ফিলিস্তিন
হামাসকে নিরস্ত্রীকরণে গাজায় ফের যুদ্ধ শুরুর হুমকি ইসরায়েলের
গাজায় খান ইউনিস ও দেইর আল বালাহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি ড্রোনের গর্জন এবং বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিদিনই মনে দেয়, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ কখনো থামবে না।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গত অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনের পরিবারগুলো এখনও ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৮২৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে, নতুন করে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কয় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা। কারণ, হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
স্থানীয় সময় রবিবার (৩ মে) জেরুজালেমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তা মন্ত্রিষভার বৈঠক হঠাৎ কর বাতিল করেন। তার পরিবর্তে তিনি যুদ্ধের বিষয়ে ছোট পরিসরে আলোচনা করেছেন।
একই সময়ে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর জন্য চাপ বাড়িয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইসরায়েলি গণমাধ্যম চ্যানেল ১৫-কে জানান, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির মধ্যে নিরাপত্তা তদারকি ও চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বহুজাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সও ব্যর্থ হয়েছে। এসব কারণে নতুন করে যুদ্ধ তাদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের আর্মি রেডিও জানিয়েছে, ভূমিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত ইয়েলো লাইন ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে গাজার ৫৯ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। একইসঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি মধ্যেও তারা দখল আরও স্থায়ী করছে। ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন সীমান্ত থেকে অতিরিক্ত সেনা এনে গাজা ও পশ্চিম তীরে মোতায়েন করছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের ফাঁদ
কায়রোতে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারীরা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর নতুন একটি কাঠামো মেনে নেওয়ার জন্য তীব্র চাপ দিচ্ছেন। এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত বোর্ড অব পিসের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ।
এ বিষয়ে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আবদুল জব্বার সাঈদ ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম আল্ট্রা প্যালেস্টাইনকে জানান, ম্লাদেনভ এমন একটি কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যেখানে ২৮১ দিনের মধ্যে ৫টি ধাপে হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র হতে হবে।
এই কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। কাঠামোতে ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা, উপত্যকার পুনর্গঠন এবং গাজার সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণকে শর্ত হিসেবে ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্লেষক ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা আল জাজিরাকে বলেন, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত নতুন টেকনোক্র্যাটিক সংস্থা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজাকে (এনজিএসি) ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী তাদের নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছে।
আবদুল জব্বার সাঈদ আরও জানান, হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইনসহ সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী একযোগে এই নিরস্ত্রীকরণের শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর বদলে তারা ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ পুরোপুরি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে যুদ্ধবিরতির মধ্যে প্রতিদিন ফিলিস্তিনে ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করার চুক্তি থাকলেও ইসরায়েল ট্রাক প্রবেশেও বারবার বাধা দিয়েছে।
ফিলিস্তিনের নিরাপত্তার প্রশ্ন
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইসাম আফিফা আল জাজিরাকে বলেন, হামাস কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে নিরাপত্তার বিষয়টিকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার বলে মনে করে।
তিনি জানান, প্রতিরোধ আন্দোলন করা গোষ্ঠীগুলো মনে করে, তাদের নিরস্ত্র করা হলে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসান কখনোই সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাজনৈতিক সমাধানে না এসে ফিলিস্তিনের অস্ত্রের বিষয়টিকে সামনে আনছে। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কোনো নিশ্চয়তা না দিয়ে মানবিক সহায়তাকে শর্ত দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ করছেন তারা।
কৌশলগত ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধ ফের শুরুর এই আলোচনা করে ইসরায়েল তাদের কৌশলগত কিছু ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মামুন আবু আমের আল জাজিরাকে বলেন, এসব হুমকি মূলত একটি ধোঁয়াশা তৈরির কৌশল। হুমকির মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এখন গাজায় যুদ্ধ থামিয়ে একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। এখন গাজায় আবার যুদ্ধ আবার শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া শান্তি উদ্যোগ ভেঙে পড়বে। আর ইরানকে মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আবার একাধিক দেশে সংঘাতে জড়িয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও চাপের মধ্যে রয়েছে। ইসরায়েলি সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান ইসরায়েল জিভের বক্তব্য উল্লেখ করে আবু আমের বলেন, ২০২৬ সালে ইসরায়েলি সেনাদের গড়ে বছরে ৮০ দিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ ফলে তাদের সেনাবাহিনীর ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ লেবাননের সংকট ইসরায়েলের জন্য এখনও ক্ষত হয়ে আছে। এই অবস্থায় গাজায় নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য বড় কৌশলগত ব্যর্থতা ডেকে আনতে পারে।
অন্যদিকে, গাজায় আটকে থাকা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন কোনো স্বস্তি বয়ে আনছে না। স্থানীয় সময় শনিবার (২ মে) প্রকাশিত ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭২ হাজার ৬০৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
