চীনের বিনিয়োগ ছাড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলার। রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকনোমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) এবং চায়না-কম্বোডিয়া ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (সিসিএফটিএ) আওতায় প্রতি বছর বাড়ছে দেশদুটির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিধি।
এ অবস্থায় চলতি বছর বাংলাদেশে তিন চীনা কোম্পানির ৩২২ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিশ্রুত ১ বিলিয়ন ডলারের আশু বিনিয়োগ ‘বড় কিছু নয়’ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘সাধারণত এখন বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার কথা না। তবে ভূ-রাজনৈতিক জায়গা থেকে বাংলাদেশে চীন তাদের ব্যবসার পরিধি বিস্তৃত করতে চাইছে। তার অংশ হিসেবেই এই বিনিয়োগ।’
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের মাঝে গেল এপ্রিলে চীনের ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫ শতাংশ ট্যারিফের ক্ষতি এড়াতে দেশটি বিকল্প পথ হিসেবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকেও বেছে নিয়েছে উল্লেখ করে আকাশ জানান, ‘ভূ-রাজনৈতিক কারণে দেশে কিছু বিনিয়োগ আসছে বটে, তবে প্রত্যাশার তুলনায় তা অপ্রতুল।’
চীনের সঙ্গে এমন বাণিজ্য ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
তবে এখানে শঙ্কার কিছু নেই উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো গবেষক অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক এ সম্পর্কের জায়গায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের চেয়েও কয়েক গুণ বড় বিনিয়োগ আছে চীনের।’
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের প্রধান খাতগুলোতে বিনিয়োগে আগ্রহী চীনা ব্যবসায়ীরা: বিডা
এই বিনিয়োগ ব্যতিক্রম কিছু নয় উল্লেখ করে মোস্তাফিজুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ইউরোপ, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজারে এখনো ডিউটি ফ্রি সুবিধা পাচ্ছে। এই সুবিধা কাজে লাগাতেই চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। এ ছাড়া চীন এশিয়ার বাজারে নিজেদের বিস্তৃতি বাড়াচ্ছে। এমন নয় যে ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার বাজার স্থানান্তর হয়ে বাংলাদেশে আসছে।’
দেশের তৈরি পোশাকখাতে (আরএমজি) চলতি সময়ে চীনের বিনিয়োগকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন না দেশীয় ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়ায় চীন আধুনিক প্রযুক্তির ম্যানুফেকচারিং এবং ইলেকট্রনিক্স কারখানা স্থাপন করছে। সেখানে বাংলাদেশে গড়পড়তা গার্মেন্টস কারখানা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে ঠিকই, কিন্তু উন্নত প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারছে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘দেশের আরএমজি খাত দেশীয় ব্যবসায়ীদের দ্বারাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ খাতে চীনের বিনিয়োগ যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হাইটেক ইলেকট্রনিক্স খাতে। ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ায় চীন সেমিকন্ডাক্টর বানাচ্ছে, আর বাংলাদেশে গড়ে তুলছে গড়পড়তা পোশাক কারখানা। এতে করে দেশের কর্মসংস্থানে দক্ষতা একমুখী হয়ে পড়ছে।’
চীন গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা ট্রান্সফার হচ্ছে না উল্লেখ করে শামীম জানান, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পলিস্টার স্পিনিং কারখানা নেই, নেই বাইওক্সিয়ালি ওরিয়েন্টেড পলিপ্রোপেলিন (বিওপিপি) ফিল্ম কারখানা।
এসব পণ্যে বাংলাদেশ প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। চীনের উচিত ছিল আরএমজি বা ম্যানুফেকচারিংয়ে এসব পণ্যে বিনিয়োগ করা। এতে করে বাংলাদেশ নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠত, রপ্তানি খাতেও বৈচিত্র্য আসতো বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।
সাম্প্রতিক চীনা বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে সাময়িক সুফল আনলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব তেমন একটা আশাব্যঞ্জক নয় বলেই মত অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের। তবে বিডা সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চীনের এই বিনিয়োগের মাধ্যমে এফডিআই খরা কাটতে শুরু করলে দেশের অন্যান্য খাতেও বৈদেশিক বিনিয়োগ আসতে শুরু করবে।
২৮৯ দিন আগে
বহুল প্রতীক্ষীত তৃতীয় তিস্তা সেতু চালু হচ্ছে আজ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে তিস্তাপাড়ের মানুষের। আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে চলেছে বহুল প্রত্যাশিত তৃতীয় তিস্তা সড়ক সেতু।
