বিশেষ-সংবাদ
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি এড়াতে দরকার পাটুরিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট দ্রুত সংস্কার
ঈদকে সামনে রেখে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত বর্ষায় পদ্মার প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত পাটুরিয়ার একাধিক ঘাট এখনো পুরোপুরি সংস্কার করা হয়নি। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে কয়েকটি পন্টুন। ফলে আসন্ন ঈদযাত্রায় ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন যাত্রী ও চালকরা।
ফেরিঘাটে সীমিত সক্ষমতা
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচটি ফেরিঘাটের মধ্যে বর্তমানে ৩ ও ৫ নম্বর ঘাট দিয়ে কোনোমতে ফেরি চলাচল করছে। ৪ নম্বর ঘাট পুরোপুরি বন্ধ ছিল; সেখানে মেরামতের কাজ করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ২ নম্বর ঘাটে ফেরি ভিড়তে না পারায় সেটিও কার্যত অকেজো হয়ে আছে। ১ নম্বর ঘাটও বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া নৌরুটে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ও পিকআপ ভ্যান মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার যানবাহন পারাপার হয়। ঈদের সময় এই সংখ্যা বেড়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজারে পৌঁছে। চাপ বাড়লে ফেরির সংখ্যাও বাড়ানো হয়।
বিআইডব্লিউটিসির আরিচা সেক্টরের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আবদুস সালাম বলেন, গত আগস্টে পদ্মার প্রবল স্রোতে পাঁচটি ঘাটই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ২, ৩ ও ৫ নম্বর ঘাট সংস্কার করে ফেরি চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। ১ ও ৪ নম্বর ঘাট এখনো পুরোপুরি সচল নয়। ৪ নম্বর ঘাট চালু করতে কাজ চলছে। তিনি স্বীকার করেন, ঘাট সংকটের কারণে ফেরিতে যানবাহন ওঠা–নামায় (লোড–আনলোড) সমস্যা হচ্ছে।
৬ ঘণ্টা আগে
ছাতকে ৮০ শতাংশ টিউবওয়েল পানিশূন্য, তীব্র পানিসংকটে লক্ষাধিক মানুষ
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ভয়াবহ পানিসংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়া, তাপদাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ টিউবওয়েল পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এতে এক লাখেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
স্থানীয় সূত্র ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ছাতক উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৫৩১টি গ্রামের মধ্যে তিন শতাধিক গ্রামে তীব্র পানিসংকট বিরাজ করছে। উপজেলার প্রায় ১৮ হাজার টিউবওয়েলের মধ্যে অন্তত ১২ হাজারটিতেই পানি উঠছে না। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২০০ থেকে ৩০০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ভাতগাঁও, কালারুকা, চরমহল্লা, সিংচাপইড়, দোলারবাজার, ছৈলা-আফজলাবাদ, গোবিন্দগঞ্জ-সৈদেরগাঁও, উত্তর ও দক্ষিণ খুরমা, নোয়ারাই, ইসলামপুর, ছাতক সদর ও জাউয়াবাজার ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একই চিত্র। টিউবওয়েল চাপলেও পানি না আসায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
অনেকেই দূষিত পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করছেন। ফলে ডায়রিয়া, জ্বর ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে।
জাউয়াবাজার ইউনিয়নের মুলতানপুর গ্রামের ক্বারী মাওলানা জুনায়েদ আহমদ বলেন, ‘১৫ বছর আগে ৫০০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন ৭০০ ফুটেও পাওয়া যাবে কিনা নিশ্চিত নয়। দিনে বহুবার চাপ দিলেও টিউবওয়েলে পানি ওঠে না।’
উত্তর খুরমা ইউনিয়নের গিলাছড়া গ্রামের গাড়িচালক আরজদ আলী বলেন, ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে পুকুরের পানি ফুটিয়ে খেয়ে বাঁচতে হচ্ছে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় এক প্রধান শিক্ষক জানান, প্রায় এক মাস ধরে স্কুলের কোনো টিউবওয়েলে পানি নেই। শিক্ষার্থীরা তৃষ্ণায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে পুকুরের পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল, পুকুর ভরাট, হাওর-বিলের প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস এবং নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে গেছে। পাশাপাশি সরকারি গভীর নলকূপ বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাজে আসছে না।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইছহাক আলী বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে। আগে যেখানে ৪০০ ফুটে পানি পাওয়া যেত, এখন ৭০০ ফুটেও পাওয়া অনিশ্চিত। সরকারিভাবে নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, পানি সংকটের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১ দিন আগে
নদী শুকিয়ে চর জেগেছে, সবুজে ভরেছে ধরলা–বারোমাসিয়া
