বিশেষ-সংবাদ
কুষ্টিয়ার ২৬ মণের ‘রাজাবাবু’, দাম হাঁকা হচ্ছে ৮ লাখ
কোরবানির ঈদ এলেই দেশের পশুর বাজারে বড় গরু নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। কোথাও বিশাল আকৃতির ষাঁড়, কোথাও লাখ টাকার দাম হাঁকা গরু—সবকিছু নিয়েই চলে মানুষের আগ্রহ।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এবার কুষ্টিয়া জেলার প্রান্তিক খামারিরা তাদের পশু প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এবারের কোরবানির বাজারে আলোড়ন তুলেছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জিয়ারখী ইউনিয়নের কমলাপুর লক্ষ্মীপুর গ্রামের প্রায় ২৬ মণ ওজনের ‘রাজাবাবু’। খামারিরা যার দাম হাঁকছেন ৮ লাখ টাকা।
ধবধবে সাদা ও কালো রঙের গরুটির বয়স তিন বছর। গরুটি এখন চার দাঁতের। বিশাল আকারের রাজাবাবুকে দেখতে প্রতিদিন দূরদুরান্ত থেকে খামারে আসছে দর্শনার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজ বাড়ির গাভী গরুর বাছুর এই গরুটিকে নিজ সন্তানের মতো লালনপালন করছেন মো. মোতালেব হোসেন মন্ডল। ভালোবেসে তিনি গরুটির নাম দিয়েছিলেন ‘রাজাবাবু’। গম, ছোলা, চালের গুড়া, আলু ও ঘাস খাইয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে পালন করা হয়েছে গরুটি।
সরেজমিনে মো. মোতালেব হোসেন মন্ডলের খামারে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২৬ মণ ওজনের গরুটির যত্ন নিচ্ছেন তার সহধর্মিনী।
তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর যাবত আমাদের গরুর খামার আছে এবং ৩ বছর এই গরুটা আমরা সখ করে লালনপালন করছি। এই গরুকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়, আমরা কোনো প্রকার ওষুধ বা ইঞ্জেকশন ব্যবহার করিনি। গরুর খাওয়া বাবদ প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আমাদের গরুটির ওজন ২৬ মণ, দাম ৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
মোতালেব হোসেন মন্ডল বলেন, আমার একটি গাভীর পেট থেকে রাজাবাবুর জন্ম। জন্মের পর থেকে তাকে আমি লালনপালন করছি। গরুটি খুবই শান্ত প্রকৃতির। এজন্যই তার নাম রেখেছি রাজাবাবু। আমি তাকে আমার নিজস্ব চাষ করা ঘাস, খড়, ভুষি খাইয়েছি। বাইরের কোনো খাবার খাওয়াইনি। হঠাৎ অসুস্থতার কারণে গরুটি এবার হাটে তুলতে পারছি না। যদি কেউ কিনতে চান, তাহলে আমার এই ০১৭২০৬০৪২০২ নম্বরে যোগাযোগ করলে হবে।
তিনি জানান, ব্যাপারীরা এ পর্যন্ত রাজাবাবুর দাম ৬ লাখ টাকা বলেছেন। কিন্তু তিনি ৮ লাখ টাকায় গরুটি বেচতে চান। যদি কাঙ্ক্ষিত দামে ‘রাজাবাবু’ বিক্রি না হয়, তাহলে তিনি শনিবার পশুটিকে নিয়ে গাবতলীর হাটে যাবেন।
মোতালেব হোসেনে আরও বলেন, এবার যদি ভারত থেকে গরু না আসে, তাহলে লাভবান হবেন খামারিরা। গো-খাদ্যের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন গরু আমদানি করা না হয়।
১২ ঘণ্টা আগে
সুনামগঞ্জে কৃষি সহায়তায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, বঞ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক
সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ফসলহানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারঘোষিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে কিছু জনপ্রতিনিধির আত্মীয়স্বজন, অকৃষক, প্রবাসী, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে কৃষকদের মধ্যে।
কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত হওয়ায় প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে তাদের পছন্দের ব্যক্তি ও স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
এছাড়া কৃষি সহায়তার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নে প্রকাশিত ৪৮০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের আত্মীয়স্বজনদের অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় গ্রাম পুলিশ, প্রবাসী এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নাজমুল মিয়া ঢাকায় কর্মরত থাকলেও তাকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের ছেলে মৃদুলের নামও তালিকায় রয়েছে, যদিও তাদের পরিবার হাওরে কোনো জমি চাষ করেনি। ইউপি সদস্য মাসুম আহমদের ভাই জাবেদ আলীর নামও তালিকায় রাখা হয়েছে, অথচ তাদের কোনো জমি তলিয়ে যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া প্যানেল চেয়ারম্যান রুজেল আহমদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের অন্তত ২০-২৫টি নাম তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, তালিকাভুক্ত অনেকেই কৃষি পেশার সঙ্গে যুক্ত নন।
স্থানীয় কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, আমার সাত কেয়ার জমি তলিয়ে গেছে, অথচ আমার নাম তালিকায় নেই। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের নাম দিয়েছেন। যাদের জমিই তলিয়ে যায়নি, তারাও সহায়তা পাচ্ছেন।
