ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরানের পাল্টা হামলার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২ মার্চ) থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে তেলের সরবরাহ ধীর হয়ে যেতে পারে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ওই অঞ্চলজুড়ে হামলার কারণে পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী দুইটি জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসোলিনের দাম আরও বাড়তে পারে।
সিএমই গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালেই যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৭৯ ডলারে পৌঁছায়। শুক্রবার এর দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার, যা থেকে সোমবার ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার সকালেই ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৪১ ডলারে লেনদেন হয়। ফ্যাক্টসেটের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার এর দাম ছিল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার, যা ছিল সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সোমবার এর দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে ভোক্তাদের পাম্পে গিয়ে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। একইসঙ্গে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এমন সময় এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যখন অনেক দেশেই মানুষ ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ভুগছে।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে এই নৌপথকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হিসেবে ধরা হয়। ইরানের উত্তরে অবস্থিত এই প্রণালী দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান থেকে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সামরিক মহড়ার কথা বলে ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালীর কিছু অংশ বন্ধ করে দেয়। এর পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে যায়।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই ওপেক প্লাস জোটভুক্ত আটটি দেশ রোববার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই নির্ধারিত বৈঠকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক জানায়, এপ্রিল মাসে তারা প্রতিদিন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়াবে। বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও এই পরিমাণ বেশি। উৎপাদন বাড়ানো দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া ও ওমান।
রিস্ট্যাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জর্জ লিওন এক ইমেইল বার্তায় বলেন, ‘বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ফলে ওপেকের অতিরিক্ত তেল উৎপাদন এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বাজারে মূল উদ্বেগ হলো তেলের চালান ঠিকভাবে চলাচল করতে পারছে কি না’
তিনি জানান, ‘যদি উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহন সীমিত হয়ে যায়, তাহলে অতিরিক্ত তেল উৎপাদ তাৎক্ষণিকভাবে খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে উৎপাদন লক্ষ্য নয়, বরং রপ্তানি পথ সচল থাকা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে।’
এদিকে, ইরান প্রতিদিন প্রায় ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে, যার বেশিরভাগই যায় চীনে। ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহত হলে চীনকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কাছে পর্যাপ্ত কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে। পাশাপাশি দেশটি চাইলে রাশিয়া থেকেও তেল আমদানি বাড়াতে পারে।