এর আগে পাঁচ দফা সময়সীমা পেছালেও অবশেষে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার (১.৪৯ কিলোমিটার) দীর্ঘ এই সেতুটি কুড়িগ্রামের চিলমারী এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মানুষের বহুকালের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে নির্মিত এ সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৬৭ কোটি টাকা। আর সংযোগ সড়ক, নদীশাসন, কালভার্ট ও জমি অধিগ্রহণে খরচ হয়েছে আরও ৩৬৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তিস্তা নদীর বুকে এটি হলো তৃতীয় সড়ক সেতু। তবে ধৈর্ঘ্যে এই সেতুটিই সবচেয়ে বড়।
প্রথম তিস্তা সড়ক সেতুটি নির্মিত হয় ২০১২ সালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা এলাকায়, যার দৈর্ঘ্য ৭৫০ মিটার এবং ব্যয় হয়েছিল ৮৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয়টি নির্মিত হয় ২০১৮ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ার মহিপুরে। সেটির দৈর্ঘ্য ৮৫০ মিটার এবং ব্যয় হয়েছিল ১৩১ কোটি টাকা।
এবার চালু হতে যাচ্ছে সবচেয়ে আধুনিক তৃতীয় সেতুটি, যা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
এলজিইডি কার্যালয় সুত্র জানায়, এলজিইডির অধীনে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ইফাদের (ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট) অর্থায়নে এবং চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৩ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও, নানা কারণে পাঁবার সময়সীমা পিছিয়ে অবশেষে এ বছরের আগস্টে শেষ হয় কাজ।
আরও পড়ুন: রংপুরে তিস্তা বাঁধে ধস, শঙ্কায় হাজারো পরিবার
সেতুটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ২৯০টি পাইল, ৩০টি পিলার, ২৮টি স্প্যান এবং ১৫৫টি গার্ডার। উভয় প্রান্তে পানি নিষ্কাশনের জন্য তৈরি করা হয়েছে ১২টি ব্রিজ ও ৫৮টি বক্স কালভার্ট। পাশাপাশি ১৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে নদীশাসনসহ মোট ৫৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
২৮৯ দিন আগে
ভবদহের দেড়শ গ্রাম পানিবন্দি, পাঁচ লাখ জীবন দুর্বিষহ
ভবদহ অঞ্চল একসময় উর্বর ফসলি জমি ও প্রাণবন্ত জনবসতির জন্য পরিচিত ছিল। তবে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে এক বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে। গত এক দশকের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত নীতির কারণে ভবদহ প্রতি বছরই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে।
সর্বশেষ জুলাই মাসের টানা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদী, খাল-নালার নাব্যতা হ্রাসের কারণে ভবদহের ৫২টি বিল প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার দেড়শ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। ফসলি মাঠ, বসতবাড়ি, অধিকাংশ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে। তারা গত ৭ আগস্ট যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে ছয় দফা দাবি পেশ করেছেন।
দাবির মধ্যে রয়েছে স্লুইসগেটের সব ভেন্ট খুলে দেওয়া, আমডাঙ্গা খালের জমি অধিগ্রহণ ও ৮১ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। বর্তমানে ভবদহে স্লুইসগেটের ২১টি ভেন্টের মধ্যে মাত্র আটটি খোলা রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কমিটির অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, গত এক দশকে ভবদহ প্রকল্পে প্রায় ১২৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবুও কার্যত কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এলাকাবাসী ও পরিবেশবিদরা এই অর্থের অপচয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, ভবদহে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই কাজ হবে না; অর্থটি যদি সঠিকভাবে ও স্বচ্ছভাবে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে কোনো সুফল মিলবে না।
আরও পড়ুন: বন্যার পানি নামছে, জেগে উঠছে ক্ষত
২৮৯ দিন আগে
কৃষি ঋণে কি বেসরকারি ব্যাংক ও প্রান্তিক কৃষকের অনাগ্রহ বাড়ছে?
চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে গত বছরের চেয়ে এ বছর ঋণের পরিমাণ নতুন করে ১ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঋণ প্রদান কম ৬৭৪ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ২টি বিশেষায়িত ব্যাংক, ৪২টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ৮টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ করেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৮.২৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে ঋণ প্রদান করা হয়েছে ৩৭ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা বেশি।
