সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক
সড়ক সংস্কারের বলি সুনামগঞ্জের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মূল্যবান গাছ
সুনামগঞ্জ বনবিভাগ ১৫টি লটে নানা প্রজাতির ৬ হাজার ৪০৯টি মূল্যবান কাঠ গাছ পানির দরে বিক্রি করে দিয়েছে। সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক চার লেন প্রকল্পের কাজের সুবিধার্থে রাস্তা প্রশস্ত করতে গাছগুলো কাটা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সড়কের সংস্কারের জন্যও একই প্রক্রিয়ায় গাছ কাটা হচ্ছে।
কাঠ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সর্বনিম্ন দর ধরলেও এই গাছের মূল্য অন্তত ২৫ কোটি টাকা হবে। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে প্রায় ২৫ কোটি টাকার মূল্যবান এসব গাছ মাত্র ১ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ৩৭৫ টাকায় নিলাম দেওয়া হয়েছে। এখন গাছের বড় বড় ফালিগুলো রাতের আঁধারে কার্গো ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সুনামগঞ্জ বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মেহগনি, আকাশমনি, জারুল, কড়াই, রেইনট্রিসহ কয়েকটি প্রজাতির গাছ সড়কের দুই পাশে লাগানো হয়েছিল। এ গাছগুলোর বয়স প্রায় ১৫-৩৫ বছর পর্যন্ত। তাই বয়স অনুপাতে প্রতিটি গাছই পরিপক্ব ও মূল্যবান কাঠের উপযোগী। বর্তমান বাজার দরে প্রতিটি গাছের মূল্য ৩০ হাজার থেকে অন্তত ১ লাখ টাকা হবে। তবে গড়ে প্রতিটি গাছের মূল্য কম করে হলেও ৪০ হাজার টাকা হবে বলে জানিয়েছেন কাঠ ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সুনামগঞ্জ-সিলেট-পাগলা-আউশকান্দি সড়ক, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কসহ আঞ্চলিক মহাসড়ক ও স্থানীয় সড়কগুলোর সংস্কার কাজ চলছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও পাগলা-আউশকান্দি সড়কে প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। রাস্তা প্রশস্তকরণের সুবিধার্থে সরকার এসব সড়কের গাছ নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।
বন বিভাগ জরিপ করে ১৫টি লটে ৬ হাজার ৪০৯টি গাছের দরপত্র আহ্বান করে। এর মধ্যে ১১টি লটে নিলাম দরপত্র পায় টাঙ্গাইল নতুন বাজার এলাকার মেসার্স শিমুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রহিম মিন্টু এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বড়গাছ এলাকার বাসিন্দা মোসাইদ আলী পান চারটি লটের গাছ।
মোসাইদ আলীকে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে চিঠি দেন সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবীর। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মেসার্স শিমুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রহিম মিন্টুকে ১১টি লটের নিলামে গাছের মূল্য বাবদ ৮৯ লাখ ১১ হাজার ৬২৫ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে চিঠি দেন সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান। ১৫টি লটে নিলামকৃত এই মূল্যবান কাঠগাছের দাম কম করে হলেও ২৫ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, সুনামগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে ইকবাল নগর পর্যন্ত ২টি লটে ৬৮০টি গাছ, টুকের বাজার থেকে নিয়ামতপুর পর্যন্ত ৫টি লটে ১ হাজার ৯২৩টি গাছ, শান্তিগঞ্জ থেকে সুলতানপুর-উজানীগাঁও পর্যন্ত ১টি লটে ৩২২টি গাছ, জগন্নাথপুর-মমিনপুর-মজিদপুর পর্যন্ত ১টি লটে ৭২০টি গাছ, একই সড়কের হাবিবনগর থেকে ৭ নম্বর সেতু পর্যন্ত ১টি লটে ২২৮টি গাছ, জগন্নাথপুরের ইছগাঁও রাণীগঞ্জ থেকে ১টি লটে ১ হাজার ২৫২টি গাছ, কুশিয়ারা সেতু থেকে ইনাতগঞ্জ পর্যন্ত ১টি লটে ৪০০টি গাছ, সৈয়দপুর-শাহারপাড়া রোডে তিনটি লটে আরও ৮৮৪টি গাছ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের গাছগুলো ১৯৯৩ সাল থেকে এবং পাগলা আউশকান্দি সড়কে গাছগুলো ২০০৯ সালে লাগানো হয়। পরিবেশবিদরা জানান, বর্তমানে তিনটি সড়কের প্রতিটি গাছই পরিপক্ব ও কাঠের জন্য মহামূল্যবান।