সর্বশেষ রবিবার বিকেলে ইসরায়েলি হামলায় আরও ৩ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে গাজার মানুষ এখন একদিকে দীর্ঘস্থায়ী ইসরায়েলি দখলদারত্ব, অন্যদিকে নতুন আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যে দিন পার করছেন।
২ দিন আগে
গাজা পুনর্গঠনে এক দশকে ৭১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন: প্রতিবেদন
ইসরায়েলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য আগামী ১০ বছরে ৭১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে বলে একটি নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) প্রকাশিত গাজা র্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্টের (আরডিএনএ) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
চূড়ান্ত এই প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই সংঘাত গাজায় মানব উন্নয়নে ‘ভয়াবহ প্রভাব’ ফেলেছে এবং সেখানে খুব শিগগিরই প্রচুর পরিমাণ অর্থ সহায়তার প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজা পুনর্গঠনের প্রথম ১৮ মাসেই জরুরি পরিষেবা পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে ২৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
প্রতিবেদনটির পৃষ্ঠপোষক ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার ভৌত অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
গাজায় অক্টোবর মাসে একটি দুর্বল ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হয়েছিল। তবে চুক্তি লঙ্ঘন করে বারবার হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকার ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, শুধু যুদ্ধবিরতির পর থেকেই নিহত হয়েছেন ৭৭৭ জন। এর মধ্যে চলতি বছরের এপ্রিলের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে আল জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ উইশাহও রয়েছেন। তিনি ৮ এপ্রিল গাজা সিটির পশ্চিমে একটি ড্রোন হামলায় নিহত হন।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম অফিস জানায়, ইসরায়েল ‘যুদ্ধবিরতি’ লঙ্ঘন করে মোট ২ হাজার ৪০০টি অপকর্মের ঘটনা ঘটিয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড, গ্রেপ্তার, অবরোধসহ নানান ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত।
ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া জনপদ
জাতিসংঘ জানায়, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে যুদ্ধবিধস্ত গাজায় ৬১ মিলিয়ন টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, যার ফলে অনেক জনপদ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। আরডিএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসিক ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫০ শতাংশের বেশি হাসপাতাল অকার্যকরসহ প্রায় সব স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার অর্থনীতি ৮৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য ও কৃষি। এই সংঘাত গাজার মানব উন্নয়নকে ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে শাসন হস্তান্তরকে সমর্থন করে এমন দেশের প্রতি গাজা পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
১৫ দিন আগে
ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘নির্যাতনের লাইসেন্স’ দেওয়া হয়েছে ইসরায়েলকে: অ্যালবানিজ
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেসকা অ্যালবানিজ বলেছেন, বিশ্ব ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালানোর এক ধরনের লাইসেন্স বা অনুমতিপত্র দিয়ে দিয়েছে। এর ফলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জীবন এখন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ এ দূত বলেছেন, ইসরায়েলে নির্যাতন কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে তার সর্বশেষ প্রতিবেদন পেশ করার সময় তিনি বলেন, ইসরায়েলকে প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কারণ আপনাদের বেশিরভাগ সরকার এবং মন্ত্রীরা এর অনুমতি দিয়েছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নির্যাতন ও গণহত্যা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে অ্যালবানিজ বলেন, যা একসময় গোপনে চলত, তা এখন প্রকাশ্যেই করা হচ্ছে। এটি একটি সংগঠিত অবমাননা, বেদনা এবং লাঞ্ছনার শাসন ব্যবস্থা, যা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে অনুমোদিত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নির্যাতন শুধু কারাকক্ষ বা জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এতে আরও বলা হয়, গণ-উচ্ছেদ, অবরোধ, ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা অস্বীকার, সামরিক বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের লাগামহীন সহিংসতা এবং ব্যাপক নজরদারি ও সন্ত্রাসের পুঞ্জীভূত প্রভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এখন একটি ‘সামষ্টিক শাস্তির’ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে জীবনযাত্রার পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে গণহত্যা সংক্রান্ত সহিংসতাকে সামষ্টিক নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সুদূরপ্রসারী মানসিক ও শারীরিক প্রভাব পড়ছে অধিকৃত জনগোষ্ঠীর ওপর।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড এবং গাজায় তাদের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কট্টর সমালোচক অ্যালবানিজ ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তীব্র বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি তাকে বিশেষ দূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭২ হাজার ২৬৩ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৪ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে, যার মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫০০ শিশু ছিল।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি মিশন অ্যালবানিজের প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাকে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এজেন্ট’ বলে অভিহিত করেছে।
এক বিবৃতিতে মিশনটি জানায়, ‘অ্যালবানিজ তার জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মকে উগ্র ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে অপব্যবহার করছেন, যার মধ্যে হলোকাস্টের (ইহুদি নিধনযজ্ঞ) বিকৃতি ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মতো বয়ানও অন্তর্ভুক্ত। তিনি নিয়মিতভাবে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে বিপজ্জনক উগ্রপন্থি বয়ান প্রচার করেন।’