এদিকে, শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সবুজ মিয়া, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ছয়ফুজ্জামান ও মহিলা সদস্য আমেনা বেগমের বিরুদ্ধে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য কৃষকদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গত ১৭ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে ৪০ জন কৃষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, শাল্লা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় দুই মৃত ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। তারা হলেন— বাহাড়া ইউনিয়নের মুক্তারপুর গ্রামের রনু রঞ্জন সরকার ও সুধীন চন্দ্র দাস।
স্থানীয়রা জানান, রনু রঞ্জন সরকার গত বছর মারা গেছেন এবং সুধীন চন্দ্র দাস মারা গেছেন প্রায় ছয় মাস আগে, অথচ তাদের নামও সহায়তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মিহির চৌধুরী বলেন, আমার তালিকা অন্যরা করেছেন। তালিকায় কিছু মৃত ব্যক্তির নাম আসতে পারে। এগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, তালিকায় মৃত ব্যক্তি বা অযোগ্য কারও নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, সুনামগঞ্জে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অকৃষকদের নাম পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তা বাদ দেওয়া হবে।
১৩ ঘণ্টা আগে
ঈদুল আজহা ঘিরে টুংটাং শব্দে মুখর নবীনগরের কামার পল্লী
কুরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কামার পল্লীগুলো। লাল আগুনে দপদপ করা লোহা, হাতুড়ির ঘনঘন আঘাত আর টুংটাং শব্দে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখরিত থাকছে কামারদের কর্মশালা।
পশু কোরবানির জন্য প্রয়োজনীয় দা, বটি, চাপাতি, ছুরি ও জবাইয়ের সরঞ্জাম তৈরি আর পুরনো সরঞ্জামে শাণ দিতে এখন দম ফেলারও সময় পাচ্ছেন না কামার শিল্পীরা। বছরের অন্য সময় কাজের চাপ কম থাকলেও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
ভোলাচং, সোহাতা, শ্যামগ্রাম, কাদৈর ও শ্রীঘরসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও কামার পল্লী ঘুরে দেখা যায়, কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে লোহা পেটানোর কাজ। আগুনে তপ্ত লোহা হাতুড়ির আঘাতে রূপ নিচ্ছে ধারালো অস্ত্রে।
কামার শিল্পীরা জানান, ঈদ উপলক্ষে চাহিদা বাড়ায় বিক্রিও বেড়েছে কয়েক গুণ। বর্তমানে পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছুরি ১০০ থেকে ২০০ টাকা, দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বটি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং চাপাতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, কাঁচামাল ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দামও কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। দুই মাস আগেও প্রতি বস্তা কয়লার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। বর্তমানে সেই কয়লা কিনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে।
শ্যামগ্রামের কামার শিল্পী শ্যামল ও সুনিল বলেন, ‘এখন কাজের এত চাপ যে নিশ্বাস ফেলার সময়ও নেই। ঈদের আগ পর্যন্ত রাত-দিন কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
কামার পল্লীতে শুধু নতুন সরঞ্জাম কিনতেই নয়, পুরনো দা, বটি ও চাপাতিতে শাণ দিতেও ভিড় করছেন ক্রেতারা।
১ দিন আগে
তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কে ধস, চরম ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন
রংপুরের গঙ্গাচড়ায় দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ধস দেখা দিয়েছে। সড়কের একাধিক জায়গায় বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন ও পথচারীরা। বর্ষা মৌসুমের আগে দ্রুত এটি সংস্কার করা না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বৃষ্টিতেই সরছে মাটি, সড়কে গভীর গর্ত
সরেজমিনে দেখা যায়, মহিপুর এলাকায় সেতুর উত্তর প্রান্তের সড়কের অন্তত আটটি স্থানে ধস নেমেছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার যোগাযোগের জন্য এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা প্রয়োজনে এ পথে চলাচল করেন প্রায় অর্ধলাখ মানুষ। তিস্তা নদীর ওপর সেতুটি চালুর পর থেকে এই রুটে ভারী যানবাহন চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সেতু এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, এই সড়কটি রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার মানুষের চলাচল ও যানবাহন পারাপারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সেতুর উত্তর পাশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করলে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয়দের
স্থানীয় সংবাদকর্মী রুহুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই নদী ভাঙন শুরু হয়। আর এই সড়কের অবস্থা আগে থেকেই নাজুক। কয়েকটি স্থানে পিচ-খোয়া উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আরও কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি হলে সড়কের বড় অংশ ভেঙে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এর আগেও সেতুপারে এমন ভাঙন বেশ কয়েকবার দেখা গেছে এবং তড়িঘড়ি করে সংস্কারও হয়েছে। কিন্তু পুরো সেতু প্রকল্পে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তা বারবার ধসে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন দেখলেই বোঝা যায়।
