৩৯টি দেশের অভিবাসীদের ওপর প্রভাব ফেলা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অভিবাসন নীতি বাতিল করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল বিচারক। ওই নীতির ফলে বহু দেশের অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান ও প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৫ মে) এক শুনানিতে প্রধান জেলা বিচারক জন ম্যাককনেল জুনিয়র ওই নীতিটি বাতিল করে রায় দেন।
রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অগণিত অভিবাসীদের জীবনকে ‘অনির্দিষ্ট আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে’ ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা (ইউএসসিআইএস) আইন উপেক্ষা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রায়ে বিচারক বলেন, ইউএসসিআইএস এমন আইনি ও নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার দাবি করেছে, যা তাদের নেই। পাশাপাশি তারা প্রয়োজনীয় যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আবেদনকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করেনি। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সংস্থাটি এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা প্রকৃতপক্ষে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবকে আড়াল করে।
তিনি বলেন, আইনের ভাষায় ইউএসসিআইএসের এসব পদক্ষেপ বেআইনি, খামখেয়ালি ও অযৌক্তিক।
তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস)।
গত বছর দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর প্রণীত ওই নীতির আওতায় আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ৩৯টি দেশের অভিবাসীদের আশ্রয়, কাজের অনুমতি, গ্রিন কার্ড ও নাগরিকত্বসহ বিভিন্ন আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কার্যত স্থগিত রাখা হয়েছিল।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সংগঠন ডেমোক্রেসি ফরোয়ার্ডের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্কাই পেরিম্যান বলেন, ‘এই রায় একটি মৌলিক নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে—ফেডারেল সরকার আইনি অভিবাসন পথ বন্ধ করতে পারে না বা মানুষ কোথা থেকে এসেছে তার ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘এসব অবৈধ নীতি দেশজুড়ে পরিবার, কর্মী, আশ্রয়প্রার্থী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তারা প্রত্যেকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়েছিলেন; কাজ করতে পারছিলেন না, আইনি সুরক্ষা পাচ্ছিলেন না এবং নিজেদের জীবন নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতেও পারছিলেন না।’
ইউএসসিআইএস যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত আবেদন অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছে। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তিদের আশ্রয় আবেদনও মঞ্জুর করে থাকে। তবে সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের আশ্রয় আবেদনের বিষয়ে অভিবাসন বিচারকেরা সিদ্ধান্ত দেন। ফলে বর্তমান রায় তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেভ দালাল-ধেইনি বলেন, এই রায়ের ফলে শুধু মামলার বাদীরা নন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেশগুলোর ইউএসসিআইএসে বিচারাধীন সব আবেদনকারী উপকৃত হবেন।
তিনি বলেন, ‘আইনি অভিবাসনের পথগুলো যেন খোলা থাকে এবং ইউএসসিআইএস যেন কংগ্রেসের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী আবেদনগুলো নিষ্পত্তির দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিজয়।’
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও অভিবাসনের মানদণ্ড কঠোর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য অন্যায্য ভ্রমণ ও অভিবাসন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের ছুটির মধ্যে ন্যাশনাল গার্ডের দুই সেনাকে গুলি করার ঘটনায় একজন আফগান নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা এই নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়াবে।
মামলাটি খারিজ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে একটি আবেদন করা হয়েছিল। সরকার তাদের আবেদনে যুক্তি দিয়েছিল, অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে কংগ্রেস নির্বাহী শাখাকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং বিভিন্ন সুবিধা প্রদান বা প্রত্যাহারের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। তবে আদালত সেই আবেদন নাকচ করে দেয়।
রায়ের পর অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, ‘এই রায় একটি শক্তিশালী নজির স্থাপন করল যে প্রশাসন কংগ্রেসের তৈরি করা আইনকে উপেক্ষা করতে পারে না এবং ডিক্রি জারির মাধ্যমে জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসন সুবিধাগুলোকে খামখেয়ালিভাবে বন্ধ করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘সৌভাগ্যবশত এটি এখনও আইনের দেশ এবং যারা আমেরিকার মূল্যবোধকে ধারণ করেন, তাদের এই ধরনের বৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারী নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার এবং প্রতিহত করার অধিকার রয়েছে।’
আফগান পুনর্বাসন সহায়তা জোট আফগানইভ্যাকের (#AfghanEvac) প্রধান ও মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য শন ভ্যানডাইভার বলেন, ‘টি আইনের শাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো আফগান মিত্রসহ অন্যান্য অভিবাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।’
ভ্যানডাইভার বলেন, ‘এই সপ্তাহেই ডালাস ও ফোর্ট ওর্থে আমরা এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা কাজের অনুমতি নবায়নে বিলম্বের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ছিলেন। অনেক পরিবার তাদের শিক্ষা, ভ্রমণ এবং বাড়ি কেনার পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তারা জানত না যে তাদের আবেদন কবে নিষ্পত্তি হবে। এমনকি নাগরিকত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেকের আবেদনও কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে ছিল।’