অন্যান্য বছরগুলোতে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঋণ প্রদান কমে আসার কারণ অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক চাষি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে কৃষি ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমেছে। বিশেষত আশপাশের যারা কৃষি ঋণ নিয়েছেন, তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন বাকিরা।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি দেশীয় ব্যাংকের মধ্যেও ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকেও ঋণ প্রদানের পরিমাণ অন্যান্য সময়ের তুলনায় কম ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উইংয়ের সর্বশেষ মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কৃষি ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে ১১.৩৫ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই ঋণ প্রদানের পরিমাণ কমেছে ৯.৭৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে তা কমেছে ০.৩০ শতাংশ। এই তিন ক্যাটাগরির ব্যাংকের অধীনে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের কথা থাকলেও সবচেয়ে কম ঋণ দিয়েছে এসব ব্যাংকই।
অন্যদিকে, দুই বিশেষায়িত ব্যাংকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ঋণ প্রদানের পরিমাণ বেড়েছে ১১.৬৯ শতাংশ। যেখানে বিশেষায়িত ব্যাংকের অধীনে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
এদিকে, ঋণ প্রদান কমলেও বেড়েছে ঋণ আদায়ের পরিমাণ। মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২৩-২৪-এর তুলনায় ঋণ আদায় বেড়েছে ৪.৬৮ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঋণ আদায় বেড়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে, ৮.৭৬ শতাংশ; যাদের হাতে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার ১২১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ কম দিলেও আদায়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল এবং এটিই কৃষকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ মাঠ সংশ্লিষ্টদের।
ক্ষুদ্র কৃষক এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ
কৃষি ঋণে ধীরে ধীরে অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে ক্ষুদ্র কৃষক এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বাংলাদেশের দুই জেলা ময়মনসিংহ এবং বরিশালের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই তারা ঋণ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।
ময়মনসিংহের কৃষি উদ্যোক্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘কৃষি ঋণ আমাদের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকে কাঠখড় পুড়িয়ে ঋণ পেলেও এ ঋণের দেনা শোধ করতে বিক্রি করতে হচ্ছে জমি। স্বল্প সুদের কথা বললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুদ বাড়ছে। অন্যদিকে, বৈরি আবহাওয়ার কারণে কৃষি ফসলে ক্ষতি হয়েছে, অনেকের মাছের ঘের ডুবে গেছে। তাদের জন্য ঋণ শোধ করা কষ্টসাধ্য।’
নিজের প্রসঙ্গে আবু বকর বলেন, ‘ঋণ নিয়ে ফসল ফলানোর পর ফসলের ক্ষতি হলে সেখানে কৃষককে কে বাঁচাবে তার কোনো পরিকল্পনা নেই। এতে করে আমিসহ আশপাশের অনেক কৃষক আছেন যারা পাঁচ-ছয় মাস ঋণের কিস্তি দিতে পারেননি। তাদের অনেকের নামে মামলার নোটিশ এসেছে।’
একই জেলার আরেক কৃষক সামসুদ্দিন বলেন, ‘কৃষককে ঋণ দেওয়ার নামে প্রতি মাসে যদি সুদ বাড়িয়ে ব্যবসা করার চিন্তা করে ব্যাংক, তাহলে কৃষকদের উন্নতি কীভাবে হবে? একদিকে ফসল হয়নি, যা বিক্রি করেছি তা থেকেও মুনাফা ওঠেনি, অন্যদিকে প্রতিমাসে সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত।’
কৃষি ঋণের খোঁজ নিতে গিয়ে বরিশালে দেখা গেল একেবারেই ভিন্ন চিত্র। দক্ষিণাঞ্চলের এ জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলায় যেসব কৃষক কৃষি ঋণ নিয়েছেন, তারা কৃষক হলেও ঋণের অর্থ কাজে লাগিয়েছেন অন্য খাতে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার এক কৃষক বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে অনেকে কৃষি ঋণ নিয়েছেন। ঋণের অর্থে কেউ দিয়েছেন দোকান, কেউবা করছেন জমির ব্যবসা।’
ঋণ নেওয়া এমন আরও কয়েকজন কৃষক জানান, কৃষি ঋণ নিয়ে ফসলের মাঠে অর্থলগ্নি করলে ঋণের টাকা শোধ করা কঠিন হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ সময়ই ফসলের যে দাম অনুমান করে ঋণ নেওয়া হয় তার অর্ধেক দামও ওঠে না। তাই ফসলের চাষ করার পাশাপাশি ঋণের অর্থ দোকান বা জমি বেচা-কেনায় অর্থ লগ্নি করেন তারা।
কৃষকরা জানান, একমাত্র বিনা সুদে ঋণ দিলে কৃষকরা ঋণের সুবিধাভোগী হতে পারবে। সুদের চাপ থাকলে ঋণ নিয়ে তারা মুনাফা অর্জন করতে পারে না। যারা একবার কৃষি ঋণ নিয়ে শুধু কৃষিকাজই করেছেন তারা আর দ্বিতীয়বার ঋণ নেননি, তারপরও মেটাচ্ছেন আগের ঋণের দেনা।
বিনা সুদে ঋণ কতটা যৌক্তিক?