সড়ক-সেতুসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা নিয়াজ আহমেদ বলেন, সড়ক সংস্কারের নামে শুধু অর্থের অপচয়ই হচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বারবার সড়ক ধসে পড়ছে আর ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ রংপুর-লালমনিরহাটের সংযোগে ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু ও সড়কে বারবার এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
২৮ কোটির সংস্কারেও মিলল না টেকসই সমাধান
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০২৪ সালে রংপুরের বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শেষ প্রান্ত সিরাজুল মার্কেট পর্যন্ত তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের (আঞ্চলিক মহাসড়ক) প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশ সংস্কার ও বর্ধিতকরণে ২৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কাজটি যৌথভাবে করেছিল মেসার্স খায়রুল কবির রানা, কে কে আর লিমিটেড ও বরেন্দ্র লিমিটেড নামের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। একই সময়ে লালমনিরহাট অংশের সিরাজুল মার্কেট থেকে কাকিনা পর্যন্ত ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কারের কাজ করে শাহাদাত এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু এত বিপুল টাকা ব্যয়ের পরও সড়কটি টেকসই রূপ পায়নি।
উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, এটি রংপুর-লালমনিরহাট অঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। বন্যা মৌসুমের আগেই সেতুপাড়ে এমন ভাঙন যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সংস্কার শুরু না হলে পুরো সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান জানান, ধসের বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার উন্নয়ন এবং লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত এই দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধনের পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সংযোগ সড়কে ধস ও খানাখন্দ সৃষ্টিসহ নানা ত্রুটির কারণে বহুবার এই সেতুতে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে।
৩ দিন আগে
উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমেই বাড়ছে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার, আশা জাগাচ্ছে বৃষ্টির পানি
বসন্তের শেষ, গ্রীষ্মকাল শুরু। খুলনার উপকূলীয় কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গৃহিণী আম্বিয়া খাতুনের প্রতিটি সকাল শুরু হয় এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম চিন্তা পরিবারের জন্য খাবার পানি সংগ্রহ করা।
প্রতিদিন দূরের গভীর নলকূপ থেকে পানি আনতে তাকে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। এতে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কখনও অসুস্থও হয়ে যান তিনি। আর যদি কোনোদিন সেই দূরের নলকূপে যাওয়া সম্ভব না হয়ে ওঠে, তখন বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হয় পুকুরের অনিরাপদ পানি। অথচ শুষ্ক মৌসুমে সেই পুকুরও শুকিয়ে যায়।
নদী ও খালের পানিও এ সময় অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে ওঠে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এমন দিনও আসে যখন পানির অভাবে রান্না করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলে মিষ্টি বা উপহারের বদলে কয়েক বোতল মিনারেল ওয়াটার নিয়ে এলে উপকূলের মানুষ যেন বেশি খুশি হয়।
সুপেয় পানির জন্য এই হাহাকার শুধু খুলনার উত্তর বেদকাশীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণ উপকূলজুড়ে এটি আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সব পানির উৎসে লবণাক্ততার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি নদী ও খালে প্রবেশ করে সেগুলোকে লবণাক্ত করে তোলে। ফলে নিরাপদ ও সুপেয় পানির সংকট দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র
‘অ্যা-ক্রসসেকশনাল ভিউ অব দ্য ড্রিংকিং ওয়াটার সিনারিও ইন আ ক্লাইমেট-স্ট্রেসড সেটিং: কেস স্টাডি ফ্রম সাউথওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র।
ওই গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের একজন নারীকে প্রতিদিন শুধু এক কলস বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহের জন্য পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। বছরের চার থেকে সাত মাস পর্যন্ত এই সংকট স্থায়ী থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ অঞ্চলের প্রায় ৮৪ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব কোনো নিরাপদ পানির উৎস নেই। ফলে তাদের নির্ভর করতে হয় বাইরের উৎসের ওপর যা অনেক সময় দূরবর্তী, অনিরাপদ কিংবা ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ভূপৃষ্ঠই নয়, ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণাক্ততার প্রভাব ভয়াবহভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে উপকূল থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে স্বাদু পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিরাপদ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।