এক সময় উত্তাল স্রোত আর গর্জনে তীরবর্তী মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানো ধরলা ও বারোমাসিয়া নদীর চিরচেনা রূপ এখন আর নেই। জলবায়ু পরিবর্তন ও পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদীর বুকে জেগে উঠেছে প্রায় আড়াই শতাধিক চর। এতে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে ধু-ধু বালুচরে সবুজ ফসলের সমারোহে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা এলাকায় ধরলা–বারোমাসিয়া ও নীলকমল নদীসহ বিভিন্ন নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে কৃষকরা বোরো ধান, ভুট্টা, তামাক, বাদামসহ নানামুখী ফসল উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজুড়ে এখন চোখে পড়ে সবুজের এক অপরূপ দৃশ্য।
নদীতে পানি না থাকায় অনেক স্থানে মানুষজন পায়ে হেঁটে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত করছেন। স্থানীয়রা জানান, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এসব চরাঞ্চলে নিয়মিত ফসল চাষ হচ্ছে এবং প্রতি বছরই ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
ধরলা নদী পাড়ের সোনাইকাজী এলাকার কৃষক আলতাফ হোসেন ও মজিবর রহমান বলেন, এক সময় এই ধরলা নদীই আমাদের ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি গিলে নিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়েছেন। সেই নদীই এখন শুকিয়ে গেছে। আমরা প্রতি বছর ধরলার বুকে জেগে ওঠা পলিমাটিতে বোরো চাষ করি। এবারও প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ ধান পাওয়ার আশা করছি। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারদর ভালো না পেলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য মজসেদ আলী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ধরলার বুকে বোরো ও ভুট্টা চাষাবাদ হচ্ছে এবং ফলনও ভালো হচ্ছে। চলতি বছরও ভালো ফলনের আশা করছেন তারা।
২ দিন আগে
বেকারত্বের চাপ: বিদেশমুখী হতে গিয়ে দালালচক্রের ফাঁদে ঝিনাইদহের যুবসমাজ
ঝিনাইদহ জেলায় বাড়ি বাড়ি ছড়িয়ে পড়েছে বেকারত্বের কালো ছায়া। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন অসংখ্য তরুণ। জীবিকা ও স্বপ্নের সন্ধানে তারা দলে দলে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে, কিন্তু বিদেশযাত্রার সেই স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। দালালচক্রের প্রতারণায় লাখ লাখ টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে পরিবারগুলো। কেউ নিখোঁজ, কেউ নির্যাতনের শিকার, আবার কেউ প্রাণ হারিয়েও ফিরতে পারছে না দেশে।
অভিযোগ রয়েছে, ঝিনাইদহজুড়ে সক্রিয় দালালচক্র ও কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সির প্রতিনিধি শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত যুবকদের টার্গেট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের কোনো বৈধ নথি না থাকায় প্রতারিত পরিবারগুলো আইনি প্রতিকার পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামের শাহ আলম সিদ্দিক ইমন দালালের মাধ্যমে মিসরে যান। সেখানে কিছুদিন কাজ করলেও গত তিন মাস ধরে তিনি নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, দালালরা তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।
একইভাবে শৈলকুপা উপজেলার ক্ষুদ্র রয়েড়া গ্রামের সোহাগ মোল্লা দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। আর্থিক সংকটে তার মরদেহ এখনও দেশে আনা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ওই গ্রামের আরও অন্তত ছয় যুবক কম্বোডিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।
মধুহাটী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন বলেন, এলাকার অধিকাংশ পরিবার দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। এই সুযোগে একটি চক্র বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদ পেতে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে মোটা অংকের টাকা নেওয়া হচ্ছে।
তার দাবি, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছেন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৩০টি মানবপাচার চক্র কাজ করছে।
শৈলকুপার বাসিন্দা বিল্লাল মোল্লা জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে আট মাস আগে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে তার ছেলে সোহাগকে কম্বোডিয়ায় পাঠান। মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিদেশে গিয়ে ছেলে ফোনে জানাতেন, তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হচ্ছে। পরে জানতে পারেন, তার ছেলেকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এখনও মরদেহ দেশে আনতে পারেননি তারা।