নির্দিষ্ট কিছু আমদানি বিকল্প ফসলে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। এর বাইরে ৫-৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয় কৃষকদের, অনেক ক্ষেত্রে এ ঋণে সুদের পরিমাণ আরও বেশি।
সুদহার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, কৃষি ঋণের সুদহার ব্যাংকগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করবে, তবে সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, এ খাতে সুদহার হবে সরল এবং নমনীয়।
কৃষকদের বিনা সুদের ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সাবেক উপাচার্য এবং কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল বায়েস বলেন, ‘বিনা সুদে ঋণ দিলে ব্যাংক ব্যবস্থার কাঠামো বলে কিছু থাকে না। এই ঋণ অপারেশনের (পরিচালনা) ক্ষেত্রেও ব্যাংকের একটি খরচ আছে। বেসরকারি ব্যাংককে ঋণ প্রদানের আওতার মধ্যে রাখতে চাইলেও সুদের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবে এই সুদ যাতে কৃষকবান্ধব হয় সেদিকে নজরদারির দায়িত্ব সরকারের।’
তিনি বলেন, ‘বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে টাকা যাবে অন্যদের পকেটে, বঞ্চিত হবে কৃষক। এ ক্ষেত্রে কৃষক যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সেজন্য আলাদা ভর্তুকি এবং বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কোনো এলাকায় বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনা ঘটলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এসব এলাকায় ঋণ নেওয়া কৃষকদের ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়া।’
এক মৌসুমের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য মৌসুম পর্যন্ত কৃষকদের ছাড় দেয়ার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জোর দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন ঋণ পরিশোধে ১২ কিস্তি পর্যন্ত সুযোগ পায় এবং মামলার মতো হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে জোর দেন এই কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ।
ঋণ প্রদানে বেসরকারি ব্যাংকের অনাগ্রহ
বেশ কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জামানত নীতি থেকে শুরু করে অনেক বেসরকারি ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ে ঋণ প্রদানে যাচাই বাছাইয়ের সক্ষমতা নেই। এ ছাড়া উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে বেসরকারি অনেক ব্যাংকের কোনো শাখা না থাকায় তারা কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে পর্যন্ত পারে না। প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকরাও শহরে এসে ঋণ গ্রহণে আগ্রহী হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, শস্য জামানত নীতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য একজন কৃষককে সর্বোচ্চ ১৫ বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য ঋণ প্রদান করা যাবে। সে হিসাবে যারা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি, তাদের প্রত্যেকের জমির পরিমাণ ০.৪৯৪ একর থেকে ২.৪৭ একর। এরা প্রত্যেকেই জামানত হিসাবে শস্য-ফসল দায়বদ্ধকরণ বা ক্রপ হাইপোথিসিসের মাধ্যমে ঋণ নিতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে কৃষক ঋণ পরিশোধে সক্ষম না হলে ব্যাংক ফসল থেকে দেনা মেটাতে পারবে।
তবে এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না বেসরকারি ব্যাংকগুলো। তাদের কর্মকর্তারা জানান, কৃষককে যে পরিমাণে ঋণ দেওয়া হয়, শুধু ফসলের জামানত দিয়ে সেই ঋণের অর্থ আদায় ব্যাংকের জন্য কঠিন।
এ প্রসঙ্গে সায় দিয়ে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘বেসরকারি ব্যাংকের মূল সমস্যা ঋণ প্রদানের পর তাদের ঋণ আদায়ের সক্ষমতা নেই। এ ধরনের নিরাপত্তাহীনতার কারণেই তারা ঋণ দিতে চায় না। আবার অনেক বড় বড় ব্যাংক এসব ক্ষুদ্র ঋণের জন্য লোকবল নিয়োগেও আগ্রহী নয়।’
এ ছাড়া বেশিরভাগ কৃষক জানেনই না যে কোন ব্যাংকে কত সুদে এই ঋণ দেওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে ব্যাংকে গিয়ে ঋণের আবেদন করবেন। এজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে স্থানীয় এনজিও বা সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকের দ্বারস্থ হন বলে মনে করেন রিপন।
তবে কৃষি ঋণে বেসরকারি ব্যাংক আরও সম্পৃক্ত হচ্ছে জানিয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালক আনিসউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, ‘কৃষি ঋণ প্রদানে ব্যাংকের অনেক লোকবল দরকার, যারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে যাচাই বাছাই করে ঋণ দেবে। এত লোকবল নিয়োগের সক্ষমতা বেসরকারি ব্যাংকের নেই। তাই ক্রেডিট এবং ডেভেলপমেন্ট ফোরামের রেটিং দেখে (সিডিএফ) ভালো এনজিওর মাধ্যমে ঋণ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো।’
জামানত নীতি বদল নয়, বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের হার ৯৫ শতাংশ, যা সবচেয়ে বেশি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জামানত নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে সক্ষমতা বাড়ালে একদিকে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে দেশের কৃষিখাতেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে।’
২৯০ দিন আগে
ভূমি অফিস নয়, এখন সেবা মিলছে ঘরে বসেই
ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও হয়রানির দীর্ঘ ইতিহাস ছাপিয়ে এখন ডিজিটাল যুগের অনেক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ভূমিকে জনবান্ধব করতে ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়েছে একের পর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপ ভূমির সাথে জড়িত। তাই এ খাতে স্বচ্ছতা ও নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ ইউএনবিকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান।