বাতায়নের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিই এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। সমুদ্রের লোনা পানি ধীরে ধীরে ভূখন্ডের ভেতরের দিকে প্রবেশ করায় লবণাক্ততার বিস্তার বাড়ছে, অন্যদিকে ভূপৃষ্ঠের নিচে থাকা স্বাদুপানির মজুতও যাচ্ছে কমে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৩০ শতাংশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত, যার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ জমি সরাসরি লবণাক্ততার শিকার। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে ১০ দশমিক ৫৬ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে জীবিকা এবং মানুষ বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ছে।
সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দরিদ্র জনগোষ্ঠী
জলবায়ুগত এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী। উপকূল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া পরিবারগুলোও বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা পায় না। উপকূলের অধিকাংশ গ্রামে বর্তমানে সুপেয় পানির প্রধান ভরসা গভীর নলকূপ বা ডিপ টিউবওয়েল। প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে লাখ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করা হলেও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে অনেক জায়গায় সেই পানিও নিরাপদ থাকছে না। ফলে উপকূলের বহু পরিবার এখন টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা বাধ্য হয়েই লবণাক্ত পানি পান করে জীবনযাপন করছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ছে, অর্থনৈতিক চাপও তীব্র হচ্ছে।
গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ফলে প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। যারা বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে পারে, তারা শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা স্বস্তিতে থাকে। কিন্তু যাদের সেই সুযোগ নেই, তাদের খাওয়া-দাওয়াসহ দৈনন্দিন প্রায় সব কাজে বাধ্য হয়ে লোনা পানিই ব্যবহার করতে হয়।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ১৯টি জেলায় প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ মানুষের বসবাস। সম্ভাবনাময় ও সম্পদসমৃদ্ধ এই অঞ্চল আজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার বিস্তার উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ক্রমাগত সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর উপকূলের প্রায় সব মিঠা পানির উৎস লোনা পানিতে দূষিত হয়ে পড়ে। পুকুর, খাল, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলোতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিঘ্নিত হচ্ছে প্রকৃতির সাম্যাবস্থা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে লোনা পানি ও ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির মধ্যে একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য বিদ্যমান থাকে। বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে জলাশয় ও মাটির নিচে স্বাদুপানির মজুত তৈরি হয়। অন্যদিকে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার প্রভাবে লোনা পানি ভূমির অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। এই দুই প্রক্রিয়ার মধ্যেই একটি সাম্যাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সেই ভারসাম্য এখন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সমুদ্রের লোনা পানি ধীরে ধীরে লোকালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে মিঠা পানির উৎসগুলোকে দূষিত করছে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় সব পানীয় জলের উৎসই আজ ঝুঁকির মুখে।
বর্তমানে উপকূলের লবণাক্ত এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মিঠা পানির পুকুর, সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি, গভীর নলকূপ, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানি, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) এবং রিভার্স ওসমোসিস বা আরও প্ল্যান্ট। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ নিরাপদ পানি উত্তোলনের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গভীর নলকূপ। তবে উপকূলের অধিকাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক নলকূপে এখন আর পানি ওঠে না। আবার কোথাও কোথাও পানি উঠলেও সেটি লবণাক্ত হয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বা ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে সরবরাহ করা হলেও সেই পানি সবসময় নিরাপদ ও মানসম্মত হয় না। ফলে নিরাপদ পানির সংকট দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠছে।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ: হতে পারে কার্যকর ও টেকসই সমাধান