অ্যালবানিজ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নির্যাতন ও গণহত্যার কাজ প্রতিরোধ ও শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি গণহত্যার অংশ হিসেবে এই ক্রমবর্ধমান নির্যাতন আরও গুরুতর এবং অমার্জনীয় করে তুলেছে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ফিলিস্তিনিদের ওপর এই ধরনের কাজ সহ্য করতে থাকে, তবে আইন নিজেই তার অর্থ হারাবে।’
৪৩ দিন আগে
ফিলিস্তিনের প্রার্থিতা প্রত্যাহার, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রার্থী দিল বাংলাদেশ
২০২৬–২০২৭ মেয়াদের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে ফিলিস্তিন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছে। এরপর ওই পদে প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২ জুন। প্রার্থী দেওয়ায় এ পদে এবার বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু তিনি বর্তমানে দায়িত্বে না থাকায় তার পরিবর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশ।
৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি পদে ফিলিস্তিনের আগেই প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ। তবে ফিলিস্তিনকে আসন ছেড়ে দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে। এর আগে ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে সভাপতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক আবর্তন নীতিমালা অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অব স্টেটস থেকে এবার সভাপতি নির্বাচন করা হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক ২০২৬ সালের মে মাসে প্রার্থীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভার আহ্বান করবেন।
বাংলাদেশ সর্বশেষ ১৯৮৬-৮৭ মেয়াদে এ মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। চার দশক পর আবারও এ পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার আশা করা হচ্ছে।
৬৯ দিন আগে
পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় ট্রাম্প প্রশাসন
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের আরও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, পশ্চিম তীরের স্থিতিশীলতা এনে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীর সংযুক্তকরণের বিরোধিতা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইইউ, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছে। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা।
স্থানীয় সময় সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, ‘পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা থাকলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প প্রশাসনের যে লক্ষ্য, তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করার এক দিন পর হোয়াইট হাউস থেকে এই মন্তব্য এসেছে।
ইসরায়েলের এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে নতুন বসতি স্থাপনের জন্য ইসরায়েলিদের ভূমি অধিগ্রহণ সহজ করা, যা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
গতকাল (সোমবার) ৮টি মুসলিমপ্রধান দেশ এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, ইসরায়েলের এসব অবৈধ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বেআইনি ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ওই যৌথ বিবৃতি দিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইসারয়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন কার্যক্রমকে পাকাপোক্ত করা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া। এতে করে ইসরায়েলের অবৈধ দখল বাড়বে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ যুক্তরাজ্য ও স্পেনও এই নিন্দায় যোগ দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তিফেন দুজারিক জানান, গুতেরেস ইসরায়েলের এসব পদক্ষেপকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে আল জাজিরার সাংবাদিক গাব্রিয়েল এলিসোন্দো দুজারিককে প্রশ্ন করেন, গুতেরেস কি এসব ব্যবস্থাকে পশ্চিম তীরের ‘ডি ফ্যাক্টো সংযুক্তিকরণ’ হিসেবে দেখছেন কি না। উত্তরে দুজারিক বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের সঠিক পথে নিয়ে যাচ্ছে না। তারা আমাদের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
মহাসচিবের মুখপাত্রকে এই সাংবাদিক আরও জিজ্ঞাসা করেন, জাতিসংঘ মহাসচিব কীভাবে ইসরায়েলকে নিরুৎসাহিত করতে পারেন। জবাবে দুজারিক বলেন, আমি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রক্ষার পক্ষে কথা বলে যাব। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য চাপ অব্যাহত রাখব। তবে আমি একা তা করতে পারব না। আমরা চাই অন্যরাও এগিয়ে আসুক।
এরপর সোমবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলকে তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার গতকালের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্য দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানাচ্ছে। ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক কাঠামো একতরফাভাবে পরিবর্তনের যেকোনো প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে।
বিতর্কিত ইসরায়েলি পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের সবচেয়ে বড় শহর হেবরনে ভবন নির্মাণের অনুমতির ক্ষমতা সেখানকার কর্তৃপক্ষ থেকে ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করা।
এই পদক্ষেপগুলো অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত দুটি প্রধান ধর্মীয় স্থান, বেথলেহেমের কাছে র্যাচেলের সমাধি এবং হেবরনে প্যাট্রিয়ার্কদের গুহার ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে।
ইসরায়েলের মন্ত্রী স্মোত্রিচ গেল রবিবার বলেন, এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল ভূমির সমস্ত অঞ্চলে আমাদের শিকড় গভীর করা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে সমাহিত করা।
সোমবার রাতে স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে বলে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং গাজায় আরও সহিংসতা শুরু করার হুমকি দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপগুলো এবং সংযুক্তিকরণের যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। তা শান্তি পরিকল্পনা ও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
স্পেন সরকার চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ইসরায়েলকে দখলদার শক্তি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলে, বসতি সম্প্রসারণের কার্যক্রমের অবসান ঘটাতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত আরেকটি ভুল পদক্ষেপ।
৮৫ দিন আগে
যুদ্ধবিরতির মাঝেও কেন হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল?