সিনিয়র সচিব জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভূমি সেক্টরে ডিজিটাল রূপান্তরের গতি বেড়েছে। নাগরিক হয়রানি রোধ, দুর্নীতি বন্ধ এবং সেবার স্বচ্ছতা আনতে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। ভূমি মন্ত্রণালয় এখন ‘ল্যান্ড সিঙ্গেল গেটওয়ে’ চালু করেছে—যার মাধ্যমে সকল ডিজিটাল ভূমি সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ঘরে বসেই নাগরিকরা অনলাইনে নামজারি, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধসহ একাধিক সেবা নিতে পারছেন। একাধিক সফটওয়্যার আপডেট করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় এসব সেবা। বর্তমানে তা লাইভ রয়েছে।
সচিব বলেন, নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—ভূমি অফিসে না গিয়েই মোবাইল অ্যাপ কিংবা কল সেন্টারের মাধ্যমে খতিয়ান সংগ্রহ বা নামজারি করা যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিদেশ থেকেও +8809612316122 নম্বরে কল করে বা “ই-খতিয়ান” অ্যাপের মাধ্যমে সেবা পাওয়া সম্ভব।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় জোর
সকল নামজারি আবেদন নির্ধারিত সময়সীমার (২৮ দিন) মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো আবেদন অযথা ঝুলে থাকলে মনিটরিং কর্মকর্তারা তা যাচাই করবেন। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের জন্যও রয়েছে পরিষ্কার নির্দেশনা—নাগরিকের আবেদন পেন্ডিং রাখা যাবে না।
ভূমি সচিব বলেন, দুর্নীতি রোধে আমার কঠোর অবস্থান। ভূমি উপদেষ্টার নির্দেশে আমি মাঠ প্রশাসনে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ডিজিটাল খামারি: বাকৃবি গবেষকের অ্যাপে বিনামূল্যে প্রাণিসেবা
জিরো টলারেন্সে ভূমি মন্ত্রণালয়:
ভূমি উপদেষ্টা ও সিনিয়র সচিব মহোদয়ের নির্দেশনায় মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ড পর্যন্ত সবাই ভূমি সেবায় যুক্ত রয়েছেন। অভিযোগ পাওয়া মাত্র তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় এই রূপান্তর কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি একটি নাগরিক বিপ্লব—যেখানে ভূমি সেবাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে মানুষের সময়, অর্থ এবং আস্থা—তিনটিকেই সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
মেলাভিত্তিক সেবা
প্রতি বছর মে মাসে পালিত হয় ভূমি সেবা সপ্তাহ। এই সময়টিতে ভূমি মেলা ও ক্যাম্প আয়োজনের মাধ্যমে সরাসরি জনগণকে সেবা দেওয়া হয়। এতে করে সেবাগ্রহীতারা যেমন উপকৃত হন, তেমনি নীতি-নির্ধারকরা পান গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক পরামর্শ।
আইনগত সংস্কার:
ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা আনতে ইতোমধ্যে পাস হয়েছে একাধিক আইন: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩; ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩; ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩; হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩; স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি (সংশোধন) আইন, ২০২৩; বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০২৩।
পাশাপাশি নতুন করে প্রণয়নাধীন রয়েছে:
জলমহাল সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৪, হাট ও বাজার বিধিমালা-২০২৫, ভূমি অধিগ্রহণ বিধিমালা-২০২৫, ভূমি জোনিং ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫।
আরও পড়ুন: একবছরে ৫ হাজার ৯৩ একর বনভূমি উদ্ধার
আর্থিক স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির ধারা:
অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ও ‘এ-চালান’ সিস্টেম যুক্ত হওয়ায় ভূমি উন্নয়ন কর এখন সহজে প্রদান করা যাচ্ছে। দৈনিক প্রায় ১০-১২ কোটি টাকা ভূমি সেবা থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ভূমি সেবার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করা হবে, যেখানে নাগরিকরা শুধুমাত্র এনআইডি দিয়েই তাদের ভূমির সব তথ্য জানতে পারবেন। ভূমি অধিগ্রহণে আইবাসের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ প্রদান, স্বয়ংক্রিয় ভূমি ডাটাব্যাংক, নামজারির অটো আপডেট, এবং সরকারি জমি রক্ষা ব্যবস্থাও সংযুক্ত হবে ল্যান্ড সার্ভিস গেটওয়েতে।
২৯১ দিন আগে
বন্যার পানি নামছে, জেগে উঠছে ক্ষত
উত্তরের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার নদী অববাহিকা থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের ক্ষতবিক্ষত চেহারা বের হতে শুরু করেছে। রোপা আমন খেত পঁচে নষ্ট হয়েছে, ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, পুকুরের মাছ বেরিয়ে গেছে; সব মিলিয়ে অপুরণীয় ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ।
উজানের ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে হু হু করে বাড়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ। গেল সোমবার রাতে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ বিপদসীমা অতিক্রম করে। টানা ৫ দিনের বন্যায় ডুবে যায় নদী তীরবর্তী অঞ্চলের ফসলি খেত। পানিবন্দি হয়ে পড়ে ৫ জেলার প্রায় ৪০ হাজার পরিবার। পানি তোড়ে ভেসে গেছে চাষিদের পুকুরের মাছ। বিশেষ করে আমন খেত ও বীজতলা ডুবে যাওয়ায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রবিবার থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করায় ধীরে ধীরে জেগে উঠছে বন্যার ক্ষত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি নদীপাড়ে। বন্যার পানিতে অনেকের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। পানির তোড়ে নষ্ট হওয়া ঘরবাড়ির বেড়া মেরামত করতে দেখায় যায় অনেককে। বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে আসা ময়লা আবর্জনায় পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে গেছে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়ে সাপও দেখা যায় বেশ কয়েকটি। পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে নদীপাড়ের বেশ কিছু বিদ্যালয়ের আসবাবপত্রও।