বংকিরা গ্রামের শাহানা খাতুন বলেন, এক বছর আগে সাড়ে ৬ লাখ টাকা খরচ করে তার ছেলে ইমনকে মিসরে পাঠান। সেখানে একটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করতেন বলে পরিবার জানতে পারে। নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও তিন মাস ধরে তার কোনো সন্ধান নেই। দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে উল্টো আরও টাকা দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু সন্তানের খোঁজ মিলছে না।
মানবাধিকারকর্মী বাবুল কুণ্ডু বলেন, দালাল ও অসাধু ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সারা দেশ থেকে যে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব। এই চক্রের ফাঁদে পড়ে গ্রামের নিরীহ পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে। সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে প্রতারিত এক যুবককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা না বাড়ালে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, সহজ আয়ের আশায় ও যথাযথ তথ্যের অভাবে অনেক যুবক প্রলোভনের ফাঁদে পড়ছে। প্রতারিত পরিবারগুলো লিখিত অভিযোগ দিলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩ দিন আগে
খরাপ্রবণ জমিতে আশার বীজ: গাকৃবির ‘জিএইউ সয়াবিন’
একদিকে লবণাক্ততা, অন্যদিকে অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়া—এসব মিলিয়েই বাংলাদেশের উপকূলীয় চরাঞ্চল। এমন পরিবেশে ফসল ফলাতে দীর্ঘদিন ধরে খরার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন সেখানকার কৃষকরা। বিশেষ করে সয়াবিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসল চাষে খরা ছিল বড় প্রতিবন্ধকতা। সেই বাস্তবতায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গাকৃবি) উদ্ভাবিত উচ্চ খরা-সহনশীল সয়াবিনের নতুন ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে সম্প্রতি এ জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মাধ্যমে গাকৃবিতে উদ্ভাবিত মোট ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল ৯৪টি, যা দেশের কৃষি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
গবেষণার দীর্ঘ পথচলা
তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম নিয়ে টানা তিন বছর নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সেখান থেকেই খরা-সহনশীল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ‘জিএইউ সয়াবিন’ নির্বাচিত হয়।
পরবর্তীতে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’-এর সহায়তায় নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর ও ভোলায় মাঠপর্যায়ে পাঁচ বছর ধরে সফল মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। মাঠের বাস্তবতায় পরীক্ষিত হওয়ার পর জাতীয় বীজ বোর্ড জাতটিকে আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করে।
৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও টিকে থেকে উচ্চ ফলন দেওয়ার সক্ষমতা এ জাতকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থায় অভিযোজন সক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ।
ফলনে শক্তিশালী, গুণে অনন্য
‘জিএইউ সয়াবিন’-এর প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল ধরে। বড় দানার কারণে এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। সাধারণ জাতের তুলনায় বেশি ফলনশীল এ জাত থেকে হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এর বীজে ট্রিপসিন ইনহিবিটরের মাত্রা তুলনামূলক কম। ফলে পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে। এ কারণে জাতটি পোল্ট্রি শিল্পের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়।
এই জাতের সয়াবিনের পরিপক্বতাও আসে দ্রুত। মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়, যা কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক।
পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা
সয়াবিন একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল। এতে রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন এবং ১৮ থেকে ২০ শতাংশ তেল। অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ এ ফসল অপুষ্টি দূরীকরণ, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষত উপকূলীয় চরাঞ্চলে যেখানে ফসলের বিকল্প সীমিত, সেখানে খরা-সহনশীল এ জাত খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কার্যকর অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষকের অনুভূতি
ড. এম এ মান্নান বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন জাতটি আমাদের দীর্ঘ নিরলস গবেষণা, মাঠের রোদ-বৃষ্টি আর কৃষকের স্বপ্নের সম্মিলিত ফসল। উপকূলীয় চরাঞ্চলের লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার যে কঠিন বাস্তবতা, এই জাত সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ ফলপ্রসূ। খরা-প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষ এতদিন অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ জাত সেই অনিশ্চয়তা ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।’