গেল বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) গাজার শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় ২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনির মরদেহ পৌঁছানোর পর হাসপাতালটির এক পরিচালক এমন একটি প্রশ্ন করেছিলেন যা গত কয়েকমাস ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
শিফা হাসপাতালের মুহাম্মদ আবু সেলমিয়া এক ফেসবুকে পোস্টে প্রশ্ন করেছেন— কোথায় যুদ্ধবিরতি? কোথায় মধ্যস্ততাকারীরা?
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৫৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বুধবার নিহত হন ২৪ জন এবং শনিবার ৩০ জন। একই সময়ে গাজায় চারজন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, উত্তর গাজায় যুদ্ধবিরতি রেখার কাছে রাতভর ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে’ তাদের এক সেনা গুরুতর আহত হন।
এসবের ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার পুনর্গঠন শুরু করা থেকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যান্য দিকগুলি স্থবির হয়ে পড়েছে। গাজা ও মিসরের মধ্যে রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং খোলার ফলে আরও অগ্রগতির আশা করা হয়েছিল। তবে সোমবার ৫০ জনেরও কম লোককে ক্রসিংটি দিয়ে পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে এখন সেটি নিয়েও অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।
জিম্মিরা মুক্তি পেলেও থমকে আছে অন্যান্য বিষয়
দীর্ঘদিনের স্থবির আলোচনার পর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত অক্টোবর মাসে সম্মত হয় ইসরায়েল ও হামাস। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি শক্তিশালী, টেকসই ও চিরস্থায়ী শান্তি নিশিত করবে।
চুক্তির শুরুতে হামাস ইসরায়েলের হাতে আটক হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি এবং নিহতদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের হাতে থাকা সকল জিম্মিকে মুক্তি দেয়। কিন্তু চুক্তিতে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার মতো বড় বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও দেয়নি।
এদিকে, জিম্মিদের দেহাবশেষ ফেরত পাঠানোর কাজ চুক্তিতে ৭২ ঘণ্টা সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা শেষ হতে অনেক সময় গড়িয়ে যায়। হামাস ইসরায়েলকে গত সপ্তাহেই তাদের শেষ জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দেয়। তবে ইসরায়েল দাবি করছে, হামাস যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করে সমস্ত দেহাবশেষ এখনো ফেরত দেয়নি। অপরদিকে, হামাসের দাবি, তারা যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে সমস্ত মরদেহ শনাক্ত করতে পারেনি। তবে তাদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইসলায়েল।
যুদ্ধবিরতিতে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও অবকাঠামো পুনর্বাসনের সরঞ্জামসহ মানবিক সহায়তা দ্রুত প্রবেশের কথাও ছিল। তবে জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, শুল্ক ছাড়পত্র ও অন্যান্য বিষয়ে বিলম্বের কারণে গাজার ২০ লাখ মানুষের কাছে সহায়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। অন্যদিকে, গাজায় সহায়তা তদারককারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে।
অভিযোগ সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি বহাল
ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই যুদ্ধে ৭১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়।
দুই পক্ষই বলছে, চুক্তি এখনও কার্যকর এবং উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি শব্দটি ব্যবহার করছে। তবে ইসরায়েলের অভিযোগ, হামাস যুদ্ধবিরতি রেখার বাইরে তৎপরতা চালাচ্ছে, (ইসরায়েলি) সেনাদের হুমকি দিচ্ছে এবং মাঝে মাঝে গুলিও ছুঁড়ছে। অপরদিকে, হামাস অভিযোগ করছে, ইসরায়েলি বাহিনী যুদ্ধবিরতি রেখা থেকে অনেক দূরের আবাসিক এলাকাগুলোতে গুলিবর্ষণ ও হামলা চালাচ্ছে।
ফিলিস্তিনিরা যুক্তরাষ্ট্র ও আরবের মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন, ইসরায়েল যেন প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ করে। বুধবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে ২টি নকজাতকসহ ৫ শিশু ছিল। এসব ঘটনাকে ইসরায়েলের ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে হামাস।
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) ৮টি আরব ও মুসলিম দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে চুক্তি কার্যকরের পরও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানায় যাতে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে।
এরপর বুধবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা হামাসের হামলার জবাব দিচ্ছে মাত্র এবং কেবল তাদের সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছে। হামাসের কর্মকাণ্ড যুদ্ধবিরতিকে ক্ষুণ্ন করলেও ইসরায়েল তা বজায় রাখতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, হামাস আগের মতো প্রতারণামূলক কৌশল ব্যবহার করে পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ ও হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ ও যেকোনো নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে হয়।
অগ্রগতির ইঙ্গিত