উপকূলীয় অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৩ হাজার মিলিমিটারেরও বেশি। তাই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মাটির পাত্র, মটকা বা ড্রামে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে আসছে। বর্তমানে ঘরের চাল বা ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখার পদ্ধতি ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই পানি কয়েক মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।
সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পানির ট্যাংক সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন বৃহৎ পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, নতুন খাসপুকুর খনন ও পুরোনো পুকুর পুনর্খনন, পুকুরে লবণপানি প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ গভীর নলকূপ স্থাপন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পানি ব্যবস্থাপনার টেকসই মডেল গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে এই সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে উপকূলের মানুষের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সুপেয় পানির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা তাই শুধু একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, এটি উপকূলবাসীর বেঁচে থাকার অধিকার। বাংলাদেশের উপকূলের জন্য নিরাপদ পানির একটি বৃহৎ ও টেকসই প্রকল্প সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ
৩ দিন আগে
৪৭২ পদের মধ্যে ২১৭টিই শূন্য, ভুগছে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল না থাকায় রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। এতে ভোগান্তিতে পড়ছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের মোট অনুমোদিত পদ রয়েছে ৪৭২টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫৫ জন, অর্থাৎ ২১৭টি পদ শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৭৪টি হলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৮ জন। ফলে ৪৬টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। নার্সের ২৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৯ জন, সেখানে শূন্য রয়েছে ৬৩টি পদ। এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ১০টি পদের মধ্যে ৪টি পদই শূন্য রয়েছে। অন্যান্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১২৬টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন। এসব পদের ১০৪টিই শূন্য রয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন ও সচেতন নাগরিকরা জানান, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক বিভাগে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেগ পেতে হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগী সোয়েব হাসান বলেন, অসুস্থ হয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স না থাকায় চিকিৎসা সেবায় প্রত্যাশার চেয়ে বিলম্ব হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিনই নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
এক রোগীর অভিভাবক ইসমাইল হোসেন বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এলে বিভিন্ন রোগের ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই’ শুনতে হয়। এত বড় হাসপাতাল নির্মাণ হলেও দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সিলেটে চলে যান।
আরেক রোগীর অভিভাবক আব্দুস সামাদ বলেন, হাসপাতালের দালালচক্র প্রতিরোধ করতে হবে। তারা সুবিধা না পেলে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। দালালদের দমন করা গেলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং হয়রানিও কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, অনেক সময় চিকিৎসকরা হাসপাতালে এলেও কিছু অসাধু ব্যক্তির খারাপ আচরণের কারণে একে একে চলে যান। ফলে চিকিৎসক সংকট এখানে কাটে না। এ বিষয়টি সমাধান করতে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা সাজিয়া বেগম বলেন, হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ দেখলে বোঝাই যায় যে সেখানে কর্মচারীর সংকট রয়েছে। মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশা করে, অথচ হাসপাতালের বিভিন্ন কোণায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদগুলো পূরণ না হওয়ায় চিকিৎসা সেবায় চাপ বাড়ছে। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হলে রোগীদের উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান স্বপন বলেন, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট থাকায় রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দ্রুত এই সংকট নিরসন হলে আমাদের ওপর চাপ কমবে এবং রোগীরা সহজে মানসম্মত সেবা পাবেন।
তিনি আরও বলেন, লোকবল সংকটের বিষয়টি আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
৪ দিন আগে
সাদুল্লাপুরে খাস জমি ও লাখ টাকার গাছ রক্ষায় অনীহা, এসিল্যান্ডের দিকে অভিযোগের তীর