এ ছাড়া, আমনের লাগানো চারা বন্যার পানিতে পচেগলে নষ্ট হয়েছে। অধিকাংশ খেতে শুধু মাটি-বালু পড়ে রয়েছে। কিছু খেতে চারা গাছ দেখা গেলেও রবিবার প্রচণ্ড রোদে তা পচেগলে নষ্ট হচ্ছিল।
আরও পড়ুন: চাঁপাইয়ে পদ্মার পানি বেড়ে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল, পানিবন্দি সাড়ে ৮ হাজার পরিবার
মাত্র এক সপ্তাহ আগে দ্বিতীয় দফার বন্যায় নষ্ট হওয়া আমন খেতে নতুন করে চারা লাগান নদী পাড়ের কৃষকরা। তা-ও তৃতীয় দফার বন্যায় ৩/৪ দিন নিমজ্জিত থেকে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে লাগানোর মতো চারা নেই অধিকাংশ চাষির কাছে। ফলে আমন নিয়ে দুঃচিন্তার ভাঁজ পড়েছে তিস্তাপাড়ের কৃষকের কপালে।
২৯২ দিন আগে
রিজার্ভ চুরিতে জড়িত ৫ দেশের নাগরিক, চার্জশিট শেষ পর্যায়ে
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটা বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ছাড়াও অন্তত চার দেশের নাগরিকের এই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। মামলার চার্জশিট প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে, শিগগিরই আদালতে দাখিল হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ইউএনবিকে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিভাগের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা, কর্মচারী ছাড়াও ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার গুরুতর গাফিলতি ছিল। এমনকি তাদের কারও কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততাও ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অত্যাধুনিক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্র এ চুরির ঘটনা ঘটায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিভাগ থেকে সচেতনভাবেই ওই ম্যালওয়্যারযুক্ত ফাইল খোলা হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার অবৈধভাবে স্থানান্তরিত হয়।
তিনি আরও বলেন, চার্জশিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) বিস্তারিত প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ওই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাতে এরই মধ্যে এফবিআইকে অনুরোধ করা হয়েছে। সেটি হাতে পেলেই তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাতে সংঘটিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার ডাকাতির ঘটনা। সে সময় বাংলাদেশে ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রেও সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়েছিল। সেই সুযোগে হ্যাকাররা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার স্থানান্তরের চেষ্টা করে, তবে ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরাতে পারে তারা।
আরও পড়ুন: ৮৬ বারের মতো রিজার্ভ চুরি মামলার প্রতিবেদন পেছাল
চুরি হওয়া ওই অর্থের বড় অংশ দুর্বল নজরদারির ফাঁক গলে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো শিল্পের গোপনীয়তা আইনের অধীনে পাচার হয়ে যায়। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে এবং প্রায় ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। পরে শ্রীলঙ্কায় প্রেরিত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলেও ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধার জটিল হয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে সরকার।
এ ঘটনার তদন্তে সিআইডির পাশাপাশি এফবিআই, ফিলিপাইনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এনবিআই) এবং শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অংশ নেয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘকেও এ অপরাধে ব্যবহৃত কৌশল ও লেনদেনের ধারা সম্পর্কে জানানো হয়।
ঘটনার ৩৯ দিন পর ওই বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন। পরে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রায় নয় বছরের তদন্তে দেশি-বিদেশি শতাধিক সাক্ষীর জবানবন্দি, আইপি ঠিকানা, নেটওয়ার্ক লগ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং ড্রিডেক্স ম্যালওয়্যার কোডসহ বিস্তৃত প্রযুক্তিগত প্রমাণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। এর ফলে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলা: প্রতিবেদন ফের পিছিয়ে ২ জুলাই
সিআইডির আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইউএনবিকে বলেন, এই তদন্তে আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ চক্রের কৌশল, তাদের দেশীয় সহযোগীদের ভূমিকা এবং আমাদের সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চার্জশিট এমনভাবে প্রস্তুত করতে চাই যাতে অপরাধীরা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইনের মুখোমুখি হয়।’
চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এ সাইবার ডাকাতির রহস্য উন্মোচিত হবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
২৯২ দিন আগে
তিস্তায় পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি স্থানীয়দের
লালমনিরহাটে উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে টানা চার দিন ধরে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে করে লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। তবে আজ সকাল থেকে তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেও স্থানীয়দের দুর্ভোগ কমেনি।
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) দুপুর ২টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫১ দশমিক ৯২ মিটার, যা বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচে।
তিস্তাপাড়ের মানুষ ও বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, চার দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সোমবার (১১ আগস্ট) রাত থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) দুপুর ১২টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে তা টানা তিন দিন ধরে বিপৎসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বাড়ার ফলে লালমনিরহাট সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার বেশ কিছু এলাকা বন্যার কবলে পড়েছে। নদীর দুই পাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নতুন নতুন এলাকা ডুবে গেছে; পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