ইসরায়েলে শেষ জিম্মির মরদেহ ফেরত পাওয়া, সীমিতভাবে রাফাহ ক্রসিং খোলা এবং গাজা শাসন ও পুনর্গঠন তদারকির জন্য একটি ফিলিস্তিনি কমিটি গঠনের ঘোষণা—এসব কার্যক্রম সহিংসতার মাঝেও যুদ্ধবিরতির চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
গত মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, এখন সময় এসেছে যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক শাসন এবং পুনর্গঠনের দিকে অগ্রসর হওয়ার।
এর জন্য ইসরায়েল ও হামাসকে এমন সব বড় ইস্যুতে সমাধানে আসতে হবে যেগুলোতে তারা তীব্রভাবে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল পুরোপুরি গাজা থেকে সরে যাবে কি না এবং হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে কি না সেসব বিষয়।
তবে রাজনৈতিক নেতারা এখনও যুদ্ধবিরতির কথা বললেও যুদ্ধ থেকে সরে না যাওয়ায় গাজায় হতাশা বাড়ছে।
গত শনিবার সকালে নামাজের সময় গাজা শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আতাল্লাহ আবু হাদাইয়েদ বাইরে ছুটে যান এবং দেখেন তার চাচাতো ভাইরা মাটিতে পড়ে আছে এবং চারপাশে আগুন জ্বলছে।
শরণার্থী শিবির থেকে তিনি বলেন, আমরা জানি না আমরা যুদ্ধে আছি না শান্তিতে।
৮৯ দিন আগে
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র ত্যাগ করবে না হামাস
একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র ত্যাগ না করার ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এ ঘোষণার মাধ্যমে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলমান আলোচনায় ইসরায়েলের একটি প্রধান দাবি প্রত্যাখ্যান করল সংগঠনটি।
স্থানীয় সময় শনিবার (২ আগস্ট) এ ঘোষণা দেয় হামাস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় হামাস এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
এর আগে উইটকফ বলেছিলেন, হামাস অস্ত্র ত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে তা সত্য নয় বলে দাবি হামাসের।
এদিকে, ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির লক্ষ্যে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান ওই আলোচনায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির কথা ছিল।
বিবিসি বলেছে, হামাস অস্ত্রত্যাগ না করলে কোনো চুক্তিতে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েল। অন্যদিকে হামাস বলছে, জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, পুরোপুরি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধের অধিকার ত্যাগ করা হবে না।
গত কয়েকদিনে বেশ কিছু আরব সরকারও হামাসকে নিরস্ত্র হয়ে গাজার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে আহ্বান জানিয়েছে।
শুক্রবার (১ আগস্ট) ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়ায়াল জামির সতর্ক করে বলেন, দ্রুত জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করতে আলোচনা ব্যর্থ হলে গাজায় যুদ্ধের কোনো বিরতি থাকবে না।
আরও পড়ুন: যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ‘ইতিবাচক’ সাড়া দেওয়ার দাবি হামাসের
এদিকে, ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ আগামী সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইসরায়েল সেপ্টেম্বরের মধ্যে যদি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ না করে, তবে তারাও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে।
বর্তমানে গাজায় চলমান দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ পর্যন্ত গাজায় অনাহারে অন্তত ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে ৯৩টি শিশু।
এমন পরিস্থিতিতে তেল আবিব সফরে রয়েছেন উইটকফ। হামাসের হাতে জিম্মিদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
উইটকফ বলেন, সংঘাতের অবসান ও সব জিম্মিকে বাড়ি ফিরিয়ে আনাকে কেন্দ্র করেই শান্তি প্রচেষ্টা হওয়া উচিত।
সফরের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং শুক্রবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলে এক বহুল সমালোচিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
আরও পড়ুন: অগ্রগতি ছাড়াই শেষ ইসরায়েল-হামাসের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের আলোচনা
জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসের থেকে এ পর্যন্ত খাবার নিতে গিয়ে অন্তত ১ হাজার ৩৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
নিহতদের অধিকাংশই ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) বিতরণকেন্দ্রের আশপাশে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি তাদের।
তবে ইসরায়েলে দাবি, এসব বিতরণকেন্দ্রের আশেপাশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে হামাস। ইসরায়েলি সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় না।
২৭৭ দিন আগে
‘গাজায় বোমার চেয়ে বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে ক্ষুধা’
ইসরায়েলি আগ্রাসনে ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকায় খাবার না পেয়ে আরও অন্তত ১০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে মধ্য গাজা থেকে সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম বলেছেন, ‘এখানে ক্ষুধা বোমার চেয়ে বিধ্বংসী হয়ে দাড়িঁয়েছে। বাসিন্দারা এখন পর্যাপ্ত খাবারের আশা করেন না। তারা যেকোনো খাদ্যবস্তুর জন্যই আশায় বুক বাঁধছেন।’