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরে কয়েক লাখ টাকা মূল্যের মেহগনি গাছসহ সরকারি খাস জমি রক্ষায় স্থানীয় ভূমি প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাফিলতি, রহস্যজনক ভূমিকা ও স্ববিরোধী অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি পক্ষ সরকারি সম্পত্তি দখলে রাখলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সরকারি গেজেট, রেকর্ড ও নকশায় জমির অবস্থান স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকলেও সরেজমিনে পরিমাপের সময় সাদুল্লাপুরের উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন দাবি করেছেন, জমিটি ‘রাস্তায় মিশে গেছে’ অথবা ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। এসিল্যান্ডের এমন বক্তব্য সরকারি রেকর্ড, গেজেট ও খোদ ভূমি অফিসেরই তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে এবং সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও প্রশাসনিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষানবিশ আইনজীবী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ।
গত বুধবার (১৩ মে) দাখিল করা লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সাদুল্লাপুর মৌজার জেএল নম্বর-৪১ এর বিআরএস ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৫৮৯ নম্বর দাগের ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিবিশেষের অবৈধ দখলে রয়েছে। ওই জমিতে থাকা প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছও বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি গেজেট ও নকশায় জমির অস্তিত্ব সুস্পষ্ট থাকলেও গত ২৩ এপ্রিল সরেজমিন পরিদর্শনের সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) দাবি করেন, জমিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এর আগে ওই অফিসেরই তদন্ত প্রতিবেদন ও নোটিশে জমিটিকে ‘সরকারি খাস জমি’ এবং গাছগুলোকে ‘সরকারি সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
নথি সূত্রে জানা গেছে, খাস জমি ও গাছ সংক্রান্ত পৃথক দুটি আবেদনের পর বনগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়াররা সরেজমিন তদন্ত করে জমি ও গাছের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে গত ৩০ মার্চ ও ২ এপ্রিল (২০২৬) তারিখের তদন্ত প্রতিবেদনে (স্মারক নম্বর-৩৩ ও ৩৮) প্রায় ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৭টি মেহগনি গাছসহ খাস জমির উপস্থিতি উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, খাস জমিটি আবেদনকারীদের দখলে থাকায় বন্দোবস্ত দেওয়া যেতে পারে এবং গাছগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করলে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পাবে।
তবে তদন্তে সরকারি সম্পদের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্ধার অভিযান বা সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বিগত ২০২৫ সালের ১৯ মে এক আবেদনে সরেজমিন তদন্তের পর জমিটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন দাবি করে ‘সরকারের কোনো স্বার্থ নেই’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একই অফিস থেকে স্মারক নম্বর ৩০০ ও ৩১১ এর নোটিশে আবার সেটিকে সরকারি সম্পত্তি বলা হয়। একই বিষয়ে প্রশাসনের এমন দ্বৈত অবস্থান সচেতন মহলকে বিস্মিত করেছে। পাশাপাশি এসিল্যান্ড গত ১২ এপ্রিল অফিস স্মারকের এক নোটিশে উক্ত জমিতে ‘সরকারি স্বার্থ’ ও ‘গাছ’ থাকার বিষয়টি লিখিতভাবে স্বীকার করলেও পরে সরেজমিনে এসে জমির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।
দখলদারের আবেদনেই সরকারি জমির স্বীকৃতি
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী জাকিউল হক মানিক ও জাহিদুল ইসলামসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি ও গাছ নিজেদের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে নিয়ে গোপনে দখলে রেখেছেন। বিষয়টি জানাজানি হলে গত মার্চ মাসে জাকিউল হক মানিক নিজেই ওই জমি বন্দোবস্ত চেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন।
উক্ত আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তার মা জোবেদা বেওয়ার নামে বিআরএস ২৩৮ নম্বর খতিয়ানে ০.০৩৬৯ একর জমির সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০০৫৬ একর সরকারি খাস জমি মিলিয়ে মোট ০.০৪২৫ একর জমি তাদের ভোগদখলে রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এই আবেদনের মাধ্যমেই সরকারি জমি দখলের বিষয়টি পরোক্ষভাবে প্রমাণিত হয়।
মামলার আড়ালে সম্পদ গোপনের চেষ্টা
সিএস ৩০৩ নম্বর খতিয়ানের সাবেক ৫২৬ নম্বর দাগের মোট ২৪ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা চললেও বিআরএস ৫৮৯ নম্বর দাগের সরকারি খাস জমি ওই মামলার অন্তর্ভুক্ত নয়।
আদালত কখনো সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ বা গোপনের অনুমতি দেয়নি। অথচ আদালতের মামলার অজুহাতে সরকারি খাস জমি ও গাছ প্রভাবশালী ব্যক্তির দখলে রাখার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ গাছে জননিরাপত্তা হুমকি