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এ অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘জিএইউ সয়াবিন ৬ বাংলাদেশের কৃষিতে একটি যুগান্তকারী অর্জন। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকের জীবনে স্থিতিশীলতা আনতে এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি গবেষক দল, ল্যাব ও মাঠপর্যায়ের বিজ্ঞানীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
খরা-আক্রান্ত জমি যেখানে একসময় অনিশ্চয়তার প্রতীক ছিল, সেখানে এখন সম্ভাবনার নতুন বীজ বপনের অপেক্ষা। ‘জিএইউ সয়াবিন’ সেই পরিবর্তনেরই এক প্রতীক হয়ে উঠতে চলেছে।
৪ দিন আগে
প্রাণ ফিরে পেল দাগনভূঞার দাদনার খাল
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি প্রবাহহীন হয়ে পড়া দাগনভূঞার দাদনার খাল অবশেষে দখল ও দূষণমুক্ত হয়ে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সম্প্রতি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মাধ্যমে খালটিতে আবারও স্বচ্ছ পানির প্রবাহ দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ময়লার স্তুপ জমে থাকায় খালটির পানি চলাচল বন্ধ ছিল। সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল খালের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নেয়। চলতি বছরে উপজেলা ও পৌর প্রশাসন খালটি দখলমুক্ত করলেও ময়লার স্তূপের কারণে সেটি কার্যত ‘মৃত’ অবস্থায় পড়ে ছিল।
নির্বাচনের আগে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাজওয়ার এম আউয়াল খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নেন এবং ‘ফুটস্টেপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করেন কাজটি করার জন্য। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করলেও নির্বাচনি আচরণবিধির কারণে উপজেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে কাজ স্থগিত করে। সে সময় তাজওয়ার আউয়াল নির্বাচনের পর খালটি পরিষ্কার করার প্রতিশ্রুতি দেন।
নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ফুটস্টেপ টিম টানা পাঁচ দিনের পরিশ্রমে ময়লা অপসারণ করে খালটিকে পরিষ্কার করে। ফলে দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে থাকা দাদনার খালে আবারও স্বচ্ছ পানির প্রবাহ শুরু হয়েছে।
দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী ও পৌর এলাকার বাসিন্দা আজমুল হক সুমন এ খাল পরিষ্কার করায় তাজওয়ার আউয়ালকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ খাল ভরাট থাকার কারণে বর্ষাকালে দাগনভূঞা পৌর এলাকায় পানি জমাট বেঁধে থাকত। বাজারের পানি নিষ্কাশনেও দীর্ঘ সময় লাগত। যার কারণে পৌর এলাকার বাসিন্দা ও বিশেষ করে ফাজিলেরঘাট রোডের ব্যবসায়ীরা পানিবন্দি থাকতে হতো দীর্ঘ সময় ধরে। এ খাল পরিষ্কারের ফলে আমরা এ ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাব। আশা করি, এ খাল যেভাবে তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তা আর কখনও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হবেনা এবং দখল হবেনা—সেদিকে মন্ত্রী মহোদয়ের সুদৃষ্টি থাকবে।
দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন লিটন বলেন, বাজার ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবী ছিল দাদনার খাল দখল ও দূষণমুক্ত করা। উপজেলা প্রশাসন দখলমুক্ত করলেও খালটি মৃত অবস্থায় ছিল। আর এ মৃত খালকে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ায় তাজওয়ার এম আউয়ালকে দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী ও পৌরবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। একইসঙ্গে আমাদের দাবী থাকবে, ভবিষ্যতে কোনো প্রভাবশালী মহল যেন এ খাল দখল করতে না পারে, খাল পরিষ্কারের কাজ যেন চলমান থাকে। এছাড়া আমরা মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আরও একটা দাবী জানাচ্ছি যে, এ খালকে যেন পুরোপুরি সংস্কার করে একটি সুন্দর লেক ও খালেরপাড়ে ওয়াকওয়ে করে দেন।
খাল পরিষ্কার প্রসঙ্গে তাজওয়ার এম আউয়াল বলেন, আমি যখন দাগনভূঞা বাজার যাই তখন ময়লাভর্তি খালটি আমার নজরে আসে। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি রাজধানীর ফুটস্টেপ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ফোনে অনুরোধ করি খালটি পরিষ্কারের জন্য। তারা আমার অনুরোধে খাল পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। কিন্তু নির্বাচনের পূর্বে হওয়ায় সহকারী রির্টানিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আচরণবিধি সংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে কাজ স্থগিত রাখতে বলেন। কাজ বন্ধ হওয়ায় সবাই হতাশ হয়ে পড়ে। তখন আমি বলেছিলাম, নির্বাচনের পরেই আমরা খালটি পরিষ্কার করে দেব। সে অনুযায়ী খাল পরিষ্কারের কাজ সম্পন্ন করি। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজ অব্যাহত থাকবে।
৬ দিন আগে
মুকুলে ছেয়ে গেছে আমের রাজধানী, ভালো ফলনের প্রত্যাশা
আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ গাছে ইতোমধ্যে মুকুল দেখা গেছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত এমন আবহাওয়া বজায় থাকলে প্রায় সব গাছই মুকুলে ছেয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। সম্ভাব্য ভালো ফলনের প্রত্যাশায় বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন আমচাষিরা।
শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুতেই জেলার বিস্তীর্ণ আমবাগানগুলো হলুদ মুকুলে সেজে উঠেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার অনুকূল সমন্বয়ের কারণে এবার মুকুল আসার হার সন্তোষজনক। মৌসুমের শুরুতেই এমন ইতিবাচক চিত্রে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত ফলন নির্ভর করবে আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ঝড়বৃষ্টি পরিস্থিতির ওপর।
জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম। এখানে ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, ল্যাংড়াসহ দেড় শতাধিক জাতের সুস্বাদু আম উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয় এ অঞ্চলের আম। বিশেষ করে মৌসুমে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ব্যাপক চাহিদা থাকে, ফলে জেলার অর্থনীতিতে আমের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছর ফলন ভালো হলেও পাকার মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন চাষিরা।
৮ দিন আগে
ঋতু পরিবর্তনে ফরিদপুরে শিশুদের অসুখ বাড়ছে, হাসপাতালে ভিড়
শীত শেষে বসন্তের আগমনের মধ্যে আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে ফরিদপুরে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে সর্দিকাশি, জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। চিকিৎসকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।
মৌসুম বদলের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ফরিদপুরের একমাত্র বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক রোগীর উপস্থিতি। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে সিরিয়ালের জন্য।
হাসপাতালটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আক্কাস মন্ডল জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রতিদিন শুধু আউটডোরে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী আসছে। ইনডোরেও প্রতিদিন সিট সংকট দেখা দিচ্ছে।
১০ দিন আগে
নদীভাঙন ও বেকারত্বে জর্জরিত কুড়িগ্রাম, নতুন সরকারের কাছে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রত্যাশা
নতুন সরকারকে ঘিরে কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের প্রত্যাশা এবার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে পিছিয়ে পড়া এ জনপদের মানুষ প্রতিশ্রুতি নয়, চান বাস্তব ও টেকসই পরিবর্তন।
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা এই জেলা প্রতি বছর ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়ে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ অন্তত ১৬টি নদী জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এসব নদীর ভাঙনে প্রতি বছর শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। বসতভিটা, আবাদি জমি, স্কুল-কলেজ ও রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী শাসনের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। অস্থায়ী বাঁধ ও প্রকল্পে কাজ চালিয়ে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করেন তারা। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নিয়মিত নদী খনন ও বিজ্ঞানসম্মত নদী শাসন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
একইসঙ্গে কর্মসংস্থানের অভাব কুড়িগ্রামের আরেক বড় সংকট। শিল্পকারখানা না থাকায় শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত যুবকদের বড় একটি অংশ কাজের সন্ধানে ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবার ভেঙে পড়ছে, সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন এবং উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করা গেলে এই জেলার কর্মসংস্থানের চিত্র বদলে যেতে পারে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজের অভাব। পরিবার রেখে দূরে যেতে চাই না। নতুন সরকারের কাছে একটাই দাবি, কুড়িগ্রামে কাজের ব্যবস্থা করুন।’
যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরের যুবক সাহিনুর রহমান বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ করেও বসে আছি। এখানে যদি কারখানা থাকত, এখানেই চাকরি করা যেত। বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হয়।’
একই উপজেলার বদলী পাড়ার শাজাহান আলী বলেন, ‘নদীভাঙনে সব হারিয়েছি। প্রতি বছর নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচি। আমরা স্থায়ী সমাধান চাই।’