কাতারভিত্তিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এই প্রতিবেদক বলেন, ‘ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ফলে এখানকার মানুষ ধীরে ধীরে যন্ত্রণাদায়ক পাশবিক মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১১১ জন ফিলিস্তিনি খাদ্য সংকটে মারা গেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে জানিয়েছেন গাজার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
বুধবার (২৩ জুলাই) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪ ত্রাণপ্রত্যাশীসহ অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য মতে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২১টি শিশু অপুষ্টিতে ভুগে মারা গেছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন তারা ত্রাণ সরবরাহ করতে পারেনি। এর ফলেই অপুষ্টিতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। সংস্থাটি জানায়, গাজায় খাদ্য সরবরাহ পুনরায় চালু হলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
মার্সি কর্পস, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, রিফিউজি ইন্টারন্যাশনালসহ ১১১টি মানবিক সংস্থা এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ক্ষুধাস্ত্র’ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, উপত্যকায় ‘গণঅনাহার’ ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ হাজার হাজার টন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী গাজা সীমান্তের কাছেই ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে সাহায্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।
পড়ুন: ‘ফিলিস্তিনপন্থি’ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করল কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
গত মার্চে ইসরায়েল গাজায় ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত ২৬ মে থেকে ইসরায়েলের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচটি) নামে নতুন ত্রাণ বিতরণ কাঠামো চালু হয়েছে।
গাজায় চলমান চরম মানবিক সংকটের মধ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েল গাজায় খাদ্য সরবরাহ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যেখানে সীমান্তে ত্রাণবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও তা বিতরণের সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পরিচালক রস স্মিথ বলেন, ‘মে মাস থেকে ত্রাণ সাহায্য বিতরণকেন্দ্রে গুলিতে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর ফিলিস্তিন প্রতিনিধি রিক পিপারকর্ন বলেন, ‘ত্রাণ নিতে আসা ব্যক্তিদের ওপর বারবার হামলার ফলে গাজায় অবশিষ্ট কয়েকটি হাসপাতাল ‘বৃহৎ ট্রমা ওয়ার্ডে’ পরিণত হয়েছে।
তিনি জানান, খাদ্যাভাব এতটাই প্রকট যে শিক্ষক, সাংবাদিক, এমনকি স্বাস্থ্যকর্মীরাও স্বাভাবিক কাজ করতে পারছেন না।
গাজার আল-শিফা হাসপাতালের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক নূর শরাফ বলেন, ‘মানুষ কয়েকদিন ধরে কিছু খেতে পায়নি। অনেক সময় ডাক্তাররাও না খেয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন।’
এদিকে গাজা সিটিসহ বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলা অব্যাহত। সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনি সাংবাদিক— ফটোজার্নালিস্ট তামের আল-জা’আনিন ও সম্পাদক ওয়ালা আল-জাবারিকে হত্যা করা হয়েছে।
এর ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়ে ২৩১-এ দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে আল-জা’আনিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফটোজার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং ওয়ালা আল-জাবারি বিভিন্ন সংবাদপত্রে সম্পাদকীয়র দায়িত্বে ছিলেন।
পড়ুন: খাবার নিতে গিয়ে নিহত আরও ৯৩ ফিলিস্তিনি, ‘বর্বরতা’ বন্ধের আহ্বান পোপের
এমন পরিস্থিতিতে, গাজা যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে ইউরোপের পথে রওনা হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ও বন্দিমুক্তি আলোচনার বিষয়ে আলোচনা করবেন।
কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি ও অন্তত ৫০ বন্দির মুক্তি নিয়ে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে। তবে মার্চে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে এ নিয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
২৮৭ দিন আগে
যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ‘ইতিবাচক’ সাড়া দেওয়ার দাবি হামাসের
ইসরায়েলের সঙ্গে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। তবে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে আরও আলোচনার প্রয়োজন বলে দাবি করেছে তারা। শুক্রবার (৪ জুলাই) এক বিবৃতিতে হামাস এ তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে কি না, হামাসের সর্বশেষ বিবৃতি থেকে তা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিশ্চিত করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
তবে, হামাস বেশ কিছুদিন ধরে বলে আসছে, ২১ মাস ধরে চলা গাজা যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের নিশ্চয়তা ছাড়া সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে যেতে রাজি নয় তারা।
আরও পড়ুন: গাজার জনাকীর্ণ ক্যাফেতে ইসরায়েলের ৫০০ পাউন্ডের বোমা হামলা
যুদ্ধ বন্ধে চেষ্টা চলছে
গত মঙ্গলবার (১ জুলাই) এক বিবৃতিতে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ইসরায়েল ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে।’
