মোজতবা খামেনি
খামেনির ছেলেই কি হচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা?
ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিবেচিত হয়ে আসছেন। এমনকি গত সপ্তাহে যুদ্ধ শুরুর দিকে ইসরায়েলি হামলায় তার বাবার মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই এই গুঞ্জন ছিল। তবে তিনি আগে কোনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেননি।
ইসলামিক রিপাবলিকের ভেতরে রহস্যময় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত মোজতবা খামেনিকে গত শনিবারের পর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সেদিন সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ৮৬ বছর বয়সী বাবা নিহত হন। ওই হামলায় মোজতবার স্ত্রী জহরা হাদ্দাদ আদেলও নিহত হয়েছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, মোজতবা খামেনি এখনও বেঁচে আছেন এবং ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা অব্যাহত থাকায় তিনি আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানায়নি।
বিমান হামলার পর আলোচনায় খামেনিপুত্র
বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম বারবার আলোচনায় আসছে। যদিও অতীতে এই বিষয়টির সমালোচনা করা হয়েছিল এই বলে যে, এটি ইরানের সাবেক বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের একটি ধর্মতান্ত্রিক সংস্করণ তৈরি করতে পারে।
কিন্তু বর্তমানে তার বাবা এবং স্ত্রীকে কট্টরপন্থিরা আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শহিদ হিসেবে গণ্য করায়, ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমদের কাছে মোজতবার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্যানেলই দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে।
যিনিই নেতা হোন না কেন, তিনি বর্তমানে যুদ্ধে লিপ্ত ইরানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ পাবেন এবং সেই সঙ্গে পাবেন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
মার্কিনভিত্তিক চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠী ‘ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান’-এর মতে, মোজতবা খামেনি তার বাবার প্রশাসনে অনেকটা ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনির ছেলে আহমেদ খোমেনির মতো ভূমিকা পালন করতেন, যা ছিল সহকারী, বিশ্বস্ত সহযোগী, দ্বাররক্ষক এবং ক্ষমতাধর মধ্যস্থতাকারীর এক সংমিশ্রণ।
ভিন্নমতের মাঝে জন্ম
১৯৬৯ সালে মাশহাদ শহরে মোজতবা খামেনির জন্ম। এটি ছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রায় ১০ বছর আগে, যখন তার বাবা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন।
আলি খামেনির জীবনীতে উল্লেখ আছে, একবার শাহের গোপন পুলিশ বাহিনী সাভাক তাদের বাড়িতে ঢুকে এই আলেমকে মারধর করে। খামেনির সন্তানরা তখন ঘুম থেকে জেগে উঠলে মোজতবা ও অন্যদের বলা হয়েছিল যে তাদের বাবা ছুটিতে যাচ্ছেন।
প্রয়াত খামেনির ভাষ্যমতে, তখন আমি বলেছিলাম, মিথ্যে বলার দরকার নেই। আমি তাদের সত্যিটা বলেছিলাম।
শাহের পতনের পর খামেনি পরিবার তেহরানে চলে আসে। মোজতবা পরবর্তীতে ইরান-ইরাক যুদ্ধে রেভল্যুশনারি গার্ডের হাবিব ইবনে মাজাহির ব্যাটালিয়নের হয়ে যুদ্ধ করেন। এ ইউনিটের অনেক সদস্যই পরে খামেনি পরিবারের সমর্থনে বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা পদে আসীন হন।
১৯৮৯ সালে তার বাবা সর্বোচ্চ নেতা হন। এরপর মোজতবা খামেনি এবং তার পরিবার ইরানের অনেক রাষ্ট্রীয় শিল্প এবং শাহের একসময়ের অন্যান্য সম্পদ থেকে তহবিল সংগ্রহকারী ফাউন্ডেশনগুলিতে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ডলার এবং ব্যবসায়িক সম্পদের মালিকানা পান।
বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্ষমতার উত্থান
তেহরানে বাবার কার্যালয়ে কাজ করার মাধ্যমেই মোজতবার নিজস্ব ক্ষমতার উত্থান ঘটে। ২০০৮-০৯ সালের দিকে উইকিলিকস কর্তৃক প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তায় মোজতবাকে রাজপোশাকের পেছনের আসল ক্ষমতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একটি নথিতে দাবি করা হয়, মোজতবা স্বয়ং তার বাবার ফোন ট্যাপ করতেন। তার প্রধান দ্বাররক্ষক হিসেবে কাজ করতেন এবং দেশের ভেতরে নিজস্ব ক্ষমতার বলয় তৈরি করছিলেন।
২০০৮ সালের একটি নথিতে বলা হয়েছিল, মোজতবাকে শাসনব্যবস্থার ভেতরে একজন সক্ষম ও শক্তিশালী নেতা এবং ব্যবস্থাপক হিসেবে দেখা হয়, যিনি ভবিষ্যতে জাতীয় নেতৃত্বের অন্তত একটি অংশের উত্তরাধিকারী হতে পারেন; তার বাবাও হয়তো তাকে সেই দৃষ্টিতেই দেখেন। তবে সেখানে তার থিওলজিক্যাল বা ধর্মীয় যোগ্যতার অভাব এবং বয়সের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের মতে, মোজতবা খামেনি রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্স এবং বাসিজ বাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন—যারা গত জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেছিল।
২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বাবার আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ দমনমূলক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোজতবার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা এখন ঝুঁকির মুখে
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা আগে মাত্র একবারই ঘটেছে। প্রথম নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ৮৬ বছর বয়সে মারা যাওয়ার পর আলি খামেনি দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
এখন নতুন নেতা এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন যখন ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানের পারমাণবিক হুমকি ও সামরিক শক্তি নির্মূল করতে চাইছে। একইসঙ্গে তারা আশা করছে, ইরানি জনগণও হয়তো এই ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
ইরানের জটিল ক্ষমতা ভাগাভাগির এই ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতাই হলেন কেন্দ্রবিন্দু এবং রাষ্ট্রের সব বিষয়ে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি সামরিক বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান কমান্ডার। এই রেভল্যুশনারি গার্ড কেবল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রতিরোধের অক্ষ এর নেতৃত্বই দেয় না, বরং ইরানের অর্থনীতি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের ওপরও তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
১ দিন আগে