কাঠ ব্যবসায়ীরা জানান, ১০-১৫ বছর বয়সী একটি মেহগনি গাছের গড় বাজারদর ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু সুনামগঞ্জ বনবিভাগ ১৫-৩০ বছর বয়সী গাছগুলো মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে নিলামে বিক্রি করে দিয়েছে। সরকারি মূল্য তালিকার দোহাই দিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে মনগড়া জরিপ করে মাত্র ৭০০ থেকে ২৫০০ টাকা ঘনফুট দরে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিমুল এন্টারপ্রাইজ সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের ৩৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গাছের প্রতিটি মাত্র ১ হাজার ৩৯১ টাকা দরে কিনে নেয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, এই সড়কের গাছগুলো বড় ও বেড়ও বেশি। সড়কের প্রতিটি গাছের দাম ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত হবে বলে জানিয়েছেন কিছু ব্যবসায়ী। কিন্তু বনবিভাগ ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে মাত্র ৮৯ লাখ ১১ হাজার ৬২৫ টাকায় নিলামে বিক্রি করে দেয়। এভাবে পানির দামে গাছগুলোকে নিলামে বিক্রি করে দিয়ে সরকারের রাজস্বের ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের মোসাইদ আলীও প্রায় ১৫ বছর বয়সী পরিণত দেড় হাজারেরও অধিক কাঠগাছ মাত্র ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকায় কিনে নেন। হাজারেরও নিচে পড়েছে প্রতিটি গাছের মূল্য। এভাবে সরকারের কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানই ৮০ ভাগের বেশি গাছ কেটে নিয়ে গেছে।
‘হাওর বাঁচাও’ আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। তাছাড়া বন বিভাগ প্রচলিত বাজারদর অনুসরণ না করে, গাছগুলোর বেড় যথাযথভাবে না মেপে জরিপ করে ঠিকাদারদের স্বার্থ দেখে প্রতিবেদন জমা দিয়ে সরকারকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ এই গাছের টাকা দিয়েই সরকার পুরো সড়কটির উন্নয়নকাজ করে দিতে পারত।
সুনামগঞ্জ হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান রাসেল বলেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক, পাগলা-আউশকান্দি, সুনামগঞ্জ-নিয়ামতপুর সড়কে গাছের নিলামের নামে দুর্নীতি হয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকার গাছ মাত্র ১ কোটি টাকায় নিলাম দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে বন বিভাগ ও ঠিকাদারের যোগসাজশ রয়েছে। ইউনূস সরকারের সময়ের এই ভয়াবহ দুর্নীতির তদন্ত হওয়া উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স’মিল মালিক বলেন, প্রতিটি গাছের গড় মূল্য অন্তত ৪০ হাজার টাকা হবে। লাকড়িও হবে কোটি টাকার। কিন্তু বনবিভাগ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে।
মেসার্স শিমুল এন্টারপ্রাইজের পরিচালক আব্দুর রহিম মিন্টুর প্রতিনিধি শামীম আহমদ বলেন, নিলাম হয়েছে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। আমাদের প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে দরপত্র পেয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। সরকারি দর অনুযায়ীই আমরা নিলাম পেয়েছি।
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আতিকুর রহমান বলেন, আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি। নিলাম প্রক্রিয়া, মূল্য নির্ধারণ, ওয়ার্ক অর্ডার প্রদান কোনো কাজেই আমি যুক্ত ছিলাম না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন। তবে যা কিছু হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্তেই হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের মোবাইল নম্বরে কল দিলে তিনি তা ধরেননি।
৬ ঘণ্টা আগে