তিনি হামাসকে দ্রুত সমঝোতায় আসার আহ্বান জানান। অন্যথায়, পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বলে হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের। এরপর, গতকাল (শুক্রবার) রাতে হামাস এক বিবৃতি দেয়, তারা মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ‘ইতিবাচক সাড়া’ দিয়েছে।
গোষ্ঠিটি আরও জানায়, যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তারা। তবে, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে হামাসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, আলোচনা সফল হলে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি শুরু হতে পারে। তবে কতজন ফিলিস্তিনি বন্দির বিনিময়ে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করা হবে এবং যুদ্ধবিরতির সময় গাজায় কী পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশ করবে, তা ঠিক করতে আলোচনা দরকার।
তিনি বলেন, হামাস জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে গাজায় ত্রাণের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি করেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যুদ্ধবিরতি শুরু হলে একই সঙ্গে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে আলোচনাও শুরু হবে। এ জন্য যুদ্ধবিরতির সময়সীমার ‘বেশি সময়’ প্রয়োজন হলেও ট্রাম্প তা বাড়ানোর নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগের আলোচনাগুলো যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মতবিরোধে ভেস্তে গেয়েছিল। নেতানিয়াহু যুদ্ধের প্রথম থেকেই বলে আসছে, ‘হামাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে যুদ্ধ থামানো হবে না।’
আরও পড়ুন: গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল: দাবি ট্রাম্পের
এদিকে, বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে হামাস ইতিবাচক মনোভাব’ দেখিয়েছে, এটি খুবই ভালো বিষয়। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তিনি জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি চুক্তি হতে পারে।
১৮ ফিলিস্তিনি নিহত
যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যেও ইসরায়েলি আগ্রাসন থামেনি। দোহাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার তথ্যমতে, শুক্রবার মধ্যরাত থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এর আগে, শুক্রবার সকালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজায় অন্তত ১৫ ফিলিস্তিনি নিহত হন। এদিকে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ক্ষুধাস্ত্র’ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে অপেক্ষারত ক্ষুধার্ত ও যুদ্ধপীড়িত বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় হাসপাতালগুলোর বরাতে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, শুক্রবার সারাদিনে ত্রাণ নিতে গিয়ে অন্তত ২০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, গত এক মাসে গাজায় ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ৬১৩ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগ নিহত হয়েছেন ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত ২৬ মে থেকে ইসরায়েলের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচটি) নামে নতুন ত্রাণ বিতরণ কাঠামো চালু হয়েছে।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন: মুসলমানদের মধ্যে আশা জাগাচ্ছেন মামদানি
বিতর্কিত এই ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের সাবেক এক নিরাপত্তা কর্মী বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমি দেখেছি যে আমার সহকর্মীরা একাধিকবার নিরস্ত্র ও ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়েছে। এমনকি মেশিনগানের ব্যবহারও করতে দেখেছি। অথচ, তারা কোনো ধরনের হুমকি ছিলেন না।’
তিনি জানান, ‘একবার একটি নিরাপত্তা টাওয়ার থেকে একজন নিরাপত্তাকর্মী কয়েকজন নারী, শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। যার কারণ তারা কেন্দ্র থেকে ফেরার সময় ধীরগতিতে হাঁটছিলেন!’
৩০৬ দিন আগে
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ৯৪ ফিলিস্তিনি নিহত
গাজায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলি ও বিমান হামলায় অন্তত ৯৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন জরুরি মানবিক সহায়তা পাওয়ার আশায় অপেক্ষমাণ ছিলেন।
নিহতের এই সংখ্যা বুধবার রাত ও বৃহস্পতিবার মিলিয়ে গণনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
রাতের বেলা দক্ষিণ গাজায় একটি তাঁবু শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুতদের ওপর হামলা চালানো হলে বহু পরিবারের সদস্য নিহত হয়। এতে একটি পরিবারেরই ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর জানা গেছে, যাদের মধ্যে ১২ বছরের কম বয়সী ছয় শিশুও ছিল।
ওই ঘটনার পর সরেজমিনে নিহত সন্তান ও নাতি-নাতনিদের লাশের পাশে বসে বিলাপ করতে দেখা যায় ইন্তেসার আবু আসসি নামের এক নারীকে। বিলাপ করতে করতে তিনি বলছিলেন, ‘আমার সন্তান, আমার সন্তান... আমার প্রিয়জন।’
খান ইউনিস শহরের নাসের হাসপাতালের মর্গের মেঝেতে চাদরে মোড়ানো এক শিশুকন্যার কপালে চুমু খেতে দেখা যায় আরেক নারীকে।