খাস জমিতে অবস্থিত বৃহদাকৃতির মেহগনি গাছগুলো বর্তমানে স্থানীয় বসতবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক ও বৈদ্যুতিক খুঁটির জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অবহিত করা হলে দুই দফা তদন্ত হয়।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২২ জুলাই চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গাছগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এখন পর্যন্ত তা অপসারণ বা নিলামের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কালবৈশাখীর এই মৌসুমে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারী মো. জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ বলেন, আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই; সরকারি সম্পদ রক্ষা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করাই মূল উদ্দেশ্য। সরকারি রেকর্ডভুক্ত সম্পদ কীভাবে গায়েব দেখানো হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আদালতে চলমান জমি বিরোধের চূড়ান্ত রায় আমি মেনে নেব।’
অভিযোগ ও সরেজমিনে জমি পরিমাপের বিষয়ে জানতে চাইলে সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, খাস জমি বন্দোবস্ত চেয়ে দুজন আবেদন করায় সরেজমিনে পরিমাপ করা হয়। সরকারি ১ নম্বর খতিয়ানের রেকর্ড অনুযায়ী হাল ৫৮৯ নম্বর দাগে ০.০০৫৬ একর খাস জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ে পরিমাপে পুরো প্লটে ২৪ শতাংশ জমি পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, খাস জমিটি রাস্তায় মিশে গেছে। এ কারণে আলাদাভাবে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া জমিটি নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ব্যক্তিমালিকানা নিয়ে মামলা থাকলেও খাস খতিয়ানভুক্ত জমি ও গাছ সরকারের সম্পদ। তাই দ্রুত এই সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
৪ দিন আগে
টানা বৃষ্টিতে আবারও বাড়ছে হাওরের পানি, বাকি ধান ঘরে তোলা নিয়ে উৎকণ্ঠায় কৃষক
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নদ-নদী ও হাওরের পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এতে নতুন করে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। মাঠের অবশিষ্ট বোরো ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো নিয়ে নদীপাড়ের গ্রামীণ জনপদে এখন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা থাকায় কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টির পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও ভারী বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবো জানিয়েছে, সুনামগঞ্জে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার জেলায় ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে গত তিন দিনেই জেলায় মোট ২৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এ সময়ে সুরমা নদীর পানি নতুন করে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুক্রবার সকাল ৯টায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১ দশমিক ৭২ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। উল্লেখ্য, বর্ষার আগে এই অঞ্চলে সুরমা নদীর বিপদসীমা ধরা হয় ৬ দশমিক ৫ মিটার।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জ ও উজানে চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এতে নদী ও হাওরের পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে কৃষকের ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তবে আপাতত বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা আমরা করছি না।
হাওরাঞ্চলের ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, চলতি বৈশাখ মাসের শুরু থেকেই একের পর এক দুর্যোগ ও বৃষ্টির কারণে ধান ঘরে তুলতে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এক-দুই দিন রোদ মিললেও পরদিনই আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কেটে রাখা ধান কোনোভাবেই শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক নিচু এলাকায় কাটা ধান এখনও পানির ওপর ক্ষেতেই ভেসে বা পড়ে রয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এ বছর কৃষকদের পিছুই ছাড়ছে না। এক দিন আবহাওয়া ভালো থাকলে পরের দুই দিনই বৃষ্টি হচ্ছে। অন্তত এক সপ্তাহ টানা রোদ থাকলে কৃষকেরা অবশিষ্ট ধান ঘরে তুলতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি ছোট-বড় হাওরে এবার মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টন ধান। সরকারি হিসাব মতে, এ পর্যন্ত জেলায় গড়ে ৮৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, মোট ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু হাওরাঞ্চলেই কাটা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩১ হেক্টর জমির ধান। সেই হিসাবে মাঠ ও হাওরে এখনও প্রায় ১৩ শতাংশ ধান কাটার বাকি রয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের ১০ দিন আগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে ইতোমধ্যে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; যার আর্থিক মূল্য ৫০০ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এরপর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আর সরকারিভাবে হালনাগাদ করা হয়নি।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এই সরকারি খতিয়ানের চেয়ে আরও অনেক বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনও চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বৃষ্টি যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বাড়তে পারে।