এর মধ্যে পাটগ্রামের দহগ্রাম; হাতীবান্ধার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী, ডাউয়াবাড়ী; কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী, নোহালী; আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্দ্ধন, বাহাদুরপাড়া; সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, কুলাঘাট, মোগলহাট, রাজপুর, বড়বাড়ী ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপরে, পানিবন্দি ৪০ হাজার মানুষ
টানা চার দিনের বন্যায় পানিবন্দি পরিবারগুলো আগে থেকেই রয়েছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। এখন পানি কমতে থাকলেও শুরু হয়েছে নতুন উপদ্রব। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ হানা দিচ্ছে বন্যাকবলিত এলাকায়।
২৯৩ দিন আগে
বিমানের ফ্লাইটে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা ঘটছে। কোনো উড়োজাহাজ মেরামতের পর উড্ডয়ন করছে, আবার কোনোটা গ্রাউন্ডেড করা হচ্ছে। নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি বাতিল হচ্ছে ফ্লাইট। এর খেসারত দিতে হচ্ছে যাত্রী ও বিমান কর্তৃপক্ষকে।
গত এক মাসে দেশি-বিদেশি রুটে অন্তত ৯টি উড়োজাহাজে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। যদিও বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে, তবে এসব ঘটনায় যাত্রীসেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিমানের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ দিনে আবুধাবি, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর ও কুয়ালালামপুরসহ একাধিক রুটে মাঝ আকাশে বা উড্ডয়নের আগে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোথাও টয়লেট বিকল, কোথাও ইঞ্জিন ত্রুটি, আবার কোথাও রানওয়েতে আটকে পড়েছে উড়োজাহাজ। এতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, সংযোগ ফ্লাইট মিস এবং গন্তব্যে যেতে না পারার ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন: পাঁচ খাতে সেরা বিমান বাংলাদেশ
রোববার (১০ আগস্ট) রোমের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বিমানবন্দরে একটি বোয়িং ড্রিমলাইনার ডানার ফ্ল্যাপ ত্রুটির কারণে ‘গ্রাউন্ডেড’ হয়। লন্ডন থেকে যন্ত্রাংশ এনে মেরামতের আগে ২৬২ যাত্রীকে হোটেলে রাখা হয়। পরদিন সোমবার (১১ আগস্ট) ড্যাশ-৮ মডেলের একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট কেবিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ২০ মিনিট উড়ে ঢাকায় ফিরে আসে।
আগস্টের শুরুর দিকেও তিনটি উড়োজাহাজে ত্রুটি দেখা দেয়। এরমধ্যে ৬ আগস্ট ব্যাংককগামী বোয়িং ৭৩৭ ইঞ্জিন কম্পনের কারণে ফিরে আসে, ৭ আগস্ট আবুধাবিগামী বোয়িং টয়লেট বিকল হয়ে ঢাকায় ফেরে এবং ৯ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পথে বোয়িংয়ে সমস্যা হয়।
গতকাল ১২ আগস্ট ঢাকা থেকে কুয়েত ও দুবাইয়ের দুটি ফ্লাইটই পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দিয়ে। উড়োজাহাজ সংকটে উভয় ফ্লাইটই বাতিল হয়েছে । এর মধ্যে ঢাকা-কুয়েত রুটের বিজি ৩৪৩ ফ্লাইটটি ছিল বিকেল ৩ টা ৪৫ মিনিটে । আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী ফ্লাইটটি ছিল বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এ বি এম রওশন কবীর ইউএনবিকে জানান, গতকাল ১২ আগস্ট বাতিল হওয়া কুয়েত ও দুবাইয়ের ফ্লাইটটি আগামীকাল যাবে । ঢাকা-কুয়েত রুটের বিজি ৩৪৩ ফ্লাইটটি আগামীকাল (১৩ আগস্ট )সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় যাবে। আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী ফ্লাইটটি আগামীকাল (১৩ আগস্ট) একই সময়ে বিকাল ৫টা ৫ মিনিটে ছেড়ে যাবে। নতুন সময়সূচি যাত্রীদের জানানো হচ্ছে ।
কেন ২ টি ফ্লাইট বাতিল করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, উড়োজাহাজ সংকট। কারণ রোমে যে ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি গ্রাউন্ডেড আছে সেটি উড্ডয়ন উপযোগী করতে ১২ আগস্ট বিমানের নিজস্ব ৫ জন প্রকৌশলী গেছেন । আশা করা যাচ্ছে, ঐদিন সন্ধ্যা নাগাদ উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন উপযোগী হবে।
বিমানের ফ্লাইটে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় এবং ত্রুটি সম্পূর্ণ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজ আকাশে ওঠে না।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা আকস্মিক নয়; বরং না হওয়ায় ছোট ত্রুটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ব্যাংকক যাত্রার এক ঘণ্টা পর ঢাকায় ফিরল বিমানের ফ্লাইট
বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও আরেক এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম ইউএনবিকে বলেন, একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটনা ঘটছে এটি সত্যি। বহরের বেশির ভাগ উড়োজাহাজ অনেক পুরনো হওয়ায় সমস্যা নিয়মিত দেখা দিচ্ছে। এসব ত্রুটি বিমান শনাক্ত করে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আরও তদারকি বাড়াতে হবে। তবে এসব ত্রুটি প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু উড়োজাহাজ গুলো পুরনো, তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করতে হবে। ইন্জিনিয়ার ও পাইলট নিয়োগে সজনপ্রীতি করা যারে না। যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে হবে।
জুলাইয়েও কয়েকটি বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে, যার মধ্যে দুবাই ও শারজায় ড্রিমলাইনার ও বোয়িং উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড হওয়ার ঘটনা রয়েছে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ১৪টি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং এবং ৫টি কানাডার ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের। বোয়িংয়ের উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে: ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০,৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, ৪টি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার,২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার।