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার এক নেতার মতে, জেলার প্রায় ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে সাড়ে ১৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনে মানুষ বারবার ঠিকানা বদলাতে বাধ্য হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বহু এনজিও কাজ করলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরাদ্দ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘অবহেলিত কুড়িগ্রামের উন্নয়নে নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। জাতীয় সংসদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু; সুষম বণ্টন নিশ্চিত হলেই কুড়িগ্রামের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।’
তাই এবার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার যেন কাগুজে পরিকল্পনার গণ্ডি পেরিয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়। নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে বদলে যাবে কুড়িগ্রাম জেলার চিত্র। দূর হবে হতাশা, জাগবে নতুন স্বপ্ন।
১০ দিন আগে
সিলেটে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, মানা হচ্ছে না সিসিকের মূল্যতালিকা
শুরু হলো পবিত্র মাহে রমজান মাস। রোজার শুরুতেই সিলেট মহানগরীতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির চিত্র দেখা গেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মাছ, মাংস, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার ও কাজিরবাজার এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মাংস ও মাছের দোকানগুলোতে আগের তুলনায় বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। রমজানের শুরুতে মাংসের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ব্রয়লার মুরগির দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি যে মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল, তা এখন স্থানভেদে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রায় সব ধরনের মাছেই কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ফলমূলের বাজারেও ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে। ইফতারে বহুল ব্যবহৃত কলার দাম হালিপ্রতি আকারভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি আপেল ও কমলার দামও আগের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
লেবু ও শসার দামেও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকদিন আগেও যে লেবু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় হালি বিক্রি হয়েছিল, তা এখন আকারভেদে ৯০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়েছে।
নগরীর তালতলা এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদির বলেন, রমজান এলেই বাজারে চাপ বাড়ে, তবে এবার আগেভাগেই দাম বেড়ে গেছে। নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারের দামের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বন্দরবাজারের এক মাংস বিক্রেতা জানান, সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম এবং চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এ কারণেই বাজারে দাম সমন্বয় হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ ফেব্রুয়ারি সিলেট নগরভবনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাতে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার রমজানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির আহ্বান জানান। সেখানে গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৬৫০ টাকা, খাসির মাংস ১১০০ টাকা, ছাগল ও ভেড়ার মাংস ১০০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৭০ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ভেজাল প্রতিরোধ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
তবে বাজার ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিক্রেতারা এই তালিকার পরিবর্তে সিসিককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মূল্য তালিকা না টাঙিয়ে বিক্রি করছেন প্রকাশ্যেই। নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
তারা বলছেন, নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় কেউ নির্ধারিত মূল্য মানছেন না। নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। একই বাজারে ভিন্ন দোকানে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে গরু ও খাসির মাংস।
ক্রেতারা বলছেন, রমজান উপলক্ষে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা এবং নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। বর্তমানে বাজারের অস্থিরতা রোজাদারদের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।এ বিষয়ে সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। সিসিকের নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে মাংস বিক্রি করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১১ দিন আগে