৫ দিন আগে
স্মার্টফোন আসক্তি ও সামাজিক অস্থিরতা: ঝিনাইদহে বিপথগামী প্রজন্ম নিয়ে উৎকণ্ঠায় অভিভাবকরা
ঝিনাইদহ জেলার শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের আচরণ, মনোযোগ ও মানসিক স্থিরতায় ভয়াবহ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনে আসক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট শিক্ষার্থীদের আচরণে এক ধরনের ‘বেপরোয়া ভাব’ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টিকে ইতোমধ্যেই ‘অ্যালার্মিং’ বা চরম উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে স্থানীয় সচেতন মহল।
শিক্ষকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ যেমন ছিল, বর্তমানে তার সঙ্গে বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মধ্যে আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির প্রতি এক ধরনের অনীহা ও অবাধ্যতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষক বা অভিভাবকদের শাসন না মানা, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠের ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া এবং তুচ্ছ কারণে ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে যা সামাজিক শৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
জেলার সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার আনোয়ার হোসেন নামে এক শিক্ষক জানান, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। সামান্য বিরতি পেলেই তারা মোবাইল ফোন, গেম কিংবা ছোট ভিডিও (শর্ট কনটেন্ট)-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক শিষ্টাচারের চরম অভাব।
ঝিনাইদহ পৌর এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি মানসিক সংযোগ তৈরি করা যেত। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি উদ্ধত। বড়দের সম্মান করা বা শিক্ষকের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে চরম গাফিলতি ও অনীহা দেখা যাচ্ছে।’ এর পেছনে ভার্চুয়াল জগতের আসক্তির পাশাপাশি বর্তমান সামাজিক অস্থিরতাও বড় কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আবু বক্কর সিদ্দিকীর মতে, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতেই বেশি সময় কাটায়। ফলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে তারা দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে সমাজে যে শ্রদ্ধাবোধ ও জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সুসম্পর্ক থাকার কথা, তা ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
যশোর অটিজম ও এনডিডি সেবাকেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানের পরামর্শক সাব্বির আহমেদ জুয়েল এ বিষয়ে বলেন, ‘অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম কিশোরদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তারা বাস্তব জীবনে খিটখিটে মেজাজের ও অবাধ্য হয়ে ওঠে। যখন তারা চারপাশের সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবেশে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা লক্ষ করে, তখন অবচেতনভাবেই সেটিকে নিজেদের আচরণের অংশ করে নেয়।’
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান শিক্ষার্থীদের এই মানসিক ও নৈতিক বিকাশের ক্রান্তিকালে পরিবারকে ‘সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্তানদের কেবল স্মার্টফোন থেকে দূরে রাখলেই হবে না, তাদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত কাউন্সিলিং প্রয়োজন।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসন পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
একটি সুস্থ ও সুশৃঙ্খল প্রজন্ম গড়তে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
৬ দিন আগে
পশুখাদ্যের দাম বাড়ায় লাভ নিয়ে শঙ্কায় খামারিরা, ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোরবানির পশুর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হলেও পশুখাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারিরা। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু। এর মধ্যে রয়েছে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। জেলার মোট চাহিদা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি হলেও অতিরিক্ত রয়েছে ৫৮ হাজার ৮৪৮টি পশু।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খামার ও বাড়িতে চলছে পশুর নিবিড় পরিচর্যা। খামারিরা জানান, প্রাকৃতিক উপায়ে পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে পশু মোটাতাজা করা হচ্ছে। তবে পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে স্থানীয় খামারিরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
৭ দিন আগে