বিমান সুত্রে জানা যায়, যাত্রী ভোগান্তি কমাতে দুটি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে, পাশাপাশি নতুন ক্রয় পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
২৯৫ দিন আগে
ঠাকুরগাঁওয়ের কোনো হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম নেই, মরছে মানুষ
প্রতি বছর বর্ষার সময় সাপের উপদ্রব বাড়ে। বৃষ্টির পানিতে সাপের বাসস্থান প্লাবিত হলে আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ের দিকে ছোটে বিষধর এই প্রাণীটি। অনেক সময় মানুষের ঘরের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয় তারা। আর মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে অতর্কিত সাক্ষাত হলে সাপগুলো ভয়ে দংশন করে বসে।
প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষায়ও ঠাকুরগাঁওয়ে বেড়েছে সাপের উপদ্রব। তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে, জেলার কোনো হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর জন্য অ্যান্টিভেনম ইঞ্জেকশন নেই। গত দুই সপ্তাহে সাপে কাটা অন্তত ৫ জন রোগী চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছেন।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়পলাশবাড়ী ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের বাসিন্দা ইসরাইল উদ্দিন। তার ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিবুল ইসলামকে গত শুক্রবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দংশন করে বিষধর সাপ। ছেলের চিকিৎসার জন্য দুই জেলার চারটি হাসপাতাল ঘুরেও সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার অ্যান্টিভেনম পাননি ইসরাইল। অসহায় বাবার চোখের সামনে মারা যায় তার আদরের সন্তান সাকিবুল।
হাসপাতালগুলোতে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ইঞ্জেকশন (অ্যান্টিভেনম) মজুদ না থাকায় আদরের সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্যর্থ বাবার দুঃখের শেষ নেই। এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো গ্রামে। ছেলের মৃত্যুশোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার মা। গত তিন দিন ধরে চিকিৎসা চলছে তার।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে বাড়ির পাশে একটি দোকানের ছাউনি থেকে বেরিয়ে এক বিষধর সাপ কামড় দেয় সাকিবুলকে। তবে ওই সময়ে ছেলেটি সাপের কামড়ের বিষয়টি বুঝতে পারেনি। পরে ব্যথা শুরু হলে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায় তার পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসক ক্ষত দেখে বুঝতে পারেন যে সাপে কামড়েছে। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অ্যান্টিভেনম না থাকায় ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিতে বলা হয়। সেখানেও অ্যান্টিভেনম না থাকায় দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে পথিমধ্যে ১০ মাইল নামক স্থানে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সাকিবুল।
আরও পড়ুন: মাগুরায় সাপের কামড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু
আক্ষেপ করে ইসরাইল উদ্দিন বলেন, ‘চারটা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। বালিয়াডাঙ্গী হাসপাতাল থেকে হরিপুর, এরপরে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতাল। সেখানেও ভ্যাকসিন (অ্যান্টিভেনম) না পেয়ে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ হাসপাতাল নিয়ে গেলাম; রাত তখন ১০টা বাজে। সেখানেও ভ্যাকসিন নেই। পরে দিনাজপুর মেডিকেলে নেওয়ার পথে আমার ছেলে আমার কোলে ওপর মারা গেল। বাবা হয়ে ছেলেকে বাঁচাতে পারিনি।’
আর যেন কোনো বাবার বুক খালি না হয়, এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্কুলছাত্র সাকিবুলের মতো ঠাকুরগাঁও জেলায় গত দুই সপ্তাহে পীরগঞ্জের সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্র তারেক, রাণীশংকৈলের কলেজছাত্র মোকসেদ আলী, হরিপুরে গৃহবধু সম্পা রাণীসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বিষধর সাপের দংশনে।
নিহতদের স্বজনরা বলছেন, জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিভেনম না থাকায় প্রাণ হারাতে হচ্ছে এসব রোগীদের।
সম্পা রাণীর স্বামী জিতেন বলেন, ‘সকালে সাপে কামড়ানোর পর হরিপুর, রাণীশংকৈল এবং সবশেষ ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে নিয়ে গেছি, কিন্তু ভ্যাকসিন পাইনি। নিরুপায় হয়ে ওঝার কাছে নিয়ে যাই। এরপরেও স্ত্রীকে বাঁচাতে পারিনি। দেড় বছরের একটা ছোট বাচ্চাকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।’
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক আজমুল হক বলেন, ‘বর্ষার সময়ে প্রতি বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় ১০ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি সাপের কামড়ে মারা যায়। এজন্য হাসপাতালগুলো অ্যান্টিভেনমের চাহিদা পাঠায়। কিন্তু ভ্যাকসিন যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছায়, তখন বর্ষা শেষ হয়ে যায়। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে বর্ষার আগেই অ্যান্টিভেনম মজুদ রাখা।’
ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন ডা. মো. আনিছুর রহমান অ্যান্টিভেনম না থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চাহিদাপত্র পাঠানোর পরও ঢাকা থেকে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়নি। ঢাকা কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে অ্যান্টিভেনমের সংকট রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। তবে এর মধ্যেও আমরা কিছু অ্যান্টিভেনম সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’
২৯৭ দিন আগে