গাজা মধ্যাঞ্চলে আল-আকসা শহিদ হাসপাতালের মর্গে ছয় বছর বয়সী বোনের লাশের পাশে বসে ছিল তার ছোট ভাই। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় একটি খাবারের দোকানের পাশে হামলায় তার পরিবারের আরও একজনসহ মোট আটজন নিহত হন।
অন্যদিকে, গাজা সিটিতে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেওয়া একটি স্কুলে চালানো আরেকটি হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হন।
এই সব হামলার পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই সহায়তা নিতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আরও বহু ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন।
গাজা মানবাধিকার সংস্থা (জিএইচএফ) পরিচালিত খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে যাওয়ার সময় পথে গুলিতে পাঁচজন নিহত হন।
বার্তা অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) সাংবাদিকদের তথ্য অনুসারে, এই সংস্থাটি (জিএইচএফ) একটি নতুন ও গোপনীয় মার্কিন সংস্থা, যারা ইসরায়েলের সমর্থনে গাজাবাসীর জন্য খাদ্য সরবরাহ করছে।
আরও পড়ুন: গাজায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল: দাবি ট্রাম্পের
এ ছাড়াও জাতিসংঘের ত্রাণ বহনকারী ট্রাকের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় গাজাজুড়ে বিভিন্ন স্থানে আরও ৪০ জন নিহত হন বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এপি জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা প্রায়ই ত্রাণ নিতে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জাতিসংঘের ট্রাক আসার অপেক্ষায় থাকা লোকদের দিকেও গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত মে মাসে বিতরণকেন্দ্র খোলার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন।
বিতরণকেন্দ্রগুলোর দিকে যাওয়ার পথে মোতায়েন থাকা ইসরায়েলি সেনাদের দাবি, তারা কেবল ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে অথবা যারা তাদের খুব কাছাকাছি আসে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তায় সশস্ত্র মার্কিন ঠিকাদাররাও নিয়োজিত রয়েছে জানিয়েছে তারা।
ক্ষুধাকে ‘যুদ্ধের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল!
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, গাজার সাধারণ নাগরিকদের অনাহারে রাখাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল, যা চলমান গণহত্যারই অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জিএইচএফের বিতরণব্যবস্থা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা মাত্র। কারণ নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ওই ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা ছাড়া জাতিসংঘের পাঠানো ত্রাণ খুবই সীমিত পরিমাণে গাজায় ঢুকতে দিচ্ছে ইসরায়েল।
বিবৃতি অনুসারে, ‘প্রাণঘাতী, অমানবিক ও ব্যর্থ একটি সামরিক সহায়তা কাঠামো বজায় রেখে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ খাদ্যান্বেষণে থাকা নিঃস্ব ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু-ফাঁদে ফেলছে।’
অবশ্য অ্যামনেস্টির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই সংস্থাটি হামাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের সব ধরনের অপপ্রচার অনুসরণ করছে।
ইসরায়েল চায়, জাতিসংঘের বিদ্যমান মানবিক সহায়তা নেটওয়ার্কের পরিবর্তে জিএইচএফ-ই হোক ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রধান ত্রাণ বিতরণকারী সংস্থা।
তাদের দাবি, জাতিসংঘের সহায়তার বড় অংশ হামাস ছিনিয়ে নেয়, যদিও ইসরায়েলের এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা।
জিএইচএফ-কে প্রত্যাখ্যান করে সংস্থাগুলো বলছে, এই সংস্থাটি ফিলিস্তিনিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা সরবরাহে ব্যর্থ। এটি ফিলিস্তিনিদের বিপন্ন করে ইসরায়েলের লক্ষ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার মাত্র।
আরও পড়ুন: ত্রাণ সহায়তা নিতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছে গাজাবাসী
চলতি বছর ইসরায়েল আড়াই মাসের বেশি সময় গাজায় খাদ্যসহ সব ধরনের ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। আগে থেকেই ভুগতে থাকা গাজাবাসীকে আরও বেশি অনাহারের দিকে ঠেলে দিয়েছে এই কর্মকাণ্ড। ইসরায়েলের দাবি, এতে হামাসকে চাপ দিয়ে বন্দিমুক্তির আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা সহজ হবে।
মার্চে অবরোধ কিছুটা শিথিল করে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গাজায় ত্রাণ সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিরক্ষা সংস্থা সিওজিএটি বুধবার জানায়, ১৯ মে থেকে এখন পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে।
এই হিসাব অনুযায়ী, দিনে গড়ে মাত্র ২৮টি ট্রাক সেখানে পাঠানো হয়েছে, যেখানে সহায়তাকর্মীরা দিনে কয়েকশ’ ট্রাক প্রয়োজন বলে দাবি করে আসছেন।
তবে নিজেদের কার্যক্রমের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে জিএইচএফ বলেছে, তারা ৫ কোটি ২০ লাখের বেশি খাবারের সমতুল্য সহায়তা দিয়েছে। প্রতিটি খাবারের প্যাকেটে ডাল, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থাকে, যা একজনের ৫০ বেলার খাবারের সমান।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। লোকজন হুড়োহুড়ি করে খাবারের বক্স ছিনিয়ে নেয়। কেউ একাধিক নেয়, আবার অনেককেই ফিরতে হয় খালি হাতে। পরে এসব বক্স বাজারেও মেলে। সেখানে থেকে কিনতে গেলে হাঁকা হয় আকাশছোঁয়া দাম।
৩০৭